Sasraya News | Sunday’s Literature Special | 15th June 2025, issue 69, Sunday | সাশ্রয় নিউজ, রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ১৫ জুন ২০২৫, রবিবার, সংখ্যা ৬৯

SHARE:

🍂মহামিলনের কথা

সীতারামের সরস বাগভঙ্গীর আলোচনাকালে ” প্রসঙ্গক্রমে রসময়” (কিঙ্করী রমাদেবী) গ্রন্থের ভূমিকায় শ্রী অভয়ানন্দজী (ডক্টর অরিন্দম চক্রবর্তী) লিখেছেন— তাঁর মুখে কৌতুক স্পর্শহীন হাস্যরসরাগে অরঞ্জিত ভাষা ক্কচিত শোনা যায়। তিনি গাড়ির ড্রাইভার কে বলেন ” সারথি”, ভগবানকে বলেন ‘ড্রাইভার’, রিটার্ন টেলিগ্রাম কে বলেন ‘ল্যাজ ওয়ালা টেলিগ্রাম’;  হেলিকপ্টার কে মিষ্টি করে বলেন “হেলি কট কট “, স্কুটার এ চেপে বলেন “টুইটারে চেপেছি “, প্লাস্টার না করা দেয়াল কে বলেন”দাঁত বের করা দেয়াল “; আলোর সুইচ কে বলেন” জিয়ন কাটি মরণ কাটি” , ঘড়িতে দম দেওয়া অর্থে বলেন “ঘড়িকে খেতে দেওয়া”, স্থান ত্যাগ করা কে বলেন”প এ আকার দেওয়া”, একরকম দেখতে দুটি তরকারি দেখলে বলেন “এরা কি যমজ ভাই”? কেউ যদি এসে তাঁর পরচিত্বজ্ঞতার কোনো ঘটনা জানায় তাহলে কাঁচুমাচু মুখে বলেন—- “তা বলে আমি বাপু অন্তর্জলি (অন্তর্যামী র অপভ্রংশ )নই।”


সীতারামের গাড়ী সর্বদাই ভক্তে ঠাসা থাকে—- যতজনকে পারা যায় প্রেমের ঠাকুর গাড়িতে তুলে নেন। নিজে অনেক সময় ই খুবই সংকুচিত হয়ে বসেন ভক্তদের চাপে। নিজের জায়গা থেকেই সীতারাম আর একটি জায়গা বের করে দেন। সাধারণত পেছনের সিটে পা ছড়িয়ে বসেন, পায়ের তলার দিকে দু তিন জন, নিচের একজন তাতেও ক্ষান্তি নেই, নিজের বসবার জায়গাটিতে একপাশ হয়ে বসে সামনের সামান্য শূন্য স্থানটিতে বসিয়ে নেন কোন সেবক কে। এই নব আবিষ্কৃত স্থানটির একটি সুন্দর নামকরণ করেছিলেন সীতারাম—- “হাফ টিকিটে ফার্স্ট ক্লাস”। কারণ জায়গাটি অল্প হলেও, যে সেখানে বসবে,তার একটু ঢুল এলেই সীতারামের বুকে গিয়ে সে পড়বে আর ঘুমুবে নিশ্চিন্তে।
সীতারাম তাঁর সেবকদের নিয়ে কতই না রসিকতা করেন। একজন সাধক সন্তান, সে সময় মন্দিরের রন্ধনকার্যে র ভারপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি মোক্ষলাভ এর জন্যে শ্রী গুরুচরণে প্রার্থনা জানালে সীতারাম সহাস্যে বললেন ” তোমাদের এক্ষুনি মুক্তি দিয়ে দিলে, ঠাকুরের ছানার ডালনা রাঁধবে কে”?
এক মঠ সেবক সাধু সন্তানের পরলোকগতা মাতার বৃসৎসর্গ স্রাদ্ধানুষ্ঠান সীতারাম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মহামিলন মঠে সম্পন্ন করেন। অভিভূত সেবকটি প্রার্থনা জানালেন —” বাবা আমার মাতৃদেবির শ্রাদ্ধানুষ্ঠান টি যেমন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব কিছু সুসম্পন্ন করলেন, আমার নিজের স্রাদ্ধকালেও এমনটি করবেন বাবা”। সীতারাম উত্তর দিলেন “অতি অবশ্যই তাই করবো, কিন্তু তুমি নিজে শ্রাদ্ধে উপস্থিত থেকে যদি এটাকে যথোচিত অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসো তবেই”। 🍁ঋণ : নব নব রূপে এসো | কিঙ্কর বিঠ্ঠল রামানুজ জী।

 

দ্য

সৃষ্টিতে বেঁচে আছেন রবীন্দ্রনাথ: একাধিক ছদ্মনামে কবিগুরুর অনবদ্য সাহিত্যের ছোঁয়া

কৌস্তুভ ঘোষ 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি : আন্তর্জালিক

বীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের এমন এক নক্ষত্র, যার আলো পরেও নিভে যায়নি। যাবেও না। একজন কবি, ঔপন্যাসিক, সুরস্রষ্টা, নাট্যকার, গায়ক, শিল্পী, দার্শনিক এই এক ব্যক্তির মধ্যে এত রূপের সমাবেশ বিশ্বসাহিত্যে দুর্লভ। তবে অনেকেই জানেন না, বিশ্বকবির এই সৃজনের জগৎ এক বা দু’টি নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহিত্যের নানান পরীক্ষায়, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে কিংবা নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা আড়াল করতে, রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছিলেন একাধিক ছদ্মনাম। তার সৃষ্টির পেছনে কখনও ছিলেন ‘ভানুসিংহ ঠাকুর’ (Bhanusingha Thakur), আবার কখনও ‘অকপটচন্দ্র ভাস্কর’ (Akapotchandra Bhaskar), ‘আন্নাকালী পাকড়াশী’ (Annakali Pakrashi) কিংবা ‘শ্রীমতী কনিষ্ঠা’ (Shrimati Kanistha)।

প্রথম যে নামটি ভেসে ওঠে এই প্রসঙ্গে, তা হল ‘ভানুসিংহ ঠাকুর’। কৈশোরে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ নিজের ভিতরের কবিকে অন্য এক ভাষার আবরণে প্রকাশ করেছিলেন। ব্রজবুলি ভাষায় রচিত সেই প্রেমময় পদাবলী পাঠকদের মনে একপ্রকার বিভ্রম সৃষ্টি করেছিল। সকলেই ভেবেছিলেন, এটা কোনও মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব কবির রচনা। এই ছদ্মনামেই প্রকাশিত হয়েছিল ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, যা পরবর্তীতে কেবল রবীন্দ্রসাহিত্যের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ই হয়ে ওঠেনি, বাংলা সাহিত্যের ছদ্মনাম-চর্চার পথিকৃৎ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিজেই পরে জীবনস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছিলেন, “আমার এই ছদ্মনামের কবিতা যখন প্রকাশিত হল, তখন অনেকেই বুঝতে পারেননি লেখকটি কে। তাতে আমি বিশেষ আনন্দই পেয়েছিলাম।”

সাহিত্যের ইতিহাসে এমন বহু লেখকই ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন মার্ক টোয়েন থেকে শুরু করে জর্জ এলিয়ট। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছদ্মনামগুলি ছিল কেবল গোপনীয়তা রক্ষার উপায় নয়, ছিল এক আত্মসৃষ্ট ভুবনের দরজা খোলার চাবিকাঠি। মনে রাখতে হবে, শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ যে নামেই লিখুন না কেন, তাঁর সৃষ্টি নিজের আলোয় আলোকিত। তিনি লিখেছেন, “নাম দিয়ে কী হবে, যখন প্রাণই বলে আমি কে।”

‘ভানুসিংহ’ পরিচয়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসার বহু বছর পরে রবীন্দ্রনাথ আবারও ফিরেছেন ছদ্মনামের আশ্রয়ে। কখনও তীব্র ব্যঙ্গচর্চা করতে গিয়ে, কখনও প্রহসন বা অভিনয়ের প্রয়োজনে তিনি সাজিয়ে তুলেছেন নানা চরিত্র। যেমন ‘আন্নাকালী পাকড়াশী’ নামে লেখেন একটি নাট্যব্যঙ্গাত্মক প্রহসন, যা ছিল তাঁর স্বীয় কাব্যনাট্য ভাবনার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যঙ্গের ভাষা। আবার ‘অকপটচন্দ্র ভাস্কর’ নামটি ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ এমন সব লেখা রচনা করেছেন, যেখানে তীব্র ব্যঙ্গ, রসবোধ ও অন্তর্নিহিত দার্শনিক চিন্তার অভাব নেই। সাহিত্যিক শ্রীবিনয় ঘোষ এই বিষয়ে একবার বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ যেন ছদ্মনামে তাঁর ভিন্ন ভিন্ন সত্তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।”

নবীন কিশোর শর্মণ (Nabin Kishore Sharman), দিকশূন্য ভট্টাচার্য (Dikshunya Bhattacharya), ষষ্ঠীচরণ দেবশর্মা (Shashticharan Debsharma), বানীবিনোদ বিদ্যাবিনোদ (Banibinod Vidyabinod), এমনকি নারীস্বরূপে ‘শ্রীমতী কনিষ্ঠা’ (Shrimati Kanistha) ও ‘শ্রীমতী মধ্যমা’ (Shrimati Madhyama)—প্রত্যেক নামের পেছনে ছিল এক-একটি চিন্তাভাবনার অবতারনা। প্রতিটি ছদ্মনাম যেন একেকটি সাহিত্যিক মুখোশ, যার আড়ালে রবীন্দ্রনাথের একান্ত ব্যক্তিসত্তা কখনও হাস্যরসিক, কখনও দার্শনিক, আবার কখনও মমতাময় নারীর আবরণে আত্মপ্রকাশ করেছে। রবীন্দ্রসাহিত্য সমালীচকদের মতে, এই ছদ্মনাম-পরীক্ষা কেবল সাহিত্যিক কৌশল ছিল না, বরং রবীন্দ্রনাথের আত্মঅন্বেষণের এক ধরণও। অধ্যাপক সুখেন্দু দত্ত এক আলোচনায় মন্তব্য করেন, “রবীন্দ্রনাথ এক অর্থে বহু স্বরে কথা বলার অভ্যেস তৈরি করেছিলেন ছদ্মনামের মাধ্যমে। তাঁর মধ্যে এত স্তর, এত সত্তা, যা এক নাম ধারণ করতে অক্ষম।”
এই সত্তার বহুমাত্রিকতা গীতাঞ্জলির মতো কাব্যেও প্রতিফলিত। ১৯১০ সালে প্রকাশিত গীতাঞ্জলি তাঁর ব্রাহ্মভাবাপন্ন আত্মদর্শী কবিতার সংকলন। যেখানে ‘আমি’ কথক হয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সংলাপে প্রবেশ করেন, ঠিক সেভাবেই ভানুসিংহের পদে প্রেমময় ‘আমি’ হারিয়ে যান রাধার বা কৃষ্ণের মতো প্রেমিকের রূপে।গীতাঞ্জলি-র ইংরেজি অনুবাদ তাঁকে এনে দিয়েছিল ১৯১৩ সালের সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার। কিন্তু যে গভীরতা ও আত্মসন্ধানের প্রকাশ গীতাঞ্জলিতে আছে, তা অনেক আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল তাঁর সেই কিশোর বয়সের ছদ্মনামে লেখা পদগুলিতে।

রবীন্দ্রনাথের ছদ্মনামের ব্যবহার শুধুই কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নাট্যসাহিত্যেও এর প্রবেশ ঘটেছিল। ১৮৮১ সালে প্রকাশিত ও মঞ্চস্থ নাটক ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’ ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম নাট্যপ্রয়াস। সেখানে যেমন ভারতীয়— পাশ্চাত্য সুরের সাহসী মেলবন্ধন ছিল। তেমনি চরিত্রগুলির ভাষার মধ্যেও বিভিন্ন ছায়া খেলা করেছে। নাটকটির শেষে দেখা যায়, কবি-সৃষ্ট এক অভিনব গীতিনাট্যের উদ্ভব, যার ভিত্তিও ছদ্মচরিত্র। এইসব সাহিত্যিক প্রয়োগ কেবল শব্দে আটকে থাকেনি। চিত্রকলাতেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যথেষ্ট পরীক্ষামূলক। প্রায় দুই হাজারের বেশি ছবি এঁকেছিলেন তিনি। নিজের নাম ছাড়াও অনেক সময় তিনি আঁকার পেছনে নিজের অন্তর্নিহিত অবচেতন মনকে নামহীন রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথের ছদ্মনামের ব্যবহারের ইতিহাস যেন এক আয়না। যেখানে ধরা পড়ে তাঁর আত্মসন্ধান, সাহিত্যচর্চার একান্ত পরীক্ষা ও নতুন ভাষা ও ভাব প্রকাশের নীরব বিদ্রোহ।

সাহিত্যের ইতিহাসে এমন বহু লেখকই ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন মার্ক টোয়েন থেকে শুরু করে জর্জ এলিয়ট। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছদ্মনামগুলি ছিল কেবল গোপনীয়তা রক্ষার উপায় নয়, ছিল এক আত্মসৃষ্ট ভুবনের দরজা খোলার চাবিকাঠি। মনে রাখতে হবে, শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ যে নামেই লিখুন না কেন, তাঁর সৃষ্টি নিজের আলোয় আলোকিত। তিনি লিখেছেন, “নাম দিয়ে কী হবে, যখন প্রাণই বলে আমি কে।” অতএব বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের ছদ্মনামগুলো আমাদের সামনে তাঁর বহুরূপী প্রতিভার এক অনন্য দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাহিত্যের ইতিহাসে এ এক চিরকালীন অন্বেষণ। এক নামহীনতার গভীরে লুকানো বিশালতাকে অনুভব করার প্রয়াস।🍁

 

 

 

🍁ল্প | এক

 

একদিন বসন্ত বিকেলে রুদ্র হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল শহরের বাইরে একটা ছোট নদীর ধারে। নদীটা নাম জানে না ও। স্রোত নেই বললেই চলে। জল থেমে থাকে, যেন অপেক্ষা করে কারও জন্য। ঠিক যেমন সে অপেক্ষা করত ইরার জন্য। হঠাৎ, এক পাখির ডাক কানে এল। সে দেখল, সামনে বসে আছে একটি গাঙশালিক। পাখিটার গায়ে অদ্ভুত রং, লাল, হলুদ, নীল। চোখে একটা দৃষ্টির দ্যুতি, যেন কিছু বলতে চায়।

 

রংধনুর নিচে ছায়া

দেবব্রত সরকার

লুদের ফিকে আলোয় ভেসে থাকা শহরটা জানে না, আজ তার শরীরে বসন্ত এসেছে। কিন্তু বসন্ত কার জন্য আসে? সে কি শুধু বকুলের গন্ধ আর কাশের দোলা? নাকি কারও মনের ভিতর নুয়ে আসা এক স্মৃতি। যেটা ধীরে ধীরে রং মিশিয়ে দেয় রোজকার ধূসসের ভেতর? রুদ্রর জন্য বসন্ত ছিল একদিনের নয়। তার কাছে বসন্ত মানে একটা দীর্ঘ অভিসার। তার ঘরে, বারান্দায়, মেঝেতে, ঘড়ির টিক টিক শব্দে একটা মেয়ের মুখ খেলা করে। নাম ছিল তার ইরা। ইরার চোখ ছিল আগুন আর জলের মাঝামাঝি। সে হঠাৎ করে চলে গিয়েছিল এক বসন্ত সন্ধ্যায়। কোথাও না জানিয়ে, কোনও বিদায় না বলে। শুধু রেখে গিয়েছিল একটা খাতা। যার প্রতিটা পাতায় আঁকা ছিল তার নিজের তৈরি অক্ষর। রুদ্র বুঝতে পারেনি, এগুলো কবিতা না রূপকথা। শুধু জানত, ওগুলো পড়লে তার বুকের মধ্যে পাখির মতো কেঁপে ওঠে কিছু একটা।

রুদ্র হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসে শহরের দিকে। কিন্তু সে আগের মানুষ নয়। তার চোখে এখন রং। কিন্তু সেই রং ফোটে না বাইরে। তার ভিতরেই জ্বলে।

সে বছর বসন্ত এল ঝড়ের মতো। পলাশ ফুল ফোটেনি, কিন্তু হাওয়ায় লাল গন্ধ ছিল। রুদ্র সে গন্ধ চিনতে পারত। ইরার শরীরে এমনই এক ধরণের ঘ্রাণ থাকত। ধূলির সঙ্গে রক্তজবা মেশানো।
রুদ্র তখন কাজ করত এক পুরনো লাইব্রেরির রক্ষণাবেক্ষণের কাজে। বই গোছানো, পোকামাকড় দূর করা, পুরনো পাণ্ডুলিপির মেরামত। এই ছিল তার রোজকার কাজ। ইরার চলে যাওয়ার পর এই বইগুলিই তার একমাত্র সঙ্গী।
একদিন, একটি পুরনো বইয়ের ভিতর থেকে বেরোল একটি ছবি। ইরার হাতে আঁকা। তার চোখে বৃষ্টির ফোঁটা, মুখে অদ্ভুত নির্লিপ্ততা, আর হাতে একটি মাটির প্রদীপ। ছবির পেছনে লেখা ছিল,
“যেখানে আলো নিভে যায়, সেখানেই জন্মায় পাখিদের প্রার্থনা।”
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেল। এ কী কবিতা? না কি গোপন সঙ্কেত?
এরপর শুরু হল রুদ্রর খোঁজ।
বইয়ের ভিতর খোঁজা, ঘরের কোণে রাখা পুরনো বাক্স ঘাঁটা, ইরার হাতে বানানো কাগজের ফুল খুলে দেখা। কোথাও কি লুকোনো আছে ইরার ফিরে আসার ইশারা?
একদিন রাতে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। এক বিশাল মাঠ। যেখানে বাতাসের দোলায় সবুজ ঘাসের মাথা নত হয়ে আছে, আর মাঠের মাঝখানে বসে আছে ইরা। তার পেছনে অন্ধকার এক বৃক্ষ, যার শিকড় নেমে গেছে আকাশে।
ইরা বলল,
“তুমি এখনও আগুন চিনতে শেখোনি। তবু হাত পুড়িয়ে রেখেছ কবিতার ভিতর। আমি ফিরে আসিনি। কারণ আমি রয়ে গেছি অন্য এক দিকে। যেখানে আলো কেবল নীল।”
রুদ্র ঘুম ভেঙে উঠে বসে। জানালার বাইরে তখন পূর্ণিমা, কিন্তু চাঁদের আলো যেন রংহীন। সে জানে, এই শহর ইরাকে ধরে রাখতে পারেনি। কিন্তু সে কি নিজে পারে?

একদিন বসন্ত বিকেলে রুদ্র হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল শহরের বাইরে একটা ছোট নদীর ধারে। নদীটা নাম জানে না ও। স্রোত নেই বললেই চলে। জল থেমে থাকে, যেন অপেক্ষা করে কারও জন্য। ঠিক যেমন সে অপেক্ষা করত ইরার জন্য। হঠাৎ, এক পাখির ডাক কানে এল। সে দেখল, সামনে বসে আছে একটি গাঙশালিক। পাখিটার গায়ে অদ্ভুত রং, লাল, হলুদ, নীল। চোখে একটা দৃষ্টির দ্যুতি, যেন কিছু বলতে চায়। পাখিটা একটু হেঁটে রুদ্রর দিকে এগিয়ে এল, তারপর আবার দূরে সরে গেল।
রুদ্র হাঁটতে থাকল পাখিটার পেছনে। পাখি তাকে নিয়ে গেল নদীর পাড় ঘেঁষে এক ঝোপঝাড়ের ভিতর। সেখানে একটি গাছের নিচে রাখা একটি কাচের বাক্স। বাক্সের ভিতর কিছু চিঠি, কিছু শুকনো ফুল, আর একটা পাতায় আঁকা সেই আগুন-চোখ ইরার মুখ।
চিঠিগুলো খুলে পড়তে শুরু করল রুদ্র। প্রতিটা চিঠি যেন একেকটা ঋতুর গল্প।
“আমি আকাশে নেই, আমি ফুলেও না,
আমি সেই শব্দে আছি যা উচ্চারণ করতেই ভয় পাও।”
“যেদিন তুমি সত্যিই একা হবে, তখন বোঝো, প্রেম কখনও আলাদা হয় না। সে শুধু বদলে যায় রূপে।”
“শরীর তো তুচ্ছ, তোমার কাঁধে বসে পাখি হয়ে যেতে চেয়েছিলাম আমি। তবু তুমি খুঁজে চলেছ গাছ।”
রুদ্রর চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে বুঝতে পারছিল, ইরা কোথাও নেই। অথচ সর্বত্র আছে। এই বসন্ত, এই পাখির ডানা, এই নদীর নৈঃশব্দ্য। সব কিছুতে সে নিজেকে রেখে গিয়েছে।

রাত্রি নামে। আকাশে তখন নক্ষত্রের দেহাবশেষ। রুদ্র হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসে শহরের দিকে। কিন্তু সে আগের মানুষ নয়। তার চোখে এখন রং। কিন্তু সেই রং ফোটে না বাইরে। তার ভিতরেই জ্বলে।
সে জানে, ইরাকে আর কখনও দেখা যাবে না চোখে। কিন্তু যেসব শব্দে সে ভাঙে, যেসব ছবিতে সে জেগে ওঠে, যেসব মৌনতায় সে একা থাকে, সেইসব অন্ধকারে, ইরা থেকে যাবে চিরদিন।
একদিন লাইব্রেরির ছাদে উঠে রুদ্র আকাশের দিকে চাইল। একজোড়া পাখি ওড়ার ঠিক আগে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই হাওয়ায় একটা কবিতার লাইন ভেসে এল :
পৃথিবীর কোনও প্রেমই ফুরোয় না/ শুধু ডানা মেলে নেয় অন্য দিগন্তে।🍁

 

 

🍁কবিতা 

 

শ্বেতা বসু-এর একটা কবিতা 

ভোর নামে তোমার মতো

এই কটেজে শব্দ ধোয়া, জানালায় নামে কুয়াশা
তোমার চোখে ঘুম পোহায়, ঠোঁট ছুঁয়ে যায় ভাষা।

চায়ের কাপে ঠান্ডা শ্বাস, কেউ রেখে গেছে স্পর্শ
তুমি বলো না, তবু বুঝি—এই রাত ছিলো পরশ।

পাহাড় বুকে চাঁদ থেমে, আমরাও কি থেমেছি?
তোমার চুলে ছায়া হয়ে, ভালোবেসে কেঁদেছি।

ভোর নামে তোমার মতো, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে—
তুমি গেলে—আমি রইলাম, প্রেম কুয়াশায় ঘিরে।

 

স্বপন দত্ত-এর একটি কবিতা

আমি ওই ইউনিফর্ম পরিধান করতে পারব না

সামনেই প্যারেড গ্রাউন্ড
ক্রমশঃ ক্ষয়ে যাওয়া হিটলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে থাকা
এখন সুনিশ্চয় উপলব্ধ হিটলার…
হ্যাঁ… হ্যাঁ… আত্মরক্ষার জন্য, অভিনয়ের জন্য
এই অভিশপ্ত সৃষ্টির ছাড়পত্রের দিকে
তীব্র আবেগ ভরা চোখে, সাদা দাড়ি এবং জোব্বা নিয়ে—
তিনি জোব্বা এবং দাড়ি খুলে ফের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবেন
নিজস্ব ভাব, নিজস্ব ভার দেয়ালের কথা
সমাপ্তি টেনে তিনি সে কত যুগ আগে—
পঁচিশে বিরাট সব কাণ্ডকারখানা হচ্ছে
অপছন্দের রঙগুলোতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হচ্ছে
ক্রমেই দলভারি গিরগিটিরা মজার সার্কাস দেখতে
আনন্দে রক্তপাতের শিস দিচ্ছে
দৃঢ় প্রত্যয়, নিষ্ঠা এবং অভিজ্ঞ— ছাপিতে উঠছে
তীব্র-তীক্ষ্ম লেলিহান শিখার সুর
রাস্তায় এবং কারাগারে এবং দেয়ালের যাতায়াতের ভেতর
গান এবং মানুষ প্রত্যাহার করার চেষ্টা চলমান

বৈশাখের যেন মনে হল, ভুলে যাওয়া কাঁদনের গানের মার্চিং সুর
ভয় এবং ক্রমাগত ভয়ের নদীতে
আত্মপরিচয় আশাহীন গোপন অধিষ্ঠিত হচ্ছে
দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের সমাপ্তিহীন, সঙ্গীহীন, সীমাহীন প্রতিযোগিতায় হারানো বন্ধু নিখোঁজ—
প্রেমিকা গীতাঞ্জলির জন্য— তিনি সম্পূর্ণ
দেখছেন একটা আলাদা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্প
তবুও তিনি সম্পূর্ণ একটা ময়লা কাগজ টেনে নিলেন,
খুঁজে নিলেন একটা ক্ষয়ে যাওয়া পেন্সিল
লিখতে শুরু করলেন— প্রিয় মানুষ…

 

শিবপ্রসাদ মণ্ডল-এর দু’টি কবিতা

চোখের চন্দনযাত্রা

চাপা শব্দে নামে বৃষ্টি, পাথরে গাঁথা চুপচাপ নরম
একটা পায়রা হঠাৎ রং খুঁজে পায়

আঙুলে আঁকা নদী পড়ে যায় পায়ে, তুমি সরে যাও
ঢেউয়ের পাশে

আমার কাঁধে চুপি চুপি ডাকে একটা হরিণ
সে জানে মাটি চেনে কারা

অরণ্যের নিষিদ্ধ শব্দে খেলা করে ধ্বনি
অন্ধরাত্রির নিচে ঢেউ বাঁধে ঘর চন্দনের মতো,
ওড়ে ধোঁয়া দু’চোখে বিসর্জন লেখা, ভিতরটা কেবল একটা যাত্রা…

 

 

শীতের ভিতরে ওই যে গ্রীষ্ম নাচে

বালির ওপর হঠাৎ জেগে ওঠে ঘাস, একটা টিকটিকি
নীরবতা কেটে দেয়
আকাশ ফাঁকি দেয় ছায়াকে আলোর দিকে,
হাঁটতে থাকে শব্দ আর তপ্ত শরীর মেপে নেয় শিকড়
ওই যে খেজুর পাতার নিচে প্রেম লুকিয়ে রাখে মুখ
ঘরে ঘরে বাতাস ফিরে যায় শূন্য পায়ে
এ যেন ঘাম ভেজা অগোচর মন্ত্র, তবুও কেউ ডাকে, ডেকে যায়…
মাঠের প্রান্তে বসে থাকা কেউ
তার চোখে ছোট এক নদী আর গভীরে লুকিয়ে থাকে গ্রীষ্ম

 

 

সুমেধা সান্যাল-এর দু’টি কবিতা

নির্বাক অরণ্যের পত্রিকা

একটা ছায়া গায়ে পরে বসে থাকে
হাত ঘুরিয়ে লেখে গাছের নাম
ঘুমের ভিতর নড়ে ওঠে কিছু বুনো গল্প
উচ্চারণে পাখি থেমে যায়
কিছু কথা নুয়ে আসে পাথরের মতই
নাভিমূল থেকে উঠে আসে গন্ধ
তুমি স্পর্শ করলেই বদলে যায় ডানা
তাকে নিয়ে যায় ধুলোর রাজপথে
আমরা আর কে?
স্মৃতির ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা নৈঃশব্দ্য
যে অরণ্য কখনও সংবাদ দেয় না
তবু তার সব পাতাই স্নিগ্ধ কবিতা

 

শালুক ফুটে ওঠে রাত্রির গায়ে

দরজা খোলার শব্দে কেঁপে ওঠে চাঁদ
কেঁপে উঠি আমিও ভিতরে ভিতরে ততটাই
জল ভেঙে যায় ঘাসের ছুঁয়ে ছুঁয়ে…
কোনও এক ধারে বসে থাকা মোম
নিজেকে জ্বালায় ধীরে ধীরে
এ যেন প্রেমের কোনও প্রাচীন ব্যাখ্যা…
মানব-মানবীর ক্ষয়ে যাওয়া দাগ

ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে ওই যে লাল অক্ষর
তার ভিতর দিয়ে পায়ের ছাপ পড়ে
যেমন হাঁটে কেউ গভীর বিশ্বাসে
পিছনে থেকে যায় কুয়াশা
শালুক ফোটে নিঃশব্দে রাত্রির গায়ে
হৃৎপিণ্ড স্পর্শ করে শীতল আগুন
আমি জানি, আত্মার বাঁকে বাঁকে
তুমি এক জলজ নীরবতা

 

 

আদিত্য মুখোপাধ্যায় (আদি)-এর একটি কবিতা 


কাব্য কন্যার ঘর

ঝড়ের সাথে সখ্য করে ; ঝড়ের ওপর মাথা রেখে চলে যাচ্ছে–

চলে যাচ্ছে কোনোক্রমে
নদীর পাড়ের মতো প্রতিনিয়ত ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে বুকের পাটাতন–

কাউকে বলতে পারি না
বলার মতো বটগাছ কই?
তাই চুপচাপ থেকেছি; একদম চুপ….

নিজের গোপন ডেরায় ঢুকে ব্যথাদের ঠোঁটে ঠোঁট রাখি—
ব্যথা কী ভালো?
ব্যথা কী মন্দ?
এসব ভাবনার আরো ভেতরে মোহন বাঁশি বাজে–
তার সুরে গলা মেলাতে হবে ; ওখানেই কাব্য কন্যার ঘর!

সেই ঘরে গেলেই বুঝে যাবো জীবনের আসল রূপ
কষ্ট ; অভাব আর ব্যথাদের শিশিরের জলে ধুইয়ে দিতে পারলেই পৃথিবীর মতো সহনশীল হওয়া যায়—

অযোগ্য আমি; কতদিন ধরে শব্দতারা বাজিয়েই চলেছি একান্তে।
সেই পথে পাথর হয়ে বসেই আছি

পার হয়ে গেল কত ২১ শে ফেব্রুয়ারি ; ২২ শে শ্রাবণ কিম্বা কত বাহারী বসন্ত বিলাস—-

অধীর অপেক্ষায় অরণ্য হয়েই রয়ে যাবো
জানি; আমি আর আমি থাকবো না; তবুও

 

অসীম দাস-এর একটি কবিতা 

সমর্পণ

অনর্গল রাজি আর অরাজি স্রোতের দায়িত্ব বয়ে
ক্লান্ত আমার শোভিত কঙ্কাল।

হোক ক্ষনকাল, সাগর সম্মতি পেলে
মসৃণ মিশে যাবো গতিহীন নরম নাব্যতায়।
ভাঙনের ভয় ভুলে, হাঁটুজল লজ্জার খিল খুলে
উপচানো গর্বের পালের মাস্তুল ফেলে
প্রশান্তির পূর্ণ পিপাসায়।

মহার্ঘ্য ডোবার আগে দৃশ্যের গন্ধমাদন থেকে
বিশল্যকরণী বীজ পৃথক রেখেছি।
অবাঞ্ছিত স্মৃতির জন্ম নয় আর,
সাধারণ স্বপ্ন শ্বাসে শুদ্ধ সুখী সৌম্য সমর্পণ
শুধু এক বার।

 

 

কপিল কুমার ভট্টাচার্য্য-এর একটি কবিতা 

গ্রীষ্মের কবি

তীব্র গরমে ফাটছে মাটি
গ্রীষ্ম দেখছি ভীষণ খাঁটি,
অবশেষে কাটল বেলা
সময়টা আর নয় যে হেলা,
সাজছে মঞ্চ তাড়াতাড়ি
হই হুল্লোর বাড়াবাড়ি,
কবিতা গানে কাড়াকাড়ি
মঞ্চকে নয় ছাড়াছাড়ি,
শুনবে সকলে পদ্য-গীত
হৃদয় তখন হবে প্রীত।

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস |পর্ব ৩১ 
শুরু হয়েছে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কবি তৈমুর খানের জীবন। বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কেমন ভাবে কেটেছিল। মননে চেতনায় কিভাবে বয়ে গেছিল উপলব্ধির স্রোত। কেমন করে প্রকৃতি ও জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। কেমন করে জীবনে এলো ব্যর্থতা। সেসব নিয়েই নানা পর্ব।

 

একত্রিশ.

রামপুরহাট শহরে তখন টিউশান করতে হয় 

রামপুরহাট শহরে তখন শনি-রবি দুই দিন টিউশান করতে হয়। টিউশান করা শেষ হলে শঙ্করলাল রায়ের ধূলিকণার দোকানে গিয়ে বসি। হ্যাঁ, শঙ্করলাল রায় ছোট্ট এই দোকানটি চালাতেন শাঁখা-সিঁদুর আর চুড়ি বিক্রি করতেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই কবিতা নিয়ে কথা বলতেন। কত সাহিত্যিককে তিনি দেখেছেন, তাঁদের কী কী লেখা পড়েছেন তাও বলতেন। নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে মগ্ন হয়ে যেতাম। তাঁর দোকানের সেই বেঞ্চিতে কখনও শ্যামচাঁদ বাগদী, কখনও অনিমেষ মণ্ডল এসে বসতেন। শঙ্করলাল রায় ছিলেন লোকসাহিত্যের গবেষক। প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়ে তাঁর ভীষণ কৌতূহল ছিল। ‘বীরভূম নামের উৎস সন্ধানে’ তাঁরই লেখা বই। জৈন ধর্মের প্রবর্তক মহাবীর কোন পথ দিয়ে পরিভ্রমণ করেছিলেন তার একটা রূপরেখাও তিনি তৈরি করেছিলেন। তারপর সাঁওতাল বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ কোথায় কোথায় হয়েছিল সেসবও একটা ম্যাপ এঁকে আমাদের বোঝাতেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেই তিনি সংসার ধর্ম পালন করতে তখন হিমশিম খাচ্ছিলেন। দোকানের সামান্য আয়ে তাঁর সংসার যেত না। তাই ভীষণ টানাটানির মধ্যে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করার মতো অবসরও তাঁর ছিল না। অনেকগুলো পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত করতে পারেননি।

আমরা যারা সাহিত্য করে বেকার যুবক-যুবতী ঘুরে বেড়াচ্ছি, ফাঁকা হাতের মুঠোয় প্রেমের এক মুঠো ভিক্ষেও জোটে না—তখন অসীম দাস শুধুমাত্র টিউশানির ভরসায় একজন সুন্দরী মেয়েকে ভালবেসেই বিয়ে করে ফেলেছে এটা কি কম সাহসের কথা? তাই মনে মনে আমাদের ঈর্ষাও জন্মেছিল তা টের পেয়েছিলাম।

সাংসারিক চাপে ও ঋণগ্রস্ত হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই মারা গিয়েছিলেন। মৃত্যুর দু’দিন আগেই ওঁর বিছানার পাশে গিয়ে বসেছিলাম।
—জেঠু, কেমন লাগছে?
—ভালো লাগছে না, আমার লেখাগুলো কোথায় পড়ে আছে জানি না।
—শ্যামচাঁদকে নিতে বলেছি সবগুলো।
কিছু খেতে ইচ্ছে করছে?
—না আমি কিছুই খাব না। তোমরা একটু চা খেয়ে যাও।
উঠে বসার চেষ্টা করেও উড়তে পারলেন না। এক হাত অবশ হয়েছিল, অন্য হাতটি ভীষণভাবে কাঁপছিল। কিছু ধরার চেষ্টা করলেন কিন্তু ব্যর্থ হলেন। তারপর বললেন,
—অনেক দুঃখ থেকে গেল! ছেলে দু’টো এখনও বড় হয়নি, সংসারটা কী করে চলবে! আমিও ওষুধ খেতে পেলাম না। সেভাবে চিকিৎসাও করানো গেল না। তোমরা একটু দেখো।
—হ্যাঁ, আমরা দেখবো, আপনি চিন্তা করবেন না!
তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন, চোখ দিয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুধারা। একসময় তাঁর স্ত্রী এসে মুছিয়ে দিলেন দুই চোখ। আর বললেন, “এইভাবে কেঁদো না! ভগবান আছেন। নিশ্চয়ই তিনি ব্যবস্থা করবেন।”

 

মৃত্যুকালীন সময়টা কত অসহায় করে দিতে পারে তা সেদিন দেখেছিলাম। যিনি মারা গেলেন— গেলেন, কিন্তু যারা বেঁচে থাকলেন কষ্টটা হয় তাদেরই বেশি। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিটি এই বেঁচে থাকা মানুষদের কথাই ভাবেন বেশি আর তখনই কাতর হয়ে পড়েন। মৃত্যু যেন তরান্বিত হয় গভীরভাবে এবং তাকে আতঙ্কিত করে দেয়। সেদিন আমরা তাঁর ঘর থেকে উঠে এসে বাইরে চোখ মুছেছিলাম। অনেক কথা মনে পড়েছিল শঙ্কর জেঠুকে নিয়ে। শালবুনির জঙ্গলে পিকনিক করার কথা। সাঁওতাল পল্লিতে গিয়ে সাঁওতালি ভাষায় কথা বলে তাদের কাছ থেকে মহুলের মদ আদায় করা। সাইকেলে যেতে যেতে রাস্তার ধারের দোকানে বসে নতুন নতুন হাটুরে মানুষদের সঙ্গে আলাপ করা। যারা কিছুতেই সাহিত্যে আগ্রহী নয় তাদের আগ্রহী করে তোলার পাঠ দেওয়া। সবেতেই ওস্তাদ ছিলেন এই নিরহংকার মানুষটি। পিতা-মাতাকে হারিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এখানে শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়িয়ে ছিলেন। তারপর ঘর বেঁধেছিলেন রামপুরহাটে। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে প্রদীপ স্বরূপ। তার মৃত্যুতে তাই আমরা অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা সময়কে উপলব্ধি করেছিলাম। আমাদের মাথার উপর থেকে যেন আমাদের অভিভাবক চলে গেলেন।
যাইহোক এই শোক সামলে উঠে দাঁড়াতে আমাদের বেশ কিছু সময় লেগেছিল। পাণ্ডুলিপিগুলি পরবর্তীকালে বই আকারে বের করেছিল শ্যামচাঁদ। কিন্তু সবগুলোই পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর পর কিভাবে তাদের সংসার চলেছিল, কিভাবে তারা বেঁচে ছিল সে প্রশ্নের উত্তর ছিল খুব কঠিন। আমরা সেই পথে আর যেতে চাই না। তার যোগ্য উত্তরসূরীর অভাবে সব স্মৃতিগুলিই মুছে যেতে বসেছে। দেয়াল পত্রিকা ‘পদাতিক’ তিনিই সম্পাদনা করতেন। তার পুরনো সংখ্যাগুলোও আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু আগেই বলেছিলাম সত্যসাধন চট্টোপাধ্যায়কেও আমরা ‘জেঠু’ বলতাম। তিনিও বের করতেন ‘ডানা’ পত্রিকা। এই ‘ডানা’-ই একমাত্র ভরসা হয়ে রইলো। ‘ডানা’ এখনো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়নি। তার নাম একটু পাল্টে দিয়ে ‘অনুভূতির ডানা’ হিসেবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। সত্য জেঠুও কবেই চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। তাঁর সেই ঘরখানাও আর নেই যেখানে থাকতো ইংরেজি সাহিত্যের এবং বাংলা সাহিত্যের অঢেল আয়োজন। কালস্রোতে কোথায় তা ভেসে চলে গেছে। একমাত্র ছেলে বুবাই থাকেন বিদেশে। সেই বাড়িটি ভেঙে দিয়ে এখন বড় ইমারত তৈরি হয়েছে। সেই ইমারতে কারা থাকেন তা জানি না। বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে দরজায় কিছুক্ষণ দাঁড়াই। অতীতের বিস্মৃতি থেকে সত্য জেঠুকে দেখতে পাই। তিনি যেন হাত নেড়ে ডাকছেন আর বলছেন, “কখন এসেছ? এসো, ভিতরে এসো, তোমার সঙ্গে আর দেখাই হয় না বহুদিন!”
মনটা উদাস হয়ে যায়। বলতে দ্বিধা নেই দেশি-বিদেশি কবিতা পাঠ এই জেঠুর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। ছাত্রজীবনে তাঁর বাড়ি থেকে যখন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম তখন রাস্তায় অন্ধকার নেমে আসতো। রাস্তাও খুব ভালো ছিল না। তবু অন্ধকারেই জোরে জোরে সাইকেলের বেল বাজাতে শিখেছিলাম। কবিতা পড়ার উষ্ণতা আমাকে সাহস যুগিয়ে ছিল। সাহিত্যকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল। অন্ধকারকে জয় করতে শিখিয়েছিল। সেই জেঠুর কথা ভোলা সম্ভব নয়। অতীত জীবনের সংগ্রামকে মানুষ কখনো ভুলতে পারে না। আমিও পারিনি। সারাদিন টিউশানি করে অবেলার বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। রাত্রে ক্লান্তি বোধ হলেও কবিতা লিখতে পারতাম। পরেরদিন সেই নতুন কবিতাটি শোনাবার লোকও পেতাম।

রামপুরহাটে তখন প্রায় সমবয়সী আরেকজন টিউশান শিক্ষক অসীম দাসের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তিনি ইংরেজি সাহিত্যটাই পড়াতেন ছাত্র-ছাত্রীদের। রামপুরহাটে বাড়ি হলেও নিজে ভাড়া নিয়ে থাকতেন। সদ্য বিবাহিত হয়েছিলেন দুর্গাপুরের এক কন্যার সঙ্গে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ছিলেন সাহিত্যের সমঝদার। পত্র-পত্রিকা লেখালেখি সবেতেই ওদের ভীষণ আগ্রহ ছিল। আর মানুষকেও অসম্ভব ভালবাসতে পারতেন। পড়ানোর কাজ শেষ হলেই তার ভাড়া বাড়িতে গিয়ে আড্ডা মারার সুযোগ পেতাম। তার বউ ঘনঘন চা এনে দিতেন। কখনো মুড়ি দিয়ে জলখাবারের ব্যবস্থাও করতেন। টিউশান করে একটা সংসার এই ভাবেই চলে যাচ্ছিল। তারপর বউটা একটা চাকরিও পেয়ে যান অঙ্গনওয়াড়ি হিসেবে। পরবর্তীকালে একটা জায়গা কিনে স্থায়ী ঘরও নির্মাণ করেন। দেখতে দেখতে তাদের ছেলে মেয়ে দু’টিও বড় হয়ে যায়। রামপুরহাট ছেড়ে চাকরিস্থলে চলে গেলে আমার সঙ্গেও প্রায় সম্পর্ক ছিন্ন। বহুদিন আর দেখা হয় না। তবে সাহিত্যের নেশা তাদের মধ্যে আর নেই বলেই মনে হয়েছে। প্রথম প্রথম দাম্পত্য জীবনের রোমান্টিকতার মতো সাহিত্যকেও তারা ভালবাসতেন। হয়তো তারপর বাস্তবের কঠোর কঠিন জীবনে সেই রোমান্টিকতা উধাও হয়ে যায়। তারা হয়তো জেনে যান সাহিত্য কিছুই দিতে পারবে না। শুধু আবেগ দিয়ে সংসার চলে না। লেখালেখি শুধু বিলাসিতা মাত্র হতে পারে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথেই অসীম দাসের সঙ্গে দেখা। দেখলাম তিনি আগের মতন আর নেই। বড় বড় দাড়ি রেখে সন্ন্যাসীর মতো হয়ে গেছেন। বললাম, “চলে আসুন না একদিন আমার বাড়ি?”
তিনি দেখতে চাইলেন আমার বাড়িটা কোথায়।
আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখালাম, ওই যে রামপুরহাট ব্লকের এক নং বিডিও অফিস, তার সামনের দিকে একটু এগিয়ে গিয়েই ডান দিকের বাড়িটা।
তিনি আশ্বস্ত হলেন এবং জানতে চাইলেন বাড়িতে কে কে আছে। বললাম স্ত্রী, বাবা আর দুই ছেলে মেয়ে।
তিনি শুধু বললেন, “ঠিক আছে যাব!”
কিন্তু তারপর আর আসেননি। ওর নতুন বাড়িতে আমিই একদিন গিয়েছিলাম। খুব সুন্দর ছিমছাম একখানা বাড়ি করেছেন। তক্তপোশের উপর বসেই অনেক কথা হলো। বউটা প্রমোশনের জন্য পরীক্ষা দেবেন। তারই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জীবন এখন হিসেবী, অনেক হিসেবী। ছেলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। মেয়েটি বাইরে কোথায় হোস্টেলে থাকে।
রামপুরহাটের একটা সাহিত্য অনুষ্ঠানে প্রথম এদের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছিল। তখন তারা সদ্য বিবাহিত। আমরা যারা সাহিত্য করে বেকার যুবক-যুবতী ঘুরে বেড়াচ্ছি, ফাঁকা হাতের মুঠোয় প্রেমের এক মুঠো ভিক্ষেও জোটে না—তখন অসীম দাস শুধুমাত্র টিউশানির ভরসায় একজন সুন্দরী মেয়েকে ভালবেসেই বিয়ে করে ফেলেছে এটা কি কম সাহসের কথা? তাই মনে মনে আমাদের ঈর্ষাও জন্মেছিল তা টের পেয়েছিলাম। কিন্তু সদ্য তাদের দাম্পত্য জীবনের শুভকামনা ছিল আমাদের মনের মধ্যেও কারণ তারা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। সাহিত্য অনুষ্ঠান আলাপ-আলোচনা করার জন্য তাদের ভাড়াবাড়িটিও যে-কোনো সময় ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য তৎপর। চা-জলখাবারেরও দায়িত্ব পালন করতেন অকাতরে। সেদিনের বাজারে এটা কি কম কিছু ছিল? তাই তাদের কথাও আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 🍁(চলবে)

