সাশ্রয় নিউজ ★ স্পেশাল প্রতিবেদন : যৌনতা নিয়ে আমাদের সমাজে যতটা চুপচাপ থাকা হয়, ততটাই উচ্চস্বরে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে শরীর থেকে মন, সম্পর্ক থেকে সমাজ পর্যন্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সেক্স (Sex) কোনw বিলাসিতা নয়। এটি একধরনের মৌলিক চাহিদা। তবে এমন ভাবাও ভুল যে, যৌন সম্পর্ক ছাড়া জীবন থেমে যায়। বরং এর অভাব কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নির্ভর করে ব্যক্তিগত মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক বাস্তবতার উপর।

বিশিষ্ট সাইকোথেরাপিস্ট ডঃ রিমা রায় (Dr. Rima Roy) বলেন, “অনেকেই মনে করেন যৌনতা মানেই শারীরিক তৃপ্তি। কিন্তু সত্যি কথা হল, এটা মানসিক স্বস্তি, আত্মিক সংযোগ আর সম্পর্কের ভিতকেও দৃঢ় করে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদে যৌন সম্পর্ক থেকে দূরে থাকেন, তাদের মধ্যে মানসিক ক্লান্তি, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।”
তবে সেক্স না করলেই যে বড় ধরনের বিপদ হয়, এমনটাও নয়। কেউ কেউ নিজেই সিদ্ধান্ত নেন ব্রহ্মচর্য বা abstinence বেছে নেওয়ার। গবেষণা বলছে, স্বেচ্ছায় এই জীবনধারা অনুসরণ করা হলে, শারীরিক বা মানসিক কোনও ক্ষতি হয় না। অনেকে এখানে মানসিক শান্তি খুঁজে পান। এক বিশেষ শক্তি সঞ্চয় করে, যা সাধারণ থেকে অসাধারণ ক্ষমতায় পৌঁছে যেতে পারে যদি তিনি আসন, প্রাণায়ম, ধ্যান যোগে নিজেকে তৈরি রাখতে পারেন। এই সমস্ত পুরুষ বা নারীর আকর্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এদের যৌন ক্ষমতাও অপরিসীম হয়ে থাকে। এই সমস্ত মানুষ হরমোনের ভরসাম্য রাখতেও সক্ষম। ফলে এরা এক বিশেষ শ্রেণীতে বসবাস করেন।
কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন ধারায় যদি হয় তাহলে বিশেষ ক্ষতি হতে পারে। কোনও এক পুরুষ বা মহিলার সমস্যার শুরু তখনই, যখন শরীরের প্রাকৃতিক চাহিদাকে দমন করতে বাধ্য হতে হয়। নিয়মিত যৌন সম্পর্ক না থাকলে, শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষত, টেস্টোস্টেরন (Testosterone) ও অক্সিটোসিন (Oxytocin) হরমোনের মাত্রা কমে গেলে ক্লান্তি, বিষণ্নতা, এমনকি যৌন অক্ষমতার সমস্যাও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞ ইউরোলজিস্ট ডঃ সৌরভ চট্টোপাধ্যায় (Dr. Saurabh Chattopadhyay) জানালেন, “দীর্ঘদিন যৌন সম্পর্ক না থাকলে কিছু মানুষের মধ্যে ঘন ঘন ‘নাইট ফল’ বা স্বপ্নদোষ, অতিরিক্ত হস্তমৈথুনের প্রবণতা, এমনকী পর্ণগ্রাফির ওপর অতিনির্ভরতা গড়ে উঠতে পারে। সবটাই নির্ভর করে ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য ও যৌন শিক্ষা কতটা স্বাস্থ্যকরভাবে তাকে তৈরি করেছে তার উপর।

এই প্রসঙ্গে সমাজতাত্ত্বিক মীনাক্ষী সেনগুপ্ত (Meenakshi Sengupta) বলেন, “যৌনতা একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। বহু দম্পতি সম্পর্কের গভীরে থাকা সত্ত্বেও দূরত্ব অনুভব করেন, কারণ যৌন চাহিদা ও সংযোগের অভাব। অথচ এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে আমরা এখনও লজ্জিত বা অস্বস্তিতে পড়ি।
আরও পড়ুন : Sexuality : সাফল্যের পথে কামনার কাঁটা: যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণই আসল শক্তি
তবে এই বাস্তবতাও সত্যি যে, অনেকে নিজের ইচ্ছায় যৌনতা থেকে দূরে থাকতে চান। তা ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক সাধনা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অন্য কোনও মানসিক কারণেও হতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যারা এই abstinence জীবনধারা মানেন, তারা মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারেন, যদি সেটা নিজের সজ্ঞানে ও শান্তিপূর্ণভাবে বেছে নেওয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, “সুস্থ যৌনতা মানে শুধুই শারীরিক যৌনক্রিয়া নয়, এটি একটি বিস্তৃত অনুভব। যেখানে রয়েছে সম্মতি, শ্রদ্ধা, ভালবাসা, ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতা।”
তবে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও অতিরিক্ত পর্ণ সংস্কৃতির প্রভাবে যৌনতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপর্যয় ঘটেছে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। কিশোর-কিশোরীরা ‘সেক্স’ বলতে কেবল চটুল আনন্দ বোঝে, কিন্তু তার গভীর সম্পর্ক বা দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে সচেতন নয়। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যে, সেক্স কি জীবনের জন্য আবশ্যক?

এর জবাবে ডঃ রিমা বলেন, “যদি আপনি সুখী হন, মানসিকভাবে স্থিত থাকেন, আপনার পার্টনারের সঙ্গে সুস্থ যোগাযোগ বজায় থাকে ও আপনার মধ্যে কোনও দমন বা কষ্ট না থাকে, তাহলে যৌনতা না থাকলেও সমস্যা হয় না। কিন্তু যদি অভাব অনুভব করেন, এবং সেটি অনাদরের রূপ নেয়, তখন সেটি মানসিক ও সামাজিক সমস্যার রূপ নিতে পারে।”
এই কারণেই প্রয়োজন সুস্থ যৌনশিক্ষা, মুক্ত আলোচনা এবং যৌনতাকে নিয়ে সমাজে একটি মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।
শেষ কথা, যৌনতাই জীবন নয়, কিন্তু জীবনের একটি স্পন্দন। তাকে অস্বীকার নয়, কিন্তু সম্মানের সঙ্গে বুঝে নিতে হবে তার প্রয়োজন, প্রভাব ও পরিসর। আর এই বোঝাতেই রয়েছে মানুষের ভবিষ্যতের মানসিক সুস্থতা, সম্পর্কের গভীরতা ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার মূল চাবিকাঠি।
সব ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Love, sex and Ancient India : প্রাচীন ভারতে প্রেম যৌনতায় ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট




