Zero-Sum Thinking America | আমেরিকায় বাড়ছে ‘জিরো-সম থিংকিং’-এর ঝোঁক

SHARE:

অলোক নাথ : হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক স্টেফানি স্তান্তচেভা সম্প্রতি লিখেছেন, ‘আমেরিকার কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় জিরো-সম মানসিকতা ধারণ করেন।’ তার মতে, এই মানসিকতা বোঝা এখন আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনীতিকে বোঝার জন্য অপরিহার্য। আসলে জিরো-সম থিংকিং (Zero-Sum Thinking) বলতে বোঝায় এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে মনে করা হয়, এক পক্ষের লাভ মানেই অন্য পক্ষের ক্ষতি। সহজ কথায়, পৃথিবীকে একটি স্থির পাই বা কেক হিসেবে দেখা হয়, কারও ভাগে বেশি মানেই অন্য কারও ভাগে কম। এই মানসিকতা শুধু নীতি নির্ধারক নয়, সমাজের সাধারণ মানুষের আচরণেও গভীর প্রভাব ফেলে।

বর্তমানে সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়, আমেরিকার রাজনৈতিক বিতর্কগুলির বড় অংশই এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ঘিরে তৈরি। যেমন, চীনের (China) সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হলে মনে করা হয়, আমেরিকা (America) হারছে। বিদেশি ছাত্রছাত্রী আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে মনে করা হয়, সেখানকার ছাত্রদের আসন কমছে। অভিবাসীরা কাজ পেলে মনে করা হয়, দেশের নাগরিকদের চাকরি কমছে। এমনকি, ডাইভারসিটি ইনিশিয়েটিভ (Diversity Initiative) বা লিঙ্গ ও বর্ণ বৈচিত্র্য বৃদ্ধির কোনও প্রকল্পে কোনও সংখ্যালঘু বা মহিলাদের সুবিধা পেলে ধরে নেওয়া হয়, অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। স্তান্তচেভা (Stantcheva) বলেন, ‘এই দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যেমন বৈষম্যকে আরও বাড়ায়, অন্যদিকে সমাজে বিভাজনও তৈরি করে। সব কিছুকে হার-জিতের লড়াই হিসেবে দেখলে সমন্বয় ও সমবায়ের জায়গা কমে যায়।’

তার গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তরুণ প্রজন্ম ও শহুরে মানুষদের মধ্যে এই মনোভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ, তারা বেশি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বেড়ে উঠছে। ছোটবেলা থেকে কলেজ, তারপর চাকরির ইন্টারভিউ সব জায়গাতেই তাদের শেখানো হচ্ছে, তুমি না জিতলে অন্য কেউ জিতবে। ফলে সমাজের সামষ্টিক উন্নতি নয়, ব্যক্তিগত জয়ই হয়ে উঠছে মূল লক্ষ্য।বিশেষজ্ঞদের কথায়, এই জিরো-সম মানসিকতার ফলে সমাজে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে। একজনের লাভকে আর অন্যের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা হয় না। বরং, তা হয়ে ওঠে হিংসার কারণ। উদাহরণ হিসেবে, ইমিগ্রেশন (Immigration) নীতির কথাই ধরা যাক। আমেরিকার অনেক নাগরিক মনে করেন, অভিবাসীরা এলে তাদের বেতনে চাপ পড়বে বা চাকরি যাবে। অথচ বাস্তবে দেখা গিয়েছে, অভিবাসীরা অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেন, যা সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থিক বৃদ্ধিতেই সহায়ক হয়। হার্ভার্ডের (Harvard) অর্থনীতিবিদ স্তান্তচেভা (Stantcheva) আরও বলছেন, ‘জিরো-সম থিংকিং থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের শিক্ষা ও আলোচনার ধরন বদলাতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, অনেক ক্ষেত্রেই একসঙ্গে সবাই লাভবান হতে পারে।’ অর্থাৎ, লস-গেন নয়, উইন-উইন পরিস্থিতি তৈরির মানসিকতা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই মানসিকতা রাজনৈতিক নেতাদের বয়ান ও মিডিয়ার উপস্থাপনাতেও নির্মিত হয়। যদি সব বিতর্কেই একপক্ষকে ‘ভিক্টিম’ ও অন্য পক্ষকে ‘ভিলেন’ হিসেবে দেখানো হয়, তবে মানুষও সেই দৃষ্টিভঙ্গি শিখে নেবে। ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির (Florida State University) অধ্যাপক টমাস মিলার (Thomas Miller) বলেন, ‘মিডিয়ায় যত বেশি জিরো-সম আঙ্গিকে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করা হবে, সমাজও ততটাই বিভক্ত হবে।’ বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে এই মনোভাব কূটনৈতিক সম্পর্ককেও জটিল করে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের (China) প্রযুক্তিগত উন্নতি বা আফ্রিকায় (Africa) তাদের বিনিয়োগকে অনেকেই আমেরিকার পরাজয় হিসেবে দেখেন। অথচ, বাস্তবে এই বিনিয়োগ বহু দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করছে। তবে, জিরো-সম দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে সেই ইতিবাচক দিকটি দেখতেই দেয় না।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মানসিকতা মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও অভাববোধ থেকে জন্ম নেয়। ছোটবেলা থেকে যদি শেখানো হয়, ‘রিসোর্স কম, লড়াই করো’, তাহলে বড় হয়ে তারা সহযোগিতার পথ কম খুঁজে পায়। ফলে, অন্যের প্রাপ্তি মানেই তাদের মনে হয়, নিজেদের হাত থেকে কিছু চলে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে সমাধান কী? স্তান্তচেভা (Stantcheva) বলেন, ‘প্রথমে স্বীকার করতে হবে, এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের চিন্তাধারারই অংশ। তারপর ধাপে ধাপে তা ভাঙতে হবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিগুলি এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ একে অপরের পরিপূরক হতে শেখে, প্রতিযোগী নয়।’ শিক্ষাবিদরা মনে করেন, স্কুলের পাঠক্রমে সহাবস্থান ও সহযোগিতার শিক্ষাকে জায়গা দিতে হবে। একইসঙ্গে, রাজনৈতিক নেতাদেরও ভাষা বদলানো প্রয়োজন, ভোটের অঙ্কে না ভেবে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বলতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এই জিরো-সম থিংকিং রাতারাতি কমবে না। কারণ, এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত। তবুও, আশার কথা হল, কিছু মানুষ ও সংস্থা ইতিমধ্যেই এই বিভাজনকামী দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছেন। যেমন, সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক (New York)-এর একটি স্কুলে ‘শেয়ারড গ্রোথ’ (Shared Growth) প্রজেক্ট চালু হয়েছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের শেখানো হচ্ছে, একসঙ্গে উন্নতিই প্রকৃত উন্নতি। প্রশ্ন একটাই, মানুষ কি অন্যের প্রাপ্তিকে নিজের ক্ষতি হিসেবে দেখতে দেখতে আরও নিঃসঙ্গ হবে, নাকি মিলিত উন্নতির পথে হাঁটবে? উত্তর সময়ই দেবে। তবে স্টেফানি স্তান্তচেভা (Stefanie Stantcheva)-র গবেষণা অন্তত এই সত্যই সামনে নিয়ে আসছে, জিরো-সম থিংকিং এর ব্যাখ্যা না বোঝা পর্যন্ত আমেরিকার সমাজ ও অর্থনীতির গতিপথও সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত 
আরও পড়ুন : Elon Musk Epstein file leak | ‘ট্রাম্পকে বিশ্বাস করবেন কীভাবে?’ এপস্টিন ফাইল নিয়ে তোপ মাস্কের

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন