সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ জয়পুর : জেলের লোহার শিকের ভিতরেই গড়ে উঠেছিল সম্পর্ক। দু’জনেই খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত, দু’জনেরই সাজা যাবজ্জীবন। তবু সংশোধনাগারের জীবনেই জন্ম নিয়েছে প্রেম। সেই প্রেমের পরিণতিতেই এ বার বিয়ের সিদ্ধান্ত। রাজস্থানের (Rajasthan) জয়পুরের (Jaipur) একটি জেলে বন্দী থাকা যুগলকে বিয়ের জন্য ১৫ দিনের প্যারোলে মুক্তির অনুমতি দিল রাজস্থান হাই কোর্ট (Rajasthan High Court)। এই ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এল সংশোধনাগার ব্যবস্থার মানবিক দিক এবং বন্দীদের সামাজিক পুনর্বাসনের প্রশ্ন।
প্যারোলে মুক্তি পাওয়া ওই বন্দী যুগলের নাম প্রিয়া শেঠ (Priya Seth) এবং হনুমান প্রসাদ (Hanuman Prasad)। বয়স যথাক্রমে ৩১ এবং ২৯ বছর। উভয়েই ২০২৩ সালে পৃথক খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন এবং আদালতের নির্দেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। বর্তমানে তাঁরা জয়পুরের সাঙ্গানের (Sanganer) ‘ওপেন এয়ার’ জেলে বন্দী ছিলেন। সেই জেলেই একে অপরের সংস্পর্শে এসে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে।সংবাদ সংস্থা পিটিআই (PTI) সূত্রে খবর, রাজস্থান হাই কোর্ট গত ৭ জানুয়ারি ওই যুগলকে ১৫ দিনের জন্য প্যারোল মঞ্জুর করে। আদালতের নির্দেশ মেনে জয়পুর জেলা প্যারোল অ্যাডভাইজ়রি কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। তারপর গত বুধবারই জেল থেকে প্যারোলে মুক্তি পান প্রিয়া ও হনুমান। জানা গিয়েছে, শুক্রবারই তাঁদের বিয়ে হওয়ার কথা।

অন্য দিকে, হনুমান প্রসাদের মামলাটি আরও নৃশংস বলে আদালতে উঠে আসে। ২০১৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক মহিলার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল হনুমানের। সেই সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো মহিলার স্বামী, তাঁর তিন সন্তান এবং এক আত্মীয়কে খুন করা হয়। ওই মামলায় ২০২৩ সালে হনুমানকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। সেই থেকেই তিনি জয়পুরের জেলে বন্দী।
এই দুই ভয়াবহ অপরাধের আসামি কীভাবে একে অপরের কাছাকাছি এলেন, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে। জানা গিয়েছে, তাঁরা দু’জনেই জয়পুরের সাঙ্গানের ওপেন এয়ার জেলে বন্দী ছিলেন। রাজস্থানের অন্যান্য জেলের তুলনায় এই সংশোধনাগারের নিয়ম কিছুটা আলাদা। এখানে বন্দীদের ওপর কড়াকড়ি তুলনামূলক কম। সংশোধনের লক্ষ্যেই এই জেল চালু করা হয়েছে। উল্লেখ্য, রাজস্থান প্রিজ়নার্স ওপেন এয়ার ক্যাম্প রুলস, ১৯৭২ (Rajasthan Prisoners Open Air Camp Rules, 1972) অনুসারে এই ধরনের জেল পরিচালিত হয়। এখানে বাছাই করা বন্দীদের জেলের বাইরে কাজ করতে যাওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়। তবে দিনের কাজ শেষ করে সন্ধ্যার মধ্যে তাঁদের জেলে ফিরে আসতে হয়। প্রশাসনের মতে, এতে বন্দীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সমাজে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি গড়ে ওঠে।
সূত্রের দাবি, প্রায় এক বছর আগে প্রিয়া ও হনুমানকে সাধারণ জেল থেকে সাঙ্গানের ওপেন এয়ার জেলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা শুরু এবং ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। বন্দি জীবনের একঘেয়েমির মধ্যেই এই সম্পর্ক তাঁদের কাছে মানসিক ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে বলে অনুমান সংশোধনাগার সূত্রের। বিয়ের জন্য প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানিয়ে আদালতে জানানোর সময় ওই যুগল দাবি করে, তাঁরা দু’জনেই নিজেদের জীবনের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং নতুন করে জীবন শুরু করতে চান। আদালত সেই আবেদন বিবেচনা করেই প্যারোল মঞ্জুর করেছে বলে সূত্রের খবর। যদিও প্যারোলের সময় তাঁদের উপর একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নিয়ম ভাঙলে প্যারোল বাতিল হয়ে যেতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে বিতর্ক। একাংশের মতে, এত গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বন্দীদের এই ধরনের ছাড় দেওয়া ঠিক নয়। আবার অন্য অংশের বক্তব্য, সংশোধনাগারের মূল উদ্দেশ্যই হল বন্দীদের সংশোধন ও সমাজে ফেরার সুযোগ দেওয়া। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আদালতের এই সিদ্ধান্তকে মানবিক বলেই মনে করছেন অনেকে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারোল বন্দীর অধিকার নয়, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত মানবিক দিক বিবেচনা করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিয়ে, পরিবারের গুরুতর অসুস্থতা বা শেষকৃত্যের মতো কারণকে সাধারণত প্যারোলের যুক্তিসঙ্গত কারণ হিসেবে দেখা হয়। প্রসঙ্গত, জেলের ভিতরে গড়ে ওঠা এই প্রেম এবং বিয়ের জন্য প্যারোলে মুক্তির ঘটনা একদিকে যেমন মানবিক অনুভূতির গল্প, তেমনই অন্য দিকে গুরুতর অপরাধ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকেও সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে। সংশোধন, শাস্তি এবং পুনর্বাসনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাল।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Second Marriage, Indian Judiciary | ডিভোর্স না দিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে মানেই নিষ্ঠুরতা, নাবালক সন্তানের হেফাজতেও অধিকার হারালেন বাবা, গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাইকোর্টের




