সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) রবিবার সংসদে পেশ করলেন তাঁর নবম কেন্দ্রীয় বাজেট। ভারতের বাজেট ইতিহাসে এই প্রথম রবিবার বাজেট পেশ করল কেন্দ্রীয় সরকার। সামনে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন, তার মধ্যেই এই বাজেট ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে ছিল বিশেষ কৌতূহল। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি, ২০২৬ সালের বাজেটে একাধিক বড় ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো উন্নয়ন। দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াতে সাতটি নতুন হাইস্পিড রেল করিডর তৈরির ঘোষণা করেছেন নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman)। প্রস্তাবিত করিডরগুলি হল মুম্বাই (Mumbai) থেকে পুনে (Pune), পুনে থেকে হায়দরাবাদ (Hyderabad), হায়দরাবাদ থেকে বেঙ্গালুরু (Bengaluru), হায়দরাবাদ থেকে চেন্নাই (Chennai), চেন্নাই থেকে বেঙ্গালুরু, দিল্লি (Delhi) থেকে বারাণসী (Varanasi) এবং বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি (Siliguri)। সরকারের দাবি, এই করিডরগুলি চালু হলে শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক শহর এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলির মধ্যে যাতায়াত আরও দ্রুত ও সহজ হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্র।
প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ শিল্পের দিকেও নজর দিয়েছে বাজেট ২০২৬। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দেশের কৌশলগত খাত হিসেবে তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন ‘ভারত সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০’ (India Semiconductor Mission 2.0)। এই প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের বক্তব্য, বিশ্ববাজারে চিপের উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশকে আত্মনির্ভর করতে এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উৎপাদন নয়, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরির উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা যায়। সাধারণ মানুষের জন্য বাজেটের অন্যতম বড় স্বস্তির জায়গা আয়কর সংক্রান্ত ঘোষণা। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে নতুন আয়কর আইন কার্যকর হবে। এই নতুন আইনের মূল লক্ষ্য কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব করা। আর্থিক ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রাপ্ত অর্থের উপর আর আয়কর দিতে হবে না বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আয়কর রিটার্ন সংশোধনের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন রিভাইজ করা যেত, সেখানে এবার স্বল্প জরিমানায় ৩১ মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন সংশোধনের সুযোগ মিলবে। সরকারের মতে, এতে ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে করদাতাদের উপর চাপ কমবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই (MSME) -এর জন্যও সুখবর রয়েছে বাজেটে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) ঘোষণা করেছেন, এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে ১০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে রপ্তানি পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নতুন বরাদ্দের মাধ্যমে সহজ ঋণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণে সাহায্য মিলবে বলে কেন্দ্রের দাবি। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও একাধিক নতুন প্রস্তাব এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। মেডিক্যাল ট্যুরিজম পরিষেবাকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরতে একটি বিশেষ স্কিম চালুর ঘোষণা করা হয়েছে। পিপিপি মডেলে (Public Private Partnership) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচটি আধুনিক মেডিক্যাল হাব তৈরি করা হবে। এই হাবগুলিতে বিশ্বমানের চিকিৎসা পরিষেবা, আধুনিক পরিকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন। পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরে দেড় লক্ষ দক্ষ কেয়ার গিভার তৈরি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য পরিষেবার মানও উন্নত হবে বলে মনে করছে সরকার। ভেটেনারি হাসপাতাল ও পশুস্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বিশেষ বরাদ্দ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বাজেট ২০২৬-এ উন্নয়ন ও জনকল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি করদাতাদের স্বস্তি, শিল্পোন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ এই চার স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে নির্মলা সীতারামনের (Nirmala Sitharaman) নবম বাজেট। ভোটের বছরে এই বাজেট কতটা রাজনৈতিক লাভ এনে দেবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে, তবে অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে, তা নিয়ে একমত বিশেষজ্ঞ মহল।
ছবি : সংগৃহীত




