সাশ্রয় নিউজ ★ ওয়াশিংটন : ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দুই দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বুধবার ঘোষণা করেছেন, চিন থেকে বিরল খনিজ এবং চুম্বক আমদানির উপর আর কোনও বিধিনিষেধ থাকবে না। একইসঙ্গে, চিনা পড়ুয়াদের আমেরিকায় পড়তে আসার ক্ষেত্রে ‘স্টুডেন্টস ভিসা’র জটিলতাও কাটিয়ে ফেলা হয়েছে।
এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মার্কিন-চিন বাণিজ্য সংঘাত নিরসনে নতুন দিগন্তের সূচনা হতে চলেছে। লন্ডনের ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে সম্প্রতি দু’দিনব্যাপী বৈঠক হয় দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে। ওই বৈঠকেই গৃহীত হয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি।বৈঠকে মার্কিন পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট (Scott Besant), বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লুটনিক (Howard Lutnick) ও বাণিজ্য বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার (Jamison Greer)। চিনের পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নেন সে দেশের উপ-প্রধানমন্ত্রী হে লিপেং (He Lipeng), যিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের (Xi Jinping) ঘনিষ্ঠ মন্ত্রী পরিষদের সদস্য। ট্রাম্প জানিয়েছেন, “চিন থেকে বিরল খনিজ এবং চুম্বক আমদানির অনুমোদনের বিনিময়ে আমরা চিনা পড়ুয়াদের জন্য স্টুডেন্টস ভিসা সহজ করছি। এটা কেবলমাত্র শিক্ষা এবং অর্থনীতির সম্পর্ক নয়, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।” তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ (Truth Social) পোস্ট করা এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেন, “আমরা চিনের থেকে ৫৫ শতাংশ শুল্ক পাচ্ছি, আর চিন পায় ১০ শতাংশ। সম্পর্ক এখন চমৎকার!”
উল্লেখ্য, গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতির ঘোষণার পর থেকেই ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে শুল্কভিত্তিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এর জেরেই মে মাসে সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনিভা (Geneva) শহরে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকেই ভিত্তি তৈরি হয় লন্ডনের সাম্প্রতিক আলোচনার। ওভাল অফিস থেকে পরবর্তী বিবৃতিতে জানানো হয়, বর্তমানে আমেরিকার চিনের সঙ্গে বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। সেই ঘাটতি কমানো এবং পরবর্তী শুল্কনীতি নির্ধারণ করাই ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যেই সম্প্রতি বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে চিনা পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে যেসব কঠোর নিয়ম চালু হয়েছিল, এবার তা শিথিল হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে আগে জানানো হয়েছিল, চিনা এবং প্যালেস্টিনীয় পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ কিছু ছাত্রছাত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং ‘কমিউনিস্ট চিনপন্থী চেতনা’ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল। কিন্তু চিন-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান উন্নত অবস্থায় এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গিয়েছে। এই ঘোষণার অর্থনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। আমেরিকার প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক শিল্পে ব্যবহৃত হয় এমন অনেক দুর্লভ খনিজ উপাদান চিন থেকেই আমদানি করতে হয়। ট্রাম্পের এই ঘোষণা সেই নির্ভরশীলতাকে আরও আনুষ্ঠানিক এবং নিরাপদ করেছে। চুম্বক এবং ‘রেয়ার আর্থ’ উপাদানের ক্ষেত্রে চিন বিশ্বে একচেটিয়া রফতানিকারক। ফলে বাণিজ্য সংঘাতের জেরে এমন উপাদানের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আমেরিকার একাধিক শিল্পক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটতে পারত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, কূটনৈতিক স্তরেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের শিক্ষাক্ষেত্র, প্রযুক্তি ও গবেষণায় যৌথ অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হল বলে মত তাঁদের। সব মিলিয়ে, দুই দেশের এই সমঝোতা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতিতেও একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে বলেই মনে করছে ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের কূটনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Starlink : ভারতে স্টারলিঙ্কের উড়ান শুরু, ইন্টারনেট বিপ্লবের দোরগোড়ায় দেশ




