সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নয়াদিল্লি: বিহারে সাম্প্রতিক স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (Special Intensive Revision – SIR) প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মোড়। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকেরই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে তার বিরুদ্ধে আপিল করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। আদালত একই সঙ্গে জানিয়েছে, যদি বাদ পড়া নাগরিকদের তথ্য প্রকাশ না করা হয়, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া এগোনো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিচারপতি সুর্য কান্ত (Justice Surya Kant) ও জয়মল্য বাগচী (Justice Joymalya Bagchi)-র বেঞ্চ এই বিষয়ে শুনানির সময় বলেন, “যদি কেউ আমাদের একটা তালিকা দিতে পারে, এই ৩.৬৬ লক্ষ বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে কারও কাছে বাদ দেওয়ার অর্ডার পৌঁছায়নি, আমরা নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেব যেন তারা ওই সকল ব্যক্তিকে তা জানায়। প্রত্যেকেরই আপিল করার অধিকার আছে।”
সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য আসে যখন আদালতের সামনে তথ্য উপস্থাপন করা হয় যে, প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারকে খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ২১ লক্ষ নতুন নাম যোগ করা হয়েছে। কিন্তু আদালত প্রশ্ন তোলে, এই যোগ হওয়া নামগুলি কি পূর্বে বাদ পড়াদের পুনঃঅন্তর্ভুক্তি, নাকি একেবারে নতুন ভোটারদের নাম? বিচারপতি বাগচী বলেন, “আপনাদের খসড়া তালিকা আছে, ফাইনাল তালিকা আছে। বাদ পড়াদের বিষয়টি স্পষ্ট। তাহলে সেই তথ্য আদালতে পেশ করুন।” আবেদনকারীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ (Prashant Bhushan)। তিনি বলেন, “এই তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে রয়েছে, তারা সহজেই তা প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ, যাদের নাম বাদ গিয়েছে, তারা সবাই সুপ্রিম কোর্টে আসতে পারবে না। কমিশন এক ক্লিকেই এই তথ্য দিতে পারে, কিন্তু তারা দিচ্ছে না।” ভূষণ আরও জানান, “প্রথমে ৬৬ লক্ষ ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছিল, পরে কিছু নতুন ভোটার যোগ করা হয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য মেলানো যাচ্ছে না। এটা খুব কঠিন সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে, অথচ নির্বাচন কমিশনের কাছে সেই ডেটা প্রস্তুত।”
এর আগে, আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে অভিষেক মনু সিংভি (Abhishek Manu Singhvi) বলেন, “যাদের নাম বাদ গেছে, তাদের কোনো নোটিস দেওয়া হয়নি, কোনও কারণ জানানো হয়নি। আপিলের সুযোগ থাকলেও, যখন মানুষ জানেই না তাদের নাম বাদ পড়েছে, তখন তারা কীভাবে আপিল করবে?”
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, বাদ দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকা জেলা নির্বাচনী অফিসে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু আবেদনকারীরা অভিযোগ করেছেন, বাস্তবে সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি। বিচারপতিরা পর্যবেক্ষণ করেন, “৬৫ লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছে, এই তথ্য আপনারা প্রকাশ করেছেন। আমরা বলেছিলাম, মৃত বা স্থানান্তরিত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যাদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে, তাদের তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে।” আদালত আরও বলেন, “এখন ফাইনাল তালিকায় ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ‘অ্যাড-অন’ কারা? বাদ পড়াদেরই পুনর্ভর্তি, নাকি একেবারে নতুন নাম?”
নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India – ECI) পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট রাকেশ দ্বিবেদী (Rakesh Dwivedi) দাবি করেন, “প্রত্যেক বাদ পড়া ভোটারকে আলাদা করে অর্ডার দেওয়া হয়েছে। খসড়া তালিকা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউ আপিল বা অভিযোগ করেনি। এগুলো কেবল ADR বা PUCL-এর মতো সংগঠনগুলির পিটিশন। তারা নির্বাচনে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয়।” দ্বিবেদী বলেন, “আইন অনুযায়ী সময়সূচী ঠিক হয়েছে। নির্বাচন এখন দুই দফায় হবে। রাজ্য প্রশাসনের কর্মচারীদের আমরা ধার নিই। কোনো আবেদনকারীই এখনো তাদের পিটিশন সংশোধন করেনি। এখন তারা ডেটা চাইছে, কিন্তু কেন?”এর উত্তরে, আবেদনকারীদের পক্ষে ভৃন্দা গ্রোভার (Vrinda Grover) বলেন, “ডেটা এখনও প্রকাশিত হয়নি। নাগরিকরা জানতেই পারছেন না তাদের নাম বাদ পড়েছে কি না।” সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে, “কেউ যদি হলফনামা দেয় যে তাদের নাম বাদ পড়েছে, তাহলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারব। কিন্তু কেউ যদি নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত বলে দাবি না করে, তাহলে আমরা কীভাবে যাচাই করব?”
বিচারপতি কান্ত বলেন, “যদি ১০০-২০০ জনও জানায় যে তারা আপিল করতে চায় কিন্তু অর্ডার পায়নি, তখনই আমরা তদন্তের নির্দেশ দিতে পারি।” আদালত আরও উল্লেখ করেছে যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় নির্বাচন কমিশন পূর্বে শুধুমাত্র ১১টি পরিচয়পত্র গ্রহণ করত। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, আধার কার্ড (Aadhaar Card)-কেও বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
এরপর কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয় যেন তারা আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায় যে, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আধারও গ্রহণযোগ্য হবে। উল্লেখ্য, SIR প্রক্রিয়া ৩০ সেপ্টেম্বর সম্পন্ন হয়। জুন মাসে বিহারের ভোটার সংখ্যা ছিল ৭.৮৯ কোটি, যা এখন ৭.৪২ কোটিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, প্রায় ৪৭ লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছেন, যদিও কমিশনের দাবি, তাদের মধ্যে অধিকাংশই মৃত বা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছেন।
এই মামলায় আবেদনকারী পক্ষের যুক্তি হল, নির্বাচন কমিশনের তথ্য স্বচ্ছ নয়। তাদের মতে, যদি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়, তাহলে প্রত্যেক নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে জানানো উচিত। অন্যথায় আপিল করার সুযোগের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিহারের এই ভোটার তালিকা বিতর্ক আসন্ন রাজ্য নির্বাচনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিপুল পরিমাণ ভোটার বাদ পড়ার অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক নয়, গণতান্ত্রিক সংকটও তৈরি করতে পারে। উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্ট এই মামলায় পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে ৯ অক্টোবর। ওই দিন আবেদনকারীরা বাদ পড়া ভোটারদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যসহ হলফনামা জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। আদালত বলেছে, “আমরা যতদূর তদন্তে যাব, তা নির্ভর করবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ওপর। এখন যদি কেউ হলফনামা দেয় যে সে ভোটার তালিকায় নেই, তখনই বিষয়টি প্রমাণযোগ্য হবে।”
ছবি : সংগৃহীত




