সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি ব্যতিক্রমী কর্মসূচীতে সম্প্রতি শোনা গেল বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) অডিয়ো বক্তৃতা। সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও, ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রায় এক ঘণ্টার অডিয়ো বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি তীব্র মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতে সাময়িক আশ্রয় নেওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বক্তব্য রাখলেও, ভারতে আয়োজিত কোনও প্রকাশ্য কর্মসূচীতে এই প্রথম তাঁর অডিয়ো বার্তা শোনানো হল বলে রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের কথা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক কার্যকলাপের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ (Awami League) এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এই আবহেই নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁর এই অডিয়ো বার্তা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।’ তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার ছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং উদ্বেগ। প্রায় এক ঘণ্টার ভাষণে শেখ হাসিনা বারবার নিশানা করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে (Muhammad Yunus)। কখনও তাঁকে ‘খুনি ফ্যাসিবাদী’, কখনও ‘সুদখোর’, কখনও আবার ‘টাকা পাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ বলে তিনি আক্রমণ শানান। তাঁর দাবি, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধ এবং হিংসাত্মক উপায়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। এই সরকার দেশকে সন্ত্রাস, অরাজকতা ও গণতন্ত্রহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।
দিল্লির এই কর্মসূচীতে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রী ও নেতারা। পাশাপাশি, বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও সেখানে যোগ দেন। অডিয়ো বার্তার প্রতিটি অংশ মনোযোগ তাঁরা দিয়ে শোনেন। হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ কার্যত ‘এক বিশাল জেলখানা, এক বধ্যভূমি এবং এক মৃত্যু উপত্যকা’য় পরিণত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ, বিরোধী কণ্ঠকে দমন করা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে। তাঁর মতে, এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত কাজ করেছে। ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে তিনি সরাসরি ‘বিদেশিদের হাতের পুতুল’ হয়ে কাজ করার অভিযোগ তোলেন। পাশাপাশি, তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে। এই পরিস্থিতিকে তিনি দেশের জন্য এক ‘অস্তিত্বের লড়াই’ বলে ব্যাখ্যা করেন।
বক্তৃতার একাধিক জায়গায় শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারকে উৎখাত করার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো জরুরি। তিনি দাবি করেন, ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে এমন এক অন্ধকার পথে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কোনও স্থান নেই। প্রসঙ্গত, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনা বিভিন্ন ভার্চুয়াল সভা ও অনলাইন অনুষ্ঠানে এই ধরনের বক্তব্য রেখে আসছেন। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তিনি ভার্চুয়াল মাধ্যমে কথা বলেন। তবে দিল্লির মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন শহরে আয়োজিত কোনও প্রকাশ্য কর্মসূচিতে তাঁর অডিয়ো বার্তা বাজানো সাম্প্রতিক অতীতে হয়নি। সেই কারণে এই অনুষ্ঠান কেবল রাজনৈতিক নয়, কূটনৈতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে এই অডিয়ো বার্তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। অন্যদিকে, সমালোচকদের মতে, বিদেশের মঞ্চ থেকে এমন কড়া ভাষায় আক্রমণ বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে এটুকু স্পষ্ট, দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার অডিয়ো বার্তা বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ ফের একবার বাড়িয়ে দিল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Khaleda Zia vs Sheikh Hasina, Bangladesh political history | বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়ার চার দশকের দ্বন্দ্বের পূর্ণ ইতিহাস




