Sasraya News

Saturday, April 5, 2025

Freud’s theory of Dream : স্বপ্নতত্ব ও জীবন

Listen

ফ্রয়েড (Freud) প্রথম থেকেই বলেছেন যে স্বপ্নের এক একটি উপকরণের এক এক ধরণের অর্থ। উপকরণগুলি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। হতে পারে ব্যক্তিটির পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা, ভীতি, হতাশা বা ইচ্ছার প্রতিভূ সেই বিশেষ প্রতীকটি। স্বপ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ধারের জন্য ফ্রয়েড প্রতিকতার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রতীকের ওপর নির্ভর করেই ব্যক্তির অবচেতন মনের দরজা খোলা সম্ভবপর। লিখেছেন : কেয়া চ্যাটার্জী 

 

 

ধ্যাহ্ন ভোজের শেষে নিজের বৈঠকখানার আরাম কেদারায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কবি কোলেরিজ। মাথার মধ্যে ঘুরপাক করছে কয়েকটি পঙক্তি কিন্তু কিছুতেই সেগুলিকে বাঁধতে পারছেন না এক সুরে। ভাবতে ভাবতে অচিরে ঘুমিয়ে পড়লেন কবি। ঘুমের মধ্যেই দেখে ফেললেন কয়েকটি ঘটনা। ঘুম ভাঙতেই কাগজ কলমে নাথিভুক্ত করলেন পুরো ব্যাপারটা কিন্তু শেষে কি হয়েছিল? আর তো মনে পড়ছে না। কবি আর এগোলেন না। আশায় রইলেন আবার যদি কখনো এই স্বপ্নটি আসে তাহলে সম্পূর্ণ করবেন তাঁর কবিতাটি। কিন্তু হায়! সেই স্বপ্ন আর ফিরে আসেনি। সম্পূর্ণ হয়নি যুগান্তকারী কবিতা কুবলা খান। সাড়ে তিনশ লাইনের ক্লাসিক কবিতাটি আসলে অসম্পূর্ণ।

 

ফ্রয়েডের স্বপ্ন তত্ত্বের বিরোধী মতামত রয়েছে প্রচুর। অনেক গবেষক মনে করেন স্বপ্নের বাস্তবে কোন অর্থ বা তাৎপর্য নেই। মানব মস্তিষ্কের অগ্রভাগ বা frontal cortext চিন্তা ভাবনার কাজটি করে। দৈনন্দিন জীবনের ওঠা পড়া এই frontal cortext এ গভীর ছাপ রেখে যায়।

 

স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা করাকালীন ফ্রয়েড বিশ্লেষণ করেছেন বিভিন্ন মানুষের দুঃস্বপ্ন, সুখ স্বপ্ন বা এমন স্বপ্ন যার কোন অর্থ নেই। এমনকি নিজের স্বপ্ন নিয়েও তিনি গবেষণা করেছেন। ফ্রয়েড স্বপ্নকে দুটি ভাগে ভাগ করেন— Manifest content ও Latent Content। স্বপ্নের সহজ সরল রূপ যা ব্যক্তি দেখছেন অর্থাৎ ঘটনাবলী হল মানিফেস্ট কনটেন্ট। অপরদিকে সেই স্বপ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ, প্রতীক হল লাটেন্ট কনটেন্ট। অর্থাৎ একটি স্বপ্নের বাইরের দিকটা হল মানিফেস্ট কনটেন্ট এবং অন্তর্মহল হল লাটেন্ট কনটেন্ট। ফ্রয়েড তাঁর এই গবেষণা গুলিকে একত্রিত করেছেন তাঁর গ্রন্থ Interpretation of Dreams এ। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বইটি কিন্তু সেইসময় পাঠকমহলে তেমন কোন সারা ফেলেনি। বরং বেশ কয়েক বছর বইটি ছিল অখ্যাতির অন্ধকারে নিমজ্জিত। তবে গ্রন্থটি হঠাৎ পাঠকদের মন জয় করে যখন মনোবিদ্যা সম্পর্কে চর্চা ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পায়। মনোবিদ্যার ছাত্র ছাত্রীরা ফ্রয়েডের গ্রন্থটি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে পড়েন।
ফ্রয়েড স্বপ্নকে চারটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন — সংক্ষেপন, অভিক্রান্তি, রূপান্তর ও প্রতিকতা। এগুলি স্বপ্নের একেকটি পর্যায়। স্বপ্ন কখনই আমাদের কাছে বিস্তারিতভাবে প্রতিফলিত হয়না। বিভিন্ন ঘটনা, চরিত্র, সংলাপ ছোট ছোট আকারে আমরা দেখতে পাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার কোন অর্থ খুঁজে পাই না। আসলে সেগুলি বিচ্ছিন্ন কিন্তু কোন না কোন চিন্তা ভাবনার প্রতিফলন। এটিকেই সংক্ষেপন বলে।
Displacement বা অভিক্রান্তি জাতীয় স্বপ্ন আমরা মোটামুটি সকলেই দেখে থাকি। কোন স্থানে বা কোন লক্ষ্যে পৌঁছনোর অভীপ্সা থেকেই অভিক্রান্তি জাতীয় স্বপ্ন আমাদের মনে আসে। অনেকসময় আমরা স্থান পরিবর্তনের বা ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। কখনো সেই স্থানে পৌঁছতে পারি, কখনো পারি না। তবে স্থানান্তরের দৃশ্যগুলো পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকে। একেই ডিসপ্লেসমেন্ট বলা হয়।
কোন বিষয়ের প্রতি ভীতি বা রাগ, হিংসা অথবা ভালোবাসা ইত্যাদি অনুভূতি স্বপ্নে ধরা পড়ে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুটি রূপ পাল্টে ফেলে। যে ব্যক্তির ওপর রাগ বা হিংসা তার বদলে অন্য কোন ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে স্বপ্নে। আমাদের প্রাক চেতন মন কিন্তু আমাদের জানাতে থাকে যে বর্তমান ব্যক্তিটি অভিষ্ট ব্যক্তি নয়। তবু স্বপ্নে আমাদের সমস্ত অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয় ওই ব্যক্তি বা বিষয়ের ওপরেই। এটি ভীতির ক্ষেত্রেও বর্তমান। বাস্তবে কোন বিশেষ বস্তুর প্রতি ভীতি স্বপ্নে রূপ পাল্টে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় ও আমরা স্বপ্নে সেই ভিন্ন বিষয়টি দেখেই ভয় পাই। এটিই রূপান্তর।
ফ্রয়েড প্রথম থেকেই বলেছেন যে স্বপ্নের এক একটি উপকরণের এক এক ধরণের অর্থ। উপকরণগুলি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। হতে পারে ব্যক্তিটির পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা, ভীতি, হতাশা বা ইচ্ছার প্রতিভূ সেই বিশেষ প্রতীকটি। স্বপ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ধারের জন্য ফ্রয়েড প্রতিকতার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রতীকের ওপর নির্ভর করেই ব্যক্তির অবচেতন মনের দরজা খোলা সম্ভবপর।
তাছাড়াও ফ্রয়েডের বলেছেন, স্বপ্নে পড়িলক্ষিত ঘটনাবলী বাস্তব না হলেও উপকরণ গুলি বাস্তব। অর্থাৎ স্বপ্নে দেখা মানুষ, বস্তু, প্রাণী, যানবাহন সবই ব্যক্তিটি কখনো না কখনো চাক্ষুষ করেছেন। সেটিই ছাপ ফেলেছে তার মস্তিষ্কে । সেই ছাপগুলিই একে একে স্বপ্নে ঘটনা পরম্পরায় ব্যক্তি মানসচক্ষে ভেসে ওঠে। সুতরাং, স্বপ্নের প্লটটি আসল না হলেও চরিত্রেরা আসল।
তবে স্বপ্ন যে শুধু ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েই ক্ষান্ত হয় তা নয়। বর্তমানে বহু গবেষক স্বপ্নতত্ত্ব নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে স্বপ্নের আরো কয়েকটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। স্বপ্নের মাধ্যমে যেমন আমাদের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে আমাদের মন শান্ত হয় আবার মস্তিষ্কের স্নায়ুর ওপর বাড়তে থাকা চাপ নিরাময়ের একমাত্র পথ নিদ্রা ও সুখস্বপ্ন। নিবন্ধের শুরুতেই উদ্ধৃত ‘কুবলা খান’এর উদাহরণের দ্বারা বোঝা যায় আমাদের শরীর ঘুমিয়ে পড়লেও মস্তিস্ক সজাগ থাকে। স্নায়ু যখনই শিথিল হয়ে পুরে তখনই তার উদ্ভাবনি ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই কারণেই অনেকসময় জটিল কোন তত্ত্ব বা সমস্যার সমাধান হয়ে যায় স্বপ্নের মাধ্যমে বা নিদ্রার পড়ে। দীর্ঘদিন যাবৎ জমিয়ে রাখা দুঃখ, অভিমান বা মানসিক চাপের অবসান ঘটে স্বপ্নের মাধ্যমে। মানসিক চাপ হ্রাস পেলে আমাদের শরীর ও মস্তিস্ক উভয়েই আবার সচল হয়ে ওঠে।
তবে ফ্রয়েডের স্বপ্ন তত্ত্বের বিরোধী মতামত রয়েছে প্রচুর। অনেক গবেষক মনে করেন স্বপ্নের বাস্তবে কোন অর্থ বা তাৎপর্য নেই। মানব মস্তিষ্কের অগ্রভাগ বা frontal cortext চিন্তা ভাবনার কাজটি করে। দৈনন্দিন জীবনের ওঠা পড়া এই frontal cortext এ গভীর ছাপ রেখে যায়। মস্তিষ্কের অন্তর্গত স্নায়ুগুলি কিছু electrical impulse সৃষ্টি করে যার ফলে সেই ভাবনা গুলিই একটি আকার নিয়ে আমাদের মস্তিস্ক তন্ত্রে ঘোরাফেরা করে। এই সময় অনেক ব্যক্তির REM বা Rapid Eye Movement হয়। Frontal cortext ও Cerebral cortext এই ভাবনা বা electrical impulse গুলিকে বোঝার চেষ্টা করে ও স্বপ্ন আকারে আমাদের মস্তিষ্কে ঘটনাবলির সৃষ্টি করে। সেই স্বপ্নের কোন গোপন অর্থ নেই। সেগুলির মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেনা। ফ্রয়েড বিরোধী তত্ত্ব সমূহের মধ্যে এটি অন্যতম ও জনপ্রিয়।
কয়েক শতাব্দী পূর্বে মেসোপটেমিয়ানরা স্বপ্ন নথিভুক্ত করে রাখতেন পোড়া মাটির টালির ওপর। চৈনিকরাও স্বপ্ন লিখে রেখে খুঁজতে চেষ্টা করতেন তার অর্থ। স্বপ্ন সম্পর্কিত নানান সংস্কার, মিথ ও কুসংস্কার ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের দেশেও। স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা চলছে আজও। স্বপ্নের হদিশ পাওয়া এখনো সম্ভবপর হয়নি। তবে স্বয়ং ফ্রয়েডের মতে স্বপ্ন বিহীন নিরবিচ্ছিন্ন স্বপ্নই মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।

ছবি : সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : Sasraya News Sunday’s Literature special | 30 March 2025, Issue 58| সাশ্রয় নিউজ, রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ৩০ মার্চ ২০২৫, সংখ্যা ৫৮

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment