কৌশিক রায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই ভক্তি, ঐতিহ্য আর ইতিহাসের এক অনন্য মেলবন্ধন। থিম পুজোর ঝলমলে আলোয় ভরা শহর কলকাতার মাঝেই আজও নিজের স্বকীয়তায় দাঁড়িয়ে আছে শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই পুজো কেবল পূজার্চনার ক্ষেত্রেই নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের দিক থেকেও আজও অনন্য।শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রাজা নবকৃষ্ণ দেব (Raja Nabakrishna Deb) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর নাম উচ্চারণ করলে দুর্গাপুজোর সঙ্গে এক অনন্য ঐতিহ্যর সংযোগ মিললেও, তাঁর জীবনের অনেক অজানা দিক আজও সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করে।
ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, নবকৃষ্ণ দেব শুধু জমিদার ও সমাজসেবকই নন, তা একজন জ্ঞানী পণ্ডিতও ছিলেন। উর্দু ও ফরাসি ভাষায় তিনি অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ইংরেজ প্রশাসনিক দুনিয়ার নামী ব্যক্তিত্ব ওয়ারেন হেস্টিংস (Warren Hastings) এবং রবার্ট ক্লাইভ (Robert Clive) পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন। এই কারণেই নবকৃষ্ণ দেবকে সমসাময়িক সমাজে অনেক সময় ‘নবকৃষ্ণ মুন্সি’ নামেও ডাকা হতো। ১৭৬৬ সালে মোঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় (Shah Alam II) তাঁকে ‘মহারাজা বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং বিদ্যাচর্চা সেই সময়ের সমাজে তাঁকে ভিন্ন মর্যাদা এনে দিয়েছিল।
রাজা নবকৃষ্ণ দেবের দানশীলতা ও দূরদর্শিতা তাঁকে আরও বিশেষ করে তুলেছিল। তিনি বেহালা থেকে কুলপি পর্যন্ত প্রায় ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজের খরচে। এই উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, মানুষের যাতায়াত ও জীবনের সুবিধার ক্ষেত্রেও এক বিরল উদাহরণ হয়ে ওঠে। শোনা যায়, তাঁর মা মারা গেলে সেই শ্রাদ্ধকার্যের জন্য তিনি প্রায় নয় লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয় লক্ষ টাকা হয়ত বড় অঙ্ক নয়, কিন্তু আঠারো শতকের বাংলায় এই খরচ কল্পনার অতীত। এতে বোঝা যায় তাঁর প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং ঐশ্বর্য কেমন ছিল।
রাজা নবকৃষ্ণ দেবের (Raja Nabakrishna Deb) নাম উচ্চারণ করলে দুর্গাপুজোর ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় আসে। বহু ইতিহাসবিদের মতে, ১৭৫৬ সালে তিনিই প্রথম কলকাতায় জমকালো দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। যদিও এই বিষয়ে ইতিহাসে কিছু মতবিরোধ আছে, তবে রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী পুজো আজও প্রমাণ করে তাঁর দূরদর্শিতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বকে। দুর্গাপুজোর সেই আয়োজন আজও শহরের মানুষের কাছে এক ভিন্ন আকর্ষণ। যেখানে আধুনিক কলকাতার থিমপুজো আলো ও কারুকার্যের ঝলকে ভরপুর, সেখানে শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো আজও ঐতিহ্য ও ভক্তির আবহকে ধরে রেখেছে। কথিত আছে, কলকাতায় পালকির প্রচলনও হয়েছিল নবকৃষ্ণ দেবের হাত ধরেই। ইংরেজ শাসনের আমলে শহর কলকাতা যখন নতুনভাবে গড়ে উঠছে, তখনই তাঁর এই উদ্যোগ সমাজ ও সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে।
নবকৃষ্ণ দেবের নাম ইতিহাসে শুধু প্রতিপত্তি ও ঐশ্বর্যের কারণে নয়, তা তাঁর সাংস্কৃতিক অবদান এবং সমাজসেবামূলক কাজের জন্যও অমর হয়ে আছে। তাঁর রাজসিক জীবনযাপন, জ্ঞানচর্চা এবং দেবী দুর্গার প্রতি ভক্তি আজও শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানে প্রতিফলিত হয়। আজকের প্রজন্মের কাছে শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো কেবল পুজো নয়, বরং এক জীবন্ত ইতিহাস। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে যখন রাজবাড়ির আঙিনা আলোয় ভরে ওঠে, তখন মনে হয় যেন আঠারো শতকের সেই নবকৃষ্ণ দেবের পদচিহ্ন এখনও সেখানে রয়ে গিয়েছে।
রাজা নবকৃষ্ণ দেবের (Raja Nabakrishna Deb) ব্যক্তিত্ব ও কৃতিত্ব আজও কলকাতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাঁর দানশীলতা, জ্ঞানচর্চা এবং দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শোভাবাজার রাজবাড়িকে দিয়েছে এক অমূল্য পরিচিতি। শহরের থিম পুজোর ভিড়ে বনেদি এই পুজো আজও এক আলাদা আবহ তৈরি করে, যা উত্তর কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চিরন্তন প্রতীক হয়ে আছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : A Symphony of Shakti: Celebrating Durga Puja in the Heart of Delhi




