সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে | রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী 26 যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে| কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ | জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন-
দেবব্রত সরকার
(আজ তার প্রথম কিস্তি)
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। মার্ক্সবাদী বাম শাসনের ঐতিহ্য থেকে শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান, বিজেপির দ্রুত শক্তি-সঞ্চয়, এবং কংগ্রেসের ঐতিহাসিক উপস্থিতি সব মিলিয়ে বাংলার ভোট-রাজনীতি একটি বহুমাত্রিক ও গতিশীল ক্ষেত্র। প্রশ্ন হল: বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগিয়ে আছে কে, বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম (বামফ্রন্ট), না কংগ্রেস? এই বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক রূপরেখা, বর্তমান সমীকরণ, ইস্যু-ভিত্তিক লড়াই, সামাজিক গণিত, সংগঠন-ক্ষমতা ও আগাম সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
১৯৭৭ থেকে টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনে (প্রধানত সিপিএম নেতৃত্বে) গ্রামীণ সংগঠন ও ক্যাডারভিত্তিক শক্তিশালী কাঠামো গড়ে ওঠে। জমি সংস্কার, পঞ্চায়েততন্ত্র, গ্রামভিত্তিক সংগঠন ছিল প্রধান শক্তি।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) পরিবর্তনের ঢেউ তোলে। সিংগুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের রাজনীতিক পুঁজি কাজে লাগিয়ে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ২০১৪-পরবর্তী সময়ে বিজেপি জাতীয় স্তরে সংগঠন ও ন্যারেটিভের বিস্তার ঘটায়; বাংলায় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রাজ্য রাজনীতিতে দুই-মেরু সংঘাতকে তীব্র করে।
রাজ্যে ঐতিহাসিক দল হিসেবে কংগ্রেসের উপস্থিতি থাকলেও বামফ্রন্ট ও তৃণমূলের মধ্যে স্যান্ডউইচ হয়ে সংগঠনগত শক্তি ক্ষয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে জোটরাজনীতি ও জেলা-পকেটভিত্তিক প্রভাবের ওপর নির্ভরতা বেশি।
বর্তমান সমীকরণ: কে এগিয়ে?
তৃণমূল কংগ্রেস: রাজ্য-পর্যায়ের শাসনক্ষমতা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ওয়েলফেয়ার ডেলিভারি (দুয়ারে সরকার, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, ছাত্র-ক্রেডিট, স্বাস্থ্যসাথী ইত্যাদি), এবং গ্রাউন্ড-লেভেল ক্যাডার নেটওয়ার্ক এসব কারণে তৃণমূল রাজ্যে শক্ত অবস্থানে। গ্রামীণ ও মফসসল এলাকায় তৃণমূলের প্রভাব তুলনামূলক দৃঢ়।
বিজেপি: বিরোধী শিবির হিসেবে বিজেপির সংগঠনগত বিস্তার, হিন্দিবল্ট থেকে রিসোর্স-সাপোর্ট, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ক্যাম্পেন ও সামাজিক মিডিয়া প্রভাব সব মিলিয়ে বিজেপি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। উত্তরবঙ্গ, জঙ্গিপুর-মালদহ-দিনাজপুরের কিছু অংশে, এবং শহর-প্রান্তের ভোটব্যাংকে বিজেপির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
সিপিএম (বামফ্রন্ট): ছাত্র-যুব আন্দোলন, ইস্যুভিত্তিক জনঅভিযান (চাকরি, দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষাক্ষেত্র) এবং নীতিভিত্তিক রাজনীতির কারণে বামফ্রন্ট আবার জন-আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে। তবে আসন-গণিতে এবং বুথ-ম্যানেজমেন্টে টেকসই রূপান্তর ঘটাতে আরও সময় ও ক্যাডার-রি-অর্গানাইজেশন দরকার।
কংগ্রেস: মালদহ-মুর্শিদাবাদ সহ ক’য়েকটি ঐতিহ্যবাহী ভোট পকেটে কংগ্রেসের প্রভাব রয়ে গেছে। জোট-সমীকরণ, স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রার্থী-নির্বাচন কংগ্রেসের সম্ভাবনা নির্ধারণ করবে।
Congress Politician Pawn khera arrest : কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে গ্রেফতার দিল্লি বিমান বন্দরে
ইস্যু-ভিত্তিক লড়াই
উন্নয়ন বনাম দুর্নীতি: তৃণমূল উন্নয়ন-সুবিধা ও ওয়েলফেয়ার-স্কিমকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখে; বিরোধী দলগুলো নিয়োগ-দুর্নীতি, বেআইনি নিয়োগ, দুর্নীতির অভিযোগ, এসব ইস্যুতে সরকারকে কোণঠাসা করতে চায়।
পরিচয়-রাজনীতি ও মেরুকরণ: বিজেপি নাগরিকত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, ধর্মীয় মেরুকরণ ও জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভে জোর দেয়; তৃণমূল ‘বাংলা নিজেই মেয়ে’ ধরনের আঞ্চলিক গর্ব, সংখ্যালঘু-সহনশীলতার পজিশনিং ও সামাজিক সংহতিকে সামনে আনে।
চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্র: যুবকর্মসংস্থান, স্কুল-কলেজে নিয়োগ-পদ্ধতি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, এসব প্রশ্নে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস মাঠে ধারাবাহিক আন্দোলন করে সুনাম অর্জন করছে।
স্থানীয় ইস্যু: পঞ্চায়েত-স্তরে রাস্তা, জল, স্বাস্থ্য, কৃষক-সহায়তা, ও বাজার-অধিকারের মতো বিষয়গুলো গ্রামীণ ভোট নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
সামাজিক অংক ও ভোটব্যাংক
সংখ্যালঘু ভোট: ঐতিহাসিকভাবে তৃণমূল ও কংগ্রেসের দিকে ঝোঁক; বিজেপির সঙ্গে এই ভোটব্যাংকের দূরত্ব তুলনামূলক বেশি। বামফ্রন্টও সংখ্যালঘু এলাকায় সংগঠন পুনর্গঠনে সচেষ্ট।
নারী ভোট: তৃণমূলের একাধিক স্কিম নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করে। বিজেপিও নারী-নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় স্কিমের কার্যকারিতা সামনে আনে। নারীদের টার্নআউট গত কয়েক নির্বাচনে গেমচেঞ্জার হয়েছে।
তরুণ ভোট: চাকরি, এক্সাম-স্ক্যাম, স্টার্টআপ-সমর্থন, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, এসব প্রশ্নে যার ন্যারেটিভ বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য, তারা তরুণদের কাছে এগিয়ে থাকবে। বাম-ছাত্র সংগঠনের মুভমেন্ট গ্রাউন্ডে দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে; বিজেপি ডিজিটাল ক্যাম্পেইনিংয়ে শক্তিশালী; তৃণমূল ওয়েলফেয়ার ও স্থানীয় নেটওয়ার্কে ভরসা করে।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য: উত্তরবঙ্গে বিজেপির পদচিহ্ন ঘন; দক্ষিণবঙ্গের গ্রামীণ বেল্টে তৃণমূলের কাঠামো শক্ত। শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে ইস্যুভিত্তিক সুইং ঘটে, দুর্নীতি ইস্যুতে বিরোধী ভোট কনসলিডেট হতে পারে, আবার ওয়েলফেয়ার-ডেলিভারির সন্তুষ্টিতে শাসকদলের পক্ষেও যেতে পারে।
সংগঠন-ক্ষমতা ও ক্যাডার নেটওয়ার্ক
তৃণমূল: বুথ-লেভেল মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট, পঞ্চায়েত-ভিত্তিক কাঠামো, স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব ও প্রশাসনিক ডেলিভারির কারণে সংগঠনগতভাবে এগিয়ে।
বিজেপি: পূর্বের তুলনায় আরও গভীর সংগঠন তৈরি হয়েছে, শাখা/মণ্ডল স্তরের প্রশিক্ষণ, আইটি-সেল, মাইক্রো-টার্গেটিং। নব প্রজন্মের উপর ভরসা বাড়ছে। প্রার্থী-সিলেকশন ও স্থানীয় জোটকৌশল উন্নত হলে বুথ-রূপান্তর বাড়তে পারে।
সিপিএম: আদর্শভিত্তিক ক্যাডারশিপ রয়েছে; নতুন প্রজন্মকে মাঠে আনার প্রচেষ্টা স্পষ্ট। তবে হারানো বুথ-নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনে সময় লাগবে।
কংগ্রেস: জেলা-নির্ভর নেতৃত্ব, জোট-সমীকরণে লাভবান; কিন্তু রাজ্যব্যাপী একীভূত সংগঠন-নেটওয়ার্ক দুর্বল।
overcome laziness after puja holidays | পুজোর পর কাজে ফেরার ক্লান্তি কাটাতে কার্যকর সহজ উপায়
সম্ভাব্য ফলাফলের নির্ণায়ক
প্রার্থী-নির্বাচন: পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা ও সংগঠন-নিয়ন্ত্রণ, এই ত্রয়ীর ভারসাম্য যে দল করবে, সে দল সুবিধায়।
অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বনাম ডেলিভারি: দীর্ঘমেয়াদী শাসনে স্বাভাবিক অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি থাকে; তবে ওয়েলফেয়ার-ডেলিভারি ও স্থানীয় উন্নয়ন তার প্রভাব কমাতে পারে।
বিরোধী ঐক্য ও ভোট-বিভাজন: BJP-বিরোধী ভোট তৃণমূলের দিকে এককভাবে গেলে তৃণমূল সুবিধায়; আবার তৃণমূল-বিরোধী ভোট যদি BJP/বাম/কংগ্রেসের মধ্যে বিভক্ত হয়, তৃণমূল আরও লাভবান। উল্টোভাবে, শাসক-বিরোধী ভোট একত্রিত হলে বিরোধী শিবির শক্তিশালী হবে।
ক্যাম্পেন ন্যারেটিভ: শেষ মুহূর্তের ইস্যু, মিডিয়া-সেন্টিমেন্ট, এজেন্ডা-সেটিং সব মিলিয়ে ‘কথা’ থেকে ‘কাজ’-এ বিশ্বাসযোগ্য সেতু গড়তে পারাই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।শক্তির চালকই হবে মসনদের দাবি দ্বার।
কে এগিয়ে?
রাজ্য-পর্যায়ের নির্বাচনী সমীকরণে তৃণমূল কংগ্রেস প্রশাসনিক ডেলিভারি ও গ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের কারণে এগিয়ে থাকে।বিজেপি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সংগঠন ও ন্যারেটিভ, দু’দিক থেকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে, বিশেষত উত্তরবঙ্গ ও শহর-প্রান্ত ও মধ্যবঙ্গ জুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছে ফলে নতুন পরিকল্পনায় এগিয়ে দল। অন্যদিকে সিপিএম ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে পুনরুত্থানের সিগন্যাল দিচ্ছে; তবে বুথ-স্তরে টেকসই রূপান্তর জরুরি। নতুন ভাবে গ্রামীণ স্তরে সংগঠন গড়ে তোলা। পুরোনো লিডারদের সরিয়ে নতুন দের স্থান দিলে ভালো ফল করতে পারে বামফ্রন্ট। কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি হ্রাস হয়েছে ফলে সেইদিকে নজর রাখা এবং কংগ্রেসের শক্তি জেলা-পকেট-নির্ভর; জোট ও প্রার্থী-ব্যবস্থাপনার ওপর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
এখানে বলা যেতেই পারে যে প্রার্থী-নির্বাচন, সংগঠন-শক্তি, এবং ভোট-কৌশল, এই তিনের মিলনে যে দল মাঠে ভালো ‘কনভার্সন’ করতে পারবে, তারাই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে।
(চলবে)
ছবি : প্রতীকী




