সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি: বয়স, সময় কিংবা লম্বা আন্তর্জাতিক কেরিয়ার কোনও কিছুই যেন রোহিত শর্মার (Rohit Sharma) ক্রিকেট-ক্ষুধাকে থামাতে পারছে না। বুধবার গুয়াহাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) বিরুদ্ধে দ্বিতীয় এক দিনের ম্যাচে ব্যাট করতে নেমে আরও একটি বড় মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললেন ভারতের এই অভিজ্ঞ ওপেনার। ওয়ান ডে ক্রিকেটে ১২ হাজার রানের গণ্ডি পেরিয়ে এলিট ক্লাবে জায়গা করে নিলেন রোহিত। পুরুষদের একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করা সপ্তম ব্যাটার। ভারতের হয়ে এর আগে মাত্র সচিন তেন্ডুলকার (Sachin Tendulkar) ও বিরাট কোহলি (Virat Kohli) এই রেকর্ড গড়েছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রস্টন চেজের (Roston Chase) করা ইনিংসের ১৬তম ওভারে এক রান নিয়ে ১২ হাজারের ঘরে পৌঁছন রোহিত। এই এক রানই তাঁকে নিয়ে গেল এক বিশেষ তালিকায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকতার পরিচয় দেওয়া এই ব্যাটারের জন্য মাইলফলকটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ তাঁর আগে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন সচিন তেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি, রিকি পন্টিং (Ricky Ponting), কুমার সঙ্গাকারা (Kumar Sangakkara), সনৎ জয়সূর্য (Sanath Jayasuriya) ও মাহেলা জয়বর্ধনে (Mahela Jayawardena)।
২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ওয়ান ডে ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল রোহিতের। তারপর থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। প্রথম দিকে মিডল অর্ডারে খেললেও সময়ের সঙ্গে ওপেনার হিসেবে তাঁর পরিচয় আরও শক্তিশালী হয়। বড় ইনিংস খেলার ক্ষমতা, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের গতি বদলে নেওয়া ও বোলারদের উপর চাপ তৈরি করার দক্ষতা রোহিত শর্মা এক দিনের ক্রিকেটের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। ১২ হাজার রানের মাইলস্টোনে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে রোহিতের কেরিয়ারের আরও বেশ কিছু পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। ওয়ান ডে ক্রিকেটে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে একাধিক শতরান ও অর্ধশতরান। তবে শুধুমাত্র রানের সংখ্যা দিয়ে তাঁর ওয়ান ডে কেরিয়ারকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। একদিনের ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলির একটি হল বড় স্কোরকে আরও বড় করে তোলার ক্ষমতা।
২০১৪ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka) বিরুদ্ধে তাঁর ২৬৪ রানের ইনিংস এখনও পুরুষদের ওয়ান ডে ক্রিকেটে এক ইনিংসে কোনও ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। সেই ম্যাচে একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছিলেন রোহিত। শুধু তাই নয়, এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনটি দ্বিশতরানের মালিকও তিনি। এই নজির তাঁকে ওয়ান ডে ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যদের থেকে আলাদা জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। রোহিতের ব্যাটিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাঁর শট নির্বাচনের বৈচিত্র্য। শুরুতে ধৈর্য ধরে খেলার পর পরিস্থিতি বুঝে রান তোলার গতি বাড়ানো তাঁর পরিচিত কৌশল। বড় মাঠে ফাঁকা জায়গা খুঁজে বাউন্ডারি আদায় করা থেকে শুরু করে দ্রুত রান তোলার জন্য আক্রমণাত্মক শট, দীর্ঘ কেরিয়ারে এই দুই ধরনের ব্যাটিংয়ের মিশেল দেখা গিয়েছে তাঁর খেলায়। সেই কারণেই ওপেনার হিসেবে ভারতীয় দলের হয়ে তাঁর ভূমিকা বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ থেকেছে।
১২ হাজার রানের এই মাইলফলক ছোঁয়ার পরও রোহিতের নজর শুধুমাত্র অতীতের রেকর্ডে আটকে নেই। তাঁর সামনে রয়েছে আরও একটি বড় লক্ষ্য ২০২৭ সালের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে ভারতকে ফাইনালে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রোহিত শর্মা। সেইবার ভারত ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছলেও চাম্পিয়নের শিরোপা জিততে পারেনি। তাই আগামী বিশ্বকাপ তাঁর আন্তর্জাতিক ওয়ান ডে কেরিয়ারে নতুন সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি জিওস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রোহিত বলেছেন, ‘আমি কখনও ভাবব না যে আমার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। যত দিন খেলব, তত দিন সামনে কিছু না কিছু করার থাকে। আর আমি ২০২৭ সালের বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে আছি, সামনে আমার জন্য কী রয়েছে, সেটাই দেখছি।’ রোহিতের এই বক্তব্যে তাঁর বর্তমান মানসিকতার একটি দিক উঠে এসেছে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের পরেও তিনি নিজেকে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া ক্রিকেটার হিসেবে দেখছেন না। বরং সামনে আরও একটি বিশ্বকাপ রয়েছে ও সেই প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখার ভাবনাই তাঁর মধ্যে কাজ করছে। অবশ্য ২০২৭ বিশ্বকাপে তাঁর অংশগ্রহণ বা ভূমিকা নিয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হবে। বর্তমানে তিনি ভারতীয় ওয়ান ডে দলে রয়েছেন এবং বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সময়টা তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতা যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজের থেকে আলাদা, সেটিও উল্লেখ করেছেন রোহিত। তাঁর কথায়, ‘বিশ্বকাপ যখন হয়, যখন আমরা আইসিসির কোনও প্রতিযোগিতায় খেলি, তখন তার নিজস্ব চ্যালেঞ্জ থাকে। বিভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলতে হয়, আলাদা আলাদা মাঠে খেলতে হয়।’ আর সেই কারণেই প্রস্তুতির ধরনও বদলাতে হয় বলে মনে করেন তিনি। রোহিতের বক্তব্য, ‘তাই আপনাকে অন্য ভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, অন্য ভাবে ভাবতে হয়। সেটাই চ্যালেঞ্জ।’ অর্থাৎ তাঁর কাছে বড় টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি শুধু শারীরিক অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিপক্ষ, মাঠের পরিবেশ এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে মানসিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রোহিতের সামনে ২০২৭ বিশ্বকাপ থাকলেও ভারতীয় ওয়ান ডে দলে এখন নেতৃত্বের দায়িত্ব রয়েছে শুভমন গিলের (Shubman Gill) হাতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে চলতি তিন ম্যাচের ওয়ান ডে সিরিজেও গিলই অধিনায়ক। এই সিরিজকে ২০২৭ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ভারতীয় দলে অভিজ্ঞতা এবং তারুণ্যের সমন্বয় তৈরির ক্ষেত্রে রোহিত ও কোহলির মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারদের উপস্থিতি নিয়েও দলের অন্দরে আলোচনা হয়েছে।
চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচেও ভারতীয় ব্যাটিংয়ে রোহিত ও গিলের শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও রোহিত দ্রুত আউট হন, পরে গিল ও কোহলির জুটিতে ম্যাচ ভারতের দিকে চলে যায়। কোহলি সেই ম্যাচে ১৩৯ রানে অপরাজিত থেকে জয় নিশ্চিত করেন ও একই সঙ্গে ১৫ হাজার ওয়ান ডে রানের মাইলফলকও ছুঁয়ে ফেলেন। ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে এই সিরিজে ভারতীয় ক্রিকেটের দুই অভিজ্ঞ তারকাই পরিসংখ্যানের নতুন পর্ব লিখেছেন। রোহিতের ১২ হাজার রান পূর্ণ করার ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ একই তালিকায় ইতিমধ্যেই রয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সতীর্থ বিরাট কোহলি। কোহলি কয়েক দিন আগেই ১৫ হাজার ওয়ান ডে রানের মাইলফলক ছুঁয়ে দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। ভারতীয় ক্রিকেটের দুই প্রজন্মের অন্যতম বড় তারকা একই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের রেকর্ডের তালিকা দীর্ঘ করে চলেছেন। তবে রোহিতের ক্ষেত্রে রেকর্ডের পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘ কেরিয়ারের ধারাবাহিক পরিবর্তনের গল্পও। ২০০৭ সালে অভিষেকের পর থেকে তিনি ভারতীয় দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সাক্ষী। ব্যাটার হিসেবে নিজের ভূমিকা বদলেছেন, অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বড় প্রতিযোগিতায় ভারতের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন। এখন তাঁর সামনে নতুন প্রশ্ন, ২০২৭ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই পথ কতটা এগোয় এবং সেই প্রতিযোগিতায় তিনি কী ভূমিকা নেন।
১২ হাজার ওয়ান ডে রান তাই রোহিত শর্মার কেরিয়ারের শেষ অধ্যায়ের চিহ্ন নয়। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, সামনে তাকিয়েই এগোতে চান তিনি। মাইলফলক এসেছে, রেকর্ডের তালিকায় নাম উঠেছে, অতীতের অসংখ্য বড় ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে রয়েছে। কিন্তু রোহিতের চোখ এখন আরও একটি ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের দিকে। সেই অপেক্ষার পথে প্রতিটি সিরিজ, প্রতিটি ইনিংস এবং প্রতিটি ম্যাচই হয়ে উঠতে পারে তাঁর পরবর্তী প্রস্তুতির অংশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubman Gill WTC Final, India World Test Championship | বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের লক্ষ্য, ঠাঁসা সূচীতে প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তা শুভমনদের




