সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ রাজগীর : বিহারের রাজগিরে অবস্থিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Nalanda University) সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু (Droupadi Murmu) দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, ঐতিহ্য ও বৈশ্বিক সংযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন। মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে নালন্দার ঐতিহ্য ও আধুনিক শিক্ষার সংযোগ এক নতুন মাত্রা পেল। রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই সমাবর্তনকে এক ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আজকের এই সমাবর্তন অনুষ্ঠান আমাদের সেই অঙ্গীকারের কথা মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞান টিকে থাকবে, আলোচনা চলবে এবং শিক্ষা মানবকল্যাণে কাজ করবে।’ তিনি স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তাদের সাফল্য অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা ও বৌদ্ধিক নিষ্ঠার ফল।
আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার
এই বছরের সমাবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ। রাষ্ট্রপতি জানান, ‘আজকের স্নাতক ব্যাচের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ৩০টির বেশি দেশ থেকে এসেছে।’ এর ফলে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে, তা আরও একবার প্রতিফলিত হয়েছে। প্রাচীন নালন্দার ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় আট শতাব্দী ধরে জ্ঞানের এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এর পতন শুধু ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য এক বিরাট ক্ষতি ছিল। তিনি বলেন, ‘নালন্দার পতন ছিল একটি বড় ক্ষতি, কিন্তু তার ধারণা কখনও মুছে যায়নি।’ আধুনিক যুগে নালন্দার পুনর্জাগরণ সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস বলেই তিনি উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, এই পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়েছে সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব, ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠানগত প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন দেশের সহযোগিতার মাধ্যমে। তাঁর মতে, ‘যখন বিভিন্ন দেশ অভিন্ন মূল্যবোধ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে, তখন বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়।’ এই মন্তব্যে নালন্দার আন্তর্জাতিক চরিত্রের গুরুত্ব ফুটে ওঠে। তিনি প্রাচীন নালন্দার শিক্ষা পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে বলেন, ‘প্রাচীন নালন্দা বিভিন্ন মতাদর্শকে স্বাগত জানাত এবং বিতর্ক ও সংলাপের একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সেখানে জ্ঞান কখনও বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হত না, বরং তা সমাজ, নৈতিকতা এবং মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বর্তমান বিশ্বের জটিল পরিস্থিতির প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, আজকের সময়ে স্বাধীন ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি। তাঁর মতে, মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাধারাই ভবিষ্যতের পথ দেখাতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়া ও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলবে। বৌদ্ধ দর্শন এবং ভারতের ঐতিহ্যের সংযোগ নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ভারতের সঙ্গে বৌদ্ধ দর্শনের সম্পর্ক গভীর এবং তা আজও জীবন্ত। তিনি বলেন, ‘এই সংযোগকে গুরুত্ব সহকারে লালন করতে হবে এবং ভারতের প্রাচীন জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে।’ একইসঙ্গে তিনি জানান, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের বৌদ্ধ অধ্যয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই ক্ষেত্রে আরও বিনিয়োগ ও মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে নালন্দা আবার সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারবে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বকে প্রভাবিত করেছিল। প্রাচীন নালন্দার গ্রন্থাগারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সেখানে লক্ষ লক্ষ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। তিনি বলেন, ‘সেই উচ্চ মানদণ্ডকে সামনে রেখে আমরা আজ যা গড়ে তুলছি, তা ভবিষ্যতের জন্য এক স্থায়ী উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।’ এই মন্তব্যে বর্তমান নালন্দার অবকাঠামো ও জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তোলার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে।
ভারতের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েও রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘২০৪৭ সালের মধ্যে ভারত যখন একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার দিকে এগোচ্ছে, তখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ শিক্ষা, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনে নালন্দা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে এই বক্তব্য গভীর প্রভাব ফেলে। নালন্দার ঐতিহ্য ও আধুনিক শিক্ষার সংযোগ যে ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন দিশা দেখাতে পারে, সেই ধারণাই এই সমাবর্তনের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমাবর্তন অনুষ্ঠান ভারতের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য এবং আধুনিক শিক্ষার এক মিলনস্থল হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য সেই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সুদৃঢ় দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Assam Visit 2026 | অসমে উন্নয়নের মেগা ঝড়! ৪৭,৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, উত্তর-পূর্বে রেল-সড়ক-গ্যাস অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত



