মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বাংলা ছবির পর্দায় একের পর এক চরিত্রে নিজেকে বদলে দর্শকের সামনে হাজির হয়েছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee)। কখনও রোম্যান্টিক নায়ক, কখনও কঠিন চরিত্র, কখনও চিকিৎসক, আবার কখনও রকস্টারের অবয়বে ধরা দিয়েছেন তিনি। লম্বা অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করার পরও নতুন কিছু করার তাগিদ তাঁর মধ্যে এখনও কমেনি। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চরিত্র বাছাইয়ের জায়গায় চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন অভিনেতা। তাঁর কথায়, ‘এত চরিত্র করে ফেলেছি। এখন ভাবতে হয়, নতুন আর কী করব!’
উল্লেখ্য যে, টালিগঞ্জের (Tollygunge) ছবির দুনিয়ায় বহু বছর ধরে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রায় একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে উঠেছে। অভিনয়জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সদ্য ৬৪ বছরে পা দিয়েছেন অভিনেতা। কিন্তু বয়স তাঁর কাজের গতি কমিয়ে দেয়নি। বরং এখনও বড়পর্দায় নিজেকে নতুন ভাবে হাজির করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এত ধরনের চরিত্র করার পর দর্শককে নতুন করে কী দেখানো যায়।

একটি জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যমকে একটি সাক্ষাৎকারে চরিত্র বাছাই নিয়ে কথা উঠতেই নিজের বর্তমান অবস্থার কথা বলতে গিয়ে প্রসেনজিৎ জানান, কাজটা তাঁর কাছে দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ, গত এক দশকেরও বেশি সময়ে নিজের অভিনয়ের ধরন তিনি বারবার বদলেছেন। একই ধরনের চরিত্রে আটকে না থেকে নানা ধরনের ভূমিকায় অভিনয় করার চেষ্টা করেছেন। ফলে নতুন চরিত্র হাতে এলে সেটির মধ্যে আগে না করা কিছু খুঁজে পাওয়াই এখন তাঁর অন্যতম চ্যালেঞ্জ। অভিনেতার কথায়, ‘খুবই কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে। সহজে আর এ রকম চরিত্র আসছে না, যা আগে করিনি। ভাঙাচোরারও তো একটা সীমা আছে। আর আলাদা কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না।’ তাঁর এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, নিজেকে বদলে দেওয়ার যে চেষ্টা তিনি গত কয়েক বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটি তাঁর কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন চরিত্র খুঁজে পাওয়া ক্রমশ কঠিন হচ্ছে।
প্রসেনজিতের অভিনয়জীবনের সাম্প্রতিক পর্বে এই পরিবর্তনের উদাহরণও রয়েছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে তাঁকে একেবারে ভিন্ন দুই ধরনের চরিত্রে দেখা যাচ্ছে। একদিকে রকস্টারের চরিত্র, অন্যদিকে চিকিৎসকের ভূমিকায় তিনি অভিনয় করেছেন। পর্দায় চরিত্র অনুযায়ী নিজের চেহারা, শরীরী ভাষা এবং অভিনয়ের ধরন বদলানোর এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু, সব ছবিতেই নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার পথে হাঁটতে চান না অভিনেতা। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক ছবিরও প্রয়োজন রয়েছে। দর্শকের বড় অংশের কাছে পৌঁছতে পারে, এমন ছবিও করতে হবে। সেই কারণেই বছরে অন্তত দু’টি ছবির ক্ষেত্রে তিনি বাণিজ্যিক দিকটিও মাথায় রাখার কথা ভাবেন। ‘কাকাবাবু’ (Kakababu) -এর মতো ছবি সেই জায়গায় পড়তে পারে বলেই তাঁর বক্তব্য। পাশাপাশি আরও এক বা দু’টি ছবিতে তিনি এমন চরিত্র করতে চান, যেখানে অভিনেতা প্রসেনজিৎকে অন্য ভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব।
এই ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, ‘সবটাই যদি অন্য প্রসেনজিৎ করতে যাই, তা হলে আমার চলবে কী করে?’ অর্থাৎ একদিকে পরীক্ষামূলক চরিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছা, অন্যদিকে দর্শকপ্রিয় ও বাণিজ্যিক ছবির প্রয়োজন,,দুই দিক সামলেই আগামী দিনের কাজ বাছতে চাইছেন তিনি। বড় অভিনয়জীবনের কারণে তাঁর কাছে আসা অধিকাংশ চিত্রনাট্যেই কোনও না কোনও নতুন উপাদান থাকে বলেও এই সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর কথায়, তাঁকে কেউ খুব সাধারণ চরিত্র নিয়ে আসেন না। পরিচালক ও প্রযোজকেরা এমন কিছু নিয়েই তাঁর কাছে আসেন, যেখানে অভিনেতা হিসেবে নতুন কিছু করার জায়গা রয়েছে। ফলে চরিত্র বাছাইয়ের সময় শুধু গল্প নয়, নিজের অভিনয়জীবনে সেই চরিত্রটির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এখনও তবে এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যেগুলি করার ইচ্ছা তাঁর বহু দিনের। বিশ্ব চলচ্চিত্রের কালজয়ী চরিত্রগুলির মধ্যে ‘দ্য গডফাদার’ (The Godfather) -এর মার্লন ব্র্যান্ডো (Marlon Brando) অভিনীত চরিত্রটি বিশেষ ভাবে তাঁর পছন্দ। ওই ধরনের কোনও চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘গডফাদারে মার্লন ব্র্যান্ডোর চরিত্রটা করার ইচ্ছা নিশ্চয়ই আছে।’ অর্থাৎ পুরনো ছবির চরিত্র হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়, বরং সেই মেজাজ বা ধাঁচের কোনও শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয়ের আকাঙ্ক্ষা এখনও রয়েছে তাঁর মধ্যে। আসলে, প্রসেনজিৎ মানেই একসময় বাংলা ছবির রোম্যান্টিক নায়ক, এই পরিচয়ও দীর্ঘদিন দর্শকের মনে গেঁথে ছিল। ‘অমরসঙ্গী’ (Amar Sangi) -এর মতো ছবিতে তাঁর প্রেমের চরিত্র দর্শকের কাছে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই সময়ের মতো একই ধরনের প্রেমের গল্পে বারবার ফিরতে চান না অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, প্রেমের চরিত্র করতে আপত্তি নেই, কিন্তু সেখানে নতুন কিছু থাকতে হবে। আগে যা করেছেন, সেটাই আবার করার মধ্যে তিনি আগ্রহ খুঁজে পান না।
এই প্রসঙ্গে ‘দৃষ্টিকোণ’ (Drishtikone)-এর কথাও উঠে এসেছে। প্রেম, সম্পর্ক ও মানুষের জটিল আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি সেই ছবিতে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তাই নতুন প্রেমের গল্প এলেও সেটিতে আগের কাজের পুনরাবৃত্তি নয়, অন্য রকম চরিত্র ও পরিস্থিতিকেই অভিনেতা খুঁজছেন। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘ডাক্তার কাকু’ (Doctor Kaku)-ও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। ছবিতে তাঁর চরিত্রটি আগের বহু কাজের থেকে আলাদা বলেই ছবিটির সঙ্গে নিজের বিশেষ সম্পর্কের কথা জানিয়েছেন অভিনেতা। একটি দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পরে কোনও চরিত্র তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে কি না, সেটিই এখন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শুধু নিজের চরিত্র বা অভিনয় নিয়েই এখন ভাবছেন না প্রসেনজিৎ। বাংলা ছবির দর্শকসংখ্যা এবং ছবি পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতিও তাঁর চিন্তার জায়গায় রয়েছে। বাংলা ছবিকে ঘিরে সমাজের একাংশে যে অভিযোগ শোনা যায়—নতুন ধরনের কাজ কম হচ্ছে—সেই আলোচনা তাঁর কানেও পৌঁছেছে। যদিও অভিনেতার নিজের মত, বাংলা ছবিতে বিভিন্ন ধরনের কাজ হচ্ছে। তাঁর মতে, অভিনেতা, পরিচালক এবং অন্যান্য কলাকুশলীরা নিজেদের জায়গা থেকে নতুন গল্প ও চরিত্র নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ছবি তৈরি হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বলে মনে করেন প্রসেনজিৎ। সেই ছবি দর্শকের কাছে কীভাবে পৌঁছবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শহরের মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকের পাশাপাশি সাধারণ সিনেমা হলের দর্শকদের কাছেও বাংলা ছবি পৌঁছনোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অভিনেতা। প্রসেনজিতের কথায়, ‘আমাদের যেমন মাল্টিপ্লেক্সে ছবি দেখাতে হবে, তেমনই যাঁরা এ সব জায়গায় যান না, তাঁদের কাছেও ছবি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ তাঁর মতে, একসময় বাংলা ছবির সাধারণ সিনেমা হলগুলিতে দর্শকের ভিড় থাকত। সেই দর্শকদের আবার হলমুখী করার বিষয়টিও ভাবা দরকার।
এখানেই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বর্তমান ভাবনার একটি বড় দিক সামনে আসে। একদিকে নিজের অভিনয়ের ক্ষেত্রে নতুন চরিত্রের সন্ধান, অন্যদিকে বাংলা ছবির বৃহত্তর দর্শকভিত্তি নিয়ে চিন্তা—দুই বিষয়ই এখন তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করার পরও থেমে যেতে চান না তিনি। বরং কী ভাবে নিজের অভিনয়ে আরও নতুন কিছু আনা যায় এবং বাংলা ছবিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই ভাবনাই চালিয়ে যাচ্ছেন। ৬৪ বছরে পা দিয়েও নতুন চরিত্রের খোঁজে থাকা প্রসেনজিতের কাছে তাই বয়স কোনও শেষরেখা নয়। বরং তাঁর বর্তমান লড়াই অন্য জায়গায়, নিজের করা চরিত্রগুলির পুনরাবৃত্তি না করে এমন কিছু খুঁজে পাওয়া, যা দর্শক আগে দেখেননি। তাঁর নিজের কথাতেই, ‘নিজেকে ভাঙাচোরারও তো একটা শেষ আছে।’ সেই সীমার মধ্যেই নতুন অভিনয়ের রাস্তা খুঁজে নেওয়াই এখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Elon Musk Partner Indian Origin | মাস্ক জানালেন তাঁর সঙ্গিনীর শিকড় ভারতে, ‘ইন্ডিয়ান অরিজিন’ পরিচয় ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে




