সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে আরও একটি গৌরবোজ্জ্বল চ্যাপ্টার যুক্ত হল। দেশের সামরিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বার রাষ্ট্রপতির বিশিষ্ট সেবা পদক পাচ্ছেন কর্নেল সোফিয়া কুরেশি (Colonel Sofia Qureshi)। সিঁদুর অভিযান শুরুর অনেক আগেই তাঁর দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং পেশাদারিত্ব ভারতীয় সেনার অন্দরমহলে নজর কেড়েছিল। তবে গত বছর পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের প্রত্যাঘাতের সময়ে সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর দৃপ্ত উপস্থিতি এবং সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তাঁকে জাতীয় স্তরে পরিচিত মুখ করে তোলে। জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারতের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কর্নেল সোফিয়াকে। সিঁদুর অভিযানের প্রতিটি ধাপ কী ভাবে পরিকল্পিত হয়েছে, কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সমস্ত কিছু তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন সংযত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে। অনেকের মতে, ওই সাংবাদিক বৈঠকের মাধ্যমেই ভারতীয় সেনা দেশের নারীশক্তির সক্ষমতা নিয়ে এক স্পষ্ট বার্তা দেয়। তাঁর সঙ্গে সেই সময় উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংহ (Wing Commander Vyomika Singh)। দুই মহিলা অফিসারের নেতৃত্বে সেই ব্রিফিং আন্তর্জাতিক মহলেও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
১৯৭৪ সালে গুজরাতের বডোদরাতে (Vadodara, Gujarat) জন্ম কর্নেল সোফিয়া কুরেশির। শিক্ষাজীবনে তিনি বরাবরই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৯৭ সালে জৈবরসায়ন বিষয়ে স্নাতোকত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সেনার সামরিক যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিক্স অভিযান সহায়ক শাখা সিগন্যাল কোরের (Signals Corps) অন্যতম শীর্ষ আধিকারিক। প্রায় ৩৫ বছরের কর্মজীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি, যার প্রতিটিতেই তাঁর দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট।২০১৬ সাল কর্নেল সোফিয়ার কেরিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। সেই বছর ভারতে আয়োজিত সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়ার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। পুণে আয়োজিত ওই মহড়ায় জাপান, চিন, আমেরিকা, রাশিয়া-সহ ১৮টি দেশের সেনা অংশ নেয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থাকাকালীন তিনি প্রথম মহিলা অফিসার হিসেবে এমন বহুজাতিক সামরিক মহড়ার নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাস গড়েন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, ওই মহড়ায় অংশ নেওয়া অন্য কোনও দেশের নেতৃত্বে মহিলা অফিসার ছিলেন না। এই কৃতিত্বই তাঁকে আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
কর্নেল সোফিয়ার পেশাদার সাফল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা মহড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৬ সালে তিনি কঙ্গোতে রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিরক্ষা বাহিনীর (United Nations Peacekeeping Mission) সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব সামলান। পরবর্তীতে ভারতীয় সেনায় মহিলা অফিসারদের স্থায়ী কমিশন সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টেও তাঁর কাজের উদাহরণ উঠে আসে। আদালত স্পষ্ট করে জানায়, কর্নেল সোফিয়ার মতো অফিসারদের দক্ষতা প্রমাণ করে যে, সেনাবাহিনীতে মহিলা অফিসারদের স্থায়ী কমিশন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও দ্বিধা থাকা উচিত নয়। এ বছর সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতির তরফে সামরিক সম্মানপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কর্নেল কুরেশি-সহ মোট ১৩৫ জন সেনা আধিকারিক ও জওয়ানকে বিশিষ্ট সেবা পদকে ভূষিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৩০ জন পাচ্ছেন পরম বিশিষ্ট সেবা পদক, চার জন উত্তম যুদ্ধ সেবা পদক, ৫৬ জন অতি বিশিষ্ট সেবা পদক, নয় জন যুদ্ধ সেবা পদক, ৪৩ জন সেনা পদক, আট জন নৌসেনা পদক এবং ১৪ জন বায়ুসেনা পদক।
এ বছরের সম্মানপ্রাপ্তদের তালিকায় আরও এক উল্লেখযোগ্য নাম হল বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্ল (Group Captain Shubhanshu Shukla)। তিনি এ বছর অশোক চক্রে ভূষিত হচ্ছেন। শুভাংশু হলেন ভারতের দ্বিতীয় মহাকাশচারী, যিনি দেশের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছেন। এ ছাড়াও তিন জন পাচ্ছেন কীর্তি চক্র এবং ১৩ জনকে দেওয়া হচ্ছে শৌর্য চক্র। কর্নেল সোফিয়া কুরেশির এই সম্মান ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নারী অফিসারদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকারও স্বীকৃতি। সাহস, নিষ্ঠা এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, সামরিক ক্ষেত্রে লিঙ্গ কোনও অন্তরায় নয়। রাষ্ট্রপতির বিশিষ্ট সেবা পদক তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অবদানেরই স্বাভাবিক স্বীকৃতি। দেশবাসীর কাছে তিনি আজ এক অনুপ্রেরণার নাম, যিনি দেখিয়ে দিলেন দায়িত্ব আর দক্ষতার সামনে সব সীমারেখাই গৌণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Hollywood side-eye photo story, Jayne Mansfield Sophia Loren dinner photo : হলিউডের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত সাইড-আই, সোফিয়া লরেন ও জেন ম্যান্সফিল্ডের সেই রাত




