Jhorer Porer Din review, Haripal Natyapraharir play | ‘ঝড়ের পরের দিন’: মানবতার মর্মস্পর্শী সুরে ভেসে ওঠা হরিপাল নাট্যপ্রহরীর নতুন মঞ্চসফল প্রযোজনা

SHARE:

সৌমিত্র বসু রচিত ও পুলক রায় নির্দেশিত হরিপাল নাট্যপ্রহরীর “ঝড়ের পরের দিন” নাটক দর্শকের মনে জাগিয়েছে ভালবাসা ও আশার বার্তা। দোয়েল পাখির প্রতীকে প্রকৃতি, সম্পর্ক ও মানবতার গল্প। A poetic review of “Jhorer Porer Din,” written by Soumitra Basu and directed by Pulak Roy. The Haripal Natyapraharir play touches hearts with its message of nature, love, and rebirth.

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ঝড় কেবল গাছ ভাঙে না, ভাঙে মানুষের ভেতরকার শান্তি, সম্পর্কের শেকড়, আর প্রকৃতির প্রতি বিশ্বাস। কিন্তু এই ভাঙনের মধ্যেই যদি জন্ম নেয় ভালবাসা, করুণা আর একতার গান, তবে তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত কাব্য। ঠিক এই আবেগেই জেগে উঠল ‘হরিপাল নাট্যপ্রহরী’ -এর (Haripal Natyapraharir নতুন প্রযোজনা ‘ঝড়ের পরের দিন’ (Jhorer Porer Din)। নাটকটি রচনা করেছেন সৌমিত্র বসু (Soumitra Basu) এবং নির্দেশনা দিয়েছেন পুলক রায় (Pulak Roy)।

নাটকের শেষে দোয়েল পাখির প্রত্যাবর্তন প্রকৃতির পুনর্জীবনই নয়, মানুষের ভেতরের আশার পুনর্জন্ম। ঝড়ে ভাঙা ডাল যেমন নতুন কুঁড়ি মেলে, তেমনই সম্পর্কের ভাঙন থেকেও জন্ম নিতে পারে ভালবাসার নতুন ভাষা। আসলে, ‘ঝড়ের পরের দিন’ এক অর্থে এক সার্বজনীন বার্তা দেয় প্রকৃতি আমাদের থেকে আলাদা নয়, আমরা তারই অংশ। তাই গাছ হারালে, পাখি হারালে, আমরা নিজের এক অংশকেই হারাই। নাটকটি সেই হারানোর ব্যথা থেকে ফেরার এক নিরাময়যাত্রা।

‘ঝড়ের পরের দিন’ নাটকটি যেন প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক দার্শনিক কাব্য। হরিপালের আশ্রমিক প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ‘শারদ নাট্য উৎসব ২০২৫’ (Sharad Natya Utsav 2025) -এ এই নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে প্রশংসার ঢেউ উঠেছে। নাটকটি দর্শককে কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে এবং শেষে এক নরম প্রত্যাশার আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে মন।

আরও পড়ুন : richest village in the world, Madhapar Gujarat | ভারতের মাটিতেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গ্রাম গুজরাটের মধপরের অবিশ্বাস্য গল্প

নাটকের শুরুতেই এক বিধ্বংসী ঝড়ের পরের নিঃস্তব্ধ সকাল। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাছের ডাল, ভাঙা বাসা, আর মানুষের ক্লান্ত চোখে ঝড়ের দাগ। এই পটভূমিতে প্রবেশ করেন তিন বৃদ্ধ। তাদের মধ্যে প্রথম বৃদ্ধের চিৎকারে যেন ধ্বনিত হয় প্রকৃতির ক্রন্দন। তারপর ছাদে উঠে আসে আরও দু’জন। তিনজনের কথার লড়াই ধীরে ধীরে রূপ নেয় মর্মস্পর্শী সংলাপে।
দোয়েল পাখির (Doel Bird) হারিয়ে যাওয়া, গাছের পতন, আর প্রকৃতির শূন্যতা- সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক গভীর আবহ। নাট্যকার সৌমিত্র বসু এখানে দোয়েলকে শুধু একটি পাখি হিসেবে নয়, তা ভালবাসা, আশা আর মানবিকতার দিক নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। দর্শক যখন শোনে, ‘গাছ যারই হোক, ছায়া সবার; পাখির গান সবার, ভালবাসাও সবার’ তখন সংলাপটি কেবল নাটকের নয়, জীবনেরই একটি মন্ত্র হয়ে ওঠে।

সৌমিত্র বসু রচিত ও পুলক রায় নির্দেশিত হরিপাল নাট্যপ্রহরীর “ঝড়ের পরের দিন” নাটক দর্শকের মনে জাগিয়েছে ভালবাসা ও আশার বার্তা। দোয়েল পাখির প্রতীকে প্রকৃতি, সম্পর্ক ও মানবতার গল্প।A poetic review of “Jhorer Porer Din,” written by Soumitra Basu and directed by Pulak Roy. The Haripal Natyapraharir play touches hearts with its message of nature, love, and rebirth.
‘ঝড়ের পরের দিন’ নাটকের একটি দৃশ্য।

নাটকের ভাষা কবিতার মতো তরল, সংলাপগুলো একে অপরকে জড়িয়ে তৈরি করেছে এক মায়াবী প্রবাহ। তিন বৃদ্ধের কথার ভেতর দিয়ে ফুটে ওঠে তাদের একাকীত্ব, ক্ষয়, এবং জীবনের প্রতি মমতা। এক পর্যায়ে তারা সিদ্ধান্ত নেন, দোয়েল পাখির স্মৃতিতে তারা রাত জেগে থাকবে। সেই দৃশ্যে আলো, সঙ্গীত আর নিস্তব্ধতার মিশেলে যে জাদু তৈরি হয়, তা দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়।একজন বৃদ্ধের সংলাপ, ‘এই যে ঝড়ের মার খেয়েও কেমন খাড়া দাঁড়িয়ে আছে আমাদের গাছটা, জ্যোৎস্নায় ঝিলমিল করছে, দোয়েলরা ফিরে এসেছে। রাত জেগে আমরা দেখি, শুনি যতক্ষণ পারি।’ এই সংলাপ জীবনের প্রতি এক অদম্য ভালবাসার প্রকাশ। আরেক বৃদ্ধ বলেন, ‘এতদিন তো ছাদে ছাদে কথা হয়েছে আমাদের, এই গাছ আর পাখি নিয়ে। আজ আমরা গাছতলায় পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁষি দাঁড়িয়ে। আসুন, হাতে হাত রেখে আমরা সময়টাকে সেলিব্রেট করি।’ এই কথাগুলো কেবল চরিত্রদের নয়, এ যেন আজকের সমাজের এক প্রার্থনা, এক অঙ্গীকার: ভাঙনের পরেও আমরা এক হবো, হাত ধরব, ভালবাসব।

আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ আঠেরো-তম কিস্তি)

অভিনয়ে ছিলেন হরিপাল নাট্যপ্রহরীর বর্ষীয়ান শিল্পী আভাষ কুমার বসু (Abhas Kumar Basu), সুমন রায় (Suman Roy) এবং পুলক রায় (Pulak Roy)। তিনজনের মধ্যে রসায়ন, সংযত সংলাপবিন্যাস, আর দেহভঙ্গির সূক্ষ্মতা নাটকটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে আভাষ বসুর গলার স্বর ও থামার মুহূর্তগুলো দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছে। নির্দেশক পুলক রায় নাট্য মঞ্চের প্রতিটি ফ্রেমে প্রকৃতিকে চরিত্রে পরিণত করেছেন। আলো ও ছায়ার বিন্যাস, পাখির ডাকের সাউন্ড ডিজাইন, এবং গাছের প্রতীকী ব্যবহার নাটকটিকে বাস্তবের সঙ্গে এক আশ্চর্য কবিতার মতো জুড়ে দিয়েছে।

নাটকের শেষে দোয়েল পাখির প্রত্যাবর্তন প্রকৃতির পুনর্জীবনই নয়, মানুষের ভেতরের আশার পুনর্জন্ম। ঝড়ে ভাঙা ডাল যেমন নতুন কুঁড়ি মেলে, তেমনই সম্পর্কের ভাঙন থেকেও জন্ম নিতে পারে ভালবাসার নতুন ভাষা। আসলে, ‘ঝড়ের পরের দিন’ এক অর্থে এক সার্বজনীন বার্তা দেয় প্রকৃতি আমাদের থেকে আলাদা নয়, আমরা তারই অংশ। তাই গাছ হারালে, পাখি হারালে, আমরা নিজের এক অংশকেই হারাই। নাটকটি সেই হারানোর ব্যথা থেকে ফেরার এক নিরাময়যাত্রা। নাট্য উৎসবের শেষে দর্শকদের মধ্যে প্রবল আবেগ দেখা যায়। অনেকে বলেন, ‘এই নাটক আমাদের মনে করিয়ে দিল, আমরা প্রকৃতির সন্তান। ভালোবাসাই আমাদের টিকিয়ে রাখে।’ কেউ আবার মন্তব্য করেন, ‘এই ধরনের নাটক আজকের সমাজে অতি প্রয়োজনীয়, যেখানে বিভাজনের বদলে একতার বার্তা দেয়।’

‘ঝড়ের পরের দিন’ শুধু একটি নাটক নয় এটি এক অনুধ্যান, এক মর্মবোধ, এক অনন্ত আশার কাব্য। ঝড়ের পর যেমন আকাশে নতুন সূর্য ওঠে, তেমনই এই নাটক মনে নতুন আলো ছড়ায়। হরিপাল নাট্যপ্রহরী (Haripal Natyapraharir) এই প্রযোজনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করেছে, ভাল নাটক শুধু মঞ্চে নয় দর্শকের হৃদয়ে বেঁচে থাকে দীর্ঘকাল।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Speech, Delhi Blast 2025 | ‘ষড়যন্ত্রকারীদের কাউকে রেয়াত নয়!’ দিল্লিকাণ্ডে নাশকতার ইঙ্গিত স্পষ্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কাঁপছে প্রশাসনিক মহল

Sasraya News
Author: Sasraya News