সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ভোর থেকে জমতে থাকা ক্ষোভ দুপুর গড়াতেই রূপ নিল তীব্র আন্দোলনে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে রাজপথে নেমে এলেন হাজার হাজার অঙ্গনওয়ারি কর্মী (Anganwadi Workers) ও আইসিডিএস কর্মী (ICDS Workers)। ভাতা বৃদ্ধি, নিয়মিত বেতন, সরকারি সুবিধা এবং মোবাইল ফোন সংক্রান্ত একাধিক দাবিকে সামনে রেখে কলকাতা পুরসভার সামনে ধুন্ধুমার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার (Subodh Mallick Square) থেকে রাজভবন (Raj Bhavan) -এর দিকে মিছিল এগোতেই কলকাতা পুরসভার সামনে পুলিশ বাধা দিলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি, বিক্ষোভ ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
অঙ্গনওয়ারি কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা চরম বঞ্চনার শিকার। নিয়মিত কাজ করলেও মাসের পর মাস বেতন ও ভাতা ঠিক সময়ে মেলে না। একজন আন্দোলনকারী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘এক মাস মাইনে দেয়, এক মাস দেয় না। কোনও মাসে পুরো টাকা আসে না, কোনও মাসে আবার বকেয়া থেকেই যায়।’ তাঁর কথায়, সংসার চালাতে গিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে গয়না বন্ধক রেখে বা বিক্রি করে মোবাইল কিনতে বাধ্য হয়েছেন অনেকেই।
উল্লেখ্য, এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল মোবাইল ফোন। আইসিডিএস প্রকল্পের কাজের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও, সেই মোবাইল কেনার টাকা বা শর্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। এক আইসিডিএস কর্মী বলেন, ‘আমরা যে ধরনের মোবাইল চেয়েছি, যে পরিমাণ টাকা চেয়েছি, তা দেওয়া হয়নি। উল্টে অন্যায় শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জোর করে মোবাইল কিনতে বাধ্য করা হয়েছে।’ তাঁর দাবি, কাজের প্রয়োজনে তথ্য আপলোড, রিপোর্ট পাঠানো, সব কিছুই মোবাইল নির্ভর হয়ে গেলেও সরকার সেই দায়িত্ব পুরোপুরি নিচ্ছে না। বিক্ষোভস্থলে দাঁড়িয়ে আর এক কর্মীর কণ্ঠে শোনা যায় দীর্ঘদিনের হতাশা। তিনি বলেন, ‘আমাদের উপর রোজ অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপানো হচ্ছে। শিশুদের পুষ্টি, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, তথ্য সংগ্রহ, সব কাজই আমাদের করতে হয়। কিন্তু তার বিনিময়ে সামান্য যে ভাতা দেওয়া হয়, সেটুকুও নিয়মিত নয়।’ তাঁর প্রশ্ন, এত দায়িত্বের পরেও কেন তাঁদের অস্থায়ী হিসেবেই রাখা হচ্ছে? কেন স্থায়ী সরকারি কর্মীর মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না?
মিছিল রাজভবনের দিকে এগোতে চাইলে কলকাতা পুরসভার সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে দেয়। পুলিশের বাধা পেতেই আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে। শুরু হয় ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা। ‘আমাদের রাজভবনে যেতেই হবে’ এই দাবিতে অনড় থাকেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী নামানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় এলাকা। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি, তর্কাতর্কি চলতে থাকে। একজন আন্দোলনকারী পুলিশের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন, ‘কেন আমাদের রাস্তা আটকানো হচ্ছে? আমরা কী অপরাধ করেছি? আমরা তো শুধু আমাদের ন্যায্য দাবি জানাতে এসেছি।’ পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। তাঁদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে এলেও পুলিশ বলপ্রয়োগ করছে। অন্য দিকে, পুলিশের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই বাধা দেওয়া হয়েছে। অঙ্গনওয়ারি ও আইসিডিএস কর্মীদের দাবি শুধু বেতন বা ভাতা নয়। তাঁরা সরকারি কর্মীর স্বীকৃতি, সামাজিক সুরক্ষা, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা এবং কাজের উপযুক্ত পরিকাঠামোর দাবিও তুলেছেন। এক কর্মীর কথায়, ‘আমরা সরকারের প্রকল্প চালাই, কিন্তু আমাদেরই সরকারি বলা হয় না। আমাদের ভবিষ্যৎ কী?’ এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আন্দোলনকারীদের মুখে মুখে।
ওয়াকিবহাল মতে, অঙ্গনওয়ারি কর্মীরা দেশের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের ভূমিকা পালন করেন। গ্রাম থেকে শহরের বস্তি, সব জায়গাতেই তাঁদের কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা স্বল্প ভাতা, অনিশ্চিত আয় এবং বাড়তি কাজের চাপে জর্জরিত। এই আন্দোলন সেই জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।রাজনৈতিক মহলেও এই আন্দোলন ঘিরে শুরু হয়েছে চাপানউতোর। বিরোধীদের দাবি, রাজ্য সরকার অঙ্গনওয়ারি কর্মীদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করছে। অন্য দিকে, রাজ্যের তরফে বলা হয়েছে, বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে মেটানোর চেষ্টা চলছে। তবে আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য, ‘আলোচনার আশ্বাস অনেক পেয়েছি, এবার কাজ চাই।’ উল্লেখ্য, অঙ্গনওয়ারি ও আইসিডিএস কর্মীদের এই আন্দোলন শুধু একটি দিনের বিক্ষোভ নয়, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা এবং অবহেলার বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ। রাজপথে নেমে তাঁরা বুঝিয়ে দিলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের লড়াই থামবে না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Sheikh Mohammed bin Zayed meeting | ভারত-আমিরশাহি বন্ধুত্বে নতুন গতি, দিল্লি বিমানবন্দরে UAE প্রেসিডেন্টকে উষ্ণ স্বাগত জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




