ফ্যাট ও পরিপাক , কি ভাবে দ্রুত ফ্যাট কমবে তার আলোচনা কি!

SHARE:

ফ্যাট ও পরিপাক

অন্তরা বিশ্বাস

 

ফ্যাট বা লিপিড হল জলে দ্রবণীয় এক প্রকার অদ্রবণীয় জৈব অণু; কিন্তু অ্যাসিটোন, ইথার, বেঞ্জিন, ক্লোরোফর্ম ইত্যাদি স্নেহদ্রাবকে দ্রবণীয়।
ফ্যাটের উৎস হল খাঁটি তেল, চর্বি, ঘি, মাংস, মাছ, মাখন গোরুর দুধ ইত্যাদি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ স্বাভাবিক ভারতীয় দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম দৃশ্য এবং অদৃশ্য ফ্যাট গ্রহণ করতে পারেন। এক গ্রাম ফ্যাট থেকে আমরা নয় কিলোক্যালোরি শক্তি পেয়ে থাকি। ভিটামিন এ, ডি, ই , কে শোষণ এবং পরিবহনে সাহায্য করে ফ্যাট। ত্বকের অ্যাডিপোজ কোষও ফ্যাট থেকে তৈরি হয়। এই ফ্যাটই দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখে। অ্যাডিপোজ কোষগুলো কিডনি, পাকস্থলী, আরও দেহের অন্য অংশের উপর পুরু স্তর তৈরি করে, বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে। কোলেস্টেরল, ভিটামিন ডি, ইস্ট্রোজেন, ও টেস্টোস্টেরন নামে হরমোন উৎপন্ন করে। ফ্যাট খাবারের স্বাদ, গন্ধ বাড়ায়।দেহে অতিরিক্ত ক্যালরির প্রয়োজন না হলে ফ্যাট দেহের বিভিন্ন অংশে সঞ্চিত থাকে। ওই সঞ্চিত ফ্যাট থেকে শক্তি সরবরাহ করতে ব্যবহৃত হয়। ফ্যাট খাবার গ্রহণের পর একটা পরিতৃপ্তি প্রদান করে।

ফ্যাটকে অনেক গুলো শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যেমন :
এক) দৃশ্য এবং অদৃশ্য অর্থাৎ যে ফ্যাট খাবারে বাইরে থেকে দেওয়া হয়। তাই দৃশ্যমান ফ্যাট। যেমন- সরষের তেল, বাদাম তেল। আর যে ফ্যাট খাবারে মিশে থাকে, তাকে অদৃশ্যমান ফ্যাট বলা যায়। যেমন- মাখন, দুধ ইত্যাদি।
দুই) কঠিন এবং তরল ফ্যাট অর্থাৎ কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় যে সব ফ্যাট কঠিন তাদের কঠিন ফ্যাট। যেমন- মাখন, পাঁঠার মাংসের চর্বি। আর যে সব ফ্যাট কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল, তা-ই হল তরল ফ্যাট। যেমন : নারকেল তেল, তিল তেল ইত্যাদি।
তিন) উদ্ভিজ্জ এবং প্রাণীজ ফ্যাট অর্থাৎ উদ্ভিদ জগত থেকে যে ফ্যাট পাওয়া যায়। তাই হল উদ্ভিজ্জ ফ্যাট যেমন সরষের তেল। আর জগত থেকে যে ফ্যাট পাওয়া যায় তাই হল প্রাণীজ ফ্যাট। যেমন : মাছের তেল ইত্যাদি।

গঠনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফ্যাটকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :
এক) সরল ফ্যাট অর্থাৎ তিন অণু ফ্যাটি অ্যাসিড ও এক অণু গ্লিসারল নিয়ে তৈরি হয়।
দুই) যৌগিক ফ্যাট অর্থাৎ ফ্যাট যখন এক বা একাধিক অন্য জৈব বা অজৈব যৌগ বা উভয়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে অণু গঠন করে।
তিন) লব্ধ ফ্যাট অর্থাৎ অ্যালকোহল ক্যারোটিনয়েড এবং স্নেহদ্রাব্য ভিটামিন।

ফ্যাটেরই সরলতম রূপ হল ফ্যাটি অ্যাসিড। কতকগুলো ফ্যাটি অ্যাসিড দেহের মধ্যে সংশ্লেষিত হয় না। খাদ্যের মাধ্যমেই দেহে গৃহীত হয়। এদের আবশ্যকীয় ফ্যাটি অ্যাসিড বলা হয়। উদাহরণ লিনোলেইক ফ্যাটি অ্যাসিড, আর লিনোলেনিক ফ্যাটি অ্যাসিড। আবশ্যকীয় ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎস হল সাফোলা, সূর্যমুখী তেল, সয়াবিনের তেল। ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের তৈলগ্রন্থি থেকে তেল ক্ষরণে সাহায্য করে। আবশ্যকীয় ফ্যাটি অ্যাসিড রোগ জীবাণু প্রতিরোধে সাহায্য করে। ভ্রূণের বৃদ্ধি ও শিশু বয়সের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

এবার আসা যাক ফ্যাট পরিপাক বিষয়ে। পরিপাক নালিতে যে প্রক্রিয়ায় পাচক রসের উৎসেচক দ্বারা ও পিত্তের উপস্থিতিতে ফ্যাট ভেঙে ফ্যাটি অ্যাসিড এবং গ্লিসারলে পরিণত হয়, তাকেই ফ্যাট পরিপাক বলে। ফ্যাট পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে পাচিত হয়। লালারসে ফ্যাট ভঙ্গক উৎসেচক না থাকায়, মুখবিবরে ফ্যাট পাচিত হয় না। পাকস্থলীতে খাবার এসে পৌঁছলে পাকস্থলীর গ্যাসট্রিক লাইপেজ অল্প পরিমাণে ফ্যাটকে মনোগ্লিসারাইড ও ফ্যাটি অ্যাসিডে পরিণত করে। গ্যাসট্রিক লাইপেজের pH হল ৪-৫ ও চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অধিক সক্রিয়। মূলত তিন অণু ফ্যাটি অ্যাসিড ও এক অণু গ্লিসারলে পরিণত করে। ফ্যাট জাতীয় খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডিনামে এলে পিত্ত লবণ ফ্যাটকে অবদ্রবে পরিণত করে। অর্থাৎ পিত্ত লবণগুলো খাবারের চর্বি কণার পৃষ্ঠটান কমিয়ে দেয়। ফলে বড় কণাগুলো অনেক ছোট কণায় বিভক্ত হয়ে অবদ্রবে পরিণত হয়। যার ফলে পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বেড়ে যায়। ফলে তাদের উপর চর্বি পাককারি উৎসেচকের কাজও বেড়ে যায়। ক্ষুদ্রান্ত্রে পিত্ত লবণের প্রভাবে অগ্ন্যাশয় এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের লাইপেজ এনজাইম দুটো সক্রিয় হয়ে ফ্যাটের পরিপাক ঘটায়।

অগ্ন্যাশয় রসে প্যানক্রিয়াটিক লাইপেজ ও আন্ত্রিক রসে আন্ত্রিক লাইপেজ থাকে। প্যানক্রিয়াটিক লাইপেজ অবদ্রবিত ফ্যাটকে (ট্রাইগ্লিসাইডে) পাচিত করে ফ্যাটি অ্যাসিড এবং তারপর গ্লিসারলে পরিণত করে।এছাড়াও অগ্ন্যাশয় রসে আরও দুটো ফ্যাট পরিপাককারী উৎসেচক থাকে। ফসফোলাইপেজ ও কোলেস্টেরল এস্টারেজ। ফসফোলাইপেজ ফসফোলিপিডকে বিশ্লিষ্ট করে ফ্যাটি অ্যাসিড, গ্লিসারল, ফসফোরিক অ্যাসিড এবং কোলিনে পরিণত করে। কোলেস্টেরল এস্টারেজ কোলেস্টেরল এস্টারকে কোলেস্টেরল ও ফ্যাটি অ্যাসিডে পরিণত করে। আন্ত্রিক রসে অবস্থিত ফ্যাট পরিপাককারী উৎসেচকটা হল, ইনস্টিটিনাল লাইপেজ। সেই লাইপেজ অবশিষ্ট ফ্যাটকে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলে পরিণত করে। লাইপেজ উৎসেচকের প্রভাবে ফ্যাটের পরিপাকের সব অদ্রাব্য বড় অণু চর্বি-জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপন্ন করে। পিত্ত লবণ অগ্ন্যাশয় রসের কোলেস্টেরল এস্টারেজকে সক্রিয় করে কোলেস্টেরল পরিপাকে সহায়তা করে ।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন