সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী ‘২৬ যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে। কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ। জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন–
দেবব্রত সরকার
(আজ পঞ্চম কিস্তি)

পঞ্চম কিস্তি লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে হল, নতুন প্রজন্মের ভোট, নতুন রাজনীতি এই পর্বে আমরা দেখব কীভাবে তরুণ সমাজ, ডিজিটাল প্রভাব, সামাজিক পরিবর্তন এবং জাতীয় রাজনীতির ঢেউ পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতিকে এক নতুন আকার দিচ্ছে। সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক প্রভাব ও জাতীয় রাজনীতির গুরুত্ব। রাজনীতি সময়ের সঙ্গে বদলায়। একসময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ছিল দলকেন্দ্রিক, মতাদর্শকেন্দ্রিক ও শ্রেণিভিত্তিক; এখন এটি ক্রমে হয়ে উঠছে “ইস্যুকেন্দ্রিক” ও “প্রজন্মভিত্তিক”। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরাই আজ পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় ভোটারগোষ্ঠী। এই নতুন প্রজন্মের চাওয়া-পাওয়া, চিন্তা, ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা পুরনো ধারা ভেঙে এক নতুন রাজনীতি তৈরি করছে।
তরুণ প্রজন্মের ভোট : কী চায় আজকের যুবসমাজ
ক. কর্মসংস্থান ও চাকরির নিশ্চয়তা
রাজ্যের সবচেয়ে বড় ইস্যু এখন চাকরি। সরকারি নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি সব কিছুই তরুণ ভোটারদের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা বাড়ছে।সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতার দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। বাম ও ছাত্র সংগঠনগুলো এই ইস্যুকে হাতিয়ার করছে।
খ. শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন
তরুণদের প্রত্যাশা শুধু চাকরি নয়, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ। তারা চায় স্টার্টআপ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উদ্যোগে সরকারি সহায়তা। তৃণমূল সরকার “ছাত্রঋণ প্রকল্প” চালু করলেও, বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে।
গ. স্বাধীন মত ও সাংস্কৃতিক চিন্তা
আজকের প্রজন্ম “আইডেন্টিটি পলিটিক্স” বা দলীয় পতাকার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যক্তিগত মত প্রকাশে। তারা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়, রাজনৈতিক নেতাদের কাজের তুলনা করতে পারে, সমালোচনাও করে খোলাখুলি।

ডিজিটাল রাজনীতি : ভোট যুদ্ধে নতুন ময়দান
ক. সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, এক্স (Twitter) এখন রাজনৈতিক প্রচারের মূল হাতিয়ার।
* তৃণমূল “Bangla Nijer Meyekei Chay” স্লোগান তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইমেজ ব্যবহার করছে।
* বিজেপি “পরিবর্তন” ও “দুর্নীতি বিরোধী” প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড তৈরি করছে।
* বাম ছাত্র সংগঠনগুলো “#JobScam”, “#SaveEducation” এর মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রতিবাদ করছে।
খ. তথ্যযুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডা
ভুয়ো খবর, বিকৃত প্রচারণা, ও অনলাইন “ট্রোল আর্মি” এখন প্রতিটি দলেরই অস্ত্র।
ভোটারদের কাছে কোনও তথ্য পৌঁছাবে, সেটাই নির্ধারণ করছে জনমত। এই প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে তরুণরাই মূল টার্গেট।
গ. ইউটিউব সাংবাদিকতা ও বিকল্প মিডিয়া
প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বাইরে “ইন্ডিপেন্ডেন্ট সাংবাদিক” ও ইউটিউব চ্যানেলগুলো এখন ভোটে বড় ভূমিকা রাখছে। এরা তথ্য বিশ্লেষণ, মাঠের রিপোর্ট, এবং “ফ্যাক্টচেক” করে তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রজন্ম-ভিত্তিক কৌশল
ক. তৃণমূল কংগ্রেস
* “ছাত্র যুব তৃণমূল” সক্রিয়ভাবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচারে নেমেছে।
* সরকার নতুন “স্টার্টআপ ইনকিউবেশন” প্রকল্প চালুর কথা বলছে।
* তবে শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি তরুণদের ক্ষোভের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খ. বিজেপি
* “ইয়ং বেঙ্গল” নামে যুব শাখা পুনর্গঠন করছে।
* জাতীয় ইস্যু যেমন CAA, NRC, জাতীয় নিরাপত্তা তরুণদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ জাগানোর চেষ্টা করছে।
* কিন্তু বেকারত্ব ও চাকরির ইস্যুতে স্পষ্ট রূপরেখা দিতে পারেনি।
গ. বামফ্রন্ট
DYFI ও SFI-এর নেতৃত্বে যুব আন্দোলন নতুন করে গতি পেয়েছে। সামাজিক ন্যায়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এই তিন ইস্যুতে তারা তরুণদের সংযুক্ত করছে।
তাদের প্রচারে আদর্শের পাশাপাশি যুক্তিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ঘ. কংগ্রেস
বামদের সঙ্গে যৌথভাবে তরুণ ভোটে প্রবেশের চেষ্টা করছে। ছাত্র সংগঠন NSUI পুনরুজ্জীবিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নারীর ভোট ও তরুণী প্রজন্ম
নারীরা, বিশেষ করে তরুণী ভোটাররা, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন শক্তি।
* “লক্ষ্মীর ভাণ্ডার”, “কন্যাশ্রী”, “রূপশ্রী” প্রকল্পগুলো তৃণমূলকে নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় করেছে।
* তবে শিক্ষিত তরুণীরা এখন রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তার ইস্যু নিয়েও সচেতন।
* বিজেপি ও বাম উভয়ই “নারী সুরক্ষা” ও “কর্মক্ষেত্রের সমতা” নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে।
সংখ্যালঘু ও দলিত তরুণ ভোটারদের নতুন ভূমিকা
সংখ্যালঘু ও দলিত তরুণদের মধ্যে “রাজনৈতিক বিকল্প” খোঁজার প্রবণতা বাড়ছে। তারা চায় নিরাপত্তা, শিক্ষা, আর্থিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সম্মান।
এই শ্রেণির মধ্যে বাম-কংগ্রেস ও কিছু নতুন আঞ্চলিক গোষ্ঠী জায়গা করে নিচ্ছে, যদিও তৃণমূল এখনও সবচেয়ে প্রভাবশালী।
নতুন শক্তি ও স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম
২০২৪ পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি দেখা দিচ্ছে :
*আঞ্চলিক সমাজভিত্তিক সংগঠন (যেমন রাজবংশী, মতুয়া বা আদিবাসী সংগঠন)।
*স্বাধীন প্রার্থী ও সামাজিক আন্দোলন-নেতারা।
এরা বড় দলের ভোট কিছুটা ভাগ করছে এবং স্থানীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা : ২০২৬ এবং তার পর
| প্রজন্ম | প্রধান ইস্যু | সম্ভাব্য ঝোঁক | দলগুলির সুযোগ |
| ————- | ————————— | —————– | ———————————- |
| **১৮–২৫ বছর** | চাকরি, শিক্ষা, দুর্নীতি | যুক্তিভিত্তিক ভোট | বামফ্রন্ট ও বিজেপি লাভবান হতে পারে |
| **২৬–৩৫ বছর** | স্থিতিশীলতা, পরিবার, আয় | বাস্তববাদী ভোট | তৃণমূলের প্রকল্প ভোটে প্রভাব ফেলবে |
| **৩৬–৫০ বছর** | নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্থিতি | শাসকপন্থী ভোট | তৃণমূল স্থিতিশীল |
| **৫০ ঊর্ধ্ব** | ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ | নস্টালজিক ভোট | কংগ্রেস ও বাম কিছুটা সুবিধা পাবে |
পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতি: পরিবর্তনের পথে
২০২৬-এর সম্ভাব্য জোট, জাতীয় রাজনীতির সংযোগ ও ভোটের ভবিষ্যদ্বাণী
ভারতের রাজনীতি আজ এক পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্র থেকে রাজ্য, সবখানেই রাজনীতির ভাষা ও প্রেক্ষাপট বদলাচ্ছে দ্রুত। পশ্চিমবঙ্গও সেই পরিবর্তনের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে এখন থেকেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আঁচড়–ঘষা, জোটের সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ ভোটের হিসাব। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) –এর নেতৃত্বে রাজ্য রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party – BJP) কেন্দ্রীয় শক্তি ও ‘ডাবল ইঞ্জিন’ তত্ত্ব নিয়ে আবারও নিজেদের জায়গা পাকা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এবারের সমীকরণ শুধু রাজ্যের সীমায় আটকে নেই। জাতীয় রাজনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছে, তার ঢেউ এসে পড়ছে বঙ্গের রাজনীতিতেও। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল, বিজেপির তুলনামূলক আসনহানি, এবং ইন্ডিয়া জোট (INDIA Bloc) –এর উত্থান রাজ্য রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথ অনেকটাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

রাজনৈতিক সমীকরণের নতুন রসায়ন
২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এলেও, ২০২৬-এর আগে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। রাজ্যজুড়ে সংগঠনের ভাঙন, স্থানীয় নেতৃত্বের কোন্দল, এবং জনসংযোগের অভাব বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তৃণমূল যদিও দুর্নীতির অভিযোগে বারবার বিতর্কে পড়েছে, শিক্ষা দুর্নীতি, চাকরি কেলেঙ্কারি, ‘স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) ঘুষকাণ্ড’ ইত্যাদি মামলায় দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত, তবু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনও ভোটের মূল চালিকাশক্তি। অন্যদিকে বামফ্রন্ট (Left Front) ও কংগ্রেস (Congress) এখন নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে যৌথভাবে প্রার্থী দিলেও সাফল্য তেমন মেলেনি। তবে তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে এক নতুন আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, বিশেষত ছাত্র–যুব স্তরে। DYFI, SFI ও NSUI–র মতো সংগঠনগুলো আবার মাঠে নেমে সক্রিয় হয়েছে, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয় রাজনীতির প্রভাব ও ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ
জাতীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ২০২৯-এর আগে বিরোধী ঐক্য কতটা কার্যকর হবে? ইন্ডিয়া জোট (INDIA Alliance) যদিও ২০২৪-এ কিছু রাজ্যে ভালো ফল করেছিল, কিন্তু অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকট ও রাজ্যভিত্তিক বিরোধ তার গতি মন্থর করে দিচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস জোটের অংশ হলেও, বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও বাম দলগুলির সঙ্গে সমন্বয় নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে বলেছেন, “বাংলায় আমরা বিজেপির বিরুদ্ধে একাই যথেষ্ট।” এই অবস্থান ভবিষ্যতের জোট রাজনীতিকে জটিল করে তুলছে। অন্যদিকে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (NDA), যদিও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এখনও শক্তিশালী, কিন্তু নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) সরকারের তৃতীয় মেয়াদে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিরোধীদের আক্রমণ তীব্র। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরতা বেশি, স্থানীয় মুখের অভাব, যা ভোটের রাজনীতিতে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

২০২৬ ভোট: সম্ভাব্য হিসাব ও ভবিষ্যদ্বাণী
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনটি প্রধান শক্তি মুখোমুখি হবে তৃণমূল, বিজেপি ও বাম–কংগ্রেস জোট। বর্তমানে তৃণমূলের ভোট শেয়ার প্রায় ৪৩–৪৫ শতাংশের মধ্যে ঘুরছে, বিজেপির ৩৫–৩৭ শতাংশ, আর বাম–কংগ্রেসের মিলিত ভোট ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। তবে ভোটের সময় সামাজিক ও ধর্মীয় মেরুকরণ, কেন্দ্রীয় সংস্থা (ED, CBI) -এর কার্যকলাপ, এবং রাজ্য প্রশাসনের উন্নয়নমূলক প্রকল্প সব মিলিয়ে চিত্র বদলাতে পারে।

তৃণমূল এখন ‘দুয়ারে সরকার’, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘স্বাস্থ্য সাথী’ -এর মতো প্রকল্প দিয়ে জনসংযোগের জাল শক্ত করছে। অন্যদিকে বিজেপি হিন্দুত্বের সঙ্গে উন্নয়ন ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের দাবি তুলছে বলে প্রকাশ | তবে প্রাক্তন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে সামনে আনলে বিজেপি রাজ্যে ভালো ফল করত বলেই উল্লেখ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপির জন্য ২০২৬ ভোটে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংগঠন ধরে রাখা এবং স্থানীয় নেতৃত্বে ঐক্য ফেরানো। কারণ এখনও সময় আছে কেন্দ্রীয় বিজেপি যদি দিলীপ ঘোষকে সঠিক ক্ষমতা দিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারে তাহলে বিজেপির আবার জনসমর্থন ফিরবে বলেই অনেকের মত। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস যদি আসন্ন সময়ে যৌথ প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে অন্তত ২০-২৫টি আসনে তাদের প্রভাব বাড়তে পারে। তবে তৃণমূল-বিরোধী ভোট একত্রিত না হলে, বিজেপির পক্ষে সহজেই দ্বিতীয় স্থানে থাকা নিশ্চিত হবে।
জাতীয় জোটের ছায়ায় বঙ্গ রাজনীতি
২০২৬-এর বঙ্গ ভোট শুধু রাজ্য নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। কারণ এই রাজ্যে ৪২টি লোকসভা আসন রয়েছে যা ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের জন্য বড় শক্তি হতে পারে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যদি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বা কৃষি নীতিতে জনসমর্থন হারায়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি পশ্চিমবঙ্গেও পড়বে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তিনি বারবার বলেছেন “দিল্লি জয় করতে গেলে বাংলা জয় জরুরি।” সেক্ষেত্রে ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল শুধু আলাদা একটি রাজ্যের ভোট নয়, এটি হবে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সূচক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি তৃণমূল দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার ইস্যুতে কিছুটা ক্ষতি পায়ও, তা পূরণ করতে পারে তার তৃণমূল স্তরের সংগঠন ও নারী ভোটারদের সমর্থন। অন্যদিকে বিজেপি যদি মুসলিম ভোটের মেরুকরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তৃণমূলের আধিপত্য অটুট থাকবে।

বাম ও কংগ্রেসের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভোটের মাঠে নিজেদের উপস্থিতি ফেরানো। যদি তারা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিকল্প রাজনীতির বার্তা ছড়াতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা ‘কিংমেকার’ ভূমিকা নিতে পারে। প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে এক ত্রিমুখী সংঘর্ষ, যার প্রতিটি ধাপে জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন ঘটবে। দিল্লি ও কলকাতার রাজনীতি এক সুতোয় বাঁধা থাকবে যেখানে একদিকে বিজেপির কেন্দ্রীয় আধিপত্য, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ, আর তৃতীয়দিকে বাম-কংগ্রেসের পুনরুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ভোট কেবল পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং ভারতের রাজনৈতিক ভারসাম্যও বদলে দিতে পারে। তৃণমূলের লক্ষ্য রাজ্যকে ধরে রাখা, বিজেপির লক্ষ্য রাজ্য দখল করা, আর বিরোধী জোটের লক্ষ্য প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়া।
এই তিন শক্তির সংঘাতে তৈরি হবে ভারতের গণতন্ত্রের পরবর্তী অধ্যায়। নতুন প্রজন্মের রাজনীতি আর কেবল নেতাদের ওপর নির্ভরশীল নয় এটি এখন চিন্তা, তথ্য ও ইন্টারনেটের রাজনীতি। যে দল এই তরুণ শক্তির ভাষা বুঝতে পারবে, যে দল চাকরি, শিক্ষা ও স্বচ্ছ শাসনের আশ্বাস বাস্তবে দিতে পারবে– ভবিষ্যৎ তার হাতেই থাকবে। পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর ভোট তাই কেবল রাজনীতির লড়াই নয় এটি প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের যুদ্ধ। বাঙলার তরুণেরা যে দলকে বিশ্বাস করবে, সেই দলই গড়বে আগামী বাংলার রাজপথ। (চলবে)
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন :




