Pat Cummins | অপরাজেয় কামিন্স, লর্ডসে ইতিহাস গড়লেন অজি অধিনায়ক

SHARE:

পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ★ লন্ডন : লন্ডনের ঐতিহাসিক লর্ডস মাঠে যখন প্রতিটি দর্শক নিঃশ্বাস চেপে ধরে দেখছিল টেস্টের উত্তেজনার নাটক, তখন সেই উত্তেজনাকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন প্যাট কামিন্স (Pat Cummins)। যেন একাই যুদ্ধ জিতে নিলেন এবং একাই গড়লেন নতুন ইতিহাস। দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে ধ্বংস করে দিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (World Test Championship) ফাইনালকে একপেশে করে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার (Australia) এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অধিনায়ক। দ্বিতীয় দিনের সকালটা যখন ভোরের আলোয় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার ড্রেসিংরুমে তখন আশা, পরিকল্পনা আর পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন। প্রথম দিনেই ধাক্কা খাওয়া প্রোটিয়াদের (Proteas) মধ্যে তখনও ছিল লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সে আত্মবিশ্বাসকে মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে চুরমার করে দিলেন কামিন্স।

প্রথম দিনের এক উইকেটের পর দ্বিতীয় দিনে লর্ডস যেন কামিন্সের ব্যক্তিগত স্টেজে পরিণত হল। ম্যাচের ৩৬ রানে টেম্বা বাভুমা (Temba Bavuma)-কে ফিরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল ধ্বংসযজ্ঞ। এরপর একে একে ডেভিড বেডিংহ্যাম (David Bedingham), কাইল ভেরিন (Kyle Verreynne), মার্কো জানসেন (Marco Jansen), কাগিসো রাবাডা (Kagiso Rabada) সবাই ছিটকে গেলেন কামিন্সের আগুনে স্পেলের মুখে। একসময় স্কোরবোর্ডে যা ছিল সম্ভাবনা, তা এক মুহূর্তেই পরিণত হল ধ্বংসস্তূপে। মাত্র ২৮ রান দিয়ে ৬ উইকেট। এটা শুধু এক পরিসংখ্যান নয়, এটা একটা বার্তাও। কামিন্স যেন বললেন, ‘আমি এখানে নেতৃত্ব দিতে এসেছি, শুধু মাঠে নয়, প্রতিটি মনোজগতে।’ ক্রিকেটের ইতিহাসে অধিনায়কের এমন দায়িত্বপূর্ণ, মগ্ন আর আগ্রাসী পারফরম্যান্স খুব কমই দেখা গেছে। এই অনবদ্য স্পেলের ফলে কামিন্স তাঁর টেস্ট কেরিয়ারে ছুঁয়ে ফেললেন ৩০০ উইকেটের মাইলফলক। একজন ফাস্ট বোলার, যাঁর হাতে বল মানেই প্রতিপক্ষের ঘুম উধাও, তিনি যখন অধিনায়ক হিসেবে এমন সাফল্য এনে দেন, তখন তা শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রেই নয়, নেতৃত্বের পাঠশালাতেও জায়গা করে নেয়।

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে এমন নজির আগে ছিল না। ফাইনালে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ চার উইকেটের রেকর্ড ছিল বাহরাইনের (Bahrain) অধিনায়ক সরফরাজ আলির (Sarfraz Ali)। ২০২২ সালের চতুর্দেশীয় সিরিজে তিনি এমন কীর্তি গড়েছিলেন। তারও অনেক আগেই, ১৯৯৩ সালে উইলিস ট্রফির (Wills Trophy) ফাইনালে পাকিস্তানের (Pakistan) অধিনায়ক ওয়াসিম আক্রাম (Wasim Akram) চার উইকেট নিয়ে অনন্য নজির গড়েছিলেন। এবার সেই রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেলেন কামিন্স, সেটাও ছয় উইকেট নিয়ে!এখানেই থেমে থাকেননি কামিন্স। অধিনায়ক হিসাবে টেস্টে সবচেয়ে বেশি পাঁচ উইকেট নেওয়ার তালিকায় ভারতীয় কিংবদন্তী বিষেণ সিং বেদী (Bishan Singh Bedi)-কেও তিনি টপকে গিয়েছেন। এই তালিকায় কামিন্স এখন দ্বিতীয় স্থানে, স্বদেশীয় রিচি বেনো (Richie Benaud)-র পাশে। তাঁদের দু’জনেরই নামের পাশে আছে নয়বার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন অধিনায়ক, বিশ্বকাপজয়ী দলনেতা ইমরান খান (Imran Khan)। ইকরানের ঝুলিতে রয়েছে মোট ১২টি পাঁচ উইকেটের ইনিংস।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে প্যাট কামিন্স এখন শুধুই একজন সফল ফাস্ট বোলার নন, তিনি একজন বিশ্ব ক্রিকেটের আলোচিত অধিনায়ক। অস্ট্রেলিয়া যতবার পিছিয়ে পড়ে, কামিন্স তখন ততবার সামনে এসে দাঁড়ান। যেন বলে দেন, ‘আমি আছি, আমি লড়ব, আমরাই জিতব।’ তাঁর নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়া হারের অর্থ জানে না বললেই চলে। তাঁরা শিখেছে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়, আর কীভাবে সেই চাপকেই শক্তিতে পরিণত করতে হয়।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে এই জয় যদি অস্ট্রেলিয়ার মুকুটে একটি নতুন পালক হয়, তবে কামিন্সের এই পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে সেই মুকুটের হীরে। প্রতিটি বলে যেমন ছিল নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, তেমনি ছিল মানসিক দৃঢ়তা। ক্রিকেটে একেকটা মুহূর্ত তৈরি করে ইতিহাস, আর লর্ডসের এই সকাল যেন গড়ে দিল কামিন্স-যুগের এক অমোঘ স্মারক। বিশ্ব ক্রিকেট এখন একটি প্রশ্নেই উত্তাল, এই কামিন্সকে থামাবে কে? দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে এমনভাবে ভেঙে দেওয়া, সেটাও ফাইনালের মতো হাই প্রেশার ম্যাচে, তা নিঃসন্দেহে বিশ্ব ক্রিকেটের বাকিদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ভারত হোক বা ইংল্যান্ড, নিউ জিল্যান্ড হোক বা পাকিস্তান, সবার মনে এখন হয়তো একটাই কথা: কামিন্স আসছে! অবশ্য শুধু উইকেটের সংখ্যায় নয়, কামিন্সের পারফরম্যান্সে ছিল কৌশলের ছাপও। পিচের বাউন্স, উইকেটের গতি, প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের মানসিক দুর্বলতা—সবকিছু নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি যে বোলিং করলেন, তাতে বোঝা যায়, ক্রিকেট তাঁর কাছে শুধুই বল ছোড়ার খেলা নয়, এটা একটা মানসিক যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে তিনি এক দক্ষ সেনাপতির মতো চালিয়ে গেলেন কৌশলের প্যাঁচ।

এখন প্রশ্ন একটাই যে, এমন এক ক্যাপ্টেন যখন দলের হাল ধরছেন, তখন কি অস্ট্রেলিয়াকে থামানো আদৌ সম্ভব? কামিন্স প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি শুধু নেতা নন, তিনি এক বিপ্লব। এবং এই বিপ্লবের ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে একের পর এক প্রতিপক্ষ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল এবার শুধুই একটি ম্যাচ নয়, এটা কামিন্সের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা। বিশ্ব ক্রিকেট আজ মাথা নত করছে তাঁর সামনে। শুধু লর্ডসে নয়, গোটা ক্রিকেটবিশ্বে এখন একটাই নাম, প্যাট কামিন্স। এক অনন্য অধ্যায়, এক নতুন কাব্য, যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে লেখা আছে বোলিংয়ের গর্জন, নেতৃত্বের দৃঢ়তা আর জয়দৃপ্ত আত্মবিশ্বাস।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubman Gill : ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু শুভমনযুগ

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment