সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নতুন অর্থবর্ষ ২০২৬-২৭ শুরুর প্রাক্কালে প্রশাসনিক গতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল নবান্ন (Nabanna)। ‘ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট’ (Vote on Account) ভিত্তিতে বিভিন্ন দফতরে আংশিক তহবিল ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে রাজ্য সরকার। অর্থ দফতর (Finance Department) -এর জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী অর্থবর্ষের প্রথম চার মাসের জন্য নির্দিষ্ট হারে বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয়ের অনুমতি মিলেছে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ (Lakshmir Bhandar) ও ‘জয় বাংলা’ (Jai Bangla) -এর মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প। রাজ্য প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্পগুলির জন্য মোট বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ছাড় করা যাবে। তবে মাসিক ব্যয় বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সরকারি স্তরে বলা হয়েছে, ‘অর্থবর্ষের শুরুতে প্রশাসনিক কাজ যাতে থমকে না যায়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা।’
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ এই সিদ্ধান্তে নতুন করে গুরুত্ব পেল। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী বাজেটে এই প্রকল্পে আর্থিক বৃদ্ধি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী সাধারণ শ্রেণির মহিলাদের মাসিক ভাতা ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে তফসিলি জাতি ও উপজাতি শ্রেণির মহিলাদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ১২০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭০০ টাকা। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকেই এই বর্ধিত ভাতা কার্যকর হয়েছে। ফলে ইতিমধ্যেই উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বাড়তি টাকা পৌঁছতে শুরু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের কয়েক কোটি মহিলা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। প্রশাসনের একজন আধিকারিকের কথায়, ‘মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যে নিম্ন আয়ের পরিবারের মহিলাদের আর্থিক সহায়তা জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের জন্য প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এই প্রকল্পের বিস্তার ও গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ রাজ্যের অন্যতম প্রধান আর্থিক প্রতিশ্রুতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, আরআইডিএফ (RIDF বা Rural Infrastructure Development Fund) সংক্রান্ত প্রকল্পগুলির জন্য ২৫ শতাংশ পর্যন্ত তহবিল ছাড়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন (ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ (West Bengal Appropriation Vote on Account Act, 2026) -এর ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। রাজ্যপালের অনুমোদনের পর এই আইন কার্যকর হয়েছে এবং ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে তা বলবৎ হবে। প্রশাসনিক ব্যয়ের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। বেতন, মজুরি, হাসপাতালের খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ভাড়া ও কর এই সমস্ত, প্রয়োজনীয় খাতে মোট বার্ষিক বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ খরচ করা যাবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের স্কলারশিপ ও স্টাইপেন্ডের ক্ষেত্রেও একই সীমা প্রযোজ্য থাকবে।
বেতন-বহির্ভূত খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত তহবিল ছাড়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার খাতকে এই সীমার বাইরে রাখা হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। পাবলিক সেক্টর ইউনিটগুলির কর্মীদের বেতন ও মজুরি মেটাতে ‘লোনস অ্যান্ড অ্যাডভান্সেস’ (Loans and Advances) খাত থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যবহার করা যাবে। একইভাবে পরিবহণ দফতরের অধীনে কর্মরত কর্মীদের বেতন, পেনশন এবং অবসরকালীন সুবিধা নিশ্চিত করতেও নির্দিষ্ট বরাদ্দ থেকে তহবিল ছাড়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রেও কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের নিজস্ব প্রকল্পগুলিতে মোট বরাদ্দের ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ খরচ করা যাবে। তবে কেন্দ্রীয় সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প বা কেন্দ্রীয় স্পনসরড স্কিমের ক্ষেত্রে অর্থ দফতরের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অর্থ দফতর নির্দেশ দিয়েছে, ‘প্রতিটি ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মেমো নম্বর উল্লেখ করতে হবে এবং নির্ধারিত আর্থিক বিধি মেনেই তহবিল ব্যবহার করতে হবে।’ অর্থাৎ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবর্ষের শুরুতে এই আংশিক তহবিল ছাড় প্রশাসনিক কাজকর্ম সচল রাখা এবং জনপরিষেবা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি পড়বে। রাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে সামাজিক প্রকল্পগুলিকে কেন্দ্র করে সরকারের অগ্রাধিকারকেও সামনে আনছে। ফলে নতুন অর্থবর্ষের সূচনাতেই নবান্নের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুই ক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PLI Scheme India investment employment | পিএলআই প্রকল্পে ২.১৬ লক্ষ কোটি বিনিয়োগ, ১৪ লক্ষ কর্মসংস্থান, মেক ইন ইন্ডিয়ার বড় সাফল্য




