places to visit in Sasaram, Bihar travel destination | ইতিহাসের বুকছোঁয়া ডাক প্রকৃতির ছোঁয়া, উইকেন্ডে ঘুরে আসুন বিহারের লুকোনো রত্ন সাসারাম

SHARE:

মেধা পাল ★সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : নিত্যদিনের ব্যস্ততা, অফিসের চাপ আর শহুরে কোলাহল থেকে কয়েকটা দিনের ছুটি মানেই মাথার ভিতর একটাই প্রশ্ন, কোথায় গেলে ইতিহাস, প্রকৃতি আর শান্তি একসঙ্গে পাওয়া যাবে? সেই উত্তর খুঁজতেই অনেকের চোখ এড়িয়ে যায় বিহারের সাসারাম (Sasaram)। অথচ ইতিহাসের পাতায় এই শহরের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনই প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগও এখানে ভরপুর। পাহাড়, জলপ্রপাত, প্রাচীন দুর্গ আর স্থাপত্যের সৌন্দর্য সব নিয়ে উইকেন্ড ভ্রমণের জন্য সাসারাম হয়ে উঠতে পারে আদর্শ গন্তব্য।বিহারের রোহতাস জেলার এই শহরটি শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়, তা ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। শূর বংশের উত্থান, মুঘল শাসনের লড়াই এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের নানা অধ্যায় ছড়িয়ে রয়েছে সাসারামের আনাচে-কানাচে। সেই ইতিহাসের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে প্রকৃতির সৌন্দর্য, যা আধুনিক পর্যটকদের মন জয় করতে বাধ্য।

আরও পড়ুন : Travelog : Mathura Vrindavan boat ride | মথুরা বৃন্দাবনের যমুনা ঘাটে নৌকা ভ্রমণ যেন স্বর্গীয় শান্তির স্পর্শ

আবার, সাসারামের নাম উঠলেই প্রথমেই মনে আসে শূর বংশের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ সুরি (Sher Shah Suri)। ভারতের ইতিহাসে প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য যাঁর নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। চৌসা ও কনৌজের যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে তিনি উত্তর ভারতের ক্ষমতা দখল করেছিলেন। সেই শাসকের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই সাসারামে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সমাধি। বিশাল কৃত্রিম জলাধারের মাঝখানে নির্মিত লাল বেলেপাথরের এই সমাধি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। প্রায় ১২২ ফুট উঁচু এই সৌধের চারপাশে জল আর প্রতিফলিত আকাশের দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বহু ঐতিহাসিকের মতে, এই সমাধির নকশাতেই পরবর্তীকালে মুঘল স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের পাশাপাশি সাসারামের ধর্মীয় দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিন্ধ্য পর্বতমালার কৈমুর পাহাড়ের কোলে অবস্থিত তারা চণ্ডী পাহাড় (Tara Chandi Hill) স্থানীয়দের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান। প্রাকৃতিক গুহার মধ্যে চার হাত বিশিষ্ট মা তারার মূর্তি দর্শনে প্রতি বছর হাজার হাজার ভক্ত আসেন। দশেরা ও দীপাবলির সময়ে এই মন্দির প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে উৎসবের আলোয়। পাহাড়ি পথে উঠতে উঠতে একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক শান্তি অনুভব করা যায়, তেমনই চোখ জুড়িয়ে যায় চারপাশের সবুজে। সাসারাম ভ্রমণের আর একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল রোহতাসগড় দুর্গ (Rohtasgarh Fort)। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত এই দুর্গটি শহর থেকে প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দূরে শোন নদীর উপত্যকায়, কৈমুর পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। লোককথা অনুযায়ী, রাজা হরিশচন্দ্র তাঁর পুত্রের স্মরণে এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। পরে মুঘল আমলে বাংলা ও বিহারের সুবেদার রাজা মান সিংহ (Raja Man Singh) এটিকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন। দুর্গের বিশাল ফটক, প্রাচীন জলাধার এবং বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ আজও দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে দূরের সবুজ উপত্যকার দিকে তাকালে সময় যেন থমকে যায়।

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সাসারামে রয়েছে ইন্দ্রপুরী বাঁধ (Indrapuri Barrage)। শোন নদীর উপর নির্মিত এই বিশাল বাঁধটি স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। বর্ষার পরে নদীর জলস্তর কমে গেলে বাঁধ সংলগ্ন এলাকা ছোট দ্বীপের মতো দেখায়। নিরিবিলি পরিবেশে নদীর হাওয়া আর সূর্যাস্তের রং উপভোগ করতে চাইলে এই জায়গাটি আদর্শ। যাঁরা পাহাড় আর জলপ্রপাত ভালবাসেন, তাঁদের জন্য তুত্রাহি জলপ্রপাত (Tutrahi Waterfall) বিশেষ আকর্ষণ। চারপাশে সবুজ পাহাড় আর শীতকালে রঙিন ছোট ছোট ফুলে ঢাকা এই অঞ্চল প্রকৃতির অপূর্ব রূপ তুলে ধরে। খিলান আকৃতির পাহাড়ে ঘেরা হওয়ায় এখানে শীত খুব বেশি পড়ে না। ভাগ্য ভাল হলে আশেপাশে হনুমান, হরিণ বা কাঠবিড়ালির মতো বন্যপ্রাণীর দেখা মিলতে পারে, যা ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

যাতায়াতের দিক থেকেও সাসারাম যথেষ্ট সুবিধাজনক। সাসারাম রেলওয়ে স্টেশন (Sasaram Railway Station) পূর্ব মধ্য রেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন। কলকাতা, দিল্লি, পটনা কিংবা বারাণসী থেকে সরাসরি ট্রেন পাওয়া যায়। কলকাতা থেকে ট্রেনে পৌঁছতে সময় লাগে আনুমানিক ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। বিমানে যেতে চাইলে নিকটতম বিমানবন্দর পটনা (Patna Airport)। সেখান থেকে গাড়ি বা ট্রেনে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাসারাম পৌঁছনো যায়। থাকার ব্যবস্থাও এখানে বেশ সহজলভ্য। শহরে বিভিন্ন মান ও দামের হোটেল রয়েছে। বাজেট হোটেল থেকে মাঝারি মানের আবাস, নিজের সাধ্য ও পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে ছোট রেস্তোরাঁ ও ধাবাগুলিও ঘুরে দেখা যেতে পারে। কিন্তু, ইতিহাসের গল্প শোনা, প্রাচীন স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করা আর প্রকৃতির শান্তিতে নিজেকে কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে দিতে চাইলে সাসারাম নিঃসন্দেহে একটি আদর্শ উইকেন্ড ট্রাভেল ডেস্টিনেশন। খুব দূরে নয়, আবার একেবারে চেনা পথেরও বাইরে, ঠিক এই কারণেই সাসারাম হয়ে উঠতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের ঠিকানা।

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mussoorie registration, QR Code Travel India, Uttarakhand travel update | মুসৌরি ঘুরতে গেলে লাগবে প্রি-রেজিস্ট্রেশন, চালু নতুন কড়া নিয়মাবলি: ভ্রমণকারীদের জন্য জরুরি নির্দেশিকা

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন