বিনীত শর্মা ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিল্পপতি ও হিন্দুজা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গোপীচাঁদ পরমানন্দ হিন্দুজা (Gopichand P Hinduja) আর নেই। মঙ্গলবার লন্ডনের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। টোরি দলের সদস্য ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসের সদস্য রামি রেঞ্জার (Rami Ranger) সামাজিক মাধ্যমে এই খবর নিশ্চিত করেন। রেঞ্জার তাঁর শোকবার্তায় লেখেন, “গোপীচাঁদ হিন্দুজা ছিলেন সবচেয়ে দয়ালু, নম্র ও বিশ্বস্ত বন্ধু। তাঁর মৃত্যু একটি যুগের অবসান।”
বিশ্বব্যাপী হিন্দুজা গোষ্ঠীর আর্থিক সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলেও, তার মূলে ছিল গোপীচাঁদের অসামান্য দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্ব। যুক্তরাজ্যের Sunday Times Rich List অনুসারে, টানা সাত বছর ধরে তিনি ও তাঁর পরিবার ব্রিটেনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্থান ধরে রেখেছিলেন। শিল্প, অর্থনীতি ও সামাজিক দায়িত্ব, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল অনন্য। প্রসঙ্গত, ১৯৪০ সালে অবিভক্ত ভারতের করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন গোপীচাঁদ হিন্দুজা। তাঁর পিতা পরমানন্দ দীপচাঁদ হিন্দুজা (Parmanand Deepchand Hinduja) ১৯১৪ সালে হিন্দুজা গ্রুপের সূচনা করেন, যা শুরু হয়েছিল এক ছোট ট্রেডিং ব্যবসা দিয়ে। কিন্তু পরবর্তীকালে গোপীচাঁদ ও তাঁর বড় ভাই শ্রীচাঁদ হিন্দুজা (Srichand Hinduja)-এর নেতৃত্বে সেটি পরিণত হয় এক বহুজাতিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে।হিন্দুজা গ্রুপ বর্তমানে ১১টি প্রধান খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে, যার মধ্যে রয়েছে, অটোমোটিভ, ব্যাঙ্কিং ও ফিনান্স, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, রিয়েল এস্টেট, জ্বালানি, মিডিয়া ও বিনোদন। গ্রুপের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে রয়েছে অশোক লেল্যান্ড (Ashok Leyland), ইন্ডাসইন্ড ব্যাংক (IndusInd Bank) ও NXTDigital Limited।
গোপীচাঁদ হিন্দুজা ছিলেন একাধারে ব্যবসায়ী, দাতব্যকর্মী ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ। তিনি হিন্দুজা অটোমোটিভ লিমিটেড (Hinduja Automotive Limited) -এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। ২০২৩ সালে বড় ভাই শ্রীচাঁদ হিন্দুজার প্রয়াণের পর তিনি হিন্দুজা গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। শিক্ষাজীবনে তিনি মুম্বইয়ের জয় হিন্দ কলেজ (Jai Hind College) থেকে স্নাতক হন ১৯৫৯ সালে। এরপর ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় (University of Westminster) তাঁকে সাম্মানিক Doctor of Law ডিগ্রিতে ভূষিত করে, আর লন্ডনের রিচমন্ড কলেজ (Richmond College) তাঁকে দেয় Doctorate in Economics-এর সম্মান। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন যেমন সরল ছিল, তেমনি পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রম ও নীতিবান। তিনি বারবার বলতেন, “সফলতার গোপন রহস্য হল বিশ্বাস ও সততা।”
তাঁর নেতৃত্বে হিন্দুজা গ্রুপ শুধু আর্থিকভাবে নয়, সামাজিক দায়িত্বেও বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়। হিন্দুজা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণমূলক প্রকল্পে শত কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে গত কয়েক দশকে। ব্রিটেন ও ভারতের ব্যবসা মহলে তাঁর মৃত্যু গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন (Boris Johnson) ও ভারতের শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল (Piyush Goyal) দু’জনেই টুইট করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। পীযূষ গয়াল লিখেছেন, “গোপীচাঁদ হিন্দুজা ছিলেন ভারতীয় উদ্যোগের বিশ্বদূত। তাঁর কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।”
গোপীচাঁদের পরিবারের মধ্যে রয়েছেন স্ত্রী মদু হিন্দুজা (Madhu Hinduja), দুই পুত্র সঞ্জয় (Sanjay Hinduja) ও ধরেশ (Dharresh Hinduja)। বর্তমানে ব্যবসার মূল দায়িত্ব তাঁদের হাতে। হিন্দুজা গ্রুপের ইতিহাস যেমন ভারতের বাণিজ্যের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত, তেমনি গোপীচাঁদ হিন্দুজার জীবনীও প্রতিফলিত করে এক সত্য, “শূন্য থেকে সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব, যদি স্বপ্ন দেখার সাহস থাকে।” উল্লেখ্য, তাঁর প্রয়াণে ভারত, ব্রিটেন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সত্যজিৎ রায়ের এক উক্তি এখানে মানানসই, “বড় মানুষরা মারা যান না, তাঁরা ইতিহাস হয়ে থাকেন।” গোপীচাঁদ হিন্দুজাও থেকে যাবেন তেমনি এক ইতিহাসের অংশ হিসেবে। তিনি ভারতীয় উদ্যোগ ও সততার মিশেলকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছিলেন।
ছবি : সংগৃহীত



