সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ লখনউ : ভারতের প্রথম নভশ্চর হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) যাওয়ার গৌরব অর্জন করে ইতিহাস রচনা করেছেন শুভাংশু শুক্লা (Shubhanshu Shukla)। ১৮ দিনের মহাকাশ মিশন শেষে দেশে ফিরে তিনি পেয়েছেন বীরোচিত সম্মান। গত ১৭ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পর এই মহাকাশযাত্রীকে ঘিরে গোটা লখনউ শহরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।

লখনউ বিমানবন্দরে পৌঁছেই শুভাংশু পরিবারের সদস্য, হাজার হাজার মানুষ, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় প্রশাসনের ভালবাসায় ভেসে যান। হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে ভিড় করা জনতা গর্জন তোলে ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগানে। তাঁর প্রাক্তন স্কুল মন্টেসরি স্কুলের (City Montessori School) শিক্ষার্থীরা রঙিন সাজে গ্রহ-নক্ষত্রের চরিত্রে সজ্জিত হয়ে হাজির হয়েছিল, আর ব্যান্ডের বাজনায় ভরে ওঠে পরিবেশ। শুভাংশু শুক্লাকে দেখতে বিমানবন্দর থেকে রাস্তায় শোভাযাত্রায় হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েন। খোলা গাড়িতে শহরময় ঘুরে শুভাংশু শুক্লা হাত নেড়ে মানুষের ভালবাসার জবাব দেন। হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘সকাল সাড়ে সাতটার পর থেকে আমি যতটা ছবি তুলেছি, মনে হয় ২ হাজারেরও বেশি সেলফি তোলা হয়ে গিয়েছে।’ অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath), ইসরো (ISRO) চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন (V. Narayanan) ও অন্যান্য রাজ্য প্রশাসনিক কর্তারা এদিন উপস্থিত ছিলেন।

মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, শুক্লার নামে বিশেষ বৃত্তি চালু করা হবে, যাতে উত্তরপ্রদেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা মহাকাশ বিজ্ঞানে পড়াশোনার সুযোগ পায়। তিনি আরও জানান, ‘চার বছর আগেও এই রাজ্যের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানের পাঠক্রম ছিল না। আজ ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান এই বিষয় পড়াচ্ছে। এটা আমাদের ভারতের বিকাশগাথার অংশ।’

শুভাংশু শুক্লার মিশনে মোট ৬০টি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে সাতটি ছিল ভারতীয় বিজ্ঞানীদের তৈরি। নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত ছিল ভারতীয় বিজ্ঞানীদের বানানো পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করা। এটাই সত্যিকার অর্জন, শুধু তথ্যই নয়, যে নতুন দরজা এই মিশন খুলে দিয়েছে, সেটাই আমাদের সম্পদ।’ ছোটবেলার বিদ্যালয়ে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে শুভাংশু বলেন, ‘মহাকাশে থাকাকালীন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি নভশ্চররা কী করে। সবাই জানতে চেয়েছে আমি কেমন করে নভশ্চর হলাম। তোমরা স্বপ্ন দেখো, চেষ্টা করো। আমাদের লক্ষ্য ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে অবতরণ করা। হয়ত তোমাদের মধ্যেই কেউ সেই পদক্ষেপ নেবে।’ হাসতে হাসতে তিনি যোগ করেন, ‘আমি কিন্তু প্রতিযোগিতায় আছি। দেখা যাক ২০৪০ সালে কে আগে চাঁদে যায়।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, শুভাংশু শুক্লার বাড়ির এলাকায় দিন কয়েক আগে থেকেই বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। রাস্তা নতুন করে পাকা করা হয়, দেশাত্মবোধক পোস্টার ও ডিজিটাল স্ক্রিনে তাঁর মহাকাশযাত্রার দৃশ্য প্রদর্শিত হয়। এদিকে, কৃষকদের সংগঠন রাষ্ট্রীয় কৃষক মঞ্চ (Rashtriya Kisan Manch) দাবি তুলেছে, শুভাংশু শুক্লাকে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারত রত্ন (Bharat Ratna) প্রদান করা হোক। দেশে ফেরার পরদিনই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী’র (Narendra Modi) সঙ্গে বৈঠকে শুক্লা শেয়ার করেন, মাইক্রোগ্রাভিটি থেকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে ফেরার সময় কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তিনি জানান, ‘শরীর ভাল থাকলেও প্রথম ক’টি পা ফেলার সময় টলে পড়েছিলাম, সহায়তা নিতে হয়েছিল।’ উল্লেখ্য, মহাকাশ স্টেশনে তিনি যে পরীক্ষাগুলো করেছেন, তার মধ্যে ছিল মাইক্রোগ্রাভিটিতে সবুজ শস্য ও মেথি (Fenugreek) চাষ। এই গবেষণাকে তিনি পৃথিবীর খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখান। তাঁর মতে, মহাকাশে খাদ্য উৎপাদন শুধু নভশ্চরদের জীবনরক্ষার জন্যই নয়, ভবিষ্যতের খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, একজন তরুণ ভারতীয় মহাকাশচারী হিসেবে শুভাংশু শুক্লা-এর এই অর্জন শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, গোটা ভারতকেই নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর সাহস, অধ্যবসায় ও সাফল্যের গল্প আজ কোটি কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা।
ছবি : সংগৃহীত




