পার্বতী কাশ্যপ ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির (Michigan State University) গবেষকরা উদ্ভিদের এক অভাবনীয় রহস্য উন্মোচন করেছেন, উদ্ভিদ কীভাবে আলোকে বোঝে এবং সেই অনুযায়ী নিজের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। এই নতুন আবিষ্কার ভবিষ্যতে এমন এক কৃষিবিপ্লব ঘটাতে পারে, যা কঠিন পরিবেশেও ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবে। গবেষক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এরিক গ্রোটেভল্ড (Erich Grotewold), মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক। তাঁর ভাষায়, ‘এই প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যতে ব্যবহার করে উদ্ভিদের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং স্ট্রেস প্রতিরোধ ক্ষমতা সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এটি এমন ফসল উৎপাদনে সাহায্য করবে যেগুলি আলোজনিত চাপ সহ্য করতে পারবে এবং আলোর শক্তি আরও দক্ষভাবে ব্যবহার করবে।’
এই আবিষ্কারটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Nature Communications-এ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট জৈব যৌগ, নারিঙ্গেনিন ক্যালকোন (Naringenin Chalcone বা NGC), যা সাধারণত উদ্ভিদের মেটাবলিজমের অংশ, সেটি আলো শনাক্তকারী প্রোটিনকে ‘রিপ্রোগ্রাম’ করতে পারে। এই প্রোটিনের নাম ইউভিআর৮ (UVR8)। এতদিন বিজ্ঞানীরা জানতেন, ইউভিআর৮ কেবলমাত্র অতিবেগুনি বি (UV-B) আলোতে প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু মিশিগান স্টেটের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, NGC নামের এই যৌগটি ইউভিআর৮-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে সেটিকে এমনভাবে সক্রিয় করে তোলে, যেন উদ্ভিদ UV আলো না পেলেও আলোর উপস্থিতি অনুভব করতে পারে।

গবেষণার সহলেখক নান জিয়াং (Nan Jiang), বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই-এ (University of Hawai‘i at Mānoa) অধ্যাপক, বলেন, ‘আমরা অবাক হয়েছিলাম দেখতে পেয়ে যে, নারিঙ্গেনিন ক্যালকোন নামের একটি মেটাবলিক যৌগ সরাসরি ইউভিআর৮-এর মতো আলো-সংবেদনশীল প্রোটিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটি এমন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে, যেখানে উদ্ভিদের মেটাবলিজম ও আলো উপলব্ধি করার ক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।’ গবেষক দল প্রথমে আরাবিডপসিস (Arabidopsis) নামের এক পরীক্ষামূলক উদ্ভিদের বিভিন্ন মিউট্যান্ট প্রজাতি পরীক্ষা করছিলেন। তাঁদের নজরে আসে, কিছু মিউট্যান্ট সূর্যালোকের নির্দিষ্ট অংশে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি থেমে যাচ্ছে। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব উদ্ভিদে ফ্ল্যাভোনয়েড উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি এনজাইম অনুপস্থিত, সেগুলির কোষে নারিঙ্গেনিন ক্যালকোন অস্বাভাবিকভাবে জমা হচ্ছে। এর ফলেই উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছিল। কিন্তু যখন বিজ্ঞানীরা আরও পরীক্ষা চালান, তাঁরা দেখতে পান, যেসব উদ্ভিদে ইউভিআর৮ প্রোটিনে পরিবর্তন ঘটেছে, সেগুলি কিন্তু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে, এমনকী আলো-চাপের পরিবেশেও।
আরও পড়ুন : men vs women sleep research | পুরুষ না মহিলা কে বেশি ঘুমান? চমকপ্রদ গবেষণা
এখান থেকেই তাঁরা বুঝতে পারেন, ইউভিআর৮ প্রোটিনের সঙ্গে NGC-এর এক আশ্চর্য সম্পর্ক আছে। এটি একপ্রকার ‘ক্রস-টক’ তৈরি করে, অর্থাৎ উদ্ভিদের বিপাক প্রক্রিয়া এবং আলোকসংবেদনশীলতা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এরিক গ্রোটেভল্ড বলেন, ‘যদি কোনও উদ্ভিদকে শুধু UV আলোতে রাখা হয়, তা প্রায় মরণঘাতী। কিন্তু একই উদ্ভিদকে যদি সাদা আলোসহ তীব্র UV আলো দেওয়া হয়, তখন তা নিজের মতো করে প্রতিক্রিয়া জানায়। আমরা মনে করি, এই নারিঙ্গেনিন ক্যালকোনই সেই যোগাযোগের মাধ্যম, যা আলোর সিগন্যালকে বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করে।’ গবেষণা দলের আরেক সদস্য, রবার্ট লাস্ট (Robert Last), তিনি দুই দশক আগে ইউভিআর৮ প্রোটিনটি প্রথম বিচ্ছিন্ন করেছিলেন, বলেন, ‘দুই দশক আগে আমরা ইউভিআর৮-কে জানতাম একমাত্র UV-B আলো শনাক্তকারী প্রোটিন হিসেবে। আজ দেখতে পাচ্ছি এটি আরও গভীরভাবে উদ্ভিদের বিকাশে জড়িয়ে আছে, এটি সত্যিই অসাধারণ।’
এই আবিষ্কার শুধু উদ্ভিদের জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, কৃষিক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা হয়ত, এমন ফসল তৈরি করতে পারবেন, যেগুলি আলো কম থাকলেও বা কঠিন পরিবেশেও স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও, এমন জেনেটিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে যা উদ্ভিদকে ক্ষতিকর রশ্মি বা জীবাণুর বিরুদ্ধে আরও প্রতিরোধী করে তুলবে। নান জিয়াং বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভিদ শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা বা বিপাক প্রক্রিয়ার জন্য নয়, ছোট ছোট জৈব যৌগগুলিকে সিগন্যালিং মেসেঞ্জার হিসেবেও ব্যবহার করে। এগুলি বৃদ্ধি, বিকাশ ও অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কারের নাম প্রকাশিত হয়েছে “Flavonoid pathway intermediates implicate UVR8 in functions beyond canonical UV-B signaling”। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, এটি উদ্ভিদ জীববিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ধাপ, যা ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াইয়ে কৃষিক্ষেত্রকে নতুন দিক দেখাতে পারে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ ষষ্ঠ কিস্তি)




