সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী ‘২৬ যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে। কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ। জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন–
দেবব্রত সরকার
(আজ সপ্তম কিস্তি)

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে: আর শুধু জেতা-হারার প্রশ্ন নয়, বদলাচ্ছে রাজনীতির চরিত্র
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আজ যেন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। কোথাও গর্জন, কোথাও নীরবতা। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress), বিজেপি (BJP), কংগ্রেস (Congress) ও বামফ্রন্ট (Left Front) প্রতিটি দলের মধ্যেই চলছে আত্মসমালোচনা, পুনর্গঠন আর ভবিষ্যতের সমীকরণ তৈরির লড়াই। এখন আর শুধু কে ক্ষমতায় আসবে বা যাবে, তার হিসেব নয় প্রশ্ন উঠছে, রাজনীতির চরিত্রটাই কি বদলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে? রাজ্যের রাজনীতি বরাবরই আবেগনির্ভর। স্বাধীনতার পর থেকে বাম শাসন, তারপর তৃণমূলের উত্থান প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল জনমানসের প্রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু ২০২৫ সালের এই সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, মানুষের ধৈর্যের সীমা ফুরোচ্ছে, দলীয় আনুগত্যের জায়গায় আসছে রাজনৈতিক ক্লান্তি আর অচিন্ত্য বিশ্বাসভঙ্গ। একদা অপরাজেয় মনে করা তৃণমূল এখন জনসংযোগের জটিল সঙ্কটে, আর বিজেপি, যে একসময় আগুন জ্বালিয়েছিল পরিবর্তনের আশায়, তারা আজ নিজেদের অবস্থান স্থায়ী করতে হিমশিম খাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শান্তনু দে বলেন, “এই মুহূর্তে রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে বাস্তববোধ বাড়ছে। মানুষ উন্নয়ন, নিরাপত্তা আর স্বচ্ছতার রাজনীতি দেখতে চায়।” তাঁর কথাই প্রমাণ করে দিচ্ছে বাংলার রাজনীতি আজ আর পুরনো স্লোগানের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর নেতৃত্বে তৃণমূলের প্রশাসনিক দিক এখনো শক্তিশালী, কিন্তু রাজনৈতিক বার্তা দুর্বল হচ্ছে। দলের একাংশের দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি ও শাসনযন্ত্রে অস্বচ্ছতা, সাধারণ ভোটারকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে এই অসন্তোষ এখন দৃশ্যমান। যেখান থেকে একসময় ‘দিদি’ ব্র্যান্ডের আবেগ তৈরি হয়েছিল, সেই মাটিতেই এখন প্রশ্ন উঠছে, “আমরা কি ঠিক জায়গায় ভোট দিয়েছি?”
অন্যদিকে বিজেপি (Bharatiya Janata Party), যাদের হাতে একসময় ছিল বিরোধিতার রণতূর্য, এখন তাদের অবস্থাও অনিশ্চিত। ২০২১-এর নির্বাচনে তারা যদিও দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসে, কিন্তু সেই গতি ধরে রাখতে পারেনি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর অতিনির্ভরতা, রাজ্য নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং সংগঠনের অমিল বিজেপিকে এখন নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি ধীরে ধীরে তাদের স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) একাধিকবার বলেছেন, “বঙ্গ আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি। এখানে পরিবর্তনের অঙ্গীকার পূর্ণ করব।” তবে শুধু মোদীর জনপ্রিয়তায় রাজ্য রাজনীতি টিকে থাকে না সেটা বিজেপিও এখন বুঝতে শুরু করেছে। তাদের লক্ষ্য এখন তৃণমূল-বিরোধী ভোট একত্রিত করা এবং শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি করা।
বামফ্রন্টের (Left Front) রাজনীতি এখন পুনর্জাগরণের পথে। ছাত্র-যুবদের মধ্যে আবারও আদর্শভিত্তিক আন্দোলনের ধারা ফিরছে।
সিপিএম (CPM)-এর তরুণ মুখরা এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে এখনও তাদের বড় চ্যালেঞ্জ প্রজন্মান্তরের ফাঁক মেটানো এবং ভোটে কার্যকর শক্তিতে রূপান্তর হওয়া।
কংগ্রেস (Congress) বরাবরের মতোই বিভ্রান্ত, যদিও কিছু জেলায় তারা গ্রামীণ ভোটে আবার সংগঠিত হচ্ছে। রাজ্যের রাজনৈতিক বাতাবরণ এখন “তিনকোণ নয়, বহুমাত্রিক।” শহর ও গ্রাম দুই জায়গার মানুষের সমস্যা আলাদা, কিন্তু চাহিদা এক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা।

চাকরি সংক্রান্ত দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ মামলা, চিটফান্ড কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পক্ষপাত সবকিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নৈতিকতার পুনর্গঠন চাইছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক বললেন, “এখন আর শুধু দল নয়, চরিত্রের ওপর ভোট দিতে হবে। রাজনীতি যদি চরিত্র হারায়, তবে সমাজও পথ হারায়।” এই মন্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে রাজ্যে নতুন জোট রাজনীতি দেখা যেতে পারে। তৃণমূলের কিছু বিক্ষুব্ধ নেতা বিজেপি বা নতুন আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের দিকে যেতে পারেন। অপরদিকে, বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে আবারও আসন-সমঝোতার ইঙ্গিত মিলছে। এই সম্ভাবনাই রাজ্য রাজনীতিকে আরও অনিশ্চিত কিন্তু উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। রাজনীতি এখন সোশ্যাল মিডিয়ারও খেলা। আজ ভোটের মঞ্চ যতটা রাস্তায়, তার চেয়ে বেশি এক্স (X), ইউটিউব, এবং ইনস্টাগ্রামে। যেখানে মিম, ভিডিও ক্লিপ, বা এক মিনিটের বক্তব্যই বদলে দিতে পারে জনমত।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে যেভাবে প্রতিদিন দুর্নীতি ও দমননীতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ছড়াচ্ছে, তা বিজেপির জন্য এক অদৃশ্য প্রচার অস্ত্র হয়ে উঠছে।
তবে বাস্তব মাঠে বিজেপির সংগঠন সেই গতিতে এগোতে পারছে না, যা তাদের ডিজিটাল শক্তি দাবি করে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো মাঠের রাজনীতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বক্তা। তিনি বলেন, “বঙ্গের মানুষ জানে আমি কীভাবে লড়েছি। যারা বাইরে থেকে এসে বাংলা দখল করতে চায়, তাদের বাংলার মাটি কখনও মেনে নেবে না।”এই বক্তব্যে তাঁর লড়াকু মনোভাব যেমন স্পষ্ট, তেমনি রাজ্যের আঞ্চলিক পরিচয় রক্ষার রাজনীতিও আবার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে পশ্চিমবঙ্গ কখনও স্থির থাকে না। এখানে ক্ষমতা পরিবর্তন মানেই এক সামাজিক আন্দোলন। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের উত্থান হোক বা ২০১১-তে তৃণমূলের ‘পরিবর্তন’ স্লোগান প্রতিটি সময়ই রাজনীতির চরিত্র বদলেছে। ২০২৫-এর এই সন্ধিক্ষণে নতুন প্রশ্ন সেই পরিবর্তনের পরবর্তী অধ্যায় কী হতে চলেছে?
বেশ কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এই বার হয়ত ভোটাররা দল নয়, নেতৃত্বের সততা আর বাস্তব উন্নয়নের খতিয়ান খুঁজবেন। একজন তরুণ ভোটার বললেন, “আমরা বক্তৃতা শুনে ভোট দেব না। কাজ দেখব, কাজের মানুষকে চাই।” আজ রাজনীতির ভাষা পাল্টাচ্ছে, আবেগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তথ্য, উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রশ্ন। এই পরিবর্তনই হয়ত বাংলার ভবিষ্যতের নতুন রাজনীতির সূচনা যেখানে শাসনের মুখোশ নয়, কাজের ফলই হবে আসল পরিচয়। বাংলার রাজনীতি এখন ভোটের চেয়েও বড় এটি ভবিষ্যতের মানচিত্র আঁকার প্রক্রিয়া। রাজনীতি বদলাবে, মুখ বদলাবে, কিন্তু বাংলার গণতন্ত্র থাকবে অটুট সময়ের স্রোতে আরও পরিণত, আরও সচেতন।”

ভোট পরবর্তী রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ফল প্রকাশের পরের চিত্র-সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্য

সমাজ ও অর্থনীতিতে ভোট-পরবর্তী প্রভাব
ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চিত্র ২০২৬–২০৩০





