Sasraya News Sunday’s Literature Special | 27th September 2026, Issue 128, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সংখ্যা ১২৮| রবিবার

SHARE:

সম্পাদকীয়

ভালবাসার প্রকৃত বিস্তার হওয়ার কথা ছিল উল্টো। নিজের ঘর থেকে শুরু করে বৃহত্তর মানুষের দিকে যাওয়া। নিকটজন থেকে অপরিচিতের দিকে যাওয়া। পরিচিত সত্তা থেকে সমগ্র জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। নিজের পরিধি ছোট করছি ও সেই ছোট পরিধির ভিতর ‘আমার’ শব্দটি যতটা সম্ভব অনেক বড় করছি। এই প্রবণতা ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক জীবনেও তার ভয়াবহ ফল দেখা যায়।

 

‘আমার’ যত বাড়ে, প্রেম তত মরে: ভালবাসার নামে আমরা আসলে কী বয়ে চলেছি?

মানুষ বদলায়। সময় বদলায়। সম্পর্কের ভাষা বদলায়। পোশাক বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, ঘরের ধরন বদলায়, এমনকী ভালবাসা প্রকাশের পদ্ধতিও বদলে যায়। কিন্তু মানুষের ভিতরের একটি পুরনো প্রবণতা আজও দিব্যি বহাল। এসব কিছুর মধ্যে নিজের অধিকার খুঁজে নেওয়া। যে মানুষটিকে ভালবাসি, তাকে নিজের করে চাই, যে সম্পর্ককে আপন বলে মানি। তার উপর নিজের প্রত্যাশার ছাপ বসাতে চাই, যে প্রকৃতিকে ভালবাসি, তাকেও শেষ পর্যন্ত ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করি। ফলে ভালবাসার নামটি থাকে, কিন্তু তার ভিতর থেকে ধীরে ধীরে সরে যায় মুক্তি।

আমরা ভালবাসতে পারি, কিন্তু নিজের ‘আমি’কে ছোট করতে পারি না। আমরা সম্পর্ক চাই, কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে নিজের আধিপত্য ছাড়তে চাই না। আমরা কাছে আসতে চাই, কিন্তু অন্যজনের আলাদা সত্তাকে জায়গা দিতে চাই না। তাই ভালবাসার ভিতরে অদৃশ্যভাবে প্রবেশ করে শর্ত। ‘আমি এত করলাম, তুমি কী করলে?’ ‘আমি তোমার জন্য এত কিছু করলাম, তুমি আমাকে সময় দিলে না কেন?’ ‘আমি তোমাকে এত ভালবাসি, তুমি অন্য কারও সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ কেন?’ এই প্রশ্নগুলি সম্পর্কের স্বাভাবিক আবেগের অংশ হতে পারে। কিন্তু যখন এগুলি অধিকারবোধে পরিণত হয়, তখন প্রেমের জায়গায় হিসাব বসে যায়। প্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই পাওয়া নয়, ছাড়তে পারা।

আমার মানুষ, আমার পরিবার, আমার সন্তান, আমার বন্ধু, আমার সমাজ, আমার দেশ, আমার বিশ্বাস ‘আমার’ শব্দটি যত দীর্ঘ হয়, ভালবাসার পরিসর তত সংকীর্ণ হতে থাকে। আমরা ভাবি, আপন করে নেওয়াই ভালবাসার চূড়ান্ত রূপ। অথচ অনেক সময় সেই আপন করে নেওয়ার ভিতরেই জন্ম নেয় মালিকানা, প্রত্যাশা, অভিমান ও নিয়ন্ত্রণের বাসনা। যে সম্পর্ক মুক্ত হওয়ার কথা ছিল, সেটিই তখন হয়ে ওঠে হিসাবের খাতা। প্রেমের সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই। মানুষ প্রেমকে নিজের সম্পত্তি বানাতে চায়। প্রকৃতির দিকে তাকালে অবশ্য অন্য ছবি দেখা যায়। ঋতু আসে, ঋতু যায়। গাছ ফুল দেয়, ফুল ঝরে। নদী নিজের জল কাউকে আটকে রাখতে দেয় না। আকাশ প্রতিদিন নতুন হয়, অথচ কোনও কিছুকে নিজের বলে দাবি করে না। প্রকৃতির এই নিরাসক্ত সৌন্দর্যের মধ্যে যে প্রেম রয়েছে, সেখানে অধিকার নেই, প্রদর্শন নেই, হিসাব নেই। মানুষের প্রেম যত বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়, তত বেশি অস্থির হয়ে ওঠে।।আমরা প্রেম চাই, কিন্তু প্রেমের সঙ্গে যে আত্মসমর্পণ জড়িয়ে আছে, সেটি চাই না। ভালবাসতে চাই, কিন্তু নিজের অহঙ্কারটিকে দরজার বাইরে রেখে ঘরে ঢুকতে রাজি নই। ফলে সম্পর্ক থাকে, অথচ প্রেম থাকে না।

বর্তমান সমাজে ভালবাসার প্রকাশের অভাব নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালবাসার ছবি আছে, শুভেচ্ছা আছে, প্রকাশ্য আবেগ আছে, সম্পর্কের ঘোষণা আছে। অথচ হাস্যকর সমাজমাধয়মের যুগে মানুষের একাকিত্বও কিন্তু কমছে না। একইভাবে অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের ভিড়ের মধ্যেই নিঃসঙ্গতা আরও ঘন হচ্ছে। কারণ ভালবাসা প্রকাশ আর ভালবাসা ধারণ করা এক বিষয় নয়। একজন মা সন্তানের জন্য অসীম ত্যাগ করতে পারেন। কিন্তু সেই ত্যাগের সঙ্গে যদি সন্তানের উপর নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেন, তবে সেখানে ভালবাসার সঙ্গে মালিকানাও এসে পড়ে। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও একই কথা। বন্ধুকে ভালবাসি বলে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কেউ পেয়ে যায় না। আত্মীয়তার ক্ষেত্রেও সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হয়, অনেক সময় প্রত্যাশার তালিকা তত দীর্ঘ হয়। আমরা ভালবাসার বিনিময়ে কিছু না কিছু ফেরত চাই। সম্মান চাই, গুরুত্ব চাই, আনুগত্য চাই, সময় চাই, স্বীকৃতি চাই। না পেলে অভিমান করি। অভিমান থেকে অভিযোগ। অভিযোগ থেকে দূরত্ব। দূরত্ব থেকে সম্পর্কের মৃত্যু। তারপর আমরা বলি, ‘ভালবাসা আর আগের মতো নেই।’ আসলে ভালবাসা হয়ত ছিলই না। ছিল প্রত্যাশার সঙ্গে মিশে থাকা এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিক সম্পর্ক।

এখানেই আত্মঅহংকারের ভূমিকা। মানুষ নিজের অনুভূতিকে এত বড় করে দেখে যে অন্য মানুষের অনুভূতির জন্য জায়গা ক্রমশঃ ছোট হয়ে যায়। নিজের কষ্ট সত্যি, নিজের অভিমান সত্যি, নিজের চাওয়া সত্যি কিন্তু অন্যজনের স্বাধীনতাও যে সমান সত্যি, সেই বোধটি অনেক সময় হারিয়ে যায়। প্রেম তখন আর দুই মানুষের মিলন থাকে না। হয়ে ওঠে দুই ‘আমি’ -এর টানাটানি। একজন বলে, আমাকে বুঝতে হবে। অন্যজনও বলে, আমাকেও বুঝতে হবে। কেউই প্রশ্ন করে না, আমি কী অন্যজনকে বুঝতে চাই? এই ছোট্ট পার্থক্যটিই সম্পর্কের ভিত বদলে দিতে পারে। কারণ ভালবাসার শুরু অধিকার থেকে নয়, গ্রহণ করার ক্ষমতা থেকে। যে সম্পর্কের মধ্যে অন্যজনের স্বাধীন অস্তিত্বের জায়গা নেই, সেটি যত আবেগপূর্ণই হোক, তার মধ্যে প্রেমের পরিপূর্ণতা থাকে না।

মানুষ ভালবাসাকে নানা নামে ভাগ করেছে। মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, দাম্পত্য, দেশপ্রেম, সমাজপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছে। ভাষাগত প্রয়োজনের জায়গা থেকে এই বিভাজন স্বাভাবিক। কিন্তু বিপদ তৈরি হয় তখন, যখন আমরা ভাবতে শুরু করি ভালোবাসাগুলিও যেন আলাদা আলাদা বস্তু। তখন ‘আমার পরিবার’ অন্য পরিবারের বিপরীতে দাঁড়ায়। ‘আমার সমাজ’ অন্য সমাজকে সন্দেহ করে। ‘আমার বিশ্বাস’ অন্য বিশ্বাসকে ছোট করে। ‘আমার মানুষ’ হয়ে ওঠে ‘অন্য মানুষের’ বিপরীত। প্রেমের যে শক্তি মানুষকে নিজের সীমানা অতিক্রম করতে পারত, সেটিই তখন সীমানা পাহারা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দেশকে ভালবাসা যদি অন্য দেশের মানুষের প্রতি ঘৃণার কারণ হয়, তবে সেখানে ভালবাসার সঙ্গে অন্য একটি প্রবৃত্তিও কাজ করছে। নিজের সম্প্রদায়কে ভালবাসা যদি অন্য সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করার দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেই ভালবাসা আর শুধু ভালবাসা থাকে না। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব যদি পরিবারের বাইরে থাকা মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর করে তোলে, তবে সেখানেও ‘আপন’ ও ‘পর’ -এর বিভাজন প্রেমকে সঙ্কুচিত করেছে।

অথচ ভালবাসার প্রকৃত বিস্তার হওয়ার কথা ছিল উল্টো। নিজের ঘর থেকে শুরু করে বৃহত্তর মানুষের দিকে যাওয়া। নিকটজন থেকে অপরিচিতের দিকে যাওয়া। পরিচিত সত্তা থেকে সমগ্র জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। নিজের পরিধি ছোট করছি ও সেই ছোট পরিধির ভিতর ‘আমার’ শব্দটি যতটা সম্ভব অনেক বড় করছি। এই প্রবণতা ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক জীবনেও তার ভয়াবহ ফল দেখা যায়। মতের অমিল মানেই শত্রুতা, পছন্দের অমিল মানেই দূরত্ব, বিশ্বাসের অমিল মানেই অবজ্ঞা। যেন অন্য মানুষের আলাদা হয়ে থাকার অধিকার নেই। সবাইকে নিজের মতো হতে হবে। প্রেম যদি অন্যের স্বাতন্ত্র্য মেনে নিতে না পারে, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্বের ভাষায় কথা বলে।

বাংলা ভাষায় ‘ভালবাসা’ ও ‘প্রেম’ শব্দ দু’টি প্রায়ই সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ভারতীয় ভাষা ও দর্শনের দীর্ঘ ঐতিহ্যে এই শব্দগুলির অর্থের নানা স্তর তৈরি হয়েছে। সংস্কৃত, বাংলা, হিন্দি-সহ বহু ভারতীয় ভাষায় প্রেমের ধারণা কেবল ব্যক্তিগত আকর্ষণ বা সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আত্মনিবেদন, বিরহ, মমতা, বিস্তার, ত্যাগ এবং নিজের সীমানা অতিক্রমের ধারণা। এই জায়গায় ভাষা কেবল শব্দের বাহন নয়, মানুষের অনুভূতির ইতিহাসও বহন করে। ‘ভালবাসা’ শব্দটি দৈনন্দিন জীবনের ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে খুব সহজেই যুক্ত হয়। সন্তানকে ভালবাসি, বন্ধুকে ভালবাসি, বইকে ভালবাসি, প্রকৃতিকে ভালবাসি এই ব্যবহার স্বাভাবিক। কিন্তু ‘প্রেম’ শব্দটির মধ্যে অনেক সময় আরও গভীর এক উত্তরণের ধারণা কাজ করে। সেখানে শুধু পাওয়া নয়, দেওয়ার প্রশ্নও থাকে। শুধু কাছে টেনে নেওয়া নয়, প্রয়োজনে দূরত্বের মর্যাদা দেওয়ার ক্ষমতাও থাকে।

অর্থাৎ ভালবাসা যদি বলে, ‘তুমি আমার আপন’, প্রেম হয়ত প্রশ্ন করে, ‘তোমার স্বাধীন অস্তিত্বের মধ্যেও কি আমি তোমাকে গ্রহণ করতে পারি?’ এই প্রশ্নটি কঠিন। কারণ এখানে নিজের অহংকে পিছিয়ে দিতে হয়। মানুষের সমস্যা সেখানেই। আমরা ভালবাসতে পারি, কিন্তু নিজের ‘আমি’কে ছোট করতে পারি না। আমরা সম্পর্ক চাই, কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে নিজের আধিপত্য ছাড়তে চাই না। আমরা কাছে আসতে চাই, কিন্তু অন্যজনের আলাদা সত্তাকে জায়গা দিতে চাই না। তাই ভালবাসার ভিতরে অদৃশ্যভাবে প্রবেশ করে শর্ত। ‘আমি এত করলাম, তুমি কী করলে?’ ‘আমি তোমার জন্য এত কিছু করলাম, তুমি আমাকে সময় দিলে না কেন?’ ‘আমি তোমাকে এত ভালবাসি, তুমি অন্য কারও সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ কেন?’ এই প্রশ্নগুলি সম্পর্কের স্বাভাবিক আবেগের অংশ হতে পারে। কিন্তু যখন এগুলি অধিকারবোধে পরিণত হয়, তখন প্রেমের জায়গায় হিসাব বসে যায়। প্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই পাওয়া নয়, ছাড়তে পারা। ভালবাসার সবচেয়ে গভীর রূপ হয়তো সেই জায়গায়, যেখানে অন্যজনকে নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার দেওয়া যায়।

সমাজে ‘আমার’ শব্দের আধিপত্য যত বাড়ছে, মানুষের পারস্পরিক দূরত্বও তত বাড়ছে। সম্পত্তি আমার, সাফল্য আমার, পরিচয় আমার, মত আমার, মানুষ আমার। এমনকি দুঃখও যেন আমার, আনন্দও আমার। সবকিছুকে নিজের সঙ্গে জুড়ে না দিলে যেন অস্তিত্বের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। কিন্তু ‘আমার’ যত শক্তিশালী হয়, ‘আমরা’ তত দুর্বল হয়। আর ‘আমরা’ দুর্বল হলে সমাজও দুর্বল হয়। ভালবাসার প্রকৃত পরীক্ষা তাই কোনও বিশেষ সম্পর্কের ভিতরে নয়, সম্পর্কের বাইরের মানুষের প্রতিও আমাদের আচরণে। যাকে চিনি না, তার প্রতি কেমন আচরণ করি? যার সঙ্গে মত মেলে না, তাকে কতটা জায়গা দিই? যে আমার কোনও কাজে লাগে না, তার প্রতিও কি মানবিক থাকতে পারি? প্রেম যদি আপনজনের জন্য হয়, তবে সেটি মমতা হতে পারে, দায়িত্ব হতে পারে, আসক্তি হতে পারে কিন্তু তার সার্বজনীন শক্তি তখনও অধরা। সময়ের সঙ্গে মানুষ নতুন পোশাক পরে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে, নতুন ভাষায় কথা বলে। কিন্তু ভিতরের ‘আমি’ যদি একই থাকে, তবে বাহ্যিক আধুনিকতা খুব বেশি দূর নিয়ে যেতে পারে না। হাতে আধুনিক যন্ত্র, মাথায় আধুনিক ধারণা, অথচ সম্পর্কের ভিতরে পুরনো মালিকানা, এই বৈপরীত্যই আজকের মানুষের বড় সঙ্কট। ভালবাসা তাই নতুন করে শেখার বিষয়। কাউকে নিজের করে পাওয়ার নয়, কাউকে তার নিজের মতো থাকতে দেওয়ার শিক্ষা। প্রত্যাশা কমানোর শিক্ষা। নিজের অহংকারকে প্রশ্ন করার শিক্ষা। অন্যের স্বাধীনতাকে নিজের ভালোবাসার শত্রু না ভাবার শিক্ষা। কারণ প্রেম কখনও কারও গলায় দড়ি হয়ে থাকতে পারে না। যে বন্ধন শ্বাস নিতে দেয় না, তাকে যতই ভালবাসার নামে সাজানো হোক, তার ভিতরে স্বাধীনতার অভাব থেকে যায়। আসলে মানুষের জীবনে ভালবাসার প্রয়োজন অপরিসীম। কিন্তু ভালবাসার নামে ‘আমার’ শব্দটির সাম্রাজ্য তৈরি করার প্রয়োজন নেই। বরং যতবার আমরা ‘আমার’ থেকে একটু সরে অন্য মানুষের দিকে তাকাতে পারব, ততবার সম্পর্কের ভিতরে নতুন জায়গা তৈরি হবে। শেষ পর্যন্ত প্রেমের প্রশ্নটি খুব সহজ : আমি কতটা পেলাম, সেটি নয়। আমি কতটা দিতে পারলাম, সেটিও একা নয়। কিন্তু আমি ভালবেসেও অন্যজনকে নিজের সম্পত্তি ভাবলাম কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। মনে রাখতে হবে, যে ভালোবাসা মানুষকে সঙ্কুচিত করে, তার চেয়ে সেই ভালবাসা মূল্যবান যা মানুষকে নিজের সীমানার বাইরে নিয়ে যায়। কারণ প্রেমের কাজ দেওয়াল তোলা নয়। প্রেমের কাজ দরজা খুলে দেওয়া। আর সেই দরজা খোলার প্রথম শর্ত, ‘আমি’ একটু সরে দাঁড়াক।

 

 

 

🍂মহামিলনের কথা 
দেখ্, সকলের রুচি ত সমান নয়! কেহ আমার বাঁশরীবয়ান দেখতে চায়— তাই তাদের প্রীতির জন্য যমুনাপুলিনে, কদম্বতলে, বাঁশরীকরে শ্যামসুন্দর সেজে রাধা রাধা বলে বংশীধ্বনি করি। আবার কেহ কেহ যুগলরূপ দেখতে চায়— তাই তাদের জন্য এক আমি রাধাকৃষ্ণ হয়ে, তাদের আনন্দ বর্দ্ধন করে থাকি। কেহ আমায় ধনুর্ব্বাণধারী দেখতে ভালোবাসে— তাই তাদের জন্য রামরূপ ধারণ করেছি। কোন ভক্ত নৃমুণ্ডমালিনী, লোলরসনা, গলিতবসনা, ভীষণা কালিকামূর্তি দেখতে চায়, সেইজন্য আমি কালী হয়ে লীলা করি। কেহ বা বাঘাম্বরধারী, নাগরাজহারী, ত্রিপুরারি -রূপে আমায় দেখতে চায়,আমি তাই হয়ে যাই। কেহ মা বলে সন্তুষ্ট হয়— আমি তার মা হয়ে কোলে লই। কেহ সখা বলে আমায় বাহুবন্ধনে বাঁধতে চায়— আমি সখা হয়ে তার বাহুপাশে বাঁধা থাকি। কেহ দাস হয়ে সেবা করতে চায়– আমি তার কাছে প্রভু হয়ে সেবা লই। কেহ স্বামী বলে আমায় জীবন যৌবন অর্পণ করে, আমি তার জীবনের নাথ হই। আমার কোন স্বাধীনতা নাই।

 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ

কিন্তাত বেদাগমশাস্ত্রবিস্তরৈ –
স্তীর্থৈরনেকৈরপি কিং প্রয়োজনম্।
যদ্যাত্মনো বাঞ্ছসি মুক্তিকারণং
গোবিন্দ গোবিন্দ ইতি স্ফুটং রট।।

—তোর বেদ, আগমাদি বিস্তর শাস্ত্রে অথবা অনেক তীর্থেই বা কি প্রয়োজন? যদি আপনার মুক্তির কারণ ইচ্ছা করিস্, তাহলে গোবিন্দ গোবিন্দ এই নাম সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষণা কর্। ওরে! আমার নাম কর্।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ দেব। ছবি: সংগৃহীত

আমায় নাম করতে বলছ —আচ্ছা, —তোমার নাম কি?

তুই দিন দিন যেন বালক হয়ে পড়ছিস্! তুই কি আমার নাম জানিস্ না?

জানি, কিন্তু পাঁচ জনের পাঁচ কথায় মাঝে মাঝে যেন ভুলে যাই গোলমাল হয়ে যায়। আর একবার আমায় বেশ করে বলে দাও দেখি?

আমার নাম প্রকৃতি, পুরুষ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, আত্মা পরমাত্মা, কৃষ্ণ, কালী, রাম, গণেশ, সূর্য্য, অগ্নি, গঙ্গা, রাধা, দুর্গা—

তাহলে স্ত্রী পুরুষ সবই তুমি ল?

তুই কি একথা আজ প্রথম শুনলি?

না না, বল বল।

দেখ্, চৈতন্য আর জড় নিয়ে এ বিরাট ব্রহ্মাণ্ড। এ জগতে উপাসনা চৈতন্যেরই হয়। চৈতন্য একটি। যে যা বলে ডাকুক না কেন— আমাকেই ডাকে, আমি এক। সকলেরই ডাকে সাড়া দিই।

তুমি যদি এক, তবে এত নামের কি প্রয়োজন? একটি নামেই ডাকলে ত হয়?

ওঁ (ব্রহ্ম)—- আমার এই একটি নাম। যুগধর্ম্মে মানুষের ধারণাশক্তি হ্রাস হয়ে গেছে। আমার সর্ব্বগত- ভাব ধারণার শক্তি না থাকায় তাহাদের উদ্ধারের জন্য কৃষ্ণ, কালী, রাম— এই সব লীলা-বিগ্রহ ধারণ করেছি। এই লীলা শ্রবণে মননে আমাতে দৃড়া ভক্তি লাভ করে ভক্ত সংসার -পাশ থেকে মুক্ত হয়।

ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণের প্রয়োজন কি?

দেখ্, সকলের রুচি ত সমান নয়! কেহ আমার বাঁশরীবয়ান দেখতে চায়— তাই তাদের প্রীতির জন্য যমুনাপুলিনে, কদম্বতলে, বাঁশরীকরে শ্যামসুন্দর সেজে রাধা রাধা বলে বংশীধ্বনি করি। আবার কেহ কেহ যুগলরূপ দেখতে চায়— তাই তাদের জন্য এক আমি রাধাকৃষ্ণ হয়ে, তাদের আনন্দ বর্দ্ধন করে থাকি। কেহ আমায় ধনুর্ব্বাণধারী দেখতে ভালোবাসে— তাই তাদের জন্য রামরূপ ধারণ করেছি। কোন ভক্ত নৃমুণ্ডমালিনী, লোলরসনা, গলিতবসনা, ভীষণা কালিকামূর্তি দেখতে চায়, সেইজন্য আমি কালী হয়ে লীলা করি। কেহ বা বাঘাম্বরধারী, নাগরাজহারী, ত্রিপুরারি -রূপে আমায় দেখতে চায়,আমি তাই হয়ে যাই। কেহ মা বলে সন্তুষ্ট হয়— আমি তার মা হয়ে কোলে লই। কেহ সখা বলে আমায় বাহুবন্ধনে বাঁধতে চায়— আমি সখা হয়ে তার বাহুপাশে বাঁধা থাকি। কেহ দাস হয়ে সেবা করতে চায়– আমি তার কাছে প্রভু হয়ে সেবা লই। কেহ স্বামী বলে আমায় জীবন যৌবন অর্পণ করে, আমি তার জীবনের নাথ হই। আমার কোন স্বাধীনতা নাই।

অহং ভক্তপরাধীনো হ্যস্বতন্ত্র ইহ দ্বিজ।
সাধুভির্গ্রস্তহৃদয়ো ভক্তৈর্ভক্তজনপ্রিয়ঃ।।

আমি ভক্তের অধীন, ভক্ত আমার হৃদয়ের ধন। ভক্ত যেমন রাখে আমি তেমন থাকি, ভক্ত যা বলে ডাকে আমি তাই হয়ে যাই।

অহো, ভক্তের এত শক্তি! আমায় বলে দাও কেমন করে ভক্ত হতে পারি— বলে দাও!

তাই বলছি— নাম কর্৷ আমি গুরুরূপে তোকে যে নাম শিখিয়েছি— তুই অনিবার সেই নাম কর্।

সে নাম ভিন্ন কি আর নাম করব না? আমায় গুরুরূপে রাম নাম করতে শিখিয়েছ; আমি কি কালী, কৃষ্ণ, হরি, হর— এ সব নাম উচ্চারণ করতে পারব না?

হাঁ, পারবি বৈকি। আমার রামের নামান্তর— কালী, কৃষ্ণ, হরি, হর। আমার রাম— কালী, কৃষ্ণ, হরি, হর সেজে লীলা করছেন; এই চিন্তা করে তুই কালী কৃষ্ণাদির চরিত্র শ্রবণ করতে পারিস্, নাম গান করতে পারিস্! তবে যতদিন ভাব দৃঢ় না হয়, ততদিন গুরদত্ত ইষ্টনাম সর্ব্বদা কীর্ত্তন করতে হয়, তাঁর চরিত্র শ্রবণ করতে হয়— তাতে ইষ্টে গাঢ় রতি হয়, সঙ্কীর্ণতা বিগলিত হয়ে যায়, ভক্ত স্হির হয়। তুই অবিরাম ইষ্ট নাম কর্৷

🍁মহারসায়ন | শ্রীশ্রীসীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব

 

 

 

🍂সাময়িকী

 

ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তিনি কোনও চূড়ান্ত দর্শন রেখে যাননি। কিন্তু মানুষ কীভাবে মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে, সেই প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল ধারাবাহিক। এখানেই তাঁর জীবনদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ধরা পড়ে। তিনি ধর্মতত্ত্বের জটিল প্রশ্নকে ব্যক্তিগত পরিসরে রেখে সমাজের বাস্তব সমস্যার দিকে মন দিয়েছিলেন। তাই বিদ্যাসাগরকে শুধু আস্তিক বা নাস্তিক এই দুই ঘরের একটিতে বসিয়ে দেখলে তাঁর বহুমাত্রিক চিন্তার প্রতি সুবিচার হয় না।

 

রক্ষণশীল সমাজের মাঝেই সংস্কারের লড়াই, বিদ্যাসাগরের কৌশল এখনও প্রাসঙ্গিক?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ছবি: সংগৃহীত

কমলাক্ষ্য ভট্টাচার্য 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আলোচনা হলেই সামনে আসে তাঁর সমাজসংস্কারক পরিচয়, নারীশিক্ষার প্রসার, বিধবাবিবাহ আন্দোলন কিংবা শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর অবদান। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ছবিটা অনেক বেশি জটিল হয়ে যায়। তিনি কী ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন? তিনি নাস্তিক? নাকি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে সংশয়, যুক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে নিজের চিন্তার ভিত্তি করেছিলেন? প্রায় দেড়শো বছর পরেও এই প্রশ্নগুলির একটিমাত্র উত্তর পাওয়া যায় না। এর একটি বড় কারণ, বিদ্যাসাগর নিজের ধর্মদর্শন নিয়ে কোনও সুসংবদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেননি। ব্যক্তিগত কথাবার্তায় তাঁর কিছু মন্তব্য পাওয়া গেলেও নিজের বিশ্বাসের পূর্ণ ব্যাখ্যা তিনি রেখে যাননি। ফলে পরবর্তী কালের গবেষক, সাহিত্যিক ও সমাজচিন্তকেরা তাঁর জীবনযাপন, চিঠিপত্র, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তাঁর ধর্মভাবনার একটি ছবি নির্মাণ করেছেন। কেউ তাঁকে আস্তিকতার কাছাকাছি রেখেছেন, কেউ নাস্তিক বলেছেন, আবার কারও মতে তিনি ছিলেন অজ্ঞেয়বাদী বা সংশয়বাদী।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বেরিয়েছিলেন তা নয়। সমাজের ভিতরে দাঁড়িয়ে সমাজের কিছু নির্মম রীতি বদলাতে চেয়েছিলেন। বিধবাবিবাহের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। প্রচলিত হিন্দু সমাজের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিধবাবিবাহের পক্ষে আন্দোলন করেছেন। নিজের পরিবারেও সেই নীতির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ কোনও সামাজিক রীতি মানুষের অধিকার ও মর্যাদার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তিনি আপস করেননি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জায়গায় আক্ষেপ করেছিলেন যে, বিদ্যাসাগরের কথোপকথন সংরক্ষণ করার মতো কোনও ‘বসওয়েল’ ছিলেন না। ফলে তাঁর দৈনন্দিন আলোচনায় ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি কিংবা ঈশ্বর নিয়ে কী ধরনের ভাবনা চলত, তার অনেকটাই এখন অজানা। এই অনুপস্থিতিই বিদ্যাসাগরকে ঘিরে বিতর্ককে আরও দীর্ঘ করেছে। তাঁর জীবনকর্মের দিকে তাকালে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে, মানুষের বাস্তব জীবন তাঁর কাছে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানুষের দুঃখ, নারীর অসহায়তা, শিক্ষার অভাব, সামাজিক বৈষম্য কিংবা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই, এই জায়গাগুলিতেই তিনি নিজের শক্তি ব্যয় করেছেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তর্কে দীর্ঘ সময় না দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র মানুষের জীবন বদলের কাজে মন দিয়েছিলেন। এই অবস্থানই উনিশ শতকের বাংলায় তাঁকে স্বতন্ত্র চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। একইভাবে, বিদ্যাসাগরের ধর্মচিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম থেকে তাঁর দূরত্ব। প্রচলিত ধর্মীয় কাঠামো, আচার বা ঈশ্বরতত্ত্ব নিয়ে তিনি কোনও আন্দোলন গড়ে তোলেননি। আবার ধর্মবিশ্বাসীদের ব্যক্তিগত আস্থার বিরুদ্ধেও তাঁকে ধারাবাহিক প্রচার চালাতে দেখা যায় না। তাঁর মনোযোগ ছিল অন্যত্র, কোনও সামাজিক প্রথা মানুষের জীবনে কী ফল তৈরি করছে, সেটিই ছিল তাঁর কাছে বড় প্রশ্ন।

ধর্ম সম্পর্কে ঈশ্বরচন্দ্র একটি বহুল আলোচিত বক্তব্যের মর্মার্থ ছিল, বর্তমান মানবজ্ঞান দিয়ে ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ নির্ণয় করা সম্ভব নয় এবং সেই জ্ঞান অর্জন মানুষের জন্য অপরিহার্যও নয়। এই বক্তব্যের ভিতরে ধর্মবিরোধী প্রচারের চেয়ে বরং একটি বাস্তববাদী মনোভাব কাজ করে। অর্থাৎ যে বিষয় মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, অধিকার ও সামাজিক সম্পর্ককে সরাসরি প্রভাবিত করছে, তার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এই কারণে বিদ্যাসাগরের জীবনকে ‘নাস্তিক’ বনাম ‘আস্তিক’ বিতর্কে আটকে রাখলে তাঁর চিন্তার বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে ‘অজ্ঞেয়বাদী’ বলেছিলেন। অর্থাৎ ঈশ্বর আছেন কি নেই, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার বদলে তিনি যেন বিষয়টিকে মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে রেখেছিলেন। এই অবস্থানের সঙ্গে তাঁর কাজেরও একটি সম্পর্ক দেখা যায়। তিনি ধর্মীয় মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেননি। তাঁর উদ্যোগের কেন্দ্রে ছিল স্কুল, পাঠ্যপুস্তক, নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ এবং মানুষের সামাজিক মর্যাদা। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্যা বাস্তব যন্ত্রণা তৈরি করে, সেই সমস্যাই তাঁর কাছে সংস্কারের বিষয় হয়ে উঠেছিল।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর শিশুপাঠ্য বইগুলির দিকেও তাকালে এই প্রবণতা ধরা পড়ে। নীতিশিক্ষা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে ঈশ্বরভীতি বা ধর্মীয় বিধানকে সামনে আনা হয়নি। বলিষ্ঠ ও ভাল চরিত্র, সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণকে ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর লেখায় ও লেখার চরিত্র গঠনে গুরুত্ব দিয়েছেন। শিশুদের নৈতিক মানুষ করে তোলার জন্য ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। আবার অন্যদিকে, বিদ্যাসাগরের জীবন নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির জায়গাগুলির একটি তাঁর কিছু সামাজিক ও ধর্মীয় আচরণ। চিঠিতে ‘শ্রীহরি শরণং’ বা অনুরূপ প্রচলিত শব্দ ব্যবহার, উপবীত ধারণ, শিখা রাখা কিংবা মায়ের মৃত্যুর পরে প্রচলিত শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করা, এসব ঘটনা দেখিয়ে বিদ্যালয়কে ধর্মবিশ্বাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে।

কিন্তু উল্টো দিকটিও দেখতে হয়। উনিশ শতকের সমাজে কোনও ব্যক্তি যে পোশাক, ভাষা বা সামাজিক রীতির সঙ্গে যুক্ত, তার সবকিছুকেই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বদরুদ্দীন উমর বিদ্যাসাগর-বিষয়ক আলোচনায় দেখিয়েছেন, ক্ষতিকর নয় এমন কিছু সামাজিক রীতি তিনি মেনে চললেও তার অর্থ এই নয় যে তিনি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র-এর আচরণের মধ্যে একটি বাস্তববাদী কৌশল কাজ করতে পারে। সমাজের প্রচলিত রীতির সবকিছুর বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নিলে যে বৃহত্তর সামাজিক কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তা তিনি বুঝতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বেরিয়েছিলেন তা নয়। সমাজের ভিতরে দাঁড়িয়ে সমাজের কিছু নির্মম রীতি বদলাতে চেয়েছিলেন। বিধবাবিবাহের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। প্রচলিত হিন্দু সমাজের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিধবাবিবাহের পক্ষে আন্দোলন করেছেন। নিজের পরিবারেও সেই নীতির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ কোনও সামাজিক রীতি মানুষের অধিকার ও মর্যাদার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তিনি আপস করেননি।

একইভাবে অন্যদিকে, এমন কিছু আচার ছিল যেগুলি পালন না করলে সরাসরি সামাজিক সংঘাত তৈরি হতে পারত, কিন্তু পালন করলেও তাঁর মূল কাজের কোনও ক্ষতি হচ্ছিল না। সেই জায়গায় তিনি আপাত-সম্মতি দেখিয়েছেন। এটিকে ধর্মবিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে দেখার আগে তাঁর সামগ্রিক জীবনপদ্ধতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। বিনয় ঘোষ বিদ্যাসাগরের এই বাস্তবধর্মী অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে বিদ্যাসাগর নিজের প্রধান লড়াইকে অন্য জায়গায় রেখেছিলেন। তাঁর কাছে সংস্কারের সাফল্য ছিল মুখ্য।

বিদ্যাসাগরের ধর্মভাবনার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা তাঁরই জীবনের শেষ পর্যায়ের। দীর্ঘ রোগভোগে তখন তিনি অত্যন্ত দুর্বল। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তাঁর কন্যা শান্তি-স্বস্ত্যয়ন ও হোম-যজ্ঞের ব্যবস্থা করেছিলেন। পরিবারের মানুষের আবেগের কথা ভেবে তিনি সরাসরি বাধা দেননি। কিন্তু সেই আয়োজনের ঘরে তিনি প্রবেশও করেননি।বতাঁর ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন -এর বিবরণ থেকে জানা যায়, কন্যার অনুরোধে তিনি হোমের ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং ঘর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখে মেয়েকে আশ্বস্ত করেছিলেন। ঘটনাটির মধ্যে একদিকে ছিল পরিবারের আবেগের প্রতি তাঁর কোমলতা, অন্যদিকে নিজের অবস্থানের প্রতি অনড়তা। এই ছোট ঘটনাটি তাঁর চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করতে চাননি। কিন্তু নিজের বিশ্বাসহীনতার জায়গাটিও বদলাননি। অর্থাৎ সহিষ্ণুতা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ ছিল না। আবার, জীবনের অন্য ঘটনাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তিনি মূর্তিপূজার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেননি। বেনারসে গিয়েও বিশ্বনাথ মন্দিরে যাওয়ার ঘটনা তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায় না। তাঁর উইলে স্কুল, দাতব্য চিকিৎসা আর অসহায় মানুষের সাহায্যের জন্য অর্থ বরাদ্দের কথা রয়েছে। কিন্তু দেবসেবার জন্য একই ধরনের কোনও পরিকল্পনা দেখা যায় না।

এখানে তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ধরা পড়ে। দান তাঁর কাছে কেবল ধর্মীয় পুণ্য অর্জনের উপায় ছিল না। মানুষের প্রয়োজন মেটানোই ছিল অর্থ ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য। ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স (Indian Association for the Cultivation of Science)-এ তাঁর অর্থসাহায্যের ঘটনাও বিদ্যাসাগর-এর জ্ঞান, শিক্ষা ও বাস্তব কল্যাণমুখী চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারকে শুধু উনিশ শতকের একটি সংস্কার আন্দোলন হিসেবে দেখলে তাঁর চিন্তার গভীরতা ধরা পড়ে না। তিনি এমন একটি সমাজে কাজ করছিলেন যেখানে ধর্মীয় পরিচয়, জাতিভেদ, সামাজিক মর্যাদা এবং পারিবারিক রীতিনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। সেই পরিবেশে দাঁড়িয়ে তিনি ধর্মকে আক্রমণ করে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করার পথ বেছে নেননি। যে প্রথা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে, সেটিকেই প্রশ্ন করেছেন।

এই জায়গাতেই তাঁর সেকুলার মনোভাবের বিশেষত্ব। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার কোনও আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্ব লিখে যাননি। কিন্তু তাঁর কাজের ভিতরে একটি কার্যকর ধর্মনিরপেক্ষতা দেখা যায়, মানুষের অধিকার নির্ধারণে তার ধর্মীয় পরিচয়কে প্রধান মানদণ্ড না করা। বিধবার জীবনযন্ত্রণা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিধবা কোন সম্প্রদায়ের, সেই কারণে নয়, একজন মানুষ হিসেবে তাঁর কী অধিকার থাকা উচিত, সেই কারণে। শিক্ষার প্রয়োজনও তিনি একইভাবে দেখেছেন। নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর উদ্যোগের পিছনে কোনও ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না। শিশুশিক্ষায় নৈতিকতার যে কাঠামো তিনি তৈরি করেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল চরিত্র ও আচরণ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর মানবতাবাদ তাই শুধু দয়ার জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দুঃখী মানুষের প্রতি সহানুভূতি যেমন ছিল, তেমনই ছিল সামাজিক কাঠামো বদলের চেষ্টা। বিধবাবিবাহের জন্য আইন প্রণয়নের আন্দোলন, মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবতাবাদ কার্যকর সামাজিক কর্মসূচিতে রূপ নিয়েছিল।

ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তিনি কোনও চূড়ান্ত দর্শন রেখে যাননি। কিন্তু মানুষ কীভাবে মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে, সেই প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল ধারাবাহিক। এখানেই তাঁর জীবনদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ধরা পড়ে। তিনি ধর্মতত্ত্বের জটিল প্রশ্নকে ব্যক্তিগত পরিসরে রেখে সমাজের বাস্তব সমস্যার দিকে মন দিয়েছিলেন। তাই বিদ্যাসাগরকে শুধু আস্তিক বা নাস্তিক এই দুই ঘরের একটিতে বসিয়ে দেখলে তাঁর বহুমাত্রিক চিন্তার প্রতি সুবিচার হয় না। তাঁকে বোঝার জন্য তাঁর কাজের দিকে তাকাতে হয়। সেখানে দেখা যায়, মানুষের কল্যাণ তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। সামাজিক রীতি তিনি অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি, আবার অপ্রয়োজনীয় সংঘাতও তৈরি করেননি। ক্ষতিকর প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় অযথা হস্তক্ষেপ করেননি। এই কারণেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ধর্মভাবনা নিয়ে বিতর্ক হয়ত সহজে শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু তাঁর জীবন থেকে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে যে, মানুষের দুঃখ দূর করার কাজ তাঁর কাছে ঈশ্বরতত্ত্বের বিতর্কের চেয়ে জরুরি ছিল। উনিশ শতকের বাংলায় এই বাস্তবমুখী মানবতাবাদ তাঁকে এক অনন্য সামাজিক চিন্তকে পরিণত করেছিল। তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদা ছিল কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের অধীন নয়; বরং মানুষের জীবন, যুক্তি, শিক্ষা ও ন্যায়ের প্রশ্নেই সমাজকে বিচার করা দরকার। সেই কারণেই আজও বিদ্যাসাগরকে শুধু অতীতের সমাজসংস্কারক হিসেবে নয়, আধুনিক ভারতীয় মানবতাবাদী চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবেও ফিরে দেখতে হয়।🍁

 

 

🍂স্মরণ
১৯৪৯ সালে প্রকাশিত ‘Communication Theory of Secrecy Systems’ গবেষণাপত্রের মাধ্যমে গুপ্তলিপি বা ক্রিপ্টোগ্রাফিকে আরও গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন শ্যানন। তথ্য কীভাবে নিরাপদ রাখা যায় ও কোনও সংকেতের গোপনীয়তা কীভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব, সেই বিষয়ে তাঁর কাজ পরবর্তী ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষণার ভিত শক্ত করে। বেল ল্যাবরেটরিজেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকও শুরু হয়। সেখানে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষক মেরি এলিজাবেথ ‘বেটি’ মুরের (Mary Elizabeth ‘Betty’ Moore) সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯৪৯ সালে তাঁরা বিয়ে করেন।

 

শূন্য আর একের ভাষায় বদলে দিয়েছিলেন দুনিয়া! ক্লদ শ্যাননের জীবনাবসান

ডিজিটাল যোগাযোগের যে জগৎ এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরির নেপথ্যে ছিলেন একজন মার্কিন গণিতবিদ ও বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী। তথ্যকে কীভাবে পরিমাপ করা যায়? কীভাবে একটি বার্তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নির্ভুল বা প্রায় নির্ভুল ভাবে পাঠানো সম্ভব? কিংবা কম্পিউটার কীভাবে ০ এবং ১-এর ভাষায় বিপুল পরিমাণ তথ্য ধারণ করতে পারে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে বদলে দিয়েছিলেন প্রযুক্তির গতিপথ। সেই বিজ্ঞানী ক্লদ ই শ্যানন (Claude E. Shannon) আর নেই। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়েছে।
ক্লদ ই শ্যানন। ছবি : সংগৃহীত

পালকি সিং

ডিজিটাল যোগাযোগের যে জগৎ এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরির নেপথ্যে ছিলেন একজন মার্কিন গণিতবিদ ও বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী। তথ্যকে কীভাবে পরিমাপ করা যায়? কীভাবে একটি বার্তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নির্ভুল বা প্রায় নির্ভুল ভাবে পাঠানো সম্ভব? কিংবা কম্পিউটার কীভাবে ০ এবং ১-এর ভাষায় বিপুল পরিমাণ তথ্য ধারণ করতে পারে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে বদলে দিয়েছিলেন প্রযুক্তির গতিপথ। সেই বিজ্ঞানী ক্লদ ই শ্যানন (Claude E. Shannon) আর নেই। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়েছে। দীর্ঘদিন আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের পর ম্যাসাচুসেটসের মেডফোর্ডের একটি নার্সিং কেয়ার সেন্টারে তাঁর প্রয়াণ হয়। আধুনিক ডিজিটাল যোগাযোগ ও তথ্যতত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ক্লদ শ্যাননের নাম প্রযুক্তির ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে রয়েছে। তাঁর গবেষণার প্রভাব যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে কম্পিউটার, তথ্য সংরক্ষণ, সংকেত প্রেরণ, গুপ্তলিপি আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো একাধিক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।

শ্যাননের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলির মধ্যে রয়েছে তথ্যতত্ত্বের বিকাশ। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্র ‘A Mathematical Theory of Communication’ যোগাযোগের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে নতুন দিক খুলে দেয়। মানুষের পাঠানো কোনও বার্তার তথ্যগত পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ করা যায়, সেই প্রশ্নকে গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন ক্লদ শ্যানন। তাঁর ধারণায় তথ্যকে এমন একটি একক দিয়ে পরিমাপ করা যায়, যা পরবর্তী সময়ে ‘বিট’ নামে পরিচিত হয়। ০ এবং ১ -এর এই দ্বিমাত্রিক কাঠামোই পরবর্তী ডিজিটাল প্রযুক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। এখনকার ইন্টারনেটের গতি থেকে শুরু করে কম্পিউটার মেমরি, ছবি, শব্দ, ভিডিও কিংবা নানা ধরনের ডিজিটাল নথি প্রায় সব ক্ষেত্রেই তথ্যের পরিমাণ এবং আদানপ্রদান নিয়ে ‘বিট’ ও ‘বিট প্রতি সেকেন্ড’ -এর ধারণা ব্যবহার করা হয়। যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট মাধ্যমে সর্বাধিক কতটা তথ্য নির্দিষ্ট সময়ে পাঠানো সম্ভব, সেই ধারণাকেও গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন শ্যানন। তাঁর এই কাজ পরবর্তী কয়েক দশকে যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের পথ তৈরি করে।

ক্লদ শ্যানন -এর গবেষণার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল জটিল তথ্যকে পরিমাপযোগ্য কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। মানুষের ভাষা, ছবি, শব্দ কিংবা কোনও সংকেত প্রভৃতি সবকিছুকেই তথ্যের নির্দিষ্ট কাঠামোয় বিশ্লেষণ করার পথ তৈরি করেছিলেন ক্লদ। ফলে কম্পিউটিং ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যে বিপুল বিস্তার পরবর্তী সময়ে ঘটেছে, তার অনেকটাই শ্যাননের তৈরি তাত্ত্বিক ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত।

শুধু তা-ই নয়, তথ্যতত্ত্বে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়েই ক্লদ শ্যানন-এর কাজের শুরু হয়নি। তরুণ বয়সেই ডিজিটাল সার্কিটের তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন ক্লদ। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় (University of Michigan) থেকে ১৯৩৬ সালে গণিত ও বৈদ্যুতিক প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পরে এমআইটি-তে (MIT) উচ্চশিক্ষার জন্য যোগ দেন। সেখানে অধ্যাপক ভ্যানেভার বুশের (Vannevar Bush) ডিফারেনশিয়াল অ্যানালাইজার নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান ক্লদ শ্যানন। তাঁর মাস্টার্সের গবেষণাপত্র ‘A Symbolic Analysis of Relay and Switching Circuits’ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বুলিয়ান অ্যালজেব্রার সাহায্যে ০ এবং ১-এর প্রতীক ব্যবহার করে কীভাবে রিলে ও সুইচিং সার্কিটকে বিশ্লেষণ করা যায়, সেই তাত্ত্বিক কাঠামো সেখানে তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল সার্কিট ও আধুনিক সুইচিং তত্ত্বের বিকাশে এই গবেষণার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৪০ সালে এমআইটি থেকেই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এসএম এবং গণিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন শ্যানন। পড়াশোনার সময় ভাষা পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতেও তাঁকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছিল। ফরাসী ও স্প্যানিশ শেখার জন্য তিনি শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন। জার্মান ভাষার পরীক্ষাও তাঁকে দু’বার দিতে হয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করার পর নিউ জার্সির প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৪১ সালে তিনি বেল ল্যাবরেটরিজে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্লদ-এর গবেষণার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। বেল ল্যাবসে গুপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গোপনীয় সংকেত নিয়ে কাজ করেন। যুদ্ধের সময়ে শত্রুর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক অস্ত্রের লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত প্রযুক্তি নিয়েও তাঁর দলের কাজ ছিল। যুদ্ধকালীন প্রয়োজন তাঁর গবেষণাকে যোগাযোগ নিরাপত্তা ও সংকেত বিশ্লেষণের আরও গভীরে নিয়ে যায়।

১৯৪৯ সালে প্রকাশিত ‘Communication Theory of Secrecy Systems’ গবেষণাপত্রের মাধ্যমে গুপ্তলিপি বা ক্রিপ্টোগ্রাফিকে আরও গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন শ্যানন। তথ্য কীভাবে নিরাপদ রাখা যায় ও কোনও সংকেতের গোপনীয়তা কীভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব, সেই বিষয়ে তাঁর কাজ পরবর্তী ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষণার ভিত শক্ত করে। বেল ল্যাবরেটরিজেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকও শুরু হয়। সেখানে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষক মেরি এলিজাবেথ ‘বেটি’ মুরের (Mary Elizabeth ‘Betty’ Moore) সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯৪৯ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। ১৯৫৬ সালে শ্যানন এমআইটিতে ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরে পরিবার নিয়ে ম্যাসাচুসেটসের উইনচেস্টারের মিস্টিক লেকের কাছে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি এমআইটিতে ডোনার প্রফেসর অব সায়েন্স পদে ছিলেন। এরপর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবেও যুক্ত থাকেন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে।

শ্যাননের জন্ম ১৯১৬ সালের ৩০ এপ্রিল মিশিগানের পেটোস্কিতে। তাঁর শৈশব কাটে গেইলর্ডে। স্কুলজীবনেই ক্লদ শ্যানন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের (Western Union) মেসেঞ্জার হিসেবে কাজ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তি, যন্ত্র আরভসমস্যার সমাধান নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। পরবর্তী জীবনে সেই আগ্রহের প্রকাশ ঘটেছে একাধিক অদ্ভুত ও মজার যন্ত্র তৈরির মধ্য দিয়ে। শুধু কঠিন গাণিতিক তত্ত্বের গবেষক হিসেবে তাঁকে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। শ্যাননের উদ্ভাবনী মন ছিল বেশ খেলুড়ে। তিনি এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যা জাগলিং বা বল নিয়ে খেলার কাজ করতে পারত। রকেটচালিত ফ্রিসবি, মোটরচালিত পোগো স্টিক, তথাকথিত ‘মাইন্ড রিডিং’ মেশিন, গোলকধাঁধার মধ্যে পথ খুঁজে নিতে সক্ষম যান্ত্রিক ইঁদুর প্রভৃতি নানা উদ্ভাবনের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। রুবিকস কিউব (Rubik’s Cube) সমাধানের জন্যও ক্লদ শ্যানন যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। বেল ল্যাবরেটরিজের করিডোরে তাঁকে একচাকায় সাইকেল চালাতে চালাতে তিনটি বল নিয়ে জাগলিং করতে দেখা যেত বলেও তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিতে উঠে এসেছে।

দাবার প্রতিও ক্লদ শ্যানন-এর গভীর আগ্রহ ছিল। কম্পিউটার দিয়ে দাবা খেলার ধারণা বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্যানন তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। আইবিএমের (IBM) ডিপ ব্লু (Deep Blue) বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকে হারানোর বহু বছর আগে ক্লদ দাবা খেলার কম্পিউটার তৈরির কাজ করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে রাশিয়া সফরের সময় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মিখাইল বটভিনিকের (Mikhail Botvinnik) সঙ্গে ম্যাচেও বসেছিলেন। ৪২ চালের লড়াইয়ের পর তিনি পরাজিত হন। তবে সেই ম্যাচ তাঁর দাবা-প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য জীবদ্দশায় বহু সম্মান পেয়েছেন শ্যানন। ১৯৬৬ সালে তিনি ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স (National Medal of Science) ও আইইইই মেডেল অব অনার (IEEE Medal of Honor) পান। ১৯৮৫ সালে পান কিয়োটো প্রাইজ ফর বেসিক সায়েন্স (Kyoto Prize for Basic Science)। আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি (American Philosophical Society), ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস (National Academy of Sciences), রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডন (Royal Society of London) ও লিওপোল্ডিনা অ্যাকাডেমির (Leopoldina Academy) সদস্যও ছিলেন ক্লদ শ্যানন। ইয়েল, মিশিগান, প্রিন্সটন, এডিনবরো, পিটসবার্গ, নর্থওয়েস্টার্ন, অক্সফোর্ড, ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়া, কার্নেগি-মেলন, টাফটস আর পেনসিলভানিয়া-সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে।

ক্লদ শ্যানন -এর গবেষণার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল জটিল তথ্যকে পরিমাপযোগ্য কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। মানুষের ভাষা, ছবি, শব্দ কিংবা কোনও সংকেত প্রভৃতি সবকিছুকেই তথ্যের নির্দিষ্ট কাঠামোয় বিশ্লেষণ করার পথ তৈরি করেছিলেন ক্লদ। ফলে কম্পিউটিং ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যে বিপুল বিস্তার পরবর্তী সময়ে ঘটেছে, তার অনেকটাই শ্যাননের তৈরি তাত্ত্বিক ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত। এখন স্মার্টফোনে কয়েক সেকেন্ডে ছবি পাঠানো, অনলাইনে ভিডিও দেখা, দূরদেশে মুহূর্তের মধ্যে তথ্য পৌঁছে দেওয়া কিংবা কম্পিউটারে বিপুল পরিমাণ ডেটা সংরক্ষণ, ডিজিটাল জীবনের এই পরিচিত দৃশ্যগুলির নেপথ্যে রয়েছে তথ্যকে বিটে প্রকাশ আর যোগাযোগের ক্ষমতা পরিমাপের সেই ধারণা। তাই ক্লদ শ্যাননের তৈরি ধারণাগুলি এখনও ডিজিটাল প্রযুক্তির গভীরে সক্রিয়। উল্লেখ্য যে, স্ত্রী বেটি মুর শ্যানন, ছেলে অ্যান্ড্রু মুর শ্যানন (Andrew Moore Shannon), মেয়ে মার্গারিটা ‘পেগি’ শ্যানন (Margarita ‘Peggy’ Shannon), বোন ক্যাথরিন এস কেয় (Catherine S. Kay) ও দুই নাতনিকে রেখে গিয়েছেন ক্লদ শ্যানন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, তাঁর শেষকৃত্য ও সমাধিস্থ করার আয়োজন ছিল একদমই ব্যক্তিগত পরিসরে। কিন্তু ০ এবং ১-এর ভাষায় যে বৈজ্ঞানিক দিক ক্লদ শ্যানন-এর মস্তিষ্ক থেকে উন্মোচন হয়, তার প্রভাব প্রযুক্তির ইতিহাসে বহু প্রজন্ম ধরে থেকে যাবে।🍁

 

 

🍂ফিরেপড়া | কবিতা 

 

শঙ্খ ঘোষ -এর একটি কবিতা

মিথ্যে

এই মুখ ঠিক মুখ নয়
মিথ্যে লেগে আছে
এখন তোমার কাছে যাওয়া
ভালো না আমার।

তুমি স্নেহে সুদক্ষিণা বটে
মেঘময় ঠোঁট নেমে আসে
তোমার চোখের জলে আজও পুণ্যে ভরে ওঠে রুদ্ধ দেশ আমি
তবু ছিঁড়ে যাই দূরে
এই মুখ ঠিক মুখ নয়
হলুদ শরীর থেমে যায়
বোধহীন, তাপী
তোমার অনেক দেওয়া হলো
আমার সমস্ত দেওয়া বাকি।

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস  
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায়চৌধুরী 

৩০. 

সকাল থেকে উঠেই তিথির মনটা কেমন বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে যা চলছে বুঝতে পারছে না কি হবে? কি হচ্ছে। সত্যিই তো। সমাজমাধ্যমে এরকম একটি নিউজ দেখার পর সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষকদের মান কোথায়? প্রাচীনকালে যেখানে শিক্ষাগুরুর অবস্থান ছিল অত্যন্ত উচ্চ পবিত্র এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় গুরুকে কেবল একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং ঈশ্বরের সমতুল্য এবং জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে গণ্য করা হতো’। আর সেই শিক্ষাগুরু আজ ভুলুণ্ঠিত। কাদের শিক্ষা দান করা হচ্ছে। এর দায়ভার কাদের। ওদিকে দুধ উতলে সব পড়ে গেল। এতক্ষণে হুশ ফিরল।

মানুষ আসলে এভাবেই হয়ত যখন পালাবার পথ থাকে না যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন বোধহয় এভাবেই হারিয়ে যাই! হারিয়ে গিয়ে কি আর কখনও সেভাবে ফিরে আসা যায়? ফিরে আসতে কী পেরেছিল লতা দি? কী হয়েছিল লতাদির সঙ্গে?

—ও বৌমা এত কি ভাবছ গো? দুধ তো সব পড়ে গেল।
—হ্যাঁ মাসি। আজকে তোমাকে চনমনে লাগছে না, কিছু হয়েছে?
তিথি চুপ করে থাকে। কী বলবে মাসিকে? কী বা বলার আছে!
এর মধ্যে শাশুড়ি মায়ের ঘরে টিভি চলছে সেই একই জিনিস দেখানো হচ্ছে। বাইরে থেকেই শোনা যাচ্ছে। না কাগুজে মাসিকে বলি, চা’টা মাকে দিয়ে আসুক। তিথি সেই শাশুড়ি মার বাহারি কাপে চা’টা দিয়ে কাগজি মাসিকে বলল,
—মাসি চা’টা একটু মাকে দিয়ে আসো তো।
—আমি যাব—?
মুখটা কাচামাচু করে বলল।
তিথির বিষন্ন একটা ভাব দেখে মাসি বলল,
—আচ্ছা যাচ্ছি।
—আচ্ছা যাচ্ছ যাও, মা যদি বলে বৌমা কোথায় তাহলে ব’ল বাথরুমে আছি।
—আচ্ছা ঠিক আছে।
—তোমার চা টা এখানে ঢেকে রাখলাম। এসে তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবে কেমন?
—উপরের ঘরটা মুছে আসব একেবারে।
—না মাসি সকাল থেকে অনেক কাজ করেছ, এখন একটু কিছু পেটে পড়ুক।
—তুমি তো শুধু চা দাও না, চায়ের সাথে অনেক কিছু দাও। খেতে তো সময় লাগবে।
—লাগুক আগে খাবে পরে কাজ।
—আচ্ছা…
কাগুজে মাসি চা টা নিয়ে চলে গেল। ওদিক উপর থেকে পবিত্র চেঁচাচ্ছে,
—আমার চা টা দেবে না কি?
তিথি চায়ের কাপটা নিয়ে পবিত্রর ঘরের দিকে ছুটল।
পবিত্র তিথিকে বলল,
—এত দেরি করলে?
তিথি দেখল, পবিত্রর ঘরেও টিভিতে এক ই নিউজ।
তিথি একবার চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল, তারপর বলল,
—আর নেওয়া যাচ্ছে না।
—ও বুঝেছি তোমার মুড কেন অফ!
—হ্যাঁ গো, আমরা সন্তান কীভাবে মানুষ করছি! কে জানে কি যে হবে!
—কেন আমরা যেটা দেবার সেটা তো ঠিকই দিচ্ছি ওকে, তো নৈতিক শিক্ষার অধিকারটা আমরা দিচ্ছি। কপালে চিন্তার ভাঁজ।
—এত চিন্তা করে কিচ্ছু হবে না, দেখা যাক।
তিথি শব্দটা বড় করে উচ্চারণ করে বলল, দেখা যাক? কী দেখা যাবে ভবিষ্যতে? সামাজিক অবক্ষয় ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে।
—শোনো তুমি এই নিয়ে এত মাথায় চাপ নিও না তো। তোমার একটুতেই টেনশন হয়ে যায়।
—কী করব বলো? ছাত্ররা যদি শিক্ষককে মেরে রক্তাক্ত করে, এটাই যদি তাদের গুরুদক্ষিণা হয়, তবে তো অবশ্যই ভাবায়।
পবিত্র বলল, না সে তো ঠিক কথাই। সত্যি এটা খুব লজ্জাজনক ব্যাপার এবং অত্যন্ত গভীর বেদনাদায়ক।
এরপর, পবিত্র তিথিকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বলল, এই নিয়ে এত বেশি মন খারাপ করো না। চাপ নিও না তোমার লেখার কতদূর?
তিথি বলল, আর লেখা!
—এ বাবা! এভাবে ভাবলে হবে? কাগুজি মাসি কদিন আছে তার মধ্যে তোমার সেই তথ্যগুলো জোগাড় করতে হবে নাকি?
—হ্যাঁ সে তো ঠিকই।
লতা মাসিকে নিয়ে লিখছিলে না?
—হ্যাঁ গো।
—যাও যাও, মাসির কাছ থেকে শুনে নিয়ে আবার লিখে ফেলো। স্মৃতির ক্যানভাসে উজ্জ্বল হয়ে ফুটুক।
—কিছু ভাল লাগছে না।
—তাই বললে হয়, যেটা লিখছে সেটা মনোযোগ দিয়ে লেখ। তোমার হাতে বা আমার হাতে কি আছে বলো! যেটা হবার সেটা হবে, তবে ভয়ঙ্কর দিন আসতে চলেছে, এখনই যদি সাবধান না হয় ভবিষ্যতে এরাই ক্রিমিনাল তৈরি হবে। ছাড়ো এসব। যাও কাগজি মাসির কাছ থেকে শুনে নাও, লতাদির জীবনকথা।
—কিছু ভাল লাগছে না গো।
-হ্যাঁ যাই, শুরু যখন করেছি শেষ তো করতে হবে।
ও-পুচু তোমাকে আদর করিনি এসো আদর করে দিই। ও মাসি বাসন মাজতে বসে গেছ? চা খেয়েছ?
—হ্যাঁ খাচ্ছি গো।
—ও মাসি বলো লতাদির জীবন কথা।
—তোমাকে এখন একটু অন্যরকম লাগছে আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। ও-বৌমা চায়ে মিষ্টি দাওনি?
—কেন চিনি কম হয়েছে?
—কি জানি হতেও পারে! আজকে অন্যমনস্কভাবে চা-টা করা হয়েছে তো। আমরা তো চিনি খাই না, তোমাকে হয়ত সেই চা-টাই দিয়েছি নাকি গো মাসি!
মাসি হো হো করে হেসে উঠল।
—এই নাও চিনি…
তিথি বেশ খানিকটা চিনি নিয়ে মাসির চায়ের কাপে দিয়ে দিল। —কী বলি সে কথা মাসির কানে যেতেই লতাকে তো ঘরে বন্দী করে রাখল!
—কেন?
—আর ওই কাস্টমার দাদাকে আসতে বারণ করে দিলেন।
—তারপর?
—তারপর সে এক সাঙ্ঘাতিক অবস্থা! কিন্তু ওই কাস্টমার দাদা ছাড়ার পাত্র নয়। আমাকে দিয়ে খবর পাঠাল, লতাকে চিন্তা করতে বারণ করো।
—ও শেষ পর্যন্ত তোমাকে শিখন্ডি করল?
—আর ব’লো না! লতা তো কেঁদে কেঁদে ভাসিয়েছে। লতার কাছে পৌঁছনো অত সহজ? তবে আমি একটু হেলামেলা ছিলাম তো! আমাকে একটু কমই সন্দেহ করত।
—বাহ মাসি তুমি গ্রেট।
তারপর ….বেশ ইন্টারেস্টিং।
—না গো বৌমা, এর পেছনেও এক করুণ অবস্থা কাজ করছে।
মাসির মুখটা দেখে কেমন যেন মনে হল তিথির। উল্লাসটা একটুতেই থেমে গেল। তিথি গ্যাসে ঝিঙে আলুর পোস্ত বসিয়ে এসেছিল। এবার সে ছুটল রান্না ঘরের দিকে, যদিও সিমে দিয়ে তাড়াতাড়ি এসে খুন্তি দিয়ে নেড়ে দেখল ঠিকঠাক আছে। নামিয়ে ফেলল। এর মধ্যেই বুবুন এসে হাজির।
—মাম মাম মাম আমার ম্যাগি…
—কেন আজকে ম্যাগি কেন বাবা?
—কেন নয় মাম, মাম, মাম আজ তো সানডে।
যাঃ! সবের মধ্যে দিতে ভুলেই গিয়েছিল যে, আজকে বুবুন ম্যাগি খাবে। ও-বোঝানোর চেষ্টা করল, যদি ম্যানেজ করা যায়।
—আচ্ছা বাবা আজকে যদি মাম্মি তোমাকে ম্যাগি না করে দেয়, তোমার খুব মন খারাপ হবে?
—কেন মাম মাম করে দেবে না কেন? মাম মাম তুমিই তো ঠিক করেছে সানডে…
—আচ্ছা আচ্ছা তুমি ঘরে যাও পরে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব।
—কি মজা কি মজা…
বলতে বলতে বুবুন বেরিয়ে গেল আর পুচুটা ওর সঙ্গী হল।

ওদিকে ঘর মোছার বালতি নিয়ে এসে হাজির হল কাগুজে মাসি।
—মাসি তোমার ঘর মোছা হয়ে গেল?
—হ্যাঁ, হল।
—মাসি বল, লতাদিদের কথা…
—ওই তো লতার সঙ্গে দেখা করে সব জানাবার পর ওর কান্না থামল। কিন্তু মাসির চোখে তো সন্দেহের তালিকায় থেকে গেল।
—কেন মাসি, কী বলছে মাসি আবার?
—বলেছে এবার অন্য কাস্টমারদের জন্য তোকে রেডি হতে হবে।
—লতা কী করেছিল?
—লতার তো উপায় ছিল না ওকে রেডি হতেই হত। তবুও একটা কাজ করেছিল। মাসির কথা মতো কাস্টমারের ঘরে গেলেও কাস্টমারকে কুপোকাত করে দিয়েছিল।
—বলো কি মাসি!
তিথি অবাক হয়ে গেল! তারপর বলল,
—কী করল?
—সে আর কাহিনি, অন্য দিন বলব।
—লতাদি কী নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিল? জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মাসি এভাবে আর কতদিন নিজেকে বাঁচাবে।
মানুষ আসলে এভাবেই হয়ত যখন পালাবার পথ থাকে না যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন বোধহয় এভাবেই হারিয়ে যাই! হারিয়ে গিয়ে কি আর কখনও সেভাবে ফিরে আসা যায়? ফিরে আসতে কী পেরেছিল লতা দি? কী হয়েছিল লতাদির সঙ্গে?লতাদির স্বপ্নের লালিত ছোট ছোট আশাগুলো কি কখনও প্রজাপতির ডানা মেলে উড়তে পেরেছিল? এক মুক্ত আকাশকে কী আর দেখা হয়েছিল?🍁 (ক্রমশঃ) 

সম্পাদকীয় নোট : অনিবার্য কারণে বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়-এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘শব্দদের রাত্রি হয়’ এই রবিবার প্রকাশিত হল না। পরবর্তী সংখ্যা থেকে যথারীতি প্রকাশিত হবে। ––সম্পাদক, সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল 

 

 

🍂কবিতা 

 

 

ফাল্গুনী চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা 

বসন্তের গান

পাহাড় ভাঙতে ভাঙতে হঠাৎ জলের উচ্ছ্বাস ম্লান হয়ে এল
রোদের নথি পত্রে কিরণেরা জলকে ঘিরে আছে
ঝলমলের ভিতর হারিয়ে যায় প্রেমের গোধূলি বেলা
রাতকে বেঁধো না আমি নিস্তব্ধ তাই
আগুনের শিখায় শিখায় লিখে যাবো প্রেমের উৎস
রেখে যাবো বিহঙ্গের মতো পরদেশে
কাকলির অঝোর
এসো না হাতে হাত ধরি
পিপাসার ভাঙ্গন থেকে পিপাসাকে মিলাই
আমার বীণাপানির মতো শ্বেত বস্ত্র-এ তুমি নির্বাসন এঁকে যাও। আমি সময়কে সেলাই করি
ভুলে যাও পুরোনো শায়েরীর ধুলো জমানো পৃষ্ঠার
ঘাত প্রতিঘাত
একটি চিতা জ্বলছে
প্রেমের স্পর্শে
দেখতে পাচ্ছো রুমালেরা
কিভাবে ফিরছে পলকের তলায়
মায়াবিন জলের ঘাট
একটু সরে এসো, তোমাকেই খুঁজছি
খোলা ঝরোখায়, রূপসায়, কুহেলিকায়

 

 

বৃন্দাবন দাস -এর একটি কবিতা 

কেউ নয় অসজ্জন

এ পোড়া ধরণীতে কেউ যন্ত্রণাহীন নয়

যৌথ অভিযান বলি যা, সেও এক নিশ্চেষ্ট অভিমান
সঙ্গমহীনতা কখনো দেবে না ভালোবাসার ভুবন

যেভাবে শুভ উদ্বোধন, সমাপ্তি সংগীত বাজে কই
আমাদের সবটাই সফল, মূর্খ ছাড়া কার করতলে

অধুনা বর্ষার প্রিয় জমি,রুক্ষ খরায় চৌচির
ডানা ছেঁটে পাখি পোষা এখানের নিয়ম
বাজার যাওয়ার আগে সুখ কেনা হয়ে যায়

এত অনটন তবুও তো জেগে আছে বিশুদ্ধ কিছু মুখ
প্রণত মাথায় শুধু ন্যুব্জ ঘাড়
অবনত জীবনে কোথায় প্রাঞ্জল প্রেম

সকাল সকাল হোক গোধূলি গোধূলি
সমান্তরাল হোক বান্ধব ও মনোনীত আশা

সুধীমাত্রেই জানে ‘অসজ্জন’ বলে কেউ থাকেনা এখানে—

 

 

মিতা নূর -এর একটি কবিতা 

বর্ষার আকাশ

এমন এক বর্ষা আকাশ মেঘ ডুবি দিনে,
তুমি এমনই আপন এক দুঃখ আমার,
পুড়িয়ে দিয়ে মন, বাড়িয়ে দিলে ঋণে…!

ছোট ছোট খুনসুটিতে হয়েছে ভুল,
কিছু ভুল ছিল তোমার…!
চোখ চাওয়াচাওয়ি খেলায়, আঙুলে ছোঁয়ার ছলে,
কিছু ভুল হয়ে ছিলো আমার…!

শত শব্দ রেখেছি জমা মেঘ বাক্সে,
তোমার নামে…!
ঠিক আসবে অভিমানে বর্ষার ডাকপিয়ন,
হাতে নিয়ে চিঠি পদ্মপাতার খামে…!

আমার বিশ্বাস আসবেই তুমি, মন বর্ষা বলে,
অপেক্ষায় চোখ ছলছলে…!
একগুচ্ছ কদম থাকবে তোমার হাতে,
ভাবলেই মন আনন্দের সুরে দোলে,
তুমি আসবেই মন বলে…!

 

 

 

স্বপনকুমার মান্না -এর একটি কবিতা 

বুঢ়াবালাঙ্গার ঘাট

নদী পারাপারে বাবার নৌকা পৌঁছাত ওপারে চাসাকন্দে,বুঢ়াবালাঙ্গায়
দু’পারের চলমান জীবন যাপন বাবা যখন খেতে বসে গল্প করে,
খুশিতে মায়ের মুখখানা হয়ে যায় পূর্ণিমা চাঁদ
আবেগতাড়িত বাবা মাকে বলত তোমাকে নিয়ে যাব একদিন।

দু’পারেই কোনও বাঁধান ঘাট নেই
কাঠের পাটাতনে পা রেখে বাবার কাঁধে ভর দিয়ে
সরু বাঁশ ধরে যাত্রীদের ওঠানামা,বড় ভরসার কাঁধ বাবার
দারিদ্র্য ভরা মায়ের সংসারে আমাদেরও ভরসার কাঁধ।

মা বলত, তোর আরও দুই মা আছে, নদী মা আর দেশ মা
বড় হয়ে বুঝবি, জানবি, তোর বাবা খুব মান্যি করে।
মায়ের কথার আমি কোনও মানে খুঁজে পাই না
ঘরের মা আমার দুঃখে কাঁদে সুখে হাসে,নদী মা অন্ন বস্ত্রের
কিন্ত দেশ মা আমাদের কোন উপকারে লাগে!
মাঝেমাঝে বাবা রাতে ঘরে ফেরে না
সেদিন গুলো বাবা নাকি দেশ মা’র কাছে যায়, দেশ মা’র খুব কষ্ট
যুগান্তর দলের ছেলেদের সাথে বাবার গোপন যোগাযোগ
শুনেছি বাবার মত আরও অনেকেই একসাথে যায়
বাবা’ই তাদের চুপিচুপি পারাপারের কাজ করে রাতের অন্ধকারে।
ভারী বুটের খটাখট শব্দে ঘুম ভেঙে মায়ের বুকে মুখ চেপে দেখি
মা’ও জেগে আছে,বাবা আজ দেশ মা’র কাছ থেকে ঘরে ফেরেনি!
বারুদের গন্ধ বুলেটের শব্দ নাকে কানে ঢুকে হৃদয় বিদীর্ণ করে
মায়ের সম্মান ফেরাতে ছেলেরা প্রাণ দিয়েছে বুঢ়াবালাঙ্গায়
চারিদিক থেকে ভেসে আসে এক নারীর চাপা কান্নার শব্দ,
তাই কী কাঁদছে ওই নারী সন্তানের ব্যথায়!
তবে ওই কী আমাদের দেশ মা!
থমথমে পরিবেশে পাখিরা গান ভুলে যায়
মা কী জানে, বাবা কবে বাড়ি ফিরবে!

আজও বাবার অপেক্ষায় আছি
বাবার মুখে শুনব আমাদের দেশ মা এখন কেমন আছে।

 

 

শুভমিতা মোনাকার -এর একটি কবিতা 

পুরুষের বেদমন্ত্র ঠোঁট

হে পুরুষ,তোমার শক্ত বুকের ভিতর মাথা গুঁজে-
অশ্রু বিসর্জন করার পর
নিজেকে শান্ত নদী মনে হয়

শামুক হয়ে যাওয়া আমার শরীর
তোমার স্পর্শে বেহালার সুর হয়ে যায়

পূর্ণিমার আলোর নীচে
যখন আমার ভিতর ঠোঁট ডুবিয়ে,
পাখির মতো আদর করো
তখন সবুজ ঘাসের ওপর গোলাপি শিশিরে
পিঠ ভিজে যায় আমার

যে পুরুষ হাত
আমাকে তপোবনে রেখে
বেদমন্ত্র ঠোঁটে
আমার ঘাড় কপাল স্পর্শ করে
সেই পুরুষের জন্য আমি
আগুনে আহুতি হতেও রাজি

 

 

অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা 

সার্টিফিকেট

নীরব একাকিত্ব।কেউ যেন কোথাও নেই।

তবুও নিজের উপস্থিতি
কয়েকটা অক্ষর আর শব্দের ভেতর।
প্রামাণ্য হিসেবে থেকে যায় প্রশংসাপত্রে।

এই যে শিশুটি ভূমিষ্ট হলো,তার উপস্থিতি
জন্ম সার্টিফিকেটের ভেতর।

তারপর, সে একে একে পরীক্ষায় কৃতকার্য হবে।
তারও উপস্থিতি কয়েকটি সার্টিফিকেটের ভেতর।

এরকমভাবে সবাই ছুটে চলেছি, নিজেদের অস্তিত্ব রাখার জন্য কিছু নথির ভেতর।

অতঃপর মৃত্যু।

তারপরেও যে উপস্থিতি, সেটুকু রয়ে যায় ডেথ সার্টিফিকেটের ভেতর।

এইভাবেই বোধহয় সব কিছু ছড়িয়ে পড়ে।

 

 

 

🍂গদ্য

ডরিসের সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাসগুলির একটি ‘দ্য গোল্ডেন নোটবুক’। উপন্যাসটি (The Golden Notebook), প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। এই উপন্যাসকে শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি হিসেবে পড়লে এর ব্যাপ্তি ধরা যায় না। নারীজীবন, মানসিক টানাপোড়েন, লেখকের সৃজনশীল সংকট, যৌনতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপ, এবং বিভিন্ন স্তরকে একসঙ্গে এনে নির্মিত হয়েছিল এই বই। একজন নারীর ব্যক্তিসত্তা কীভাবে পরিবার, প্রেম, রাজনীতি ও লেখালিখির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, সেই প্রশ্ন বইটির অন্যতম কেন্দ্রে রয়েছে। ‘দ্য গোল্ডেন নোটবুক’ প্রকাশের সময় নারীর অভিজ্ঞতা ও মানসিক জগত নিয়ে সাহিত্যে যে ধরনের আলোচনা চলত, তার তুলনায় লেসিংয়ের উপস্থাপনা ছিল অনেক বেশি খোলামেলা ও বহুমাত্রিক।

 

৮৭ বছরে বয়সে নোবেল পান, কিন্তু জীবনের শুরুতেই পড়াশোনা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন! ডরিস লেসিংয়ের বিস্ময়কর পথ

ডরিস লেসিং (Doris Lessing) শুধু একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন নারীজীবন, রাজনীতি, সমাজ, যৌনতা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরন্তর প্রশ্ন তোলা একজন স্বতন্ত্র সাহিত্যিক-কণ্ঠ। ডরিস লেসিং -এর জন্ম পারস্যে, কিন্তু বেড়ে ওঠেন আফ্রিকায়। পরে লন্ডনে বসবাস করেন। তাঁর নিজের জীবনই ছিল যেন এক দীর্ঘ উপন্যাস। আর সেই জীবনের অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে জন্ম দিয়েছিল প্রায় ৫০টি বইয়ের এক বিশাল সাহিত্যভুবন।
ডরিস লেসিং। ছবি : সংগৃহীত

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়

১৪ বছর বয়সেই স্কুলের গণ্ডি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরপর কখনও পরিচারিকার কাজ, কখনও টেলিফোন অপারেটর, কখনও স্টেনোগ্রাফার, আবার কখনও সাংবাদিকতা! জীবন তাঁকে ঘুরিয়েছে একের পর এক পথে। অথচ সেই মেয়েটিই একদিন বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান নোবেল পুরস্কার হাতে তুলে নেবেন, তা কে জানত! ৮৭ বছর বয়সে সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার সময় ডরিস লেসিং (Doris Lessing) শুধু একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন নারীজীবন, রাজনীতি, সমাজ, যৌনতা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরন্তর প্রশ্ন তোলা একজন স্বতন্ত্র সাহিত্যিক-কণ্ঠ। ডরিস লেসিং -এর জন্ম পারস্যে, কিন্তু বেড়ে ওঠেন আফ্রিকায়। পরে লন্ডনে বসবাস করেন। তাঁর নিজের জীবনই ছিল যেন এক দীর্ঘ উপন্যাস। আর সেই জীবনের অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে জন্ম দিয়েছিল প্রায় ৫০টি বইয়ের এক বিশাল সাহিত্যভুবন।

ডরিস লেসিংয়ের জীবনকে শুধু একজন নোবেলজয়ী লেখকের জীবনী হিসেবে দেখকে ভুল হবে। তাঁর এমন লেখক যাত্রা, প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে জীবনের নানা পেশা ও অভিজ্ঞতাকে নিজের পাঠশালা করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা পরে প্রায় ৫০টি বইয়ের বিশাল সাহিত্যভাণ্ডারে রূপ নেয়। তাঁর লেখায় ব্যক্তিমানুষের ঘর, সম্পর্ক ও শরীর যেমন জায়গা পেয়েছে, তেমনি জায়গা পেয়েছে রাজনীতি, যুদ্ধ, সমাজ, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ সভ্যতার প্রশ্ন।

ডরিস লেসিংয়ের জন্ম ১৯১৯ সালের ২২ অক্টোবর পারস্যের কেরমানশাহে। সেই অঞ্চল বর্তমানে ইরানের অন্তর্গত। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মচারী ও মা ছিলেন নার্স। জন্মভূমি থেকে তাঁর পরিবারের পরবর্তী যাত্রা তাঁকে নিয়ে যায় দক্ষিণ রোডেশিয়ায়, বর্তমান জিম্বাবোয়েতে। ১৯২৫ সালে পরিবার সেখানে চলে যায়। উপনিবেশিক আফ্রিকার পরিবেশ, সামাজিক বিভাজন, মানুষের জীবনযাপন এবং ঔপনিবেশিক সমাজের নানা বৈপরীত্য পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখায় বিভিন্ন ভাবে ফিরে এসেছে। শৈশব ও কৈশোরে ডরিস লেসিং কনভেন্ট স্কুল আর একটি মেয়েদের স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু ১৪ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছেড়ে দেন। এখানেই তাঁর জীবনের প্রচলিত শিক্ষাপথ শেষ হয়ে গেলেও জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ বন্ধ হয়নি। পরবর্তী জীবনেই তিনি নানা পেশায় যুক্ত হয়ে মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। কখনও পরিচারিকার কাজ করেছেন, কখনও টেলিফোন অপারেটর, কখনও স্টেনোগ্রাফার, আবার কখনও সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে ছোটগল্প লেখার চর্চাও চালিয়ে যান। এই বিচিত্র কর্মজীবন তাঁর লেখকসত্তাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের বদলে তাঁর শিক্ষার বড় অংশ হয়ে উঠেছিল বাস্তব জীবন। কর্মক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদি সবকিছুই তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ফলে পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যে সমাজকে দূর থেকে দেখা কোনও বর্ণনা পাওয়া যায় না। পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর সংঘাত সেখানে বারবার উঠে এসেছে।

১৯৪৯ সালে ডরিস লেসিং লন্ডনে চলে যান। লন্ডন তাঁর সাহিত্যিক জীবনের নতুন পর্বের সূচনা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেন, দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা টানাপোড়েন তাঁর চিন্তার জগৎকে আরও প্রসারিত করে। তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন ও বিভিন্ন সামাজিক প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা নেন। পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও অংশ নেন। তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কখনও কেবল সংগঠনের সদস্য হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজ ও সভ্যতার গতিপথ নিয়ে তাঁর প্রশ্ন তাঁর সাহিত্যেও জায়গা করে নেয়। ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা বাঁকে ভরা। ডরিস লেসিং দু’বার বিবাহ এবং তাঁর তিন সন্তান ছিল। পরিবার, মাতৃত্ব, নারী হিসেবে সামাজিক ভূমিকা আর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তাঁর সাহিত্যচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। নারীকে কেবল পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ কোনও চরিত্র হিসেবে না দেখে তাঁর নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব, চিন্তা এবং সৃজনশীলতার অধিকার নিয়ে ডরিস লিখেছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, প্রায় ৫০টি বই নিয়ে তৈরি ডরিস লেসিংয়ের সাহিত্যজগৎ। কিন্তু একক কোনও ঘরানায় আটকে নেই। উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও নানা ধরনের কল্পনাধর্মী রচনায় তিনি কাজ করেছেন। তাঁর লেখায় কখনও বাস্তব সমাজের কঠিন ছবি, কখনও মানুষের মনস্তত্ত্ব, কখনও রাজনৈতিক বিশ্বাসের সংঘাত, আবার কখনও ভবিষ্যৎ পৃথিবী কিংবা ভিনগ্রহের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবসভ্যতার বিচার উঠে এসেছে। বিংশ শতাব্দীর মানুষের জীবনযাত্রা আর আচরণগত পরিবর্তন তাঁর সাহিত্যজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ডরিসের সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাসগুলির একটি ‘দ্য গোল্ডেন নোটবুক’। উপন্যাসটি (The Golden Notebook), প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। এই উপন্যাসকে শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি হিসেবে পড়লে এর ব্যাপ্তি ধরা যায় না। নারীজীবন, মানসিক টানাপোড়েন, লেখকের সৃজনশীল সংকট, যৌনতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপ, এবং বিভিন্ন স্তরকে একসঙ্গে এনে নির্মিত হয়েছিল এই বই। একজন নারীর ব্যক্তিসত্তা কীভাবে পরিবার, প্রেম, রাজনীতি ও লেখালিখির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, সেই প্রশ্ন বইটির অন্যতম কেন্দ্রে রয়েছে। ‘দ্য গোল্ডেন নোটবুক’ প্রকাশের সময় নারীর অভিজ্ঞতা ও মানসিক জগত নিয়ে সাহিত্যে যে ধরনের আলোচনা চলত, তার তুলনায় লেসিংয়ের উপস্থাপনা ছিল অনেক বেশি খোলামেলা ও বহুমাত্রিক। তাঁর নারীচরিত্রগুলিকে দেখলে দেখলে দেখা যায়, অন্যের সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করে না; তারা নিজের জীবন, সম্পর্ক, বিশ্বাস ও শরীর সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে। সেই কারণে তাঁর সাহিত্য নারীবাদী পাঠের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে লেসিংকে কেবল নারীবিষয়ক লেখক হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর বিশাল সাহিত্যকর্মের অনেকটাই আড়ালে চলে যাবে একথা অনস্বীকার্য।

লিসিং-এর লেখার আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তা হল ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা। মানুষের সভ্যতা কোন দিকে এগোচ্ছে, প্রযুক্তি ও ক্ষমতার ব্যবহারে পৃথিবীর পরিণতি কী হতে পারে, কিংবা মানবসমাজকে বাইরের কোনও পর্যবেক্ষক কীভাবে দেখবে? এই ধরনের প্রশ্নও তাঁর রচনায় এসেছে। কখনও বিজ্ঞানকল্পের আবহ ব্যবহার করে তিনি মানুষের বর্তমান সমাজকেই নতুন করে দেখেছেন। ভবিষ্যতের কল্পনা তাঁর কাছে রোমাঞ্চের বিষয় ছিল না এমন নয়। একইভাবে বর্তমান সভ্যতার আচরণকে অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার উপায় ওঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ২০০৭ সালের ১১ অক্টোবর ডরিস লেসিংয়ের জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে সাহিত্যজগতের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে ওঠে। তিনি তখন লন্ডনের উত্তরাংশে নিজের বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। একটি ট্যাক্সি থেকে নেমে বাড়ির কাছে পৌঁছনোর সময় রয়টার্সের (Reuters) এক সংবাদকর্মী ডরিস লেসিংকে জানান যে, তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আচমকা পাওয়া সেই খবরের মুহূর্তটি সংবাদমাধ্যমে ধরা পড়ে যায়। বাড়ির সিঁড়িতে বসে থাকা লেসিংয়ের ছবি পরবর্তী সময়ে তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্যতম পরিচিত দৃশ্য হয়ে ওঠে।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি (Swedish Academy) ডসিস্কে যে স্বীকৃতি দেয়, সেখানে তাঁর লেখায় নারীজীবনের অভিজ্ঞতা, সংশয়, তীব্রতা ও ভবিষ্যৎদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরা হয়েছিল। পুরস্কার ঘোষণার সময় ডরিস লেসিংয়ের বয়স ছিল ৮৭ বছর। ফলে তিনি সেই সময়ে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া সবচেয়ে বেশি বয়সের ব্যক্তি হিসেবে দৃষ্টান্ত তৈরি করেন। নোবেল পাওয়ার ঘটনাটিও লেসিংয়ের জীবনকাহিনির মতোই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। লেখক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত পথ, প্রতিষ্ঠিত পেশা কিংবা বয়সের কোনও বাধ্যতামূলক সীমা নেই। তাঁর জীবনই তার একটি বিশেষ উদাহরণ। ১৪ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেওয়া কিশোরী একদিন বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ মর্যাদাগুলির একটির অধিকারী হবেন, এমন ভবিষ্যৎ হয়ত তাঁর নিজের কাছেও তখন কল্পনাতীত ছিল।

ডরিস লেসিংয়ের সাহিত্যকে বোঝার জন্য তাঁর জীবনের ভৌগোলিক যাত্রাপথও জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পারস্যে জন্ম, আফ্রিকায় বেড়ে ওঠা, পরে লন্ডনে বসবাস! এই অভিজ্ঞতাগুলি তাঁকে একাধিক সমাজ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে নিয়ে আসে। ফলে ডরিসের লেখায় মানুষের জীবনকে কোনও একটি দেশের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ করে দেখার প্রবণতা ছিল না। ঔপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতা, সামাজিক শ্রেণিবিভাজন, নারীজীবন, রাজনৈতিক মতাদর্শ আর সভ্যতার ভবিষ্যৎ ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর সাহিত্য ক্রমশই বৃহত্তর মানবসমাজের দিকে তাকিয়েছে। ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর লন্ডনে ডরিস লেসিংয়ের মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাহিত্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ডরিস লেসিংয়ের প্রয়াণের সঙ্গে একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনের অবসান হলেও তাঁর বইয়ের আলোচনার পরিসর থেমে যায়নি। নারীজীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, রাজনীতি, সমাজ ও সভ্যতার প্রশ্ন যত নতুন ভাবে সামনে আসে, লেসিংয়ের রচনাগুলিও তত নতুন পাঠের সুযোগ তৈরি করে।

ডরিস লেসিংয়ের জীবনকে শুধু একজন নোবেলজয়ী লেখকের জীবনী হিসেবে দেখকে ভুল হবে। তাঁর এমন লেখক যাত্রা, প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে জীবনের নানা পেশা ও অভিজ্ঞতাকে নিজের পাঠশালা করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা পরে প্রায় ৫০টি বইয়ের বিশাল সাহিত্যভাণ্ডারে রূপ নেয়। তাঁর লেখায় ব্যক্তিমানুষের ঘর, সম্পর্ক ও শরীর যেমন জায়গা পেয়েছে, তেমনি জায়গা পেয়েছে রাজনীতি, যুদ্ধ, সমাজ, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ সভ্যতার প্রশ্ন। ২০০৭ সালে নোবেল পুরস্কার তাঁর সেই দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। আর তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, সাহিত্যিক হয়ে ওঠার পথ সবসময় একই রকম হয় না। কখনও কখনও স্কুলের শেষ দরজা পেরিয়েই শুরু হয়ে যায় অন্য দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা, যার নাম জীবন। 🍁

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক :  সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরেপড়া :  কবিতা ‘ আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন