সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল গুজরাটের সাণন্দে। ‘কেনস টেকনোলজি’ সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্টের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) দেশের শিল্পোন্নয়ন, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্রভাই প্যাটেল (Bhupendra Bhai Patel), উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সংঘভি (Harsh Sanghvi), কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সাণন্দের দ্রুত শিল্পোন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘গত মাসের শেষ দিনেও আমি সাণন্দে ছিলাম, আর এই মাসের শেষ দিনেও এখানে আছি। ২৮ ফেব্রুয়ারি মাইক্রনের প্ল্যান্টে উৎপাদন শুরু হয়েছে, আর আজ কেনস টেকনোলজির সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্টে উৎপাদন শুরু হল।’ তাঁর মতে, এই ধারাবাহিকতা কেবল কাকতালীয় নয়, বরং ভারতের সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমের দ্রুত বিকাশের প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের নিজস্ব সংস্থা যখন সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে আগ্রহ দেখায় এবং তা বাস্তবায়িত হয়, তখন তা গোটা দেশের জন্য গর্বের মুহূর্ত।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, কেনস এখন বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও বিস্তৃত হবে। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া, মেক ফর দ্য ওয়ার্ল্ড’ নীতির বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক বাজারে নির্ভরযোগ্য সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, সাণন্দে তৈরি হওয়া ইন্টেলিজেন্ট পাওয়ার মডিউল (Intelligent Power Modules) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলিতে রপ্তানি হবে এবং সেখান থেকে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘একভাবে সাণন্দ এবং সিলিকন ভ্যালির মধ্যে একটি নতুন সেতু তৈরি হয়েছে।’ এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্র এখন আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মানচিত্রে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি জানান, এই প্ল্যান্টে তৈরি পণ্যগুলি ইলেকট্রিক ভেহিকল, ভারী শিল্প এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্পক্ষেত্রে নতুন গতি আনবে। পাশাপাশি, এই ধরনের উদ্যোগ বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্যান্ডেমিক এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিতে ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশের এগিয়ে আসা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সরকার ২০২১ সালে ‘ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন’ (India Semiconductor Mission) চালু করে, যার লক্ষ্য দেশের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে স্বনির্ভরতা গড়ে তোলা। প্রধানমন্ত্রী জানান, এই মিশনের আওতায় ইতিমধ্যে দেশের ছয়টি রাজ্যে প্রায় ১.৬ লক্ষ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্পে কাজ চলছে। কেনস এবং মাইক্রনের প্রকল্পও তার অংশ। তাঁর কথায়, ‘সেমিকন্ডাক্টরে আত্মনির্ভরতা মানে শুধু চিপ তৈরি নয়, বরং এআই, ইলেকট্রিক ভেহিকল, ক্লিন এনার্জি, প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক্সসহ একাধিক ক্ষেত্রে শক্তি বৃদ্ধি।’ এই প্রসঙ্গে ‘ধ্রুব সিক্সটি ফোর’ (Dhruva Sixty Four) মাইক্রোপ্রসেসরের কথাও উল্লেখ করেন তিনি, যা দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ইতিমধ্যে ‘ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০’ ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জাম ও উপকরণ উৎপাদনে জোর দেওয়া হবে। লক্ষ্য হল একটি পূর্ণাঙ্গ দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম তৈরি করা।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশে প্রায় ৮৫ হাজার ডিজাইন প্রফেশনাল তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।’ পাশাপাশি ‘চিপস টু স্টার্টআপ’ (Chips to Startup) কর্মসূচির মাধ্যমে ৪০০-র বেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টার্টআপকে আধুনিক ডিজাইন টুলস দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ইতিমধ্যে ৫৫টিরও বেশি চিপ ডিজাইন করা হয়েছে। বর্তমানে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর বাজার প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এবং এই দশকের শেষে তা ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলে ধারণা। এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতে এই খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আমাদের বড় শক্তি।’ ক্রিটিক্যাল মিনারেলস এবং রেয়ার আর্থ উপাদানের প্রসঙ্গে তিনি জানান, সরকার ইতিমধ্যে ‘ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেলস মিশন’ (National Critical Minerals Mission) চালু করেছে। পাশাপাশি উপকূলীয় রাজ্যগুলিকে যুক্ত করে একটি ‘রেয়ার আর্থ করিডোর’ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যা খনি থেকে উৎপাদন পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দশক শুধু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সময় নয়, প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সময়।’ তিনি এই সময়কে ‘ভারতের টেক ডেকেড’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিতে ভারতের অগ্রগতি আগামী দিনে দেশের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
ডিজিটাল ইন্ডিয়া, ফিনটেক এবং স্পেস সেক্টরে উন্নয়নের কথাও তিনি তুলে ধরেন। স্পেস সেক্টরে বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং নিউক্লিয়ার শক্তির বিস্তার নিয়ে সরকারের পদক্ষেপগুলিও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথায়, ‘কেনসের এই প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত পণ্য ভারতকে বিশ্বের উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ তাঁর বক্তব্যে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নির্ভর ভারতের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশ উঠে আসে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi | বিধানসভা ভোটের আগে ‘আমার প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী’ খোলা চিঠিতে তোপ নরেন্দ্র মোদীর, ভুয়ো ভোটার-তোষণ-সিএএ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর




