সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই শিল্পোন্নয়নকে সামনে রেখে পরিকাঠামো বৃদ্ধির রণনীতি স্পষ্ট করে তুলছে নবান্ন (Nabanna)। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম বর্ধমান (Paschim Bardhaman) জেলার শিল্পচিত্রকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করে চলেছে রাজ্য সরকার। সেই লক্ষ্যেই এবার আসানসোলের (Asansol) ধর্মায় তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প পার্ক (Industrial Park)। প্রায় ৭ একর জমির উপর গড়ে উঠতে থাকা এই শিল্পতালুকের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। পশ্চিমবঙ্গ ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন নিগম (WB Small Industries Development Corporation) সূত্রে খবর, আগামী ডিসেম্বরের ১৮ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য শিল্প সম্মেলনে এই নতুন প্রকল্পটিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হতে পারে।
নবান্নের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের দাবি, ধর্মার এই শিল্পতালুক পশ্চিম বর্ধমানের শিল্প-মানচিত্রে এক নতুন মোড় আনবে। ছোট, মাঝারি এবং স্টার্ট-আপ উদ্যোক্তাদের জন্য এখানে থাকবে প্রয়োজনীয় সব সুবিধা, প্লট, রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল, ড্রেনেজ, সাধারণ পরিষেবা কেন্দ্র, গুদাম, লজিস্টিকস সুবিধা এবং উদ্যোক্তা সহায়ক কক্ষ। নবান্নের এক উর্ধ্বতন কর্তার (Senior Official) ভাষায়, “এই প্রকল্প কেবল একটি শিল্প পার্ক নয়, এটি পশ্চিম বর্ধমানের ভবিষ্যৎ শিল্পকেন্দ্র হয়ে উঠবে। বিনিয়োগ যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থানের বিপুল সুযোগ তৈরি হবে।”
রাজ্য সরকারের লক্ষ্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পক্ষেত্রে আরও ব্যাপক বিনিয়োগ আনা। ধর্মা অঞ্চলটি পরিবহণের সুবিধা, আসানসোলের শিল্প ঐতিহ্য, এবং বিদ্যমান লজিস্টিক সুবিধার জন্য বহুদিন ধরেই বিনিয়োগের অনুকূল জায়গা হিসেবে পরিচিত। তাই এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আধুনিক শিল্পতালুক গড়ে ওঠা সময়ের দাবি বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।ক্ষুদ্র শিল্প দফতরের এক আধিকারিক (Official) বলেন, “নতুন এই শিল্প পার্ক ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে বিনিয়োগের নতুন দরজা খুলে দেবে। উদ্যোক্তারা সহজেই জমি, পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন। এতে ছোট ব্যবসাগুলির বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।”
বিশেষ সূত্রের খবর, উদ্যোক্তাদের আবেদন পাওয়ার পর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে দ্রুত জমি বরাদ্দ করা হবে। এছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের জন্যও আলাদা হেল্পডেস্ক তৈরি করা হচ্ছে, যাতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষেবা পাওয়া যায়।ডিসেম্বরের ১৮ তারিখের শিল্প সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ওই অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নবান্ন চাইছে, বেসরকারি পুঁজির মাধ্যমে ধর্মাকে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী শিল্প-হাব হিসেবে সাজিয়ে তোলা হোক। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, “এই সম্মেলনে আমরা প্রকল্পটির সব দিক তুলে ধরব। বিনিয়োগকারীরা যাতে বাস্তবে এসে দেখে যেতে পারেন, সেই অনুযায়ী অবকাঠামোর কাজ এখন দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হচ্ছে।” এরই সঙ্গে, শিল্প পার্কে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক, লাইট-ম্যানুফ্যাকচারিং, গুদামজাতকরণ, কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ সহ নানা ধরনের ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনাও চলছে।
শুধু বিনিয়োগই নয়, ধর্মার শিল্পতালুক তৈরি হলে এলাকার কর্মসংস্থানও বহুগুণে বাড়বে। ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার হলে স্থানীয় যুবসমাজের জন্য তৈরি হবে নতুন চাকরির সুযোগ, টেকনিক্যাল, অ্যাকাউন্টিং, মেশিন হ্যান্ডলিং, ম্যানেজমেন্ট, লজিস্টিকস, সিকিউরিটি থেকে শুরু করে আরও নানা ক্ষেত্রে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, প্রথম ধাপে প্রায় ১৫০০-২০০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী ধাপে আরও বাড়বে।
আসানসোল-ভবিষ্যৎ শিল্প-করিডোর?
আসানসোল দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। কয়লা, ইস্পাত শিল্প, রেলওয়ে পরিকাঠামো এবং পরিবহণ ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চল বিনিয়োগকারীদের বিশেষ নজর কাড়ে। জাতীয় সড়ক, রেলপথ এবং পার্শ্ববর্তী শিল্প ইউনিটগুলির সুবিধা থাকায় শিল্পতালুক গড়ে ওঠার জন্য আসানসোলকে বিশেষভাবে উপযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।এক শিল্প বিশেষজ্ঞ (Industry Analyst) বলেন, “আসানসোলের ভৌগোলিক সুবিধা এবং শিল্প ঐতিহ্য এমনিতেই অনুকূল। নতুন শিল্পতালুক তৈরি হলে এটি ধীরে ধীরে পুরো পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক করিডোর হয়ে উঠতে পারে।”
রাজ্য সরকারের ধারণা, কলকাতা, দুর্গাপুর ও আসানসোল- এই ত্রিভুজ শিল্পাঞ্চল আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের মোট শিল্প বৃদ্ধির অর্ধেকের বেশি অংশের যোগান দিতে পারে।অন্যদিকে, নির্বাচনের আগে যেখানে সরকারি ঘোষণা নানা সময়েই রাজনৈতিক বলে ব্যাখ্যা করা হয়, সেখানে নবান্ন দাবি করছে, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অঙ্গ। শিল্পনীতি-২০২৩ এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প উন্নয়ন রূপরেখা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গকে শিল্প-বান্ধব রাজ্য হিসেবে তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য। তবে রাজনৈতিক মহলের দাবি, রাজ্যে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীরা বারবার প্রশ্ন তোলায়, সরকার দ্রুত দৃশ্যমান ফল দেখাতে চাইছে। তাই নির্বাচনের আগে এই প্রকল্প চালুর প্রস্তুতি আরো গুরুত্ব পেয়েছে।
যদিও নবান্নের এক শীর্ষ আধিকারিকের দাবি, “এটি কোনও নির্বাচনী প্রকল্প নয়। শিল্প উন্নয়ন আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। ধর্মার শিল্পতালুক সেই পরিকল্পনারই অংশ।” ফলে স্পষ্ট, শিল্প পার্ক চালু হলে শুধু আসানসোল নয়, গোটা পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান, দুটোই নতুন দিগন্ত দেখতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ উনিশ-তম কিস্তি)




