সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা : বিহারের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল রাষ্ট্রীয় জনতা দল। রবিবার পটনায় দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছেলে তেজস্বী যাদবের (Tejashwi Yadav) হাতে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লালুপ্রসাদ যাদব (Lalu Prasad Yadav)। তেজস্বীকে আরজেডি’র সর্বভারতীয় কার্যকরী সভাপতি পদে নিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে দলীয় নেতৃত্বে প্রজন্ম পরিবর্তনের বার্তা স্পষ্ট করে দিলেন লালু। তবে এই ঘোষণার ঠিক আগেই কন্যা রোহিণী আচার্যের (Rohini Acharya) বিস্ফোরক মন্তব্যে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে যাদব পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দলীয় টানাপড়েন। রবিবার থেকে বিহারের রাজধানী পটনায় শুরু হয়েছে আরজেডি’র জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠক। প্রথম দিনের অধিবেশনেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে তেজস্বীকে কার্যকরী সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রাবড়ি দেবী (Rabri Devi), দলের প্রবীণ নেতা ও বিধায়করা এই ঘোষণার সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে নিয়োগপত্র তুলে দিয়ে লালুপ্রসাদ যাদব স্পষ্ট করে দেন, ভবিষ্যতে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক রণকৌশলের প্রধান মুখ হবেন তেজস্বীই।
যদিও খাতায়কলমে এত দিন লালুই আরজেডি’র সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন, বাস্তবে দলের দৈনন্দিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিধানসভা কৌশল ও জোট রাজনীতির ভার দীর্ঘদিন ধরেই তেজস্বীর কাঁধে ছিল। বিরোধী শিবিরের মুখ হিসেবে বিহার বিধানসভায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা এবং তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে দলের স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এ বার সেই বাস্তবতাকেই সাংগঠনিক স্বীকৃতি দিলেন লালু। কিন্তু, এই ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্তেই দল ও পরিবারের অন্দরে জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে। জাতীয় কার্যনির্বাহী সভার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই রোহিণী আচার্য সমাজমাধ্যমে নাম না করে দলীয় নেতৃত্বকে তীব্র আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, ‘দলের নিয়ন্ত্রণ এখন অনুপ্রবেশকারী এবং ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে চলে গিয়েছে, যাদের একমাত্র লক্ষ্য লালুবাদকে ধ্বংস করা।’ রোহিণীর মতে, এই সঙ্কটকালে দলের আত্মসমালোচনা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর এই মন্তব্য আরজেডি’র অন্দরমহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
উল্লেখ্য, রোহিণী আচার্য গত বছর বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডি’র ভরাডুবির পর রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা করেছিলেন। সেই সঙ্গে যাদব পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাও তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী পরাজয়ের দায় কার উপর বর্তাবে এবং দলের ভবিষ্যৎ কৌশল কী হবে, তা নিয়েই মূলত পরিবার ও দলে বিভাজন তৈরি হয়। অন্যদিকে, যাদব পরিবারের এই টানাপড়েন আরও তীব্র হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। সে সময় জ্যেষ্ঠপুত্র তেজপ্রতাপ যাদবকে (Tej Pratap Yadav) দল ও পরিবার থেকে ত্যাজ্য করেন লালু। পরে তেজপ্রতাপ আলাদা রাজনৈতিক দল গড়ে বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করলেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাননি। এই ঘটনাগুলি আরজেডি-র অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই তেজস্বীর হাতে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা তুলে দেওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
আরজেডি নেতৃত্বের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লালুপ্রসাদ যাদব পরিষ্কার বার্তা দিলেন যে, দলকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তেজস্বীর উপরই ভরসা করছেন তিনি। বিহারের তরুণ ভোটারদের কাছে তেজস্বীর গ্রহণযোগ্যতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থানের মতো ইস্যুতে তাঁর আগ্রাসী অবস্থান আরজেডি-কে নতুন করে শক্তি জোগাতে পারে বলে আশাবাদী দলীয় নেতৃত্ব। অন্য দিকে, রোহিণীর ‘ষড়যন্ত্র’ মন্তব্যকে ঘিরে দলের অন্দরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। অনেকের মতে, এই অভিযোগ আরজেডি-র সাংগঠনিক দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে দলের ভিতরে যে হতাশা ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তেজস্বীর সামনে সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রসঙ্গত, পটনার এই বৈঠক আরজেডি-র ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। লালুপ্রসাদ যাদবের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন আনুষ্ঠানিক ভাবে তেজস্বীর হাতে। কিন্তু পারিবারিক মতভেদ, অতীতের নির্বাচনী ব্যর্থতা এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকট, এই সব কিছুর মাঝেই তেজস্বীকে দলকে নতুন পথে চালিত করতে হবে। আরজেডি-তে প্রজন্ম বদলের এই ঘোষণা বিহারের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সে দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Republic Day | সাধারণতন্ত্র দিবসে কর্তব্যপথে নতুন ভূমিকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিদেশি অতিথিদের জন্য নিজেই ধারাভাষ্যকার হয়ে উঠলেন ভারতের কণ্ঠ




