Sasraya News Sunday’s Literature Special | 22th March 2026, Sunday | Issue 103 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ২২ মার্চ ২০২৬, সংখ্যা ১০৩

SHARE:

সম্পাকীয় 

সাইরেন বাজে
বোবা আর্তনাদ
আকাশে উড়ে যায় ধ্বংসের কলেবর রথ
রক্ত ঝরে পাঁচিলের গা বেয়ে মানবিক স্বর
কালো ধোঁয়াগুলো থেমে যাক
মানুষ ফিরে পাক বাঁচার আশ্বাস

তুমি চুপ করো, তুমি চুপ করো, তুমি চুপ করো
আমি ভারতের নাগরিক গুরু
বদলে নাও ভাবনার ধ্বংসরূপগুলো
ইতিহাস হয়ে যাক আজ থেকে
সাইরেন তুমি থেমে যাও, থেমে যাও…
—দেবব্রত সরকার 

 

 

 

মহামিনের কথা 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
তারই জীবন সফল, তারই সার্থক সুখ, যার রসনা সতত ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ এই নাম উচ্চারণ করে। চুরাশি লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে মানুষ দেব দুর্লভ মানবদেহ লাভ করে। সেই সুদুর্লভ শরীর লাভ করত যদি সে গুরু আশ্রয় পূর্ব্বক নিরন্তর নাম করতে পারে তবে তার জীবন সার্থক। নচেৎ গো, গর্দ্দভ, শৃগাল, কুকুরের মত বৃথা জীবন ধারণ করে যাতায়াত করতে থাকে। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ ও পঞ্চবিষয় হতে মানুষ সুখ লয় কিন্তু সে সুখ অতি ক্ষণস্থায়ী এবং পরিণামে জ্বালাপ্রদান করে থাকে।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

কিন্তু যার রসনা অবিরত কৃষ্ণ কৃষ্ণ ঘোষণা করে,সে ভুমাসুখ লাভে সমর্থ হয়। তার সুমুখে, পশ্চাতে, দক্ষিণে, বামে, অধে, উর্দ্ধে সুখই বিরাজ করে। তার কাছে দুঃখ বলে কিছু থাকে না। তার দশদিকে সুখের অমৃতময় প্রাচীর উত্থিত হয়,সে সুখের মহাপারাবারে নিমগ্ন হয়ে যায়। যতদিন সেই কৃষ্ণ নামকারী কৃষ্ণনামময় মহাভাগবত মরলোকে থাকেন ততদিন নিজে ভুমাসুখ ভোগ করেন এবং অন্যান্য পাপী-তাপীকেও সেই ভুমাসুধামৃত পান করান,তার সংসারই বৈকুণ্ঠ হয়ে যায়। তার দেহে মনে প্রাণে আমিই বিরাজ করি। তার স্বাতন্ত্র্য কেড়ে নিয়ে আমার করে চালাই; তাকে একেবারে আত্মসাৎ করে নিই। নাম কর্, নাম্ কর, নাম কর্।

তোমার নামের মহিমা শুনে হতাশ প্রাণে আশার সঞ্চার হয়। দাও শক্তি দাও,যেন দিবানিশি নাম করতে পারি। যেন নামই আমার একমাত্র অবলম্বন হয়। তুমি কৃপা করে আমায় নাম করাও।
বল্—
কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ রক্ষ মাম্।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ পাহি মাম্॥

🍁শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস /১ 
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

শব্দদেরাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

২২.

চিঠির ভিতরে চিঠি 

সকালটা অন্যদিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কোনও অশুভ পূর্বাভাস ছিল না, কোনও অস্বাভাবিক তাড়াও নয়। সোমদত্তা ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলেছিল, আলো ঢুকেছিল ঘরে, পাড়ার পরিচিত শব্দগুলো কানে এসেছিল দুধওয়ালার সাইকেলের ঘণ্টা, পাশের বাড়ির ঝগড়ার শব্দ, দূরে কোথাও প্রেশার কুকারের সিটি। এইসব শব্দের মধ্যেই তার জীবন এতদিন ধরে চলে আসছে। বইমেলার সেই দিনের পর কয়েকটা রাত কেটেছে ঠিকই, স্মৃতি এসেছে, আবার একটু একটু করে থিতুও হয়েছে। সে ভেবেছিল, স্মৃতিরা যেমন আসে, তেমনই ধীরে ধীরে চলে যাবে। ঠিক তখনই দরজার কলিং বেলটা বাজল। সোমদত্তা প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। ভাবল, হয়ত কুরিয়ার, হয়ত ভুল দরজা। সে ধীরে ধীরে গিয়ে দরজা খুলল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে দেখে তার প্রথমেই অস্বস্তি হল। লোকটা খুব সাধারণ, পোস্টম্যানের মতোই, কিন্তু তার হাতে একটা খাম ছিল। মোটা, বাদামি রঙের, আর তার ওপর লাল অক্ষরে লেখা তার নিজের নাম।
—আপনি সোমদত্তা?
লোকটা জিজ্ঞেস করল।
নিজের নামটা অন্যের মুখে এইভাবে শুনে সোমদত্তার বুকের ভেতর কেমন একটা ঠক করে উঠল। সে মাথা নাড়ল। লোকটা সই করতে বলল। সে কলম ধরল। হাত কাঁপছিল। কেন কাঁপছে, সে বুঝতে পারছিল না। জীবনে সে অনেক চিঠি পেয়েছে ব্যাঙ্কের, অফিসের, পরীক্ষার… কিন্তু রেজিস্ট্রি চিঠি খুব কম এসেছে। রেজিস্ট্রি মানেই খবর। ভাল বা খারাপ কিন্তু সাধারণ নয়।

…এই চিঠির কোনও উত্তর না দিলেও চলবে। তুমি চাইলে এটাকে শেষ চিঠি হিসেবেই ভাবতে পারো। আমি শুধু চাইছিলাম, তুমি জানো– তুমি আমার জীবনের কোনও ভুল অধ্যায় নও। তুমি সেই অধ্যায়, যেটা শেষ না করেই আমি সামনে চলে এসেছিলাম। 

লোকটা চলে গেল। দরজা বন্ধ হল। ঘরের ভেতরে হঠাৎ অদ্ভুত একটা নীরবতা নেমে এল। খামটা হাতে নিয়েই সোমদত্তা বুঝতে পারল, এই চিঠিটা এখনই খুলতে তার সাহস হচ্ছে না। যেন খামটার ভেতরে শুধু কাগজ নয়, অনেক বছর ধরে চেপে রাখা কোনও সত্য আছে। সে চিঠিটা টেবিলে রেখে দিল। তারপর রান্নাঘরের দিকে গেল, জল খেল, কিন্তু মনটা বারবার টেবিলের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। কার চিঠি হতে পারে? চিঠিতে প্রেরকের নাম খুব স্পষ্ট ভাবে লেখা নেই। কে লিখতে পারে? এই প্রশ্নটা তার মাথার ভেতরে ঘুরতে লাগল। অফিস থেকে হলে অফিসের নাম থাকত। ব্যাঙ্ক হলে লোগো থাকত। কিন্তু খামটার ওপর কোনও পরিচিত নাম নেই। শুধু তার নাম আর ঠিকানা, স্পষ্ট হাতের লেখায় লেখা। হাতের লেখাটা… সে ভাল করে তাকাল। এই লেখাটা কি সে চেনে? অনেক বছর আগের কোনও স্মৃতি কি এখানে লুকিয়ে আছে? সে নিজেকে বলল, না, বেশি ভাবছিস। তবু বুকের ভেতরের চাপটা কমল না।
সে আবার টেবিলের কাছে এসে বসল। খামটা হাতে নিল। খামটার ওজন খুব বেশি নয়, কিন্তু সেই অল্প ওজনটাই আজ তার কাছে ভারি লাগছে। বইমেলার দিন নীলাঞ্জনের মুখ দেখার পর থেকে তার জীবনে আবার একটা অস্থিরতা ঢুকে পড়েছে, এটা সে জানে। এই চিঠিটা সেই অস্থিরতারই কোনও ফল কি না, সে নিশ্চিত নয়, কিন্তু অস্বীকারও করতে পারছে না।
হঠাৎ তার মনে পড়ল, চিঠি। একি নীলাঞ্জনের চিঠি?

কলেজের দিনগুলোতে রেজিস্ট্রি চিঠি নয়, কিন্তু চিঠি তো ছিল। কত বছর কেটে গেছে, তবু চিঠির কাগজের গন্ধ, ভাঁজ করার ভঙ্গি, খামের ভেতর থেকে কাগজ বের করার মুহূর্ত, সবকিছু তার শরীর এখনও মনে রেখেছে। আজকের এই রেজিস্ট্রি খামটা যেন সেই পুরনো চিঠিগুলোর একটা বিকৃত, পরিণত রূপ। সে খামটা খুলল না। খোলার আগে সে সময় নিতে চাইল। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে আলো ঝলমল করছে। মানুষজন নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত। কেউ জানে না, এই ঘরের ভেতরে একটা চিঠি এসে পড়েছে, যেটা হয়তো সবকিছু পাল্টে দিতে পারে। সোমদত্তা ভাবল, চিঠির ভেতরে কী থাকতে পারে? কোনও আইনি নোটিস? কোনও পুরনো সম্পত্তির ব্যাপার? নাকি কোনও অসুখের খবর? এইসব ভাবনার মধ্যে হঠাৎ করে একটা ভাবনা খুব জোরালো হয়ে উঠল, নীলাঞ্জন?।সে নিজেকে ধমক দিল। এতদিন পর কেন? কেন এখন? নীলাঞ্জনের তো নতুন জীবন আছে। সে তো অন্য একজনের সঙ্গে বইমেলায় গিয়েছিল। এই তথ্যটা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরে আবার হালকা একটা ব্যথা উঠল। সে নিজেকে বোঝাল, অতীত মানেই অতীত। অতীত থেকে রেজিস্ট্রি চিঠি আসে না। তবু হাতটা খামের ওপর থেকেই গেল। অনেকক্ষণ পরে সে খামটা খুলল। খুব সাবধানে। যেন কাগজটা বেরলেই কোনও শব্দ হয়ে যাবে, কোনও বিস্ফোরণ ঘটবে। ভেতরে একটা কাগজ। অফিসিয়াল কাগজ নয়। সাদা, সামান্য হলদে। লেখা টাইপ করা নয়। হাতে লেখা। এই হাতের লেখাটা সে চেনে। চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে অনেক বছর ভেঙে পড়ল। বুকের ভেতরে একটা চাপ জমে এল। সে বসে পড়ল। কাগজটা কাঁপা হাতে খুলল। প্রথম লাইনে লেখা–
সোমদত্তা চিঠিটা খুলে বসে পড়ার পর অনেকক্ষণ কেবল প্রথম লাইনটার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
“এই চিঠিটা লিখতে আমার অনেক সময় লেগেছে” এই কথাটার মধ্যেই যেন সময়টা জমে আছে। কতটা সময়? কত বছর? কত না বলা দিন? কাগজটা তার হাতে সামান্য কাঁপছিল। সে জানে, এই কাঁপন ভয় নয়, উত্তেজনাও নয়, এটা সেই পুরনো কাঁপন, যেটা নীলাঞ্জনের নাম শুনলেই একসময় হতো।

নীলাঞ্জনের হাতের লেখা বদলায়নি। বয়সের সঙ্গে অক্ষরগুলো একটু ধীর হয়েছে, একটু ভারী হয়েছে, কিন্তু সেই পুরনো ভঙ্গি রয়ে গিয়েছে। যেন লেখার মধ্যেও সে থেমে থেমে শ্বাস নিচ্ছে। নীলাঞ্জন লিখেছে–
“সোমদত্তা,
এই চিঠিটা লিখতে আমার অনেক সময় লেগেছে। আসলে লিখতে বসার আগেই আমি বহুবার ভেবেছি, লেখা উচিত কি না। হয়ত উচিত নয়। হয়ত অনেক দেরি হয়ে গেছে। হয়ত এই চিঠি তোমার জীবনে অপ্রয়োজনীয় একটা অস্থিরতা নিয়ে আসবে। কিন্তু তারপরও লিখছি, কারণ কিছু কথা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মরে না, শুধু চুপ করে থাকে। বইমেলার সেই দিনে তোমাকে দেখার পর আমি বুঝেছি, এই চুপ করে থাকা আর সম্ভব নয়।
আমি জানি না তুমি আমাকে দেখার পর কী ভেবেছ। আমি জানি না তুমি আমার দিকে তাকিয়েও কেন চোখ সরিয়ে নিয়েছিলে। হয়ত অভিমান ছিল, হয়ত ক্লান্তি, হয়ত শুধু এই পৃথিবীতে বাঁচার অভ্যাস। আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। বরং আমি নিজেকেই প্রশ্ন করছি, এতদিন পরে কেন এই সাহস এল?”
সোমদত্তার বুকের ভেতর একটা চাপ জমে উঠল। সে পড়তে থাকল।
“সেদিন বইমেলায় আমি মৈত্রীর সঙ্গে গিয়েছিলাম। এটা আমি লুকোচ্ছি না। মৈত্রী আমার বর্তমান। শান্ত, সংযত, খুব বেশি প্রশ্ন করে না। তার পাশে থাকলে জীবনটা সহজ লাগে। কিন্তু সহজ জীবন মানেই পূর্ণ জীবন… এটা বোধহয় ঠিক নয়। তোমাকে দেখার পর আমি বুঝলাম, জীবনের কিছু অংশ কখনও ‘সহজ’ হয়ে ওঠে না, তারা শুধু সত্য হয়ে থাকে।
তোমাকে দেখার মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, কেউ যেন হঠাৎ করে বহু বছর আগের একটা দরজা খুলে দিয়েছে। আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি ভেবেছিলাম, সময় সবকিছু মুছে দেয়। আজ বুঝছি, সময় শুধু আমাদেরকে ব্যস্ত করে তোলে, ভুলিয়ে দেয় না।”

চিঠির এই অংশে এসে সোমদত্তা থামল। জানালার দিকে তাকাল। বাইরে দুপুরের আলো। এত আলো, অথচ তার ভেতরে কোথাও একটা সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সে আবার পড়তে শুরু করল।
“তুমি কি মনে করো, আমি আমাদের দিনগুলো ভুলে গিয়েছিলাম? না, ভুলিনি। কলেজের সেই দিনগুলো, লাইব্রেরির সিঁড়ি, ক্যান্টিনের টেবিল, তোমার চুপ করে শোনার ভঙ্গি, সবকিছু আমি বহন করেছি। কিন্তু আমি তখন ভয় পেয়েছিলাম। ভবিষ্যতের ভয়। দায়িত্বের ভয়। নিজের অযোগ্যতার ভয়। তোমার সামনে আমি নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করতাম। সেই অসম্পূর্ণতা থেকেই হয়ত আমি ধীরে ধীরে চুপ করে গিয়েছিলাম।
চিঠিগুলোর কথা আমার খুব মনে পড়ে। আজকে যখন সবাই এক মুহূর্তে মেসেজ পাঠিয়ে দেয়, তখন সেই চিঠির সময়টা কেমন অদ্ভুত লাগে। অথচ সেই চিঠির প্রতিটা শব্দ আজও আমার মনে আছে। তোমার হাতের লেখা, তোমার শব্দ বেছে নেওয়ার ভঙ্গি– সবকিছু। আমি জানি, একদিন না দেখলে তোমার মন খারাপ হতো। বিশ্বাস করো, আমারও হতো। কিন্তু আমরা কেউই সেটা ঠিক করে বলতে শিখিনি।”

এই জায়গায় এসে সোমদত্তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। নীলাঞ্জন লিখেছে সেই কথাগুলো, যেগুলো সে নিজেও কোনওদিন মুখে বলেনি।
“আমি আজ বুঝি, আমাদের বিচ্ছেদটা কোনওদিনই একটা সিদ্ধান্ত ছিল না। সেটা ছিল ধীরে ধীরে সরে যাওয়া। কোনও শেষ কথা ছিল না, কোনও দরজা বন্ধ করা ছিল না। শুধু একদিন হঠাৎ আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, এখন আর আমরা একে অপরের জীবনের মাঝখানে নেই। এই বুঝে ফেলার কষ্টটা আমি আজও ভুলতে পারিনি।
আমি জানি, এই চিঠি তোমার কাছে হয়ত অন্যায়। তোমার জীবনে নিশ্চয়ই অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। হয়ত তুমি এখন অন্য মানুষ। হয়ত আমার কোনও জায়গা নেই। আমি এই চিঠি লিখে কোনও জায়গা চাইছি না। কোনও উত্তর চাইছি না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাইছিলাম, যা আমরা ছিলাম, তা আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য অংশ।
তুমি হয়ত ভাবছ, এতদিন পরে কেন। এর কোনও পরিষ্কার উত্তর আমার নেই। শুধু এটুকু জানি, কিছু দেখা আমাদের ভেতরের জমাট সময়কে ভেঙে দেয়। বইমেলার সেই ভিড়ের মধ্যে তোমার চোখে চোখ রাখার মুহূর্তটা আমার জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর, আবার সবচেয়ে সত্য মুহূর্ত ছিল।”
চিঠি আরও দীর্ঘ। নীলাঞ্জন থামেনি।
“আমি মৈত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। সবটা নয়, কিন্তু কিছুটা। সে জানে আমার একটা অতীত আছে, যেটা আমি মুছে ফেলিনি। আমি জানি, এই চিঠি লেখার মধ্যেই হয়ত আমি নিজের বর্তমানটাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি। তবু লিখছি। কারণ কিছু সত্য চাপা দিলে মানুষ ধীরে ধীরে মিথ্যে হয়ে যায়।
সোমদত্তা, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি না। কারণ ক্ষমা চাওয়ার মতো কোনও নির্দিষ্ট অপরাধ আমি দেখাতে পারব না। কিন্তু আমি দুঃখিত, যে আমি সময়মতো সাহসী হতে পারিনি। যে আমি তোমাকে অপেক্ষায় রেখেছিলাম, নীরবতায় রেখেছিলাম। সেই অভিমান যদি আজও তোমার ভেতরে থাকে, আমি তাকে সম্মান করি।

এই চিঠির কোনও উত্তর না দিলেও চলবে। তুমি চাইলে এটাকে শেষ চিঠি হিসেবেই ভাবতে পারো। আমি শুধু চাইছিলাম, তুমি জানো– তুমি আমার জীবনের কোনও ভুল অধ্যায় নও। তুমি সেই অধ্যায়, যেটা শেষ না করেই আমি সামনে চলে এসেছিলাম।”

শেষের দিকে অক্ষরগুলো আরও ধীর। “আজ আর আমি তরুণ নই। আজ আমি জানি, সব প্রেম পূর্ণতা পায় না। কিন্তু কিছু প্রেম আমাদের মানুষ করে তোলে। তুমি আমাকে মানুষ করেছিলে। এই কথাটা তোমাকে না বলে আমি আর থাকতে পারছিলাম না। ভালো থেকো।

—নীলাঞ্জন”
চিঠি শেষ।

সোমদত্তা অনেকক্ষণ নড়ল না। কাগজটা হাতে নিয়েই বসে রইল। এই চিঠি তার কাছে কোনও প্রস্তাব নয়, কোনও আহ্বান নয়, এটা একটা স্বীকারোক্তি। বহু বছর পরে বলা একগুচ্ছ সত্য। সে জানে, এই চিঠির উত্তর দেওয়া বা না দেওয়ার মধ্যেই কোনও সমাধান নেই। কিন্তু এই চিঠি তার জীবনের ভেতরে একটা নতুন প্রশ্ন রেখে গেল, কিছু প্রেম কি সত্যিই শেষ হয়, নাকি তারা শুধু সময়ের ভেতর লুকিয়ে থাকে? সে ধীরে ধীরে চিঠিটা ভাঁজ করল। আগের মতো করে। খুব যত্নে। ঠিক যেমন একসময় নীলাঞ্জনের চিঠিগুলো ভাঁজ করত। বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। ঘরে আলো জ্বলছে। জীবন আবার চলবে। কিন্তু আজকের দিনটা, এই চিঠিটা, আর কোনওদিন তার মতো থাকবে না।🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

🍂কবিতা 

 

অনীক দত্ত -এর কবিতাগুচ্ছ

আমাদের বিকেল 

আমাদের আকাশে ধোঁয়ার রঙ
ট্রামের ঘণ্টা বাজে ধীর
রাস্তার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষ
চোখে তাদের অনন্ত নীড়।

বাতাসে চায়ের গন্ধ
বইয়ের পাতায় আলো,
এই শহর যেন ক্লান্ত কবি
নিজের গল্প নিজেই ভাল।

 

ডাক

নদী ডাকে
জলের স্রোত গাইছে গান
অজানা কোনো তানে…

পাড়ে বসে
আমি ভাবি
জীবন কত দূর

নদী শুধু বয়ে যায়
সময়ের সুর।

একলা 

আমি চলেছি একা
ধুলোভরা পথ
স্বপ্নগুলো বাতাস হয়ে
আমাকে ডাকে অজানায়

সব স্মৃতি পেছনে ফেলে
ভাঙা দিনের গান
পথের শেষে হয়ত আছে
নতুন ভোরের মান।

ভালবাসা

তোমার চোখে দেখেছিলাম
একটি নরম ভোর
মেঘের ফাঁকে সূর্য যেমন
হাসে নীলের ঘোর

তোমার ছোঁয়ায় জীবন আমার
নতুন রঙে ভরা
ভালোবাসা নীরব নদী
বয়ে চলে সারা।

বৃষ্টি গান

মেঘ ভেলায় বৃষ্টি
এসে ধুলো মুছে দেয়,
জানালাতে টুপটাপ শব্দ
স্বপ্ন ভিজিয়ে নেয়

কাদামাটি গন্ধে ভরা
গ্রামের সব পথ
বৃষ্টির মাঝে লুকিয়ে থাকে
শৈশবেরই রথ।

সময় 

সময় বড় অদ্ভুত নদী
কেউ ধরতে পারে না

চোখের পলকেই বদলে যায়
জীবনেরই মায়া…

গতকাল ছিল হাসির দিন
আজ নীরবতা ঘিরে
সময়েরই স্রোতে মানুষ
ভেসে যায় ধীরে ধীরে।

পাহাড়ের প্রমাণ নীরবতা 

পাহাড় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে
মেঘের গায়ে মাথা
বাতাস এসে গল্প বলে
অজানা কোনও কথা।

সবুজ ঢেউয়ের মাঝে লুকায়
মানুষের সব ভয়
পাহাড় যেন শান্ত গুরু
নীরব শিক্ষা কয়।

রাতের শহর 

আলো জ্বলছে
এই শহরের হাজার চোখে
অচেনা সব মানুষেরা
স্বপ্ন বোনে শোকে।

রাস্তাঘাটে ক্লান্তি ঘুমায়
ট্যাক্সির হর্ণ বাজে
এই শহরের রাতের গল্প
নীরবে শুধু সাজে।

শূন্যতা 

কিছু কথা বলা হয়নি
কিছু স্বপ্ন ভাঙা
মনের মাঝে জমে থাকে
অগণিত মায়া

শূন্যতারও একটি সুর
নীরব সঙ্গীত
যে শুনেছে সে বুঝেছে
মনের গভীর টান

নতুন ভোর

অন্ধকারের শেষে আলো আসে
তখন জীবনের সব হারানো কিছু
ফিরে পেতে ভাল লাগে

মানুষ আবারও ভাঙা ডানায় উড়তে শেখে
নতুন ভোরে জেগে ওঠে
স্বপ্ন হাজারও।

 

ফাল্গুনী চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা 

বসন্তের গান

পাহাড় ভাঙতে ভাঙতে হঠাৎ জলের উচ্ছ্বাস ম্লান হয়ে এল

রোদের নথি পত্রে কিরণেরা জলকে ঘিরে আছে
ঝলমলের ভিতর হারিয়ে যায় প্রেমের গোধূলি বেলা
রাতকে বেঁধো না আমি নিস্তব্ধ তাই
আগুনের শিখায় শিখায় লিখে যাবো প্রেমের উৎস
রেখে যাবো বিহঙ্গের মতো পরদেশে
কাকলির অঝোর
এসো না হাতে হাত ধরি
পিপাসার ভাঙ্গন থেকে পিপাসাকে মিলাই
আমার বীণাপানির মতো শ্বেত বস্ত্র-এ তুমি নির্বাসন এঁকে যাও। আমি সময়কে সেলাই করি
ভুলে যাও পুরোনো শায়েরীর ধুলো জমানো পৃষ্ঠার
ঘাত প্রতিঘাত
একটি চিতা জ্বলছে
প্রেমের স্পর্শে
দেখতে পাচ্ছো রুমালেরা
কিভাবে ফিরছে পলকের তলায়
মায়াবিন জলের ঘাট
একটু সরে এসো, তোমাকেই খুঁজছি
খোলা ঝরোখায়, রূপসায়, কুহেলিকায়

 

 

প্রিয়াংকা নিয়োগী সনি -এর একটি কবিতা 

রঙের দাপট

রঙের দাপট ঝলমলিয়ে তারকা মনোভাবে,
নিজের মন রঙ জলে আলোর অলকানন্দে,
খারাপ সম্পর্ক ভাল করে বেঁধে রাখে ফাগুনে,
অলীক অভিজ্ঞতায় একটু একটু করে হোলি আকর্ষণে।
সৃষ্টিশীলতা তুলে ধরছে আঁকড়ে ধরছে বাধছে ঐক্যের শিকড়ে,
রঙের দেশে রঙের বেশে রঙের চারুকলাতে আপন খেয়াল
চলে।
বসন্তের ডাকে আহ্বানে জল রঙ রয়ে যায় মনে।

 

সুজয়নীল দাশগুপ্ত -এর একটি কবিতা 

ঘোর 

অন্ধকার যত গভীর হয়
তত কাছে আসে ভোর
ভাঙা স্বপ্নের মাঝেও
জাগে নতুন কোনো ঘোর।

একটু আশা, একটু আলো
মানুষ বুকে রাখে,
তাই তো জীবন হাজার ব্যথা
নিয়ে আবার হাঁটে।

 

 

নার্গিস পারভিন -এর একটি কবিতা

চোরাবালি

বাতাস গতিপথ বদলাবে;
স্বপ্ন দেখেছিল চায়ের দোকানী, মুদি- ময়রা, বেকার হাভাতে
স্বপ্ন দেখেছিল যুবক-যুবতী, কন্যা সন্তানের পিতা
স্বপ্ন বুনেছিল আবাল-বৃদ্ধা-বনিতা

চোরাবালির ভিতরে হাঁসফাঁস করছে প্রত্যাশা
নাভিশ্বাস উঠছে মধ্যবিত্ত বুকে
তার পরে যারা-
মানুষ না, ভোটারের স্তরে যদি ওঠে
ধন্য হবে বেঁচে থাকা

অজগরটা কি আরও ওপরে উঠে আসবে একে বেঁকে?
কিনে ফেলবে সম্পূর্ণ আকাশ?

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী

.

সুনয়না দি

ব্যথাতে সারা গা কাহিল করে দিল। ভোরের সূর্যোদয় কোনদিনও দেখা হয় না কল্যাণীদেবীর। যত দিন যাচ্ছে তত যেন ব্যথা নামক অক্টোপাসে দানব আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে। আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুঝতে পারছেন গায়ে যখন রক্তের তেজ ছিল কত কথাই না বলেছেন
কত তেজই না দেখিয়েছেন। এই নিজের বৌমা তিথি ওর সঙ্গেও কত খারাপ ব্যবহার করেছেন শিক্ষিতা মেয়ে চাকরি করতে দেবে না বলে কত ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে কিন্তু মেয়েটি বুদ্ধিমতী এতকিছুর পরেও সবকিছু সহ্য করেছে কিন্তু চাকরি না করার ব্যাপারটা মানতে পারেনি, যে সে কখনও চাকরি করবে না। সবকিছু সহ্য করেছে কিন্তু এই একটা জায়গায় স্টিক ছিল মেয়েটি। আর এই জন্যই কল্যাণী দেবী তার বৌমার জন্য গর্ববোধ করেন। পৌষ মাসের সকালে বৌমার হাতে চা খেয়ে তবে মনটা ফুরফুরে হয়ে ওঠে। আজ তো এসে চা দিয়ে গেল না। ছেলে এসে চা দিল। তাহলে কী বৌমার কিছু হয়েছে? নতুন কাজের মেয়ে সেও বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না কাকে জিজ্ঞেস করবেন, এসব ভাবতে ভাবতে কোনও রকমে বারান্দায় গিয়ে বসলেন। তখনই তিথি আর পবিত্র গিয়ে জিজ্ঞেস করল –তোমার শরীর ঠিক আছে তো?

–পবিত্র তিথিকে বলল, মনে হয় মেয়েটি খারাপ হবে না।
–তুমি তো আমাকে অনেক কথা শুনিয়েছ। সুইটি তো এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়াত না।
–ঠিকই বলেছ।
–তাহলে কি সুইটিকে ছাড়িয়ে দেবে।
–কিন্তু সুনয়না কী অতটা সময় দিতে পারবে? ওর তো সংসার আছে।
–একবার ওর সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারো, ওকে এক্সট্রা টাকা দিলে নিশ্চয়ই থাকবে।

–ওই আছে আর কি! কেন কিছু বলবি?
–হ্যাঁ, আমরা একটু বেরচ্ছি।
–কোথায়?
–তিথির মাসির বাড়িতে যাচ্ছি ।
–কেন রে?
–কি করে যে কথাটা বলি।
–আরে বাবা বল না খারাপ কিছু!
–ওর বোনজি মারা গেছে।
–মানে! কোন বোনজি মারা গেছে?
–ছোট মাসির নাতনি।
–এসব কী বলছিস!
কল্যাণী দেবী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন।
–হ্যাঁ গো, ওর বোন খুব ভেঙে পড়েছে। এই সময়ে না গেলে হয়!
–সে তো ঠিকই।
–সেটাই বলো ওকে বুঝিয়ে।
–কবে হয়েছে ঘটনা?
–গতকাল রাতে খবর পেয়েছে।
–ও বাবা! সে তো যাওয়ারই দরকার।
–কিন্তু…
কোনও চিন্তা নেই। সুনয়নাদি আসবে তোমার দেখাশোনা করবে শ্বেতাম্বরীকেও খেতে দেবে আমরা না আসা অব্দি।
–ও আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে, তাহলে। সাবধানে এসো। বৌমারও তো চোখ মুখ ভাল লাগছে না ওর কী শরীর খারাপ?
–হ্যাঁ। খবরটা পাবার পরেই তো ওর সাংঘাতিক অবস্থা হয়েছিল।
–এত কিছু হয়েছে আমাকে জানালি না।
–এত রাত্রে তোমাকে কী বলাটা ঠিক হতো? তুমি তো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাও।
–ঠিক আছে, আমরা আসছি দেরি হয়ে যাবে আবার তো ফিরতে হবে।
–সুনয়না কখন আসবে রে?
–আসবে আসবে চিন্তা নেই।
–না বাড়িতে আমি একা থাকব…
–ও মা বারবার বলছি সুনয়না আসবে।
বেরোতে বেরতেই সুনয়না ঢুকছে।
–ওই নাও মা তোমার মুশকিল আসান এসে গেছে।
–কি হয়েছে দাদা?
–আরে বাবা, মা চিন্তায় পড়ে গেছে তুমি আসবে কি আসবে না!
–না, না, কথা যখন দিয়েছি তো আসবই।
–ঠিক আছে, আমরা আসছি সুনয়না, দেখো তোমার ওপর সব দায়িত্ব রইল।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ দাদা নিশ্চিন্তে যান, বৌদি নিশ্চিন্তে যান। একবার দেখুন না পরখ করে আমরা অতটা খারাপ নই।
–এই না, না, না আমরা ওইভাবে বলিনি তুমি কিছু মাইন্ড ক’রো না।
তিথি লক্ষ্য করল সুনয়নার মুখটা কেমন যেন পানসে হয়ে গিয়েছে সত্যিই তো আমরা সহজে ওদেরকে বিশ্বাস করতে পারি না কেন? ওরা অতটাও খারাপ কি? না না এই ভাবনাগুলো স্থান দেওয়া উচিত নয়। ওতো সময়ের আগেই এসেছে অন্যদিন যতই লেট করুক আজকে তো কথা খেলাপ করেনি। গেট দিয়ে বেরিয়ে আবার ঢুকে আসলো তিথি।
–এই সুনয়না তুমি তো তাড়াতাড়ি এসেছ খাবার খেয়েছ কিছু?
–ওই খেয়েছি।
–না না শোনো পেটে খিদে নিয়ে থেকো না। মাকে খাবার দেবার পর শ্বেতাম্বরীকে খাইয়ে তুমি নিজে খেয়ে নিও কেমন। নিজের মনেই ভেব বাড়িটাকে।
এক মুহূর্তেই সুনয়নার মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন কত বিশ্বাস ভরা চাওনি ভরসার পাত্রী হয়ে উঠতে পারছে।
–তারপর হাসিমুখে বলল আচ্ছা ঠিক আছে।
–তাহলে আসি আমি মায়ের ফোনে ফোন করে খবর নেব কেমন?
–আচ্ছা তোমার বর কিছু বলেনি তো?
–না গো বৌদি, ও কিছু বলেনি। ওই তো আমাকে পাঠাল। আহা বৌদিরা থাকবে না তুমি যাও।
–ঠিক আছে বাড়ি গিয়ে পরে বরকে আমাদের থেকে বোলো ধন্যবাদ জানিয়েছি।
–আচ্ছা, সাবধানে এসো বৌদি।
–দরজাটা লাগিয়ে দাও।
–হ্যাঁ দিচ্ছি।
এর মধ্যে কল্যাণীদেবী তারস্বরে চিৎকার করছেন এই সুনয়না সুনয়না…
–হ্যাঁ যাই জেঠিমা
–কিছু বলছেন?
–ওরে আমার পা টা একটু টিপে দে রে। আমি পাটা তো ফেলতেই পারছি না।
–এই দিচ্ছি…
-কখন থেকে ডাকছি, তুই কোথায় ছিলিস রে?
-ওই যে ছাদের দিকটায় গেছিলাম শ্বেতাম্বরীকে পটি করাতে।
–এই এক হয়েছে বৌমার যে কি মতিগতি কী আর বলি এর পেছনে তো খাটুনিও আছে।
নে এই তেল দিয়ে পাটাকে ভাল করে মালিশ কর।
–আরাম হচ্ছে।
–ওই হচ্ছে রে।
–ও জেঠিমা ফোন বাজছে আপনার।
–আবার কে ফোন করছে…
–দে দে জানলার কাছে রাখা আছে।
–হ্যাঁ দিই
–হ্যালো।
–কে জেঠিমা?
–রোসো কথা বলতে দে আগে।
–মা তুমি ঠিক আছ? আর শ্বেতাম্বরী?ও খেয়েছে ?
–হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক আছে, হ্যাঁ ওকে খাইয়েছে।
–সুনয়না কোথায়?
–ওই ওই দিকটা গেছে।
–কেন মিথ্যা কথা বলছে জেঠিমা আমি তো জেঠিমার কাছেই বসে মনে মনে ভাবছে সুনয়না।
বড়লোকের ব্যাপার এদের মতিগতি বোঝা দায়।
–ও জেঠিমা তাহলে আমি গেলাম কাজ করি গিয়ে।
–কে সুনয়না না?
–হ্যাঁ ও চলে গেল ওদিকে।
–তোরা কখন ফিরবি।
–ফিরবো গো, এইতো পৌঁছালাম…
–সে কিরে এত বেলায়!
-দূরত্বটা কী কম বলো, আর বেরোলাম কটায় !
–হ্যাঁ রে ওরা খুব কান্নাকাটি করছে না।
–কি যে বলো, একটা কম বয়সী মেয়ে মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যু কতটা আঘাত দেয় বুঝতে পারছ না।
–আচ্ছা বেশ রাখছি।
–কইরে কোথায় গেলিরে।
–কি বলছ জেঠিমা।
–আরে মালিশটা কর।
–আরো করে দেবো?
–তবে না তো কি…
–বিকেল হতে চললো অন্য কাজগুলোও তো করব জেঠিমা।
–আচ্ছা দাও তেলটা করে দিই।
–আচ্ছা জেঠিমা তোমাদের এটা অনেক পুরনো দিনের বাড়ি না এই যে কড়ি বর্গা।
–হ্যাঁ রে।
–কিন্তু দেখো তোমাদের কড়ি বর্গাটা বেঁকে গেছে মনে হচ্ছে না একটু নিচু হয়ে গেছে ছাদটা।
–যতসব অলক্ষুনে কথা বলিস। কোথায়?
–কেন দেখো তুমি খাটের উপর থেকে বসে বসেই তুমি এসব ধরতে পারবে
–ওমা ঠিকই তো বলেছিস রে।
–এ বাবা কেমন হালকা বৃষ্টি পড়ছে দেখো কি করে ফিরবে বৌদিরা? শীতকালে বৃষ্টি কেমন অসহ্য লাগে না বলো?
–সেই তো কথাটা ঠিকই বলেছিস। হ্যাঁরে কিসে গেছে জানিস?
কল্যাণী দেবী একটু চিন্তিত অবস্থায় প্রশ্নটা করল।
–হ্যাঁ, গাড়িতে গেছে।
–গাড়িতে তো গেছে বুঝেছি চার চাকা না দু চাকা।
-সুনয়না একটু হেসে বলল ওহ চার চাকাতে।
–তবুও ভাল তবুও গ্রামের রাস্তা তো একটু তো চিন্তা লাগেই।
–ঠিক আছে, তুমি অত চিন্তা করো না তো আমি সন্ধ্যাটা দিচ্ছি।
–হ্যাঁ, রে তুই আবার সন্ধ্যেবেলায় চলে যাবি নাকি।
সুনয়না শ্বেতাম্বরীকে কয়েকটা বিস্কিট দিতে দিতে বলল না না তোমাকে একা রেখে কি করে যাই বলো?
–তুই আমাকে বড় আশার কথা শোনালি।
–ঠিক আছে তুমি মেলা বকো না, এই যে রিমোটটা দিলাম বসে বসে টিভি দেখো।
–বেশ, বেশ, বেশ।
সুনয়না সন্ধ্যে দিতে গেলে শ্বেতাঙ্গরী ও পিছে পিছে গেল।
কল্যাণী দেবীর ফোন বাজতে লাগল। এ সময় আবার কে ফোন করল, সুনয়না সুনয়না না রে…
–কোথায় গেল ওরে, তোর হল?
ফোনটাকে আমার কাছে পিঠে রেখে যাবে, তা নয! লেপ ছেড়ে উঠে ফোনটা টেবিলের উপর থেকে নিল। তারপর বলল –হ্যালো।
–হ্যাঁ মা, আমি পবিত্র বলছি।
–হ্যাঁ বাবা বল।
–তুমি ঠিক আছ?
–ও হ্যাঁ রে ঠিক আছি আমাকে নিয়ে অত ভাবিস না। তোরা ফিরছিস তো?
–হ্যাঁ, এই তো বেরলাম। তোমাদের ওদিকে বৃষ্টি হচ্ছে?
–হ্যাঁ হচ্ছে। ওখানে?
–হ্যাঁ।
–সাবধানে আসবি।
–ঠিক আছে চিন্তা ক’রোনা আর সুনয়না আছে তো?
–হ্যাঁ আছে
–ঠিক আছে আর একটু থাকুক তারপরে ও-যদি যেতে চায়, ওকে ছেড়ে দিও।
–আচ্ছা।
–পবিত্র তিথিকে বলল, মনে হয় মেয়েটি খারাপ হবে না।
–তুমি তো আমাকে অনেক কথা শুনিয়েছ। সুইটি তো এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়াত না।
–ঠিকই বলেছ।
–তাহলে কি সুইটিকে ছাড়িয়ে দেবে।
–কিন্তু সুনয়না কী অতটা সময় দিতে পারবে? ওর তো সংসার আছে।
–একবার ওর সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারো, ওকে এক্সট্রা টাকা দিলে নিশ্চয়ই থাকবে।
–ঠিক আছে কথা বলে দেখি।
–আর সুইটি আসছে না কেন?
–কে জানে ভাল লাগে না একদম।
–তখন ই বলেছিলাম যে ওকে একবার বিশ্বাস করেই দেখি না কি হয়।
–যাই বলো না কেন আমার পাখির চোখ দেখো এখন এ ঠিকঠাক কাজ করে।
–হ্যাঁ দ্রুত কাজ করে,তেমন পরিষ্কার ও নয়।
–তবে এই যে বাড়িতে ছিলাম না এতটা সার্ভিস দেয়া
–কম কথা নয়।
–তবে এ ধরনের মেয়েরা সংসার পেয়েছে তো যেভাবে নির্যাতিত শোষিত হয়েছে মনে হয় খারাপ হবে না।
খুব আস্তে আস্তে কথা বলে না।
–হ্যাঁ, খুবই আস্তে আস্তে কথা বলে, কথা তো আমি মাঝে মাঝে বুঝতেই পারি না। তার মধ্যে আবার একটু মাঝে মাঝে নেপালি টান আছে।
–যাক সব ভাল হোক ওর।
সংসার পেয়েছে সেখানে ও সুখে থাক আমাদের এখানে কাজ করুক ছাই না করুক এই প্রার্থনা টুকু তো করতেই পারি।
–এ কথা মনে মনে ভাবে তিথি
একটু আনন্দিত হয়। আর সুনয়নার গায়ের উজ্জ্বল গমপাকা ত্বক যেন আরো বেশি উজ্জ্বল হয়ে আসলো তিথির মনে। মুহূর্তের জন্য অনেক কাছের মনে হলো সুনয়নাকে। 🍁 (ক্রমশঃ)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com 

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন