সঞ্জয় সান্যাল : মন চাইলেই কি পাহাড় ডাকে? হয়ত ডাকে না। কিন্তু প্রকৃতি যখন নিজের হাতে একটি ক্যানভাস আঁকে, তার টানে টান অনুভব না করে উপায় থাকে না। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের (Karnataka) শিবমোগ্গা (Shivamogga) জেলার এক প্রান্তে এমনই এক অপরূপ প্রাকৃতিক শিল্পকর্ম, সাভেহাকলু জলাধার-এর (Savehaklu Reservoir)। অচেনা, নিঃশব্দ, পর্যটনের প্রচলিত রুট থেকে অনেকটা বাইরে হলেও যার সৌন্দর্য আজও নিখাদ ও বিশুদ্ধ। নাগারা (Nagara) থেকে কোডাচাদ্রি (Kodachadri) যাওয়ার পথে, চক্র ড্যামের (Chakra Dam) প্রায় ৬ কিমি দূরে গড়ে ওঠা এই জলাধার বর্ষাকালে হয়ে ওঠে এক যাদুময় স্বপ্নভূমি। শহরের ক্লান্তি আর যান্ত্রিকতা ছাপিয়ে এখানে এসে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে বলছে, “এখানে থামো, শুধু দেখো, শুধু শোনো…”

আমরা যে সকালে বেরিয়ে ছিলামা, তখন মেঘের চাদর মেলা ছিল পুরো পথ। শিবমোগ্গার দিকে এগোতে এগোতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল সবুজের এক বিশাল রাজ্য। গা ছমছমে নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে পাখির ডাক, কোথাও কোথাও রাস্তায় হালকা কুয়াশা। সব মিলিয়ে যেন কোনও কবিতার দৃশ্যপট তৈরি হচ্ছিল। চক্রা ড্যামের পাশ কাটিয়ে যখন সাভেহাকলুর (Savehaklu) ধারে পৌঁছালাম, প্রথমেই যে শব্দটা মনে এল, তা হল “অবাক”। আর কিছু নয়। শুধু জল আর সবুজ। কিন্তু তেমন এক জল আর তেমন এক সবুজ যা মনকে ধ্যানের মতো স্থির করে দেয়। বিশাল জলাধার, চারপাশে ঘন বন, মাঝে মাঝে উঠে থাকা পাহাড়ি ঢেউ, আর নীল-সবুজ মিশে যাওয়ার এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা।

জলাধারের তীরে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, এই জায়গাটা শুধুই ভ্রমণের নয়। এটা অনুভবেরও। যে ধরনের নৈঃশব্দ এখানে বিরাজ করে, তা যে-কোনও শহুরে ক্লান্তি ঘোচানোর জন্য যথেষ্ট। বর্ষাকালে, যখন জলাধারের জল উপচে পড়ে, তখন এই জায়গা হয়ে ওঠে যেন এক জীবন্ত ছবির ফ্রেম। দূর থেকে ভেসে আসে জল পড়ার ক্ষীণ শব্দ। বাতাসে আর্দ্রতার ছোঁয়া, মাটিতে লেগে থাকা বৃষ্টির সুবাস। আর কী চাই বলুন?
এমন নয় যে এখানে কোনও পর্যটন-কেন্দ্রিক আড়ম্বর আছে! নেই কোনও খাবারের দোকান, কোনও টুরিস্ট গাইড, এমনকী মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বল। কিন্তু সেই একাকীত্বই যেন এই জায়গার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সাভেহাকলু এমন এক স্থান, যা আপনাকে নিজের সঙ্গে দেখা করাবে। এই ধরনের জায়গা গাইডেড ভ্রমণের নয় ঠিকই, তবে অবশ্যই আত্ম-আবিষ্কারের নিশ্চিন্ত জায়গা বলাই যায়।
এখানে আসার পথে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেছিলেন, ‘এই জলাধার কিন্তু সিনেমার লোকেশন হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে। বেশ কিছু দক্ষিণী ছবির দৃশ্য এখানে শ্যুট হয়েছে।’ কথাটা শুনে আরও বিস্মিত হলাম। এই নিভৃত এক জায়গা! সিনেমার পর্দায় তার ছায়া আছে। হয়ত প্রকৃতির সৌন্দর্য কোনও ক্যামেরাও আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু তার ছায়া কিছুটা রেখে দিতে পারে! সাবধানতা হিসেবে একটা তথ্য জেনে রাখা জরুরি। এই জলাধার এলাকা একটি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। তাই এখানে প্রবেশের আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। প্রত্যেকের এই নিয়মের দিক থেকে সতর্ক থাকাই ভাল।

প্রকৃতি এখানে যেন কোনও এক গোপন রহস্য খুলে দেয় ধীরে ধীরে। আমরা অনেকক্ষণ জলাধারের ধারে চুপচাপ বসে রইলাম। সময় যেন থেমে গিয়েছিল। শুধু মেঘ, আলো, জল আর হাওয়ার ঢেউ খেলা। একটু দূরে দেখা যাচ্ছিল ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেঘ ঢুকছে। মেঘের দল মাঝে মাঝে আবার কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে সূর্যকে। সেই আলো-আঁধারির মধ্যে রিজার্ভয়ারের জল যেন এক এক সময়ে এক এক রঙে রাঙিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। কখনও সবুজ, কখনও রূপলি। কখনও নীলচে ধূসর। আরও একটা মুহূর্ত ছিল। যা বিশেষভাবে মনে গেঁথে গেছে। হঠাৎই এক ঝাঁক পাখি, সম্ভবত বুনো হাঁস কিংবা পানকৌড়ি উড়ে গেল জলাধারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সেই শব্দ সেই দৃশ্য, সেই উড়ন্ত দৃশ্যরেখায় সাভেহাকলু তখন যেন একটি জীবন্ত ক্যানভাস। এই জায়গার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য বোধহয়, জায়গাটির অনাবিষ্কৃত থাকা। এখনও অধিকাংশ পর্যটকের কাছে এটি অজানা। এবং তা হয়ত ভালই। কারণ তাতে করে এই জায়গাটির নিস্তব্ধতা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য, সবই বজায় আছে। এখানে আসা মানে শুধু বেড়ানো নয়। একটা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েও যে যাওয়া।
সবুজের সমারোহ। ছবি : সংগৃহীতফিরতি পথে মনে হচ্ছিল, চেনা শহরের কোলাহলে ফিরে গিয়ে এই নির্জনতা আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু সাভেহাকলুর এই অফবিট ভ্রমণ মনে গেঁথে থাকবে। এটুকু বুঝেছিলাম, মন যখন ক্লান্ত হবে, চোখ যখন শান্তি খুঁজবে, তখন বারবার ফিরে আসতে চাইব এই জলধারার ধারে, এই সবুজের আঁচলে, প্রকৃতির কোলের ওপর। সাভেহাকলু জলাধার হয়ত কর্ণাটকের কোনও ট্যুরিজম গাইডে বড় করে লেখা থাকে না। কিন্তু যারা প্রকৃতিকে ভালবাসেন, ভিড় এড়িয়ে চলতে চান, আর নিজেদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চান, তাঁদের জন্য এই জায়গা নিঃসন্দেহে এক পরম আশ্রয়। শেষবার পেছন ফিরে দেখার সময় মনে হচ্ছিল, এই জলধারার নিচে কোথাও লুকিয়ে আছে কোনও পুরনো দিনের গল্প। হয়ত সেই গল্পের চরিত্র আমরাই হতে পারলাম! অল্প সময়ের জন্য হলেও। আগেই বলেছি, এই ভ্রমণটির কথা মনে থাকবে অনেকদিন। আর যে দিন আবার ছুটি নিয়ে, ব্যাগপ্যাক কাঁধে করে পাহাড়ের টানে রওনা হব, সাভেহাকলুর নাম ঠিক সেই তালিকার একেবারে ওপরে থাকবে। যদি আপনি প্রকৃতির সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর স্বপ্ন দেখেন, যদি নিঃশব্দ জলরেখার ধারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চান, তাহলে সাভেহাকলু জলাধারই (Savehaklu Reservoir) আপনার পরবর্তী গন্তব্য হোক।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Manali | মানালি: পাহাড়ি রূপকথার পাতায় ছুটি কাটানোর ঠিকানা