 

 

 

🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস 
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

 

কিশানগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়

 

[পর্ব ]
তব্রত ঘেমেছে। খেলাটা তো এই সেদিন শুরু করল, আর দার্জিলিং আউটিং ছিল তো টেন বোর্ড পরীক্ষা দেবার পর গত বছর। তার মানে অনেকদিন থেকে লোকটা তাকে ফলো করছে! কিছু ভেবে উঠতে না উঠতেই কম্প্যুটরের লোকটা আবার কথা বাজায়। “ওই মেয়েটাকেই তো রাস্টিকেট করেছে তোমাদের হেড মাস্টার নেল মন্টেরিও সাহেব। তোমার এলেম আছে হে। আলাপ হতেই আউটিং-এ সুন্দরীর সঙ্গে রাতে হোটেলের লেডিজ বাথরুমে গিয়ে অতক্ষণ ধরে ইন্টুমিন্টু করতে পারলে! আর এখন নিজের ঘরে বসে নিজেকে নিজে পারবে না! শোনো ব্যাপারটার ছবি টবি একবার যদি ভাইরাল হয়ে যায় তোমাকে মন্টেরিও সাহেব এই গ্রাহামস-এ রাখবে ভেবেছ !”
জোঁকের মুখে নুনের চাইতেও বেশি কিছু পড়লে যে অবস্থা, তা-ই ঋতব্রতর। তার সব স্বর বন্ধ হয়ে গেছে। এই লোকটা এত জানল কী করে! মণিকা বলে দেয়নি তো! এরপর শুধু শোনা ছাড়া কিছু করার থাকে না। ঋতব্রত লোকটাকে গুনে গুনে দেখায় তিন লাখ টাকা জোগাড় হয়ে গেছে। লোকটা জানায় ওই টাকা কীভাবে নেওয়া হবে তা পরে জানানো হবে।
নির্দেশ মতো সে একবার ওয়েবক্যামেরার সামনে তার বাঁহাতের উল্কি দেখায়। নিজের আইডেন্টিটি প্রমাণ ওই ‘তিন তিনে চাপা চু’ দেখিয়ে সে এবার কম্পিউটার বন্ধ করে দেয়। ঋতব্রতরও হেরোইনের নেশা নেবার সময় হয়ে গিয়েছে। আর তাছাড়া মণিকার কথা বলে যে ধাক্কা দিয়েছে লোকটা তাতে এক্ষুনি নেশা না করলে উপায় নেই। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে তার।

পঙ্কজ থাপা বলল, “ওই পাহাড়ের মালকিন কুকুর বেড়াল পছন্দ করেন। ওই পাহাড়ের ধাপে ধাপে তিনি অর্কিড আর নানা ক্ষেতি করেন। কুকুরগুলো পাহাড়া দেয়। বাইরের লোক ঢুকতে পারে না। একদিকে রিসর্ট তৈরি করেছেন। সেখানে এরকম কুকুর থাকলেও থাকতে পারে। তা তোমরা কখন ফিরছ? কাল থাকবে কি? আজ তো রাত হয়ে গেল। দিনের বেলায় ঘুরতে ঘুরতে কাল সেখানে গেলে হয়।”

**
এই ঠান্ডার দেশে এসে একটু নেশা টেশা না করলে চলে! বোঁদে অনেকক্ষণ থেকে ছুঁকছুঁক করছে। মালবাবু আর গুরু গ্রাহামস স্কুলের বোর্ডিং থেকে ফিরে বিকেল বিকেল ত্রিপাই রোডে ডেকি লজ হোটেলে ঢুকে পড়লে বোঁদে নিজের মতো একটু চরতে বেরিয়েছে। ওকে লজে রেখে বেরিয়েছিল ফেলুদা। ডেকি লজের ম্যানেজার কমলবাবু বাঙালি। মালবাবুর সুবিধা হয়। বাঙালি খাওয়া-দাওয়া পাওয়া যায় এখানে।

পঙ্কজ থাপা হই হই করে উঠেছে ফোন পেয়ে। পুরনো বন্ধু। বলেছে ডিকি লজ থেকে বাস স্ট্যান্ড একেবারে কাছে। পাঁচ মিনিটের হাঁটা। বাস স্ট্যান্ডের পেছনেই গ্যারেজ। এটা পঙ্কজদের নিজেদের।
এখানে গুরুও যেমন মালবাবুও তেমন। একেবারে সন্ন্যাসী। ঠান্ডার দেশে এসে একটু গরম না হলে হয়! লোকাল না, লোকাল না, একদম ভুটানের মালের ব্যবস্থা আছে। বলেছে পঙ্কজ থাপা।
ভেড়ার লিভার দিয়ে মাল খেতে খেতে হঠাৎ বোঁদের মনে হল, কথাটা পেড়ে দেখা যেতে পারে। ফেলুদা তো অন্য সব গল্প করছে, কিন্তু বড়সড় কুকুরের খোঁজ তো আর করছে না! অথচ বলেছিল পাহাড় থেকে একটা বড় লোমঅলা কুকুর ধরে নিয়ে গিয়ে মালবাবুকে দিয়ে এ যাত্রা রক্ষা পাবে। তবে সে কুকুর যেন গঙ্গারামের মতো হয়। হ্যাঁ গঙ্গারামের ছবি তো বোঁদের মোবাইলে আছে।
কথায় কথায় বোঁদে শুধোল, “আচ্ছা, এখানকার যে বড়সড় কুকুর তা কিশানগঞ্জে বা শিলিগুড়িতে নিয়ে গেলে বাঁচে?”
“হ্যাঁ, বাঁচবে না কেন! কত লোক এখান থেকে কিনে নিয়ে যায়! ঝুপুস ঝাপুস লোমে ঢাকা বড় বড় কুকুর তো কলকাতার লোকেরা খুব পছন্দ করে। যাদের শখ আছে তারা অনেকেই বেড়াতে এলে নিয়ে যায়। এখানে তো রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়ায় অনেক। তোমার চাই বুঝি। হয়ে যাবে। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
পঙ্কজ থাপা অনেকটা কথা বলেছে। এবার সে কাঠি দিয়ে একটুকরো লিভার শালপাতার প্লেট থেকে তুলে মুখে পুরল। তার দুই হাতে কালি আর গ্রীজ লাগানো। কাপড়ে মুছে সে বেতের মোড়া নিয়ে বসেছে। গ্যারেজের অল্প আলোয়। গ্যারেজের জামা-কাপড় ছেড়ে চান করবে একেবারে রাত ন’টায়। তার আগে এভাবে মুছেই কাজ চালায়।

বোঁদে গ্লাসের শেষ মদটুকু উপুড় করে শুষে নিয়ে বলল, “বস, আমার একটা চাই কিন্তু বড় কুকুর, ছবির সাথে মিলিয়ে দিতে হবে। আমাদের এক পরিচিত লোকের কুকুর হারিয়ে গেছে। তারা সেই কুকুরের শোকে খুব কাতর। মিল করে যদি সেরকম একটা দেয়া যায় তো বেঁচে যায় তারা।”
পঙ্কজ থাপা বোঁদের দিকে তাকাল। গ্লাসে কিচ্ছুটি নেই তবু আর একবার বোঁদে গ্লাসটা মুখে ধরে শেষ বিন্দুটুকু শুষে নেয়ার চেষ্টারত। চার পেগ খেয়েছে। আরও দু’পেগ দিলে হতো। কিন্তু পঙ্কজ থাপা জানে বন্ধু ট্যুরিস্ট। সে যদি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে একটা বিপদ ডেকে আনে তবে কান টানলে মাথা আনার ঢঙে তাকেও ডাকা করবে পুলিশ। আর পুলিসে ছুঁলে যে ছত্রিশ ঘা তা যারা ব্যবসা করে, সবাই জানে। আর বিড়লা হাউস-এ আছে নার্কোটিক প্রধান শিভম লেপচা। এই অফিসারটি যেমন সৎ, তেমন্ হিংস্র। সেবার বীরবাহাদুরের চেলা মোহিত লিম্বুকে এক কিলো হেরোইন সহ গ্রেপ্তার করেছিল রংপু থেকে। ট্যুরিস্টদের ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে ট্যুরিস্ট গাড়িতেই শিলিগুড়ি থেকে মাল নিয়ে আসত সে। তারপর কালিম্পং আর দার্জিলিং এর পথে পথে তা ছড়িয়ে পড়ে। পঙ্কজ থাপা জানে কোর্টে প্রোডিউস করার আগে থানায় নিয়ে শিভম লেপচা মোহিত লিম্বুর দু’হাতের দশ আঙ্গুলের উপর দিয়ে পুলিশের গাড়ি দু’বার চালিয়ে দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তিন বছরেরর জেল থেকে ফিরে এসে তার ভিক্ষা করা ছাড়া আর কোনও কাজ করার ক্ষমতা নেই।
সতর্ক পঙ্কজ থাপা বোঁদের মুখের উপর চোখ রেখে বলল, “কই দেখি, কী ছবি?”
বোঁদে মোবাইল খুলে দেখাল গঙ্গারামের ফটোগ্রাফ। একটা হাফ প্যান্ট পরা নাদুস-নুদুস ছেলে বকলস ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটা কুকুর নিয়ে।
পঙ্কজ থাপা বলে, “আরে এই ছেলেটাকে তো চেনা চেনা লাগছে। বাসস্ট্যান্ডের বাজারে হয়ত দেখেছি।”
“হ্যাঁ তা দেখতে পারো। ও তো এখানেই পড়ে। গ্রাহাম স্কুল না কোন স্কুলে। ওর বাবার সাথেই তো আমি এসেছি।”
পঙ্কজ থাপা এবার কুকুরটিকে খুঁটিয়ে দেখে বলে, “ওঃ এটা তো থাই ডগ। খুব ভাল জাত। শেয়াল আর কুকুরের মিক্সড বিড। এর চোখ দেখ, বাঘের চোখের মতো, হলদে হলদে। এর গায়ের রং ক্রিম হলেও, কালো আর সাদাও হয়। এর গায়ের লোম তো বেশ ঘন আর সোজা দেখছি। কার্লি লোমও হয়। হিংস্র তো বটেই, খুব বুদ্ধিমান এরা। প্রভুকে একবার চিনে ফেললে, আর কোনও ভয় নেই, যে-কোনও বিপদে একাই একশ।”
বোঁদে খুব উৎসাহিত স্বরে শুধোয়, “পাওয়া যাবে, এরকম পাওয়া যাবে?”
“হ্যাঁ। তবে দাম একটু বেশি। কিন্তু এই বয়সের পাব কিনা বলতে পারছি না। ছোট বাচ্চা হলে অসুবিধা ছিল না। স্পিটজ পরিবারের তো! পাওয়া যেত। কিন্তু বড় কুকুর তো আর দোকানে মিলবে না। এদিক ওদিক দেখতে হবে। ওই ওদিকটায়, মানে ডেলো পাহাড়ের ধাপে এক সঙ্গে বেশ কিছু কুকুর-বেড়াল আমি দেখেছি।”
বোঁদের চোখের ভেতর আশা নিরাশার আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার চমকাচ্ছে তো একটু পরেই আলো নিভে আসছে।
পঙ্কজ থাপা বলল, “ওই পাহাড়ের মালকিন কুকুর বেড়াল পছন্দ করেন। ওই পাহাড়ের ধাপে ধাপে তিনি অর্কিড আর নানা ক্ষেতি করেন। কুকুরগুলো পাহাড়া দেয়। বাইরের লোক ঢুকতে পারে না। একদিকে রিসর্ট তৈরি করেছেন। সেখানে এরকম কুকুর থাকলেও থাকতে পারে। তা তোমরা কখন ফিরছ? কাল থাকবে কি? আজ তো রাত হয়ে গেল। দিনের বেলায় ঘুরতে ঘুরতে কাল সেখানে গেলে হয়।”
“আমরা তো কাল খুব সকালে চলে যাব। মালবাবু, মানে যার সাথে এসেছি, তিনি রেলের কর্মচারী। তাঁকে কাল অফিসে যেতে হবে সকাল দশটার মধ্যে। তবে ভাই তুমি যদি খুঁজে পাও, একটু দেখো। তোমাকে ছবিটা হোয়াটস অ্যাপ করে দিচ্ছি।”
মোড়া ছেঁড়ে উঠতে উঠতে বোঁদে কণ্ঠস্বরে খানিক মিনতি ফুটিয়ে বলল, “কোনও খবর থাকলে আমাকে জানিও কিন্তু।” 🍁(চলবে)

 

🍂ল্প| দুই

পুতুলের চোখ

রীতা বিশ্বাস পান্ডে

সেদিন বৃষ্টি থেমেছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু আকাশটা তখনও ঘন কালো মেঘে ঢাকা। সন্ধ্যার আবছা আলোয় পুরনো বাড়িটার ভাঙা ছাদের ফাটল দিয়ে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে পড়ছিল, আর সেই টুপটাপ শব্দটা কেমন যেন বিষণ্ণ সুর বাজাচ্ছিল। এ বাড়িতে কেউ থাকে না অনেক দিন। শুধু একটা বিড়াল মাঝে মাঝে এসে উঁকি দিয়ে যায়। অথচ, আজ জানালার ভাঙা শার্সির ফাঁক দিয়ে একজোড়া চোখ স্থির তাকিয়ে আছে বাইরে। সে চোখ পুতুলের।
পুতুলটা মেঝেতে পড়ে ছিল উপুড় হয়ে। তার এক হাত ভাঙা। পরনের ফিকে গোলাপি ফ্রকটা ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, তার কাঁচের চোখ দু’টো কেমন যেন জীবন্ত দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, তারা যেন এই বাড়িটার প্রতিটি ফিসফিসানি, প্রতিটি ভাঙা স্বপ্ন, প্রতিটি নীরব দীর্ঘশ্বাস শুষে নিচ্ছে।
পাশের বাড়ি থেকে শশী যখন তার ছেলে রিকিকে ডাকতে এসে জানালা দিয়ে উঁকি দিল, তখন তার চোখ আটকে গেল পুতুলটার দিকে। এই রকম একটা পুতুল সে বহু বছর আগে তার ছোট বোন মিতুর জন্য কিনেছিল। মিতু তো হারিয়ে গেছে সেই কবে, এই পুরনো বাড়ির পেছনেই খেলা করতে গিয়ে। পুলিশ অনেক খুঁজেও তাকে পায়নি। মিতুর পুতুলটাও তার সঙ্গেই হারিয়ে গিয়েছিল। শশীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠল। এই পুতুলটা… এ তো অবিকল মিতুর পুতুলের মতো! সে দ্রুত দরজার কড়া নাড়ল, কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। তবু এক অজানা টানে সে দরজা ভেঙে বাড়ির ভেতরে ঢুকেই পড়ল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন শতাব্দীর ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছিল। ধুলো আর মাকড়সার জালের আড়ালে লুকিয়ে ছিল বিস্মৃত স্মৃতিরা।
অবশেষে শশী পুতুলটার কাছে পৌঁছল। নিচু হয়ে সে যখন পুতুলটাকে তুলে নিল, তখন তার হাতে কেমন যেন একটা ঠান্ডা অনুভূতি হল। পুতুলের কাঁচের চোখ দু’টো যেন এবার তাকেই দেখছে, এক অদ্ভুত জিজ্ঞাসা নিয়ে। শশী পুতুলটাকে বুকের কাছে ধরে রাখল। তার মনে হল, এই পুতুলের চোখ দু’টো যেন মিতুরই চোখ, যে চোখগুলো তাকে কিছু বলতে চাইছে।
হঠাৎ পুতুলের ভাঙা হাত থেকে একটা ছোট কাগজের টুকরো খসে পড়ল। ভাঁজ করা সেই টুকরোটা খুলতেই শশীর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ছোট্ট হাতের লেখায় লেখা, “দিদি, আমি হারিয়ে যাইনি। আমি এই বাড়ির বাগানেই…” লেখাটা অসমাপ্ত।
শশী দ্রুত পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাড়ির পেছনের বাগানে ছুটল। যেখানে একসময় মিতু খেলা করত, যেখানে মিতু হারিয়ে গিয়েছিল। ঘন ঝোপঝাড় আর আগাছার মধ্যে সে পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। আর সেখানেই, মাটির নিচে লুকানো একটা ছোট্ট কাঠের বাক্সের সন্ধান পেল সে। বাক্সটা খুলতেই তার ভেতরের জিনিস দেখে শশী স্তব্ধ হয়ে গেল। সেখানে ছিল মিতুর প্রিয় খেলনা, আর তার একটি ছোট চুলের ক্লিপ। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল একটি ডায়েরি, যার শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, “আমি লুকিয়েছি, যাতে কেউ আমাকে খুঁজে না পায়। এই পুতুলটা সব জানে।”
শশীর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। মিতু হারিয়ে যায়নি? সে লুকিয়েছিল? কেন? আর এই পুতুলটা… সে কি সত্যিই কিছু জানে? পুতুলের কাঁচের চোখ দু’টো তখনও স্থির। তাদের গভীরে লুকিয়ে আছে এক অমীমাংসিত রহস্য, যা হয়ত কোনওদিনই উদ্ঘাটন হবে না। শশী পুতুলটাকে আরও শক্ত করে ধরল, যেন তার মধ্যে দিয়েই মিতুর অব্যক্ত কথাগুলো শুনতে চাইছে। কিন্তু পুতুলটা শুধু নীরব।
শশীর হাতে ধরা পুতুলটা তখনও নীরব। তার কাঁচের চোখ দু’টো যেন বহু অব্যক্ত কথার ভারে ভারী। শশী জানে না মিতু কেন লুকিয়েছিল, বা কেন সে পুতুলটার মধ্যে দিয়ে তাকে কিছু বলতে চাইছিল। ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা অসমাপ্ত বাক্যটি তার মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছিল। “আমি এই বাড়ির বাগানেই…” এরপর কী? মিতু কি তাহলে বাগানেই মারা গিয়েছিল? নাকি অন্য কিছু?
শশী পুতুলটাকে নিয়ে পুরনো বাড়ির ভেতরে ফিরল। মিতুর ডায়েরিটা তার বুকের কাছে ধরা। ডায়েরির প্রতিটি পাতা যেন এক গোপন জগতের চাবিকাঠি। শশী মেঝেতে বসে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ডায়েরিটা পড়তে শুরু করল। মিতুর ছোট্ট হাতে আঁকা ছবি, তার খেলার বিবরণ, আর মাঝে মাঝে কিছু এলোমেলো বাক্য। প্রথম দিকের পাতাগুলোতে ছিল নির্দোষ বালিকার সরলতা। কিন্তু যত পাতা উল্টাতে লাগল, তত মিতুর লেখা কেমন যেন পাল্টে যেতে লাগল।
একটা পাতায় মিতু লিখেছে, “আজ একটা নতুন বন্ধু পেয়েছি। কেউ তাকে দেখতে পায় না, শুধু আমি দেখতে পাই। সে খুব মজার গল্প বলে।” শশীর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। মিতু কি কল্পনার বন্ধু নিয়ে খেলা করত? নাকি অন্য কিছু? পরের পাতাগুলোতে সেই ‘বন্ধুর’ উল্লেখ আরও স্পষ্ট হতে লাগল। মিতু লিখছে, তার বন্ধু তাকে বলত বাড়ির পেছনের বাগানে নাকি এক গুপ্তধন আছে, আর সেই গুপ্তধন খুঁজে বের করতে হলে কাউকে কিছু বলা যাবে না।
শশী ডায়েরির শেষ পাতায় পৌঁছাল, যেখানে লেখাটা অসমাপ্ত ছিল। কিন্তু তার ঠিক আগের পাতায় একটা অদ্ভুত ছবি আঁকা ছিল। একটা বড় গাছ, আর তার নিচে একটা ছোট বৃত্ত, যেন সেখানে কিছু লুকানো আছে। শশীর মনে পড়ল, বাড়ির পেছনের বাগানে সত্যিই একটা অনেক পুরনো বকুল গাছ আছে, যার নিচে মিতু প্রায়ই খেলা করত।
শশী দ্রুত আবার বাগানের দিকে ছুটল। মিতুর ডায়েরিতে আঁকা গাছের সঙ্গে বকুল গাছটা হুবহু মিলে যাচ্ছে। গাছটার গোড়ায়, যেখানে মিতু ছবিতে বৃত্ত এঁকেছিল, শশী হাত দিয়ে মাটি সরাতে শুরু করল। প্রথমে নরম মাটি, তারপর একটু শক্ত কিছুতে ধাক্কা খেল তার হাত। ধীরে ধীরে মাটি সরিয়ে সে দেখল, একটা ছোট, ভাঙা মাটির পাত্র।
পাত্রটার ভেতরটা ছিল খালি। কিন্তু তার নিচে, একদম তলার দিকে, একটা ছোট ধাতব টুকরো চকচক করছে। শশী সেটিকে তুলে নিল। সেটা ছিল একটা পুরনো লকেট। লকেটটা খুলতেই শশী দেখতে পেল ভেতরে দু’টি ছবি। একটিতে অল্পবয়সী মিতু হাসছে, আর অন্যটিতে একজন অচেনা মহিলা, যার চোখে মুখে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। লকেটের পেছনের দিকে খোদাই করা ছিল কিছু অক্ষর, “ম.স.”।
শশী লকেটটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। এই মহিলা কে? আর মিতুর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? শশীর মন বলল, মিতুর নিখোঁজ হওয়ার রহস্য এই লকেটের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। পুতুলের চোখ, ডায়েরি, আর এই লকেট সব যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। মিতু কি তাহলে লুকিয়ে ছিল না, তাকে কেউ লুকিয়ে রেখেছিল? শশীর মনে এক নতুন আশার আলো জ্বলে উঠল, মিতুর শেষ কথাগুলো হয়ত তাকে সত্যিটার দিকে নিয়ে যাবে।
শশীর হাতে ধরা পুরনো লকেটটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, মিতুর নীরবতা আসলে এক গভীর চিৎকারের নাম। ‘ম.স.’ এই অক্ষরগুলো তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এই মহিলা কে? শশীর স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে লাগল। হঠাৎ তার মনে পড়ল, তাদের গ্রামের পাশের গ্রামে ‘সরকার’ পদবীর একটি পরিবার ছিল, যাদের এক মেয়ে নিখোঁজ হয়েছিল অনেক বছর আগে। তার নাম ছিল মালতী সরকার। মালতীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা চাপা পড়ে গিয়েছিল সময় আর বিস্মৃতির ধুলোয়।
শশীর মনে হল, মিতুর ডায়েরিতে লেখা সেই ‘নতুন বন্ধু’ কি তাহলে এই মালতীই? মালতী কি কোনওভাবে এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল? নাকি অন্য কোনও সম্পর্ক ছিল তাদের? শশী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। এই লকেট আর মিতুর ডায়েরি নিয়ে সে পুলিশের কাছে যাবে। যদিও এত বছর পর নতুন করে তদন্ত শুরু করা কঠিন, কিন্তু এই নতুন সূত্রগুলো হয়ত কিছু আলোর দিশা দেবে।
পুলিশ প্রথমে শশীর কথা শুনে কিছুটা সন্দিহান ছিল। একটি পুরনো ডায়েরি, একটি পুতুল আর একটি লকেট– এ সবকিছুই কি এক দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান করতে পারে? কিন্তু শশী যখন মিতুর ডায়েরির শেষ পাতা, লকেটের ছবি আর ‘ম.স.’ অক্ষরগুলোর কথা বলল, তখন তাদের মধ্যেও কিছুটা আগ্রহ দেখা গেল। তারা মালতী সরকারের ফাইলটা আবার খুললেন।
তদন্ত শুরু হল। মালতী সরকারের অতীত খুঁড়তে গিয়ে পুলিশ জানতে পারল, মালতী মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল এবং সে প্রায়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে যেত। একবার সে যখন নিখোঁজ হয়, তখন তার পরিবার তাকে খুঁজে পাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল। পুলিশ মালতীকে খুঁজতে গিয়ে এই পুরনো বাড়িটির কাছাকাছি এলাকাগুলোতে খোঁজ শুরু করল।
ক’য়েকদিনের মধ্যেই, এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এল। এই বাড়ির পেছনের বাগানের কাছাকাছি একটি পুরনো কুয়োর পাশ থেকে কিছু পুরনো হাড়গোড় আর কাপড়ের টুকরো উদ্ধার হল। ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হল, সেগুলো মালতী সরকারেরই। মালতী কীভাবে মারা গিয়েছিল, সেটা স্পষ্ট না হলেও, মনে করা হচ্ছে, সে হয়ত পালিয়ে এসে এই কুয়োর মধ্যেই পড়ে গিয়েছিল।
আর মিতু? মিতুর ডায়েরি, বিশেষ করে ‘আমি লুকিয়েছি, যাতে কেউ আমাকে খুঁজে না পায়’ এই বাক্যটি নতুন করে ভাবিয়ে তুলল পুলিশকে। মিতু কি তাহলে মালতীকে দেখে ভয় পেয়ে লুকিয়েছিল? নাকি মালতী তাকে নিজের লুকানোর কথা বলেছিল? মিতু কি তাহলে মালতীর শেষ পরিণতি জানত?
শশী পুতুলটাকে হাতে নিয়ে বসে ছিল। পুতুলের কাঁচের চোখ দু’টো এখনও স্থির, যেন সে সমস্ত ঘটনার সাক্ষী। হয়ত মিতু মালতীর ঘটনা দেখে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে সে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল। আর সেই লুকিয়ে থাকার পরিণতিই ছিল তার নিজের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। মিতু হয়ত সেই বাগানেই মালতীকে খুঁজে পেয়েছিল, আর সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে সেও নিজের মতো করে লুকিয়ে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু হয়ত আর ফিরে আসতে পারেনি।
পুতুলের চোখগুলো যেন এক অজানা ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষী হয়ে রইল। মিতু আর মালতীর পরিণতি হয়ত পুরোপুরি জানা যাবে না, কিন্তু তাদের দু’জনের লুকানোর গল্পটা এই পুরনো বাড়ির প্রতিটি ইটে, প্রতিটি ধুলোর কণায় মিশে রইল। শশী জানল, এই পুতুলটা শুধু একটা খেলনা নয়, এটা ছিল এক ভয়াবহ সত্যের বার্তাবাহক, যা এতদিন ধরে নীরব ছিল।🍁

 

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার,  কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার, অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক 

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

 

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment