সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগে ব্যাট হাতে দুরন্ত ফর্মে রয়েছেন স্মৃতি মন্ধানা (Smriti Mandhana)। তাঁর নেতৃত্বেই রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (Royal Challengers Bengaluru) পৌঁছে গিয়েছে ফাইনালে। মাঠে ঝরছে আত্মবিশ্বাস, ব্যাটে আসছে ধারাবাহিক রান। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে গভীর মানসিক লড়াই, যার সূত্রপাত গত বছরের একদিনের বিশ্বকাপ থেকে। সম্প্রতি আরসিবিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সেই কঠিন সময়ের কথা প্রথমবার প্রকাশ্যে আনলেন ভারতের সহ-অধিনায়ক।

বিশ্বকাপের শুরুটা ভারতের জন্য স্বপ্নের মতনই ছিল। প্রথম দু’টি ম্যাচে জয়ের পর আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর ভারতীয় শিবির। কিন্তু সেই ছন্দ হঠাৎই ভেঙে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টানা তিন ম্যাচে হার। ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে ওঠা নিয়েই তৈরি হয় প্রশ্নচিহ্ন। অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) -এর দলের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এই সময়েই মানসিক ভাবে সবচেয়ে কঠিন পর্বের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন স্মৃতি মন্ধানা। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লিগ ম্যাচে তিনি ৮৮ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছিলেন। কিন্তু সেই ইনিংসও দলকে জয় এনে দিতে পারেনি। সেই হারের পরের দিন বিমানে ওঠার পর এক অদ্ভুত নীরবতা গ্রাস করেছিল তাঁকে। মন্ধানা নিজেই জানিয়েছেন, বিমানে কোনও সতীর্থের সঙ্গে কথা বলেননি। ভারতীয় দলের ড্রেসিংরুমে তখন অশান্তির গুঞ্জন উঠলেও বাস্তবটা ছিল আলাদা। কোনও বিবাদ নয়, কোনও দূরত্ব নয়, সবটাই ছিল নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই।
আরসিবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মন্ধানা বলেছেন, ‘বিশ্বকাপের আগে আমি খুব ভাল ফর্মে ছিলাম। কিন্তু প্রথম তিনটি ম্যাচে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারিনি। একদিনের ক্রিকেটে প্রথম ১০ ওভারের মধ্যে আউট হতে চাই না। কিন্তু বারবার সেটাই হচ্ছিল।’ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হারার পর তিনি নিজের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সমস্যার শিকড় খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন। নেটে ভাল ব্যাট করলেও ম্যাচে গিয়ে যেন কিছুতেই সব ঠিক হচ্ছিল না। তিনি আরও বলেছেন, ‘হয় চাপে পড়ে যাচ্ছিলাম, নয়ত শট নির্বাচনে ভুল হচ্ছিল। ঠিক কী সমস্যা হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছিলাম না। প্রথম তিনটি ম্যাচের পর ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।’ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৮০ -এর বেশি রান করেও দলকে জেতাতে না পারার যন্ত্রণা তাঁকে আরও ভেঙে দেয়। তাঁর কথায়, ‘ফর্ম ফিরে পেলেও দলকে জেতাতে পারিনি। সেই হতাশা আরও বেড়ে যায়।’ ইংল্যান্ড ম্যাচের পর বিমানের সেই নীরব যাত্রা ছিল তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম কঠিন মুহূর্ত। মন্ধানা বলেন, ‘পরের দিন বিমানে চুপচাপ বসেছিলাম। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। এমনটা আমার জীবনে আগে কখনও হয়নি।’ সেই সময় মনের মধ্যে কাজ করছিল এক গভীর উদ্বেগ। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলেও যদি ভারত সেমিফাইনালে উঠতে না পারে, তা হলে সেটি যে কত বড় ধাক্কা হবে, তা তিনি অনুভব করছিলেন।

এই মানসিক চাপে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগের রাতেও ঘুমোতে পারেননি তিনি। মন্ধানার কথায়, ‘মনে হচ্ছিল, যদি সেমিফাইনালে উঠতে না পারি, তা হলে ভারতের মহিলা ক্রিকেট ২০ বছর পিছিয়ে যাবে।’ এই আশঙ্কা তাঁকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। কিন্তু সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানো। নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যাট হাতে ঝড় তোলেন স্মৃতি মন্ধানা। ৯৫ বলে ১০৯ রানের অনবদ্য শতরান ভারতকে টানা তিন ম্যাচ পর জয়ের মুখ দেখায়। সেই ইনিংস শুধু স্কোরবোর্ড বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল গোটা দলের মানসিকতা। মন্ধানা বলেন, ‘ওই ম্যাচটা আমাদের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওই জয় আমাদের প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে এনেছিল। তাই ওই শতরানটার গুরুত্ব আমার কাছে আলাদা।’ তিনি আরও জানান, সেই সময় দল নিয়ে নানা কথা হচ্ছিল। সমালোচনা, সন্দেহ, সবই চলছিল। কিন্তু ড্রেসিংরুমে তার প্রভাব পড়েনি। ‘দল হিসাবে আমরা সব সময় একে অপরের পাশে থাকি,’ বলেছেন মন্ধানা। ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে উঠতে না পারলে যে তা সকলের জন্য লজ্জার হত, সেটাও তিনি করে বলেছেন।
নিউ জ়িল্যান্ড ম্যাচের পর পাওয়া ছন্দ ও আত্মবিশ্বাস বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিল ভারত। সেমিফাইনাল পেরিয়ে ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে প্রথমবার মহিলাদের এক দিনের বিশ্বকাপ জেতে ভারত। সেই জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিল মন্ধানার মানসিক দৃঢ়তা ও লড়াইয়ের মানসিকতা। উল্লেখ্য, বর্তমানে ডব্লুপিএলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই স্মৃতি ফিরে দেখলে বোঝা যায়, সাফল্যের আড়ালে কতটা চাপ, কতটা নীরব কান্না লুকিয়ে থাকে। বিমানের সেই নিঃশব্দ যাত্রা থেকে বিশ্বজয়ের উল্লাস, ভারতের মহিলা ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Raveena Tandon controversy | মিথ্যা খবরেই ভেঙে পড়েছিল পরিবার, রাতের পর রাত ঘুমহীন রবিনা টন্ডন, আজও তাড়িয়ে বেড়ায় সেই স্মৃতি



