বসুধা চৌধুরী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : আইপিএল (IPL) থেকে ইংল্যান্ড সিরিজ পর্যন্ত ব্যাট হাতে ধারাবাহিক সাফল্যে ঝলমল করছেন ভারতের তরুণ তারকা শুভমন গিল (Shubman Gill)। জাতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি দলের সহ-অধিনায়ক হিসেবেও তিনি মনোনীত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই পথচলার পেছনে রয়েছে এক অনন্য গল্প, সেখানে একজন ফলের রস বিক্রেতার ছেলে অবিনাশ কুমার (Avinash Kumar) হয়ে উঠেছেন শুভমনের ব্যক্তিগত সাইড-আর্ম থ্রোয়ার। এই অজানা কাহিনি আজ ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে নতুন আলো ফেলছে।

মোহালি স্টেডিয়ামের বাইরে বহু বছর ধরে ঠেলাগাড়িতে ফলের রস বিক্রি করতেন কুশিনগরের বাসিন্দা রামবিলাস শাহ (Rambilas Shah)। শুভমন ও তাঁর বাবা লখবিন্দর গিল (Lakhwinder Gill) ছোটবেলা থেকেই ওই দোকানের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। রামবিলাসের ছেলে অবিনাশ একসময় দ্রুতগতির বোলার ছিলেন। কিন্তু আর্থিক অনটন অবিনাশকে ক্রিকেট ছাড়তে বাধ্য করে। পরবর্তীতে তিনি স্টুডিওতে চাকরি নেন। এই প্রসঙ্গে অবিনাশ বলেন, “ক্রিকেট একসময় আমার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সংসারের চাপে সেটা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।”

শুভমনের বাবা লখবিন্দর যখন অবিনাশকে ক্রিকেট ছেড়ে দিতে দেখেন, তখন তিনি আপত্তি জানান। এমনকী একদিন সাইড-আর্ম থ্রোয়ারের ভিডিও দেখিয়ে তাঁকে নতুন করে অনুশীলন শুরু করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় অবিনাশের নতুন যাত্রা। শুভমনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দৃঢ় হতে থাকে, আর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন শুভমনের অনুশীলনের অপরিহার্য অংশ।অবিনাশ বর্তমানে দিনে গড়ে ১৫০-২০০ টাকা আয় করেন। কিন্তু তিনি কখনও শুভমন বা তাঁর পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেননি। তাঁর কথায়, “শুভমনের বাবা আমার জীবন বদলে দিয়েছেন। হোলি বা দিওয়ালির সময় সাহায্য করেছেন। অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছেন। আমি ওদের কাছে চিরঋণী।”

২০১৯ সালে অবিনাশ পাঞ্জাব দলের সাইড-আর্ম থ্রোয়ার হিসেবে যোগ দেন। তখন থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। মনদীপ সিংহ (Mandeep Singh), গুরকিরত মান (Gurkeerat Mann), প্রভসিমরন সিংহ (Prabhsimran Singh) -এর মতো ক্রিকেটারদের কাছেও তিনি প্রশংসা পান। তবে শুভমনের সঙ্গেই তাঁর বন্ধুত্ব সবচেয়ে গভীর। ২০২৪ সালে একদিন মজা করে অবিনাশ শুভমনকে বলেন, “এখন তুই অধিনায়ক। আমাকেও আইপিএলে সুযোগ করে দে।” শুভমন তখন হেসে বলেন, চিন্তা করো না, সময় এলে সব হবে।কিছুদিন পরই সেই কথাই সত্যি হয়ে যায়। অবিনাশের জীবনে আসে অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। হঠাৎ শুভমনের ফোনে তিনি জানতে পারেন যে গুজরাট টাইটান্স (Gujarat Titans) থেকে তাঁকে ডাকা হতে পারে। প্রথমে হতবাক হলেও পরে তিনি আইপিএলের অনুশীলনে যোগ দেন। অবিনাশ বলেন, “এর আগে শুভমন আমাকে জুতো, জামা, মোবাইল দিয়েছে। কিন্তু আইপিএলে সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবতেও পারিনি।”

শুধু আইপিএলেই নয়, ইংল্যান্ড সিরিজের প্রস্তুতিতেও শুভমন ভরসা রেখেছিলেন অবিনাশের ওপর। তাঁর কাজ ছিল নেটে লাল বল দিয়ে শুভমনকে চ্যালেঞ্জ করা। অবিনাশের নিজের ভাষায়, “শুভমন আমাকে বলেছিল লাল বলে ওকে সমস্যায় ফেলতে। কারণ আন্তর্জাতিক ম্যাচে সেটাই কাজে আসবে। আমি চেষ্টা করতাম ওকে যতটা সম্ভব চাপে রাখতে।” যদিও অবিনাশ কখনও নিজের অবদানের কৃতিত্ব নিতে চান না। তিনি বলেন, “শুভমনের সাফল্য শুধু তাঁর কঠোর পরিশ্রমের ফল। আমি কেবল নকিং করিয়েছি। আসল কৃতিত্ব ওর বাবা আর কোচদের। আমার থ্রোয়ে অনেকবার আঘাত পেয়েছে শুভমন। তবু কখনও কিছু বলেনি। ওর এই মনোবলই আজ ওকে এই জায়গায় এনেছে।”

শুভমন গিলের সাফল্যের গল্পে তাই শুধু প্রতিভা আর কঠোর পরিশ্রম নয়, রয়েছে বন্ধুত্ব ও ত্যাগের কাহিনি। একসময় ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়া অবিনাশ আজ আবার ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন শুভমনের হাত ধরেই। ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে এই গল্প শুধু অনুপ্রেরণাই না, অসাধারণ মানবিক দৃষ্টান্তের পরিচয় বয়ে নিয়ে আসে।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Cheteshwar Pujara | শুভমন গিলের ‘হুমকিতে’ ফিফা টিমে ঢুকেছিলেন বুমরাহ! খোলসা করলেন পুজারা




