Parenting | ছেলের বড় হওয়া, পারফেকশনের খোঁজে আমি ব্যস্ত, আর ও হাঁটছিল নিজের পথেই : অনুকৃতি

SHARE:

মিলি ঘোষ ★ সাশ্রয় নিউজ : “আমি কোনও সন্তানের জন্ম দিইনি, ওরা নিজেরাই নিজেদের তৈরি করে নিয়েছে”। এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তির মতোই শোনায় অনুকৃতি উপাধ্যায়ের (Anukrti Upadhyay) কথা। সন্তান প্রতিপালনের নিখুঁত কোনও ফর্মুলা নেই, মা হিসেবে এ কথা অকপটে স্বীকার করেছেন লেখিকা। ভারতীয় সমাজে যেখানে সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণে রাখাই ‘ভাল মা’-এর (Parenting) লক্ষণ বলে বিবেচিত, সেখানে অনুকৃতির এই স্বীকারোক্তি নতুন আলো ফেলেছে মাতৃত্ব এবং সন্তান প্রতিপালনের ধারণার ওপর।

-প্রতীকী ছবি

ব্যাঙ্কিং জগতের একজন সম্পূর্ণসময়ের কর্মী হিসেবে যখন তিনি মা হন, তখন নিজের মত করে তৈরি করেছিলেন ছেলেকে মানুষ করার এক ছকে বাঁধা পরিকল্পনা। “আমি প্রতিটি পদক্ষেপে ভাবতাম, আমি ঠিক করছি তো? ঠিকভাবে দুধ দিচ্ছি তো? তার মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য যথেষ্ট করছি তো? এমনকী, ওর চুল না কাটার মতো ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন ছিলাম,” বলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা বারবার তাঁর সেই কল্পনার কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেন, “গাছের যত্ন নিই, জল দিই, আলোতে বসাই, কথা বলি। কিন্তু গাছ নিজেই বড় হয়। আমার ছেলে-ও তাই। আমি শুধু পাশে ছিলাম। ও নিজের মতো বড় হয়েছে।” এই কথাগুলোর মধ্যে এক ধরনের মা-মানবিক আত্মসমর্পণের গন্ধ পাওয়া যায়, যা নিয়ন্ত্রণের বদলে গ্রহণের মত না কিছুটা? ছেলের শৈশবের স্মৃতি টেনে আনেন লেখিকা। একসময় যে ছেলে চুল কাটতে চাইত না, বা স্কুলের নিয়ম মানতে অনাগ্রহী ছিল, সেই ছেলেই এখন একজন আত্মবিশ্বাসী, স্পষ্টভাষী তরুণ। “আমি অবাক হই, ও কীভাবে এমন হল! আমি তো এসব কিছু শিখাইনি। বরং, অনেক সময় ও-ই আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে,” বলেন অনুকৃতি।এত কথার মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে এক গভীর সত্য, আমরা আমাদের সন্তানদের নিরন্তর গড়ে তোলার চেষ্টায় থাকি, অথচ তারা নিজেদের মতো করে তৈরি হয়। এই নির্মাণে আমাদের প্রভাব থাকলেও তা চূড়ান্ত নয়। বরং, সন্তানের নিজের চাওয়া, নিজের চলার পথই তাকে তার মত করে গড়ে তোলে। তিনি আরও বলেন, “বিশ্বাস করুন, আমি গল্প লিখতেও ঠিক মত পারি না, একটা চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না। একটা সম্পূর্ণ মানুষ কীভাবে তৈরি করব?” এই বিনয়ের মধ্যে যে গভীর উপলব্ধি রয়েছে, তা কেবল একজন মা-ই বলতে পারেন যিনি নিজের চেষ্টার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে প্রস্তুত। মাতৃত্বের ‘পারফেকশনিজম’ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। সমাজের চাপ, সোশ্যাল মিডিয়ার ‘পারফেক্ট পেরেন্টিং’-এর প্রলোভন। সব কিছুর ভেতরে নিজের সন্তানের স্বাভাবিক প্রবাহে বড় হয়ে ওঠার জায়গা করে দেওয়া কি আসলে কঠিন নয়? অনুকৃতি তার অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেয়েছেন, “হ্যাঁ, আমি হয়ত কিছুর চেষ্টা করেছি, অনেক পড়ে নিয়েছি, নিজেকে সংশয়ের ভেতর নিয়ে গিয়েছি। কিন্তু শেষমেশ দেখেছি, ও আমার প্রচেষ্টার বাইরে নিজের জগত তৈরি করছে। এবং সেটাই সবচেয়ে সুন্দর।”

Read : Love Affairs : বিয়ের তিন দিনের মাথায় স্বামীকে ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরল নতুন বউ

এখানে মনে রাখতে হবে, এই গল্প কেবল একজন মা ও ছেলের সম্পর্কের নয়। এটা সেই প্রতিটি অভিভাবকের জন্য যারা নিখুঁত বাবা-মা হওয়ার দুশ্চিন্তায় সন্তানদের শৈশব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। অনুকৃতির চোখে, সবচেয়ে ভাল ‘পেরেন্টিং’ হল পাশে থাকা, আর সন্তানকে নিজের মতো বেড়ে ওঠার জায়গা দেওয়া। লেখিকার মতে, “আমি প্রতিদিন অনেক কথা বলি। গাছেরা শোনে। পাখিরা মাঝে মাঝে উড়ে যায়। কিন্তু আমার ছেলে? ও থাকত, শোনার ভান করত, অথবা সত্যিই শুনত, আমি জানি না। কিন্তু আজ যে ও একজন সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠেছে, সেটা দেখে আমি কৃতজ্ঞ।” এই নিরাভরণ, অনাড়ম্বর আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তি নতুন করে ভাবতে শেখায়। মা হওয়া মানেই সব জানার দায়িত্ব নয়। কখনও কখনও না জানাটাই সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা। সন্তান যদি নদী হয়, তবে মা কেবল তীর। কখনও আগলে রাখা, কখনও ছেড়ে দেওয়া। আর সেই ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেই সন্তান বড় হয়। চুল না কাটার অভ্যেস নিয়ে শুরু হয়েছিল যে ছেলের গল্প, সে আজ নিজের ভাষায় কথা বলে। নিজের মত করে পথ বেছে নেয়। মা হয়ত তাকে ‘বানাননি’, কিন্তু তার পাশে ছিলেন। সেটাই যথেষ্ট ছিল একটি সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য! তবে প্রশ্ন থাকেই, আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশে প্রতিক্ষেত্রে সেটা কতটা সম্ভব? তবে অনুকৃতির কলম থেকে নেমে আসা শব্দগুলি নিঃসন্দেহে আশা জাগায়। ইতিবাচক আলো দেয় এটা মানতেই হয়।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Relationships : শুধু ভালবাসা নয়, বাঁচাতে হবে সম্পর্কও, সঙ্গীকে আজই বলুন এই ৫টি কথা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন