সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ব্রিটেনে শুরু হল এক নতুন যুগ। প্রযুক্তি, পরিচয় এবং নিরাপত্তার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এক সম্পূর্ণ ডিজিটাল আইডি সিস্টেম ‘Gov.uk One Login’। ১৭ অক্টোবর শুক্রবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে এই প্রকল্প। শুরুতে এই ডিজিটাল আইডি শুধুমাত্র প্রাক্তন সেনাকর্মীদের (Ex-servicemen) জন্য চালু হলেও, ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা আরও বড়। ভবিষ্যতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য এটি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তুতি চলছে। লক্ষ্য একটাই, অবৈধ অভিবাসন ও বেআইনি কাজের জাল ছিন্ন করা, দেশের প্রশাসনিক পরিকাঠামোকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল রূপে গড়ে তোলা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টার্মার (Sir Keir Starmer) এই নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দিতে গিয়ে বলেন, “আগামী দিনে যুক্তরাজ্যে (UK) ডিজিটাল আইডি ছাড়া কেউ কাজ করতে পারবে না। দেশের আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই আমরা এই পদক্ষেপ নিচ্ছি।”*
এই নতুন ডিজিটাল আইডির তথ্য থাকবে ‘Gov.uk One Login’ নামে একটি স্মার্টফোন অ্যাপে। এখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য যুক্ত করতে পারবেন। ফলে জাল পরিচয় ব্যবহার করে কাজ পাওয়া, ভাতা তোলার মতো প্রতারণা অনেকটাই বন্ধ হবে বলে মনে করছে প্রশাসন। সরকার আশা করছে, এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের তথাকথিত “শ্যাডো ইকোনমি” বা গোপন আর্থিক কার্যকলাপের পরিমাণ অনেক কমবে। কিন্তু, এই ‘One Login’ সিস্টেমের আসল অনুপ্রেরণা এসেছে ভারতের আধার (Aadhaar) প্রকল্প থেকে। বিশ্বের বৃহত্তম বায়োমেট্রিক পরিচয় ব্যবস্থা ‘আধার’ -এর মাধ্যমে ভারত ১২ সংখ্যার একটি ইউনিক আইডির সাহায্যে নাগরিকদের ডিজিটাল পরিচয় নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৮ কোটি আধার অথেন্টিকেশন (Aadhaar Authentication) হয় ভারতে। আর সেই সাফল্যের গল্প এখন নজর কেড়েছে ব্রিটিশ প্রশাসনের।
ব্রিটেনের নতুন ডিজিটাল আইডি মূলত ভারতের ‘আধার’ এবং ‘ডিজিলকার’ (DigiLocker) মডেলের সমন্বয়ে তৈরি। ভারতে যেমন নাগরিকেরা ডিজিলকারের মাধ্যমে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভোটার কার্ড, শিক্ষাগত সার্টিফিকেটসহ যাবতীয় নথি নিরাপদভাবে রাখতে পারেন, ব্রিটেনও তেমনই ‘Gov.uk Wallet’ নামে একটি ডিজিটাল ভল্ট চালু করছে, যা এখন ‘One Login’ অ্যাপে সংযুক্ত হবে। একবার পরিচয় যাচাই সম্পূর্ণ হয়ে গেলে, নাগরিকেরা সরকারি সেবা নেওয়া থেকে শুরু করে চাকরির আবেদন, সব কিছুই এই একক প্ল্যাটফর্ম থেকে করতে পারবেন।ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার সম্প্রতি ভারত সফরে এসে মুম্বইতে ইনফোসিস (Infosys) -এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও আধারের স্থপতি নন্দন নিলেকানির (Nandan Nilekani) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই বৈঠকেই স্টার্মার ভারতের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে “বিশ্বের কাছে এক অনুকরণীয় উদাহরণ” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “ভারত যেভাবে ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে, তা অভূতপূর্ব। এটি দেখিয়েছে, কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করা যায়।”
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক আধুনিকীকরণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের এক বড় স্বীকৃতি। ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশও যখন ভারতের উদাহরণ অনুসরণ করছে, তখন বোঝা যায়, “ডিজিটাল ইন্ডিয়া” (Digital India) প্রকল্প সত্যিই বিশ্বমানের এক রোল মডেল হয়ে উঠেছে।অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, ব্রিটেনের এই পদক্ষেপে দেশটির কর্মসংস্থান ও অভিবাসন নীতি আরও স্বচ্ছ হবে। যাঁরা ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স নম্বর (National Insurance Number) জাল করে বা অন্যের নম্বর ব্যবহার করে কাজ করতেন, তাঁদের জন্য এখন আর ফাঁকি দেওয়া সহজ হবে না। কারণ নতুন ডিজিটাল আইডিতে থাকবে বায়োমেট্রিক যাচাই এবং ফটো-ভিত্তিক অথেন্টিকেশন, যা প্রায় অপ্রতিরোধ্য। প্রযুক্তি সংস্থা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালু হলে যুক্তরাজ্যের প্রশাসনিক খরচও অনেকটা কমবে। কাগজপত্রের ব্যবহার কমে যাবে, প্রক্রিয়াগুলি আরও দ্রুত হবে, এবং নাগরিকদের সরকারি পরিষেবা পাওয়া আরও সহজ হবে।
ভারতের পরিকাঠামোর মতো একটি ডিজিটাল সিস্টেম গড়ে তুলতে ব্রিটেনের এই পদক্ষেপকে ইতিহাসের এক অভিনব মোড় হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। কারণ, যে দেশ একসময় ভারতের উপর উপনিবেশিক শাসন চালিয়েছিল, আজ সেই দেশই ভারতের ডিজিটাল মডেল অনুসরণ করে নিজেদের সমাজে পরিবর্তন আনছে। এই বাস্তবতা যেন ইতিহাসের চক্র পূর্ণ হওয়ার এক অনন্য প্রতীক। ভারত আজ শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই নয়, চিন্তাধারায়ও পথ দেখাচ্ছে প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Ratan Tata refused invitation | রাজকীয় সম্মানের চেয়েও মানবিকতা বড়: রতন টাটার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত


