সাশ্রয় নিউজ ★কলকাতা : প্রায় এক দশক পর ফের একবার মুখোমুখি হলেন দুই বাংলার দুই শীর্ষ প্রতিনিধি। সোমবার বিকেলে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হলেন নতুন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ (M Riaz Hamidullah)। প্রায় ৯ বছর পর এই সাক্ষাৎ কূটনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এই বৈঠক শুরু হয়। উপস্থিত ছিলেন কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের কার্যনির্বাহী ডেপুটি হাইকমিশনার মহম্মদ আশরাফুল সিকদার (Mohammad Ashraful Sikder) ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ (Manoj Pant)। যদিও বৈঠকটি ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সরকারি তরফে, তবে বৈঠকের সময়সীমা এবং প্রেক্ষাপট দেখে তা নিছক সৌজন্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বলেই অনুমান করছে প্রশাসনিক মহল।
সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস (Mohammad Yunus)-এর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। পাশাপাশি, দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। বৈঠকের শেষে বাংলাদেশের হাইকমিশনের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, শাড়ি ও আরও কিছু স্মারক। উপহার গ্রহণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের সম্পর্ক। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস সব কিছুতেই মিল। এই বন্ধন আরও গভীর হোক, এটাই আমাদের কামনা।”
উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৬ সালে তৎকালীন বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোয়াজ্জেম আলি (Mouazzem Ali)-র সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর। সেই বৈঠককেও দুই পক্ষ ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলেই ব্যাখ্যা করেছিল। কিন্তু তারপর দীর্ঘ ৯ বছরে আর কোনও বৈঠক হয়নি দুই পক্ষের মধ্যে। তবে বর্তমান বৈঠকের তাৎপর্য অনেকটাই ভিন্ন। কারণ, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রদবদল ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের সংবেদনশীলতা এখন অনেক বেশি। শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের পতনের পর বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে দেশের প্রশাসনিক দায়িত্ব রয়েছে। সেই সরকারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ মহম্মদ ইউনূস।অন্যদিকে, সম্প্রতি বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে (Sirajganj) অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) পৈতৃক ভিটেতে হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতী। এই ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরব হন ও সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)-কে চিঠি লিখে জানান। তিনি লেখেন, “রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলার নন, তিনি সমগ্র উপমহাদেশের ঐতিহ্য। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থান আক্রান্ত হওয়া অত্যন্ত লজ্জার।” এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সাক্ষাৎ যথেষ্ট বার্তাবহ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। যদিও এদিনের বৈঠকে কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি, তবে মুখ্যসচিবের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে আলোচনা শুধুই সৌজন্যের স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না।
কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের কার্যনির্বাহী ডেপুটি হাইকমিশনার আশরাফুল সিকদার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “এটি একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ। দুই বাংলার মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই বিশেষ। আমরা সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করতে চাই।” তবে বৈঠকে বাণিজ্য, জলসীমা ব্যবহার, সীমান্তবর্তী সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও শিক্ষা কর্মসূচি নিয়েও কিছু আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক নিছক প্রটোকল নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পরিবর্তনের পর ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভূগোল, ভাষা ও ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক আলাদা। সব মিলিয়ে নবান্নের এই বৈঠক দুই বাংলার সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। এই প্রাথমিক সৌজন্য সাক্ষাৎ ভবিষ্যতের বৃহত্তর কূটনৈতিক সংলাপের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠবে কিনা, সে দিকে এখন নজর সকলের।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shashi Tharoor on PM Modi | ‘ভারতের প্রধান সম্পদ’, মোদীর প্রশংসায় সরব কংগ্রেসের শশী থারুর




