তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : আধুনিক ক্রিকেটে সাফল্যের পাশাপাশি লুকিয়ে থাকে গভীর লড়াই। মাঠের বাইরে যে লড়াই অনেক সময় ব্যাট-বলের চেয়েও কঠিন, সেই কথাই সামনে আনলেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্য ভারতী ফুলমালি (Bharati Fulmali)। গায়ের রং নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কটাক্ষ, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য এবং অনলাইন ট্রোলিংয়ের শিকার হওয়ার যন্ত্রণার কথা প্রথমবার খোলাখুলি জানালেন তিনি। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে নিজের সংগ্রামের পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতার অন্ধকার দিকটিও তুলে ধরলেন ফুলমালি। বর্তমানে মহিলা প্রিমিয়ার লিগে (Women’s Premier League) গুজরাত জায়ান্টসের (Gujarat Giants) হয়ে খেলছেন ভারতী ফুলমালি। ব্যস্ত টুর্নামেন্টের মাঝেই একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন, গত তিন বছর ধরে সমাজমাধ্যমে তাঁর চেহারা, বিশেষ করে গায়ের রং নিয়ে লাগাতার কটাক্ষ করা হচ্ছে। কখনও তা সরাসরি, কখনও আবার ইঙ্গিতে, কিন্তু প্রতিটি মন্তব্যই যে তাঁর মানসিক জগতে দাগ কেটেছে, সে কথা স্বীকার করেছেন এই ভারতীয় অলরাউন্ডার।
ফুলমালির কথায়, ‘যখন কেউ আপনার চেহারা আর ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন খুব খারাপ লাগে। এটা সামলানো সহজ নয়।’ তাঁর দাবি, ডব্লিউপিএল শুরু হওয়ার পর থেকেই এই ধরনের মন্তব্যের পরিমাণ আরও বেড়েছে। জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, ততই যেন বিদ্বেষী কণ্ঠস্বর জোরালো হয়েছে সমাজমাধ্যমে। বিশেষ করে ম্যাচের পর কিংবা কোনও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভুল হলে, কটাক্ষের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। একজন পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে সমাজমাধ্যম থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা কার্যত অসম্ভব, সে কথাও অকপটে মেনেছেন ফুলমালি। অনুশীলন, ম্যাচ সংক্রান্ত প্রচার, দলের বিভিন্ন আপডেট, সব কিছুতেই সমাজমাধ্যম আজ অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেন, ‘আমরা ম্যাচ খেলি, অনুশীলন করি, তাই সমাজমাধ্যম ব্যবহার করতেই হয়। আমিও করি। কখনও সখনও খুব গভীর ভাবেই দেখি, মানুষ আমাকে নিয়ে কী বলছে।’ এই কৌতূহল যে স্বাভাবিক, তা মানছেন তিনি। ভাল মন্তব্য যেমন মন ভালো করে, তেমনই খারাপ মন্তব্য ক্ষত তৈরি করে। তবে অভিজ্ঞতার নির্যাস হিসেবে ফুলমালি বুঝেছেন, মন্তব্যের জগতে ডুবে গেলে নিজেরই ক্ষতি। তাঁর কথায়, ‘ভাল কথাও দেখেছি, কিন্তু সংখ্যায় তা খুব কম। বেশির ভাগই নেতিবাচক। অনেকে আমাকে ঘৃণা করে, এমন মন্তব্যও চোখে পড়েছে।’ এই উপলব্ধি যে একদিনে আসেনি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ সামলে তবেই তিনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন, সেটাও স্পষ্ট।
গায়ের রং নিয়ে কটাক্ষ, বিষয়টি শুধু একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত জীবনে সমাজের গভীরে প্রোথিত বর্ণবিদ্বেষের প্রতিফলন। ফুলমালির অভিজ্ঞতা সেই কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে আনে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে ক্রিকেটাররা প্রায় দেবতার মর্যাদা পান, সেখানেই একজন মহিলা ক্রিকেটারকে তাঁর ত্বকের রঙের জন্য হেনস্তার শিকার হতে হয়, এই বৈপরীত্য নতুন করে প্রশ্ন তোলে সামাজিক মানসিকতা নিয়ে। কিন্তু, এই লড়াইয়ে ফুলমালি একা নন। সতীর্থদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, দলের মধ্যেই তিনি মানসিক শক্তি খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর মতে, ‘সতীর্থেরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। কারণ প্রায় সকলেই কোনও না কোনও ভাবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।’ দলগত সংহতিই তাঁকে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে বলে স্বীকার করেন ফুলমালি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফুলমালি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, অন্যেরা কী ভাবছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কিন্তু নিজে কী দেখবেন, সেটার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। তাঁর কথায়, ‘এখন বুঝেছি, অন্যেরা কী ভাবছে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কিন্তু আমি কী দেখব, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ এই উপলব্ধিই তাঁকে মানসিক ভাবে দৃঢ় করেছে। প্রসঙ্গত, মহিলা ক্রিকেট যতই পেশাদার হোক, ততই বাড়ছে প্রচার, জনপ্রিয়তা এবং তার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনা। ভারতী ফুলমালির অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তাঁর মতো ক্রিকেটাররা মাঠে লড়াই করেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, আর মাঠের বাইরে লড়াই করেন সামাজিক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ে জয় শুধু রান বা উইকেটে নয়, আত্মসম্মান ও মানসিক শক্তিতেও। কিন্তু, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের উত্থানের সময়ে ফুলমালির এই স্বীকারোক্তি সমাজের সামনে একটি আয়না ধরল। খেলোয়াড়দের কৃতিত্বের পাশাপাশি তাঁদের মানবিক অনুভূতিগুলিকেও যে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, সেই বার্তাই যেন উঠে এল তাঁর কথায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Bangladesh Cricket ICC Controversy | বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন অশান্তি: খেলতে না আসার শাস্তি কি? বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার পর ১৫০ সাংবাদিকের কার্ড বাতিল করে দিল আইসিসি




