কৌশিক রায়, সাশ্রয় নিউজ ★ দীঘা : রথযাত্রার ঠিক আগের সন্ধ্যায়, সমুদ্রের গর্জনের শহর দিঘা (Digha) যেন এক অভূতপূর্ব উত্তেজনায় ভরে উঠল। বুধবার বিকেলে দীঘায় পৌঁছলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। শহরের প্রবেশপথেই তাঁকে স্বাগত জানাতে ভিড় জমিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। মুখ্যমন্ত্রীও তাঁদের নিরাশ করলেন না, গাড়ি থামিয়ে কাঁথির (Contai) পথঘাটে বারবার নামলেন, কথা বললেন তৃণমূল কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে।
মুখ্যমন্ত্রীর সফরের মূল উপলক্ষ্য, দীঘার নতুন জগন্নাথ মন্দিরে প্রথম বার আয়োজিত হতে চলা রথযাত্রা উৎসব। এটি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একটি সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সূচনা। রাজ্য সরকার-নির্মিত নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির থেকে পুরনো মন্দির পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তায় গড়াবে রথের চাকা। শুক্রবার সকালেই শুরু হবে রথযাত্রা, আর সেই সূচনা লগ্নে নিজেই উপস্থিত থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী। সোনার ঝাঁটা দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে রথ টানার রীতি বজায় রেখে শুরু হবে মঙ্গলযাত্রা। দীঘা আসার সময় পথে কাঁথি ৩ পঞ্চায়েত সমিতির সামনে গাড়ি থামিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। আবার কাঁথি বাসস্ট্যান্ডের কাছেও গাড়ি থামিয়ে করমর্দন করেন সাধারণের সঙ্গে। এক পর্যায়ে যান মারিশদা (Marishda) থানাতেও। সেখানে পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে কিছু সময় কাটালেও, ঠিক কী কারণে সেখানে গিয়েছিলেন তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে জল্পনা চলছে। তবে রাজনৈতিক ইঙ্গিতও মেলে এই সফরে। রামনগর (Ramnagar) বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক অখিল গিরি (Akhil Giri) মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একসঙ্গে পদযাত্রায় অংশ নেন, যা তৃণমূলের দলগত ঐক্যের বার্তা বলেই মনে করছেন অনেকে। এলাকাভিত্তিক জনসংযোগ এবং প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ দুইয়েরই সুচিন্তিত সমন্বয়ে এগোচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর এই দীঘা সফর।
দীঘার এই রথযাত্রাকে ঘিরে প্রশাসনের তরফে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সূত্রের খবর, এবার দীঘায় প্রায় ২ থেকে ২.৫ লক্ষ ভক্তের জমায়েত হতে পারে। এই বিশাল জনসমাগম সামলাতে দমকল, স্বাস্থ্য দফতর, পুলিশ ও সিভিল ডিফেন্সের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও একযোগে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্নের (Nabanna) তরফ থেকে জানানো হয়েছে, মমতা নিজে এসে সেই প্রস্তুতি পরিদর্শন করতেই আগেভাগে দীঘায় এসেছেন।
নিউ দীঘা স্টেশন থেকে ওল্ড দীঘা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে বসানো হয়েছে কাঠের শক্ত ব্যারিকেড। যান চলাচলে আনা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ। স্থানীয় হোটেল, লজ, গেস্ট হাউজে চলছে ভিড় সামলানোর প্রস্তুতি। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অস্থায়ী ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমও গড়ে তোলা হয়েছে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশাসনিক আধিকারিক জানান, “এই রকম বড় পরিসরে দীঘায় রথযাত্রা প্রথম। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থাকছেন, ফলে প্রত্যেকটা পদক্ষেপেই সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।” যদিও বুধবার রাত পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মন্দিরে যাননি। তবু অনেকেই ধারণা করছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা কিংবা শুক্রবার ভোরেই তিনি মন্দির পরিদর্শনে যাবেন ও ঠাকুর দর্শন করে রথ টানার প্রস্তুতি সম্পন্ন করবেন।
এই প্রথম দীঘায় রথযাত্রা উৎসব এমন রাজকীয় গুরুত্ব পেল। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার (Subhadra) নতুন বিগ্রহ স্থাপনের পর এই উৎসব কেবল ধর্মীয় অনুরাগীদের নয়, রাজ্যজুড়ে পর্যটন ও সংস্কৃতির নতুন ঠিকানা হয়ে উঠছে। রাজ্য সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই রথযাত্রা আগামিদিনে পূর্ব মেদিনীপুরের (Purba Medinipur) পর্যটনের অন্যতম বড় চাবিকাঠি হয়ে উঠতে চলেছে, এমনটাই আশা করছে প্রশাসনিক মহল। অন্যদিকে, এই সফরের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও দেখালেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্যালেন্ডারে জনসংযোগ ও ধর্মীয় সংস্কৃতির জায়গা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এবং তারই ফলস্বরূপ, শুক্রবার সকাল থেকে যখন রথের রশি হাতে দাঁড়াবেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তখন দীঘার আকাশে বাজবে ঢাকের বাদ্যি আর বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে সৈকতের এই রথযাত্রা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi | ভারত-মরিশাস সম্পর্কের বন্ধনে নতুন ছোঁয়া, ফোনে কী কথা বললেন মোদী ও রামগুলাম




