তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ : গ্রীষ্মকাল মানেই আমের (Mango) মৌসুম। পাকা আমের মিষ্টি গন্ধ, রসালো স্বাদ আর রঙের উজ্জ্বলতা যেন পুরো গরমকালটাকে রাঙিয়ে তোলে। কিন্তু এই প্রিয় ফলও হতে পারে শরীরের জন্য বিপদের কারণ, যদি না মেপে খাওয়া হয়। রসনার আনন্দে বুঁদ হয়ে আমরা ভুলে যাই, ‘যতই মধু, বেশি খেলেই বিষ’। চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ ও আয়ুর্বেদের মতে, অতিরিক্ত আম খাওয়ার অতিরিক্ত অভ্যাসও ডেকে আনতে পারে একাধিক শারীরিক সমস্যা। পুষ্টিবিদ দ্বৈপায়ন মুখোপাধ্যায় (Dwaipayan Mukherjee) বলেন, “পাকা আমে ফ্রুক্টোজ থাকে প্রচুর। এটি প্রাকৃতিক হলেও, ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ক্ষেত্রে ফ্রুক্টোজও বিপজ্জনক হতে পারে।” বিশেষ করে যাঁরা আগে থেকেই রক্তে শর্করার সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আম একেবারেই পরামর্শযোগ্য নয়।

আমে রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক চিনি ও ক্যালোরি। সাধারণত একটি মাঝারি আকারের আমে প্রায় ১৫০–২০০ ক্যালোরি থাকে। অতএব, দিনে তিন-চারটি আম খাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় একবেলা ভাতের সমান ক্যালোরি গ্রহণ করা। চিকিৎসক সায়ন্তনী লাহা (Sayantani Laha) জানাচ্ছেন, “আমের মধ্যে থাকা ক্যালোরি খুব তাড়াতাড়ি ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। নিয়মিত অতিরিক্ত খেলে ওজন বাড়তে বাধ্য।” বিশেষত, ওজন কমানোর চেষ্টায় থাকা মানুষের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে একটি অবাঞ্ছিত প্রতিবন্ধকতা। শুধু ওজন বা চিনি নয়। হজমের দিক থেকেও বেশি আম খাওয়াটা যথেষ্ট সমস্যাজনক। অনেকে সকালে খালি পেটে আম খান, কেউ আবার ভরপেট খাওয়ার পর। দু’টোই বিপজ্জনক। অতিরিক্ত ফাইবার ও অ্যাসিডিক প্রকৃতির কারণে হতে পারে অম্বল, গ্যাস্ট্রিক, বা এমনকী ডায়রিয়া পর্যন্ত। “অনেক সময় মানুষ একসঙ্গে তিন-চারটে আম খেয়ে ফেলেন। এরপর পেট ভার, ফাঁপা ভাব, বা গ্যাসের অভিযোগ করেন। আসলে, হজমের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়,” জানালেন আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ ড. রূপাঞ্জনা মিত্র (Dr. Rupanjana Mitra)।

এখানেই শেষ নয়। আয়ুর্বেদ মতে, আম একটি ‘উষ্ণ প্রকৃতির’ ফল। অর্থাৎ, শরীরে গরমের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই অতিরিক্ত আম খাওয়ার ফলে গায়ে ফোঁড়া, চুলকানি, নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা এমনকী গরম লেগে মাথা ঘোরার মতো সমস্যাও হতে পারে। গ্রীষ্মকালে এমনিতেই শরীরের মধ্যে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়। তার ওপর আমের মতো উষ্ণ প্রকৃতির ফল সেই সমস্যাকে দ্বিগুণ করে তোলে। আর এক ভয়ঙ্কর দিক হল, রাসায়নিক দিয়ে পাকানো আম। বাজারে এখনও অনেক জায়গায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করে আম পাকানো হয়, যা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এই রাসায়নিক বিষ মূলত পাকস্থলীর ক্ষতি করে, মাথাব্যথা, বমি ভাব, এমনকী দীর্ঘদিন খেলে ক্যানসারের সম্ভাবনাও বাড়াতে পারে। চিকিৎসক অঞ্জন সেনগুপ্ত (Anjan Sengupta) বলেন, “কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো আম খেলে শুধু স্বাদ নষ্ট হয় না। দেহেও তার ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া হয়। এটি একপ্রকার ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ার মতো।” তবে তাই বলে কি আম একেবারেই বাদ? একেবারেই না। বরং কিছু নিয়ম মানলে আম খাওয়াও হতে পারে উপকারী। দিনে একটি বা বড়জোর দু’টি মাঝারি আকারের আমই যথেষ্ট। খাওয়ার আগে অন্তত এক ঘণ্টা ঠান্ডা জলে ভিজিয়ে রাখা উচিত, এতে আমের উষ্ণতা কিছুটা কমে যায়। আর খালি পেটে বা ভরপেট খাওয়া একেবারেই নয়। খাওয়ার ঠিক আগে বা পরেও না খাওয়াই ভাল। ডায়াবেটিসের রোগীদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সুস্থ ডায়েট বা ওজন নিয়ন্ত্রণের দিক দিয়ে ভাবলে। আমের বিকল্পও তৈরি করা যায়।

যেমন গ্রীন ম্যাঙ্গো (Green Mango) স্মুদি, আমের সঙ্গে ওটস মিশিয়ে হালকা ব্রেকফাস্ট, বা গ্রিলড চিকেন স্যালাডে আমের কিউব। “ডায়েট ঠিক রেখে মেপে আম খেলেও স্বাদ ও উপকার দু’টোই পাওয়া যায়,” বলছেন নিউট্রিশনিস্ট শ্রেয়া দত্ত (Shreya Dutta)। শেষ কথা হল, আম আমাদের বাঙালির আবেগ, গ্রীষ্মকালীন প্রেম। তবে সেই প্রেম যেন না হয়ে দাঁড়ায় শরীরের সঙ্গে প্রতারণা। ভালবাসার মতো ফলকে ভালোবাসুন বটে। কিন্তু বুঝে-শুনে, মেপে মেপে। যেন ‘আমে দোষ নেই, দোষ অতিভোজনে’ এই প্রবাদই সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। “আমে স্বাদ আছে, শক্তিও আছে, কিন্তু পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ না রাখলে বিপদও আছে,” এই কথাটি মনে রাখলেই আম খাওয়ার আনন্দেও থাকবে স্বাদ, আর শরীরেও থাকবে স্বস্তি।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Jackfruit : শরীরে বিপদ ডেকে আনতে পারে অতিরিক্ত কাঁঠাল, সতর্ক করছেন পুষ্টিবিদরা




