Travelog : Mathura Vrindavan boat ride | মথুরা বৃন্দাবনের যমুনা ঘাটে নৌকা ভ্রমণ যেন স্বর্গীয় শান্তির স্পর্শ

SHARE:

আবার এক জায়গায় দেখা গেল ছোট্ট ঘাট, যেখানে ভোরে কৃষ্ণ ভক্তরা পদ্মাসনে বসে জপ করছেন। কিছু দূরে আবার যমুনার বুকে ভেসে আছে পদ্ম ফুলের মালা, ধূপকাঠির ধোঁয়া, ভক্তদের ফেলে দেওয়া প্রদীপ।

সঞ্জয় সান্যাল : মথুরা (Mathura) ও বৃন্দাবন (Vrindavan)। নাম শুনলেই হৃদয় জুড়ে যায় এক অদ্ভুত শান্তি ও ভক্তির উচ্ছ্বাসে। এই দুই শহর শুধু উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) ধর্মীয় পর্যটনের কেন্দ্রই শুধু নয়, ভারতের প্রাচীন ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্রও বটে। এবারের ভ্রমণে আমরা বেছে নিয়েছিলাম একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা, যমুনা (Yamuna) নদীর বুকে নৌকা ভ্রমণ। যমুনার শান্ত জলে ভাসতে ভাসতে মন্দিরশহরের সেই অপরূপ রূপ দর্শন করাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। সেদিন নৌকা ছাড়তেই প্রথমেই চোখে পড়ল ঘাটের ধারে সারি সারি মন্দির। পেছনে উঁচু উঁচু গম্বুজ, ছোট ছোট শিখর, রঙিন পতাকা আর ঘন্টার শব্দে তৈরি এক অপার্থিব অনুভূতি। যমুনা থেকে দেখা এই মন্দিরগুলির দৃশ্য যে কতটা মনোমুগ্ধকর, তা শব্দে প্রকাশ করা মুশকিল। মন্দিরের ছায়া নেমে আসে জলে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে নাচে সেই ছায়া, কখনও ম্লান, কখনও গাঢ়। মনে হয়, ওই যে, যেন কৃষ্ণ (Krishna) লীলা দেখাচ্ছেন ভক্তদের।

যমুনা নদীর ওপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে মনে হচ্ছিল, জীবনের সব কোলাহল, সব দুঃখ যমুনা নিজের বুকে টেনে নিয়ে শুধু শান্তি ফিরিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যার আগে যখন ফেরার সময় এলো, সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। কমলা আলোয় মন্দিরগুলির গায়ে ঝিলিক খেলে যাচ্ছিল। নদীর জলে সেই প্রতিফলন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থাকে, তবে তার ছোঁয়া পাওয়া যায় এই মথুরা বৃন্দাবনের যমুনা ঘাটে নৌকা ভ্রমণে।

নৌকোয় বসে থাকতে থাকতে চোখে পড়ল বিখ্যাত বিশ্বরূপ মন্দির (বা Vishram Ghat Temple)। শোনা যায়, কংস (Kansa) বধের পর শ্রীকৃষ্ণ এখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তাই এই ঘাটের নাম ‘বিশ্রাম ঘাট’ (Vishram Ghat)। এরপর পরই শুরু হল মন্দিরের অসংখ্য শৃঙ্খল, কোথাও শিব মন্দির (Shiva Temple), কোথাও রাধা (Radha) কৃষ্ণের প্রেমময় বিগ্রহ, কোথাও আবার দশাবতার মন্দির (Dashavatar Temple) তার প্রাচীন ভগ্নপ্রায় সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি মন্দিরেরই নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব আখ্যান। গাইড বলছিলেন, এই মন্দিরগুলির অনেকগুলিই ১৬-১৭শ শতাব্দীতে নির্মিত। পরে মুঘল ও ব্রিটিশ আক্রমণে অনেক মন্দির ভেঙে গেলেও, তাদের গল্প আজও নদীর বাতাসে ভেসে বেড়ায়। বৃন্দাবনের দিকে এগোতে এগোতে নদীর পাড়ে দেখা গেল প্রাচীন কালী মন্দির (Kali Temple)। লালচে পাথরে গড়া এই মন্দিরের গায়ে সূক্ষ্ম নকশা আর টেরাকোটার কাজ। জলের দিক থেকে এমনভাবে দেখা যায় যে মন্দিরটি যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে। আবার এক জায়গায় দেখা গেল ছোট্ট ঘাট, যেখানে ভোরে কৃষ্ণ ভক্তরা পদ্মাসনে বসে জপ করছেন। কিছু দূরে আবার যমুনার বুকে ভেসে আছে পদ্ম ফুলের মালা, ধূপকাঠির ধোঁয়া, ভক্তদের ফেলে দেওয়া প্রদীপ।

