সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ জোহানেসবার্গ : জোহানেসবার্গের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচীর মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি (Giorgia Meloni) মুখোমুখি বৈঠকে বসেন এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে ভূরাজনীতি অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে, এই বার্তাটি বৈঠকের শুরুর আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আলোচনা শেষে দুই নেতা জানান, ভারত-ইতালি কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা শুধু দুই দেশের জনগণকেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৈঠকের পরে মন্তব্য করেন, ‘ইতালির সঙ্গে আমাদের কৌশলগত সম্পর্ক দিনদিন আরও পরিণত হচ্ছে। এই অংশীদারিত্ব জনগণের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে সামনে রেখেই গড়ে উঠছে।’ সঙ্গে তিনি জানান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মহাকাশ প্রযুক্তি এবং শিক্ষা এই সব ক্ষেত্রেই যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করবে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও সমানভাবে আশাবাদী। তিনি জানান, ভারত এখন ইউরোপীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী, এবং ‘দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও নতুন উদাহরণ তৈরি করছে।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী দিনে এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে চলেছে।
দুই দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল উদ্ভাবন এবং পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তির উন্নয়ন। মোদী জানান, ‘বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন বাধ্যতামূলক। ভারত-ইতালি একসঙ্গে কাজ করলে ডিজিটাল ক্ষেত্র আরও শক্তিশালী হবে।’ বিশেষত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ গবেষণা নিয়ে দুই দেশের বিশেষ আগ্রহের কথা উঠে আসে বৈঠকে। ইতালি দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ভারতের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, প্রতিরক্ষা-উৎপাদন, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক সহযোগিতা আরও গভীর হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন মেলোনি। এদিকে ভারতও তার প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করতে চাইছে। ফলে দুটি দেশের কৌশলগত স্বার্থ আজ একসঙ্গে মিলিত হয়েছে, এ কথা অনস্বীকার্য।
কিন্তু বৈঠকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত ছিল সন্ত্রাসে অর্থ জোগান রোধে ভারত-ইতালি যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা। মোদী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সন্ত্রাসবাদ যে কোনও সভ্যতার জন্য হুমকি। এর পিছনে আর্থিক জোগান যেভাবে চলছে, তা বন্ধ করা ছাড়া বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’ এই কথার সঙ্গে একমত হয়ে জর্জিয়া মেলোনি বলেন, ‘টেরর ফাইন্যান্সিং বন্ধ করা শুধু কোনও একটি দেশের দায়িত্ব নয়, এটি গোটা মানবসমাজের দায়বদ্ধতা। আমরা দু’দেশ মিলে এই প্রচেষ্টা আরও জোরালো করব।’ বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলি যত দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে, সেই তুলনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রায়ই ধীরগতির হয়। তাই ভারত-ইতালির এই নতুন যৌথ উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক মহল অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। দুই দেশের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ইউরোপ-এশিয়া নিরাপত্তা সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রসঙ্গে দুই নেতাই বলেছেন, যৌথ শিল্প-প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সবুজ শক্তি, অটোমোবাইল এবং শিক্ষা গবেষণা- এই সব ক্ষেত্রেই আগামী বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। মোদী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, ‘ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি। ইতালির প্রযুক্তি ও দক্ষতা ভারতের বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আমরা একসঙ্গে পরিকল্পনা করছি।’ ওই বৈঠকে দুই দেশের যুবসমাজ এবং গবেষণা সহযোগিতার প্রসঙ্গও বিশেষ গুরুত্ব পায়। দুই নেতা মনে করেন, যুবসমাজকে যুক্ত করা গেলে উদ্ভাবনের জগতে এক নতুন দিগন্ত খুলবে। শিক্ষা বিনিময় এবং গবেষণা-সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন কর্মসূচী শিগগিরি ঘোষণা করা হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তারা।
জোহানেসবার্গে এই বৈঠকের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও মন্তব্য করেছে যে, এই বৈঠক শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎই নয়, এটি ভারত-ইতালি সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সন্ত্রাসে অর্থ জোগান রোধে দুই দেশের যৌথ ঘোষণা বৈশ্বিক কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক নীতিতেও প্রভাব ফেলবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মোদী-মেলোনি বৈঠক শুধু রাজনৈতিক আলাপই নয়, তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনের ওপর এক বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ আগামী দিনে কী নতুন পরিবর্তন আনে, তা এখন আন্তর্জাতিক দুনিয়ার নজরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi G20 Johannesburg Visit | জোহানেসবার্গে পা রাখতেই বিশ্বজনীন বার্তা, প্রধানমন্ত্রী মোদী বললেন, ‘মানবতার ভবিষ্যৎ রক্ষাই G20 -এর মূল লক্ষ্য’