আবার এক জায়গায় দেখা গেল ছোট্ট ঘাট, যেখানে ভোরে কৃষ্ণ ভক্তরা পদ্মাসনে বসে জপ করছেন। কিছু দূরে আবার যমুনার বুকে ভেসে আছে পদ্ম ফুলের মালা, ধূপকাঠির ধোঁয়া, ভক্তদের ফেলে দেওয়া প্রদীপ।
মথুরা-বৃন্দাবনে নৌকা ভ্রমণ। ছবি: সংগৃহীত

এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক আধ্যাত্মিকতার মাদকতা।যমুনার এপারে সম্পূর্ণ আলাদা এক ছবি। বিস্তীর্ণ সবুজ ফাঁকা জমি, মাঝে মাঝে নারকেল ও তালগাছের সারি, মাটির ছোট কুঁড়েঘর। নদীর ওদিকটায় যেন প্রকৃতি আজও তার অরূপ রূপে বিরাজমান। নৌকায় বসে এদিক ওদিক তাকালেই মনে হচ্ছিল, একপাশে নগরসভ্যতা, অন্যপাশে প্রকৃতির নির্জনতা। আর মাঝখান দিয়ে বইছে যমুনা, যুগ যুগান্ত ধরে কৃষ্ণভক্তি ও মানুষের জীবনকে একসূত্রে বেঁধে। এই নৌকা সফর শুধু পর্যটন নয়, এক গভীর আত্মিক অভিজ্ঞতা। মনে হচ্ছিল, মথুরা বৃন্দাবনের প্রতিটি ধুলো কণাতেই মিশে আছে কৃষ্ণের স্মৃতি। গাইড বলছিলেন, ‘দেখুন, এখানে আসলে কেউ খালি হাতে ফেরে না। না ভক্তি, না শান্তি, কিছু না কিছু নিয়েই ফেরেন।’ সত্যিই, যমুনা নদীর ওপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে মনে হচ্ছিল, জীবনের সব কোলাহল, সব দুঃখ যমুনা নিজের বুকে টেনে নিয়ে শুধু শান্তি ফিরিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যার আগে যখন ফেরার সময় এলো, সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। কমলা আলোয় মন্দিরগুলির গায়ে ঝিলিক খেলে যাচ্ছিল। নদীর জলে সেই প্রতিফলন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থাকে, তবে তার ছোঁয়া পাওয়া যায় এই মথুরা বৃন্দাবনের যমুনা ঘাটে নৌকা ভ্রমণে।

যাঁরা ভ্রমণ পিপাসু, তাঁদের জন্য কিছু তথ্য, মথুরা রেলস্টেশন থেকে বিশ্রাম ঘাটের দূরত্ব মাত্র ২ কিলো মিটার। রিকশা, অটো সহজেই পাওয়া যায়। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নৌকা সার্ভিস চালু থাকে। নৌকা ভাড়া ৫০ টাকা থেকে শুরু হয়। চাইলে গাইডেড ট্রিপও নিতে পারেন, গাইডদের থেকে মন্দিরের ইতিহাস ও লোককথা শুনতে পাবেন। শ্রাবণ মাসে বা জন্মাষ্টমীর সময় ভিড় বেশি হয়, তাই আগে থেকে সময় ঠিক করাই ভাল।মথুরা বৃন্দাবন ভ্রমণ পূর্ণ হয় যমুনা ঘাটে এই নৌকা সফরেই। নদীর বুকে বসে থাকা, মন্দিরশহরকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা আর অনুভব করা জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে প্রকৃতি, ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও ভালবাসায় মিশে যাওয়ারও একটি অনন্য উপায়।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Manali | মানালি: পাহাড়ি রূপকথার পাতায় ছুটি কাটানোর ঠিকানা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন