Sasraya News, Sunday’s Literature Special | Issue 74, 20th July 2025 Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | সংখ্যা ৭৪। ২০ জুলাই ২০২৫ রবিবার

SHARE:

সম্পাদকীয়

জীবন চক্রের রহস্যে সামান্য কিছুটা সময় বিলীন হলে আর বাকিটা মায়ায় জড়ায়। আমাদের সময়ে আমরা এক হতে শিখলে জীবন্ত অবস্থায় মায়া ভেঙে যায়। ভালবাসা প্রেমে পড়লে তা তৃপ্তির আনন্দে বুঁদ হয়ে যায়। বলতে পারি সময়ের গলিতে মায়ার রেখাচিত্র। আমাদের চলার পথে কিছুটা সময় বিলীন হয়ে যায়, ঠিক যেন নদীর স্রোতে ধুয়ে যাওয়া কোনও নামহীন স্বপ্ন। আর বাকিটুকু তা জড়িয়ে থাকে মায়ার আচ্ছাদনে। এই মায়া, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি প্রহরে আবছায়া রঙে রঙিন করে তোলে, কখনও আশ্বাস, কখনও প্রতারণা, কখনও ভালবাসা হয়ে আমাদের হৃদয়ে বাসা বাঁধে।
আমরা সময়ের মানুষ। আমাদের সময় সীমিত, অথচ সেই সীমাবদ্ধতাই আমাদের বাঁচতে শেখায়। আমরা যদি এই সময়ে এক হতে পারি। একে অপরের সঙ্গে।  আত্মার সঙ্গে। অস্তিত্বের সঙ্গে। তবে জীবন্ত অবস্থায় মায়া নিজেই ভেঙে পড়ে। যেন আত্মা নিজেকে চিনে ফেলে। বিভ্রমের খোলস গড়িয়ে পড়ে। আর এক নতুন আলোয় আলোকিত হয়। ভালবাসা যা প্রেমে রূপ নেয় তা শুধুমাত্র আকর্ষণ নয়। অন্তর আত্মার শান্তির রূপ।  গভীর প্রেমের মধ্যে একটি তৃপ্তির আনন্দ থাকে, যা কোনও চাহিদা বা স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না। বরং এটি একধরনের আত্মবিসর্জন। বলা যেতে পারে,  যেখানে ভালবাসার মানুষটির অস্তিত্বেই নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়। সে প্রেম বুঁদ করে দেয় হৃদয়কে আর সেই বুঁদ হয়ে থাকাটাই যেন জীবনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ অনুভব। আজকের এই দ্রুতবেগের সময়ে যখন সম্পর্কগুলোও হয়ে উঠছে অস্থায়ী ও প্রয়োজনভিত্তিক তখন এই সত্যটি মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন সময়কে বিলীন হতে দেওয়াও একরকম মুক্তি। জীবন চক্রে সময় এবং মায়াকে চিনতে শেখাটাই আত্মজাগরণের শুরু। আমরা যখন এক হই মানে এ ভাবে বলতে পারি, যেমন – ব্যক্তি ও ব্যক্তি, আত্মা ও আত্মা, তখনই আমরা বুঝি মায়া কেবল মোহ নয়। সে আমাদের শিক্ষক। মায়াও আমাদের নিজেকে চিনতে শেখায় । এ ভাবেও বলা যায় ভালবাসা যদি আত্মার অঙ্গ হয় তা থেকে প্রেমের গভীরতার সৃষ্টি। আর ভালবাসা আত্মার অঙ্গ হলে তার গভীরে শায়িত প্রেম।  প্রেমকে জাগাতে হয়। এটা আমরা সকলেই জানি যে ভালবাসা প্রকাশের ক্ষমতা হল প্রেম।

তাহলে ভালবাসা তার প্রকাশভঙ্গি যার পরিণতিতে আসে প্রেম আর এর ফলেই আসে তৃপ্তি, আসে শান্তি, আসে জীবনকে পুরোপুরি উপলব্ধির সম্ভাবনা। সময়, মায়া ও প্রেম এই ত্রিরেখার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আমরা। হয়ত একদিন বুঝতে পারব বেঁচে থাকাটা আসলে ভালবাসারই আরেক নাম। আর সেই ভালবাসার রূপান্তর ঘটে প্রেমে তাহলে তার মুক্তি। আমি সাধারণত বলতে চাই যে, এই উপলব্ধিতেই গড়ে উঠুক আগামী সময়ের মানবিক সম্পর্ক। এই আবিষ্কারের আলোয় ভেসে যাক সমস্ত বিভ্রম। ফিরে আসুখ শান্তি। ক্ষয় হয়ে উঠুক অক্ষয়। প্রাণের স্পন্দনে মনকে ক্ষয় করলে অন্তর আত্মা মিলিত হয় ঈশ্বর যোগে। এই যোগ আমাদের জীবন রহস্যের মুক্তির পথ। এই পথের সন্ধানে প্রবাহিত অজস্র প্রাণ। যদি আমরা জীবনের গভীর রহস্য সময়ের পথে মায়ার খেলা বুঝে ফেলতে পারি তাহলে রিপুকে সংযম করে পরমাত্মায় যুক্ত হতে পারি। কিন্তু আমরা কোনও না কোনও ভাবে বিভ্রান্তের শিকার হই। কোনও কোনও মানুষ তার নিজস্ব বোধকে সম্মানের মর্যাদায় রাখতে গিয়ে বেশ কিছু ভুল ব্যখ্যা করে ফেলেন। তিনি তখনও বুঝতে পারেন না যে তিনি মায়ার শহরে মিশে আছেন। আসলেই এমন চিন্তাশীল বিকৃত শক্তিপুরুষ খুব সহজেই হারিয়ে যেতে থাকে। এবং সংসার যাপনে বিভ্রান্ত ছড়িয়ে যায় বারংবার তাকে পৃথিবীতে উপস্থিত হয়ে নিজেকে শুধরানোর জন্য সময় দেওয়া হয়। এই সমস্ত আত্মার ততদিন পর্যন্তই শান্তি ফেরে না। ফলে এই বৃহত্মর বায়ুমন্ডলেই ঘুরপাক খেতে থাকে। এই ঘূর্ণনের ধাক্কায় ধাক্কায় শুধরে ওঠে সহস্র জন্মের পর। যখন ভালবাসা প্রেম ও সময়ের স্রোত বুঝে উঠতে পারেন। সময়, মায়া ও প্রেম এই ত্রিরেখার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই মিলে মিশে একাকার হয়ে উঠলে আমরা পরম তৃপ্তির অনুভব করব।
ভালবাসার প্রকাশভঙ্গির পরিণতিতে আসে প্রেম আর এই প্রেম-এর ফলেই আসে তৃপ্তি, আসে শান্তি, আসে জীবনকে পুরোপুরি উপলব্ধি করবার সম্ভাবনা । সাধারণ মানুষে-মানুষে নজর না ফিরিয়ে নিজেকে তৈরির জন্য প্রস্তুত হন একজন অসাধারণ মানুষে পরিবর্তন হতে।🍁

 

 

🍂মহামিলনের কথা 

গুরুর উপর যদি বিন্দুমাত্র ভালবাসা, শ্রদ্ধাভক্তি থাকে তাহলে নিজের যত ময়লা আবর্জনা গুলো তাঁর ঘাড়ে চাপিয়ে তাঁকে দুঃখযন্ত্রনা ভোগ করাতে কি প্রাণ চাইবে? গুরু কি ময়লা ফেলার গাড়ি না কি? যাদের সে ভালবাসা-ভক্তি নেই, যারা ঘোর বিষয়ী স্বার্থপর, তাদেরই এইরকম হীনবুদ্ধি হয়।

তারা তো শিষ্য বলেই গণ্য হবার উপযুক্ত নয়। আর যাদের গুরুর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা-ভালবাসা আছে তারা সেই ভয়ে আর পাপ করতে পারে না, পাছে গুরুকে ভুগতে হয়। হ্যাঁ, এই রকম শিষ্যের পাপের ভার তিনি নেন। বস্তুত *ভগবানই গুরুরূপে* তার ভার গ্রহণ করেন ও তাকে উদ্ধার করেন।🍁

–স্বামী বিরজানন্দ | পরমার্থ-প্রসঙ্গ

 

 

🍂নুবাদ 

 

২৬ বছর বয়সে নিউইয়র্কে ফিরে রোজালিন ইয়ালো ব্রঙ্কসের ‘ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হাসপাতাল’-এ রেডিওআইসোটোপ সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট স্থাপন করেন। শুরুতে এক ঝাড়ুদারের ঘরকেই ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর করেছিলেন। তবে এসময় এসে তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও স্থিতি খুঁজে পান। গ্র্যাজুয়েট স্কুলের বন্ধু অ্যারন ইয়ালোকে বিয়ে করেন তাঁদের বিবাহিত জীবনে দুই সন্তান হয়। রোজালিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, নারী চাইলে পরিবার ও কেরিয়ার দুই-ই সামলাতে পারেন। মূল ইংলিশ আর্টিকেল থেকে বাংলায় ভাষান্তরঃ সানি সরকার

 

রোজালিন ইয়ালো
১৯৭৭ সালের চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার

রোজালিন ইয়ালো সেই সময়ে একজন পদার্থবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন, যখন একজন নারীর পক্ষে সফল হওয়া ছিল বিরাট বাধা। তথাপি, তিনি সফল হয়েছিলেন। তাঁর গবেষণা সঙ্গী সলোমন বারসনের সঙ্গে মিলে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি যুগান্তকারী অবদান রেখেছিলেন। ওঁর কাজ, ‘রেডিওইমিউনো অ্যাসে’ (radioimmunoassay), যেটি রক্তে বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা পরিমাপের একটি অভিনব পদ্ধতি হিসেবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।

ক’য়েক ঘণ্টা ধরে বারবার রক্ত পরীক্ষা করে দেখেন ইনসুলিন কত দ্রুত বিপাকীয় হয়ে রক্ত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এতে ওঁরা দেখতে পান, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন তৈরি করতে অক্ষম নন; তাদের শরীরে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা ইনসুলিনকে কার্যকর হতে দেয় না। এটিই ডায়াবেটিস চিকিৎসায় একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার ছিল। তবে বৃহত্তর ক্ষেত্রে, এই রেডিওইমিউনো অ্যাসে পদ্ধতি জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। RIA পদ্ধতিতে এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ মাত্রার উপাদানও নির্ধারণ সম্ভব হয়।

ওঁর প্রাথমিক জীবন ও পড়াশোনা সম্পর্কে জানা যায়, ১৯২১ সালে নিউইয়র্কের সাউথ ব্রঙ্কসে রোজালিন সাসম্যান জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারে আর্থিক ও শিক্ষাগত অসুবিধা সত্ত্বেও রোজালিন দমে যাননি। সেই পরিস্থিতিতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে কলেজের ডিগ্রি অর্জন করবেনই। বাড়িতে বই কম থাকলেও তিনি অবিরাম পড়াশোনার ভেতর ঢুবে থাকতেন।অন্যদিকে, রোজালিন সব বিষয়েই পারদর্শী ও মেধাবী ছিলেন। জানা যায় যে, বিশেষ করে, ১৯৩০-এর দশকে পদার্থবিদ্যা, বিশেষত নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে যে উত্তেজনা ছিল, তা ওঁকে বিশেষ আকর্ষণ করেছিল। মেরি কুরির জীবনী পড়ে ও এনরিকো ফার্মির নিউক্লিয়ার ফিশন বিষয়ক বক্তৃতা শুনে রোজালিন সম্পূর্ণভাবে মুগ্ধ হয়ে যান রোজালিন। প্রসঙ্গত, তৎকালীন নিউইয়র্ক সিটির এক মেধাবী কিন্তু দরিদ্র মেয়ে হিসেবে তিনি হান্টার কলেজে ভর্তি হন। সেই সময় ওই কলেজ ছিল একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ ফ্রি উইমেন্স কলেজ। রোজালিনের বাবা-মা চাইতেন, তিনি শিক্ষিকা হোন। কিন্তু রোজালিন ইয়ালো পদার্থবিদ হতে চাইলেন। ফলে তিনি হান্টারের প্রথম ফিজিক্স মেজর হিসেবে সম্মানসহ দ্রুত স্নাতক হন।

রোজালিনের কথায়, ‘বিশ্ব তার অর্ধেক মানুষের মেধাকে হারালে, সমসাময়িক অসংখ্য সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না।’ এখানে উল্লেখ করা অবশ্য কর্তব্য যে, প্রাথমিক কেরিয়ার সংগ্রাম শুরু হলেও সেই সময় গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামগুলো মহিলাদের সহকারী পদ দিতে চাইত না, আর তাঁর পক্ষে পড়ার খরচ জোগানোও সম্ভব ছিল না। তাই তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বায়োকেমিস্টের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ নেন, যাতে অন্তত তার বিনিময়ে ক্লাস করতে পারেন। এরপর ক্রমশঃ পরিস্থিতি বদলায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরুষ বিজ্ঞানীরা যুদ্ধে যোগ দিতে থাকেন। এই সময়ই ১৯৪১ সালে রোজালিন ইয়ালো ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পান। মজার ব্যাপার হল, সেখানে ৪০০ জন শিক্ষকের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র মহিলা। উল্লেখ্য যে, রোজালিন নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করেন ও তেজস্ক্রিয় উপাদান পরিমাপের যন্ত্র তৈরি ও ব্যবহার শিখে নেন।

২৬ বছর বয়সে নিউইয়র্কে ফিরে রোজালিন ইয়ালো ব্রঙ্কসের ‘ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হাসপাতাল’-এ রেডিওআইসোটোপ সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট স্থাপন করেন। শুরুতে একটি ঝাড়ুদারের ঘরকেই ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর করেছিলেন। ক্রমশঃ কাজের জায়গার পাশাপাশি এসময় এসে তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও স্থিতি খুঁজে পান। গ্র্যাজুয়েট স্কুলের বন্ধু অ্যারন ইয়ালোকে বিয়ে করেন। তাঁদের বিবাহিত জীবনে দুই সন্তান হয়। রোজালিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, নারী চাইলে পরিবার ও কেরিয়ার দুই-ই সামলাতে পারেন।
রোজালিনের কথায়, ‘বিজ্ঞান ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের পার্থক্য শুধু এটুকু, নারীরা সন্তান জন্ম দেয়। এতে নারীদের জন্য কিছুটা কঠিন হয়, তবে… এটিও একটি চ্যালেঞ্জ, যা অতিক্রম করা সম্ভব।” প্রসঙ্গত, তখনকার নিয়ম ছিল, কোনও মহিলা পাঁচ মাসের বেশি গর্ভবতী হলে চাকরি ছাড়তে হবে। তিনি সেই নিয়মকে উপেক্ষা করেন।

রেডিওইমিউনো অ্যাসে আবিষ্কার ফিরে দেখলে দেখা যায়, ১৯৫০ সালে সলোমন বারসন তাঁর টিমে যোগ দেন। তখন রোজালিন ইয়ালোর বয়স ২৯। প্রথমে তারা রেডিওআইসোটোপ ব্যবহার করে রক্তের পরিমাণ নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। তারপর তারা ইনসুলিন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ইনসুলিন সহজলভ্য ও অন্যান্য হরমোনের তুলনায় সহজে কাজ করার উপযোগী ছিল। তাছাড়া তাঁর স্বামীও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন বলে তিনি এ বিষয়ে আরও বেশি আগ্রহী ছিলেন।

ওঁরা প্রথমে ইনসুলিনের অণুর সঙ্গে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন যুক্ত করে, এবং ক্ষুদ্র পরিমাণে সেই ইনসুলিন নিজেদের দেহেও প্রবেশ করান। ক’য়েক ঘণ্টা ধরে বারবার রক্ত পরীক্ষা করে দেখেন ইনসুলিন কত দ্রুত বিপাকীয় হয়ে রক্ত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এতে ওঁরা দেখতে পান, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন তৈরি করতে অক্ষম নন; তাদের শরীরে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা ইনসুলিনকে কার্যকর হতে দেয় না। এটিই ডায়াবেটিস চিকিৎসায় একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার ছিল। তবে বৃহত্তর ক্ষেত্রে, এই রেডিওইমিউনো অ্যাসে পদ্ধতি জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। RIA পদ্ধতিতে এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ মাত্রার উপাদানও নির্ধারণ সম্ভব হয়। শুধু হরমোন নয়, ১৯৭৭ সালের নোবেল বক্তৃতায় রোজালিন ইয়ালো ১০০টিরও বেশি বায়োলজিক্যাল উপাদানের কথা উল্লেখ করেন। হরমোন, ওষুধ, ভিটামিন, এনজাইম, ভাইরাস, নন-হরমোনাল প্রোটিন প্রভৃতি যা RIA দ্বারা পরিমাপ সম্ভব।

১৯৭৭ সালে সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফের কাছ থেকে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন। আজও অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ, হেপাটাইটিস ভাইরাস শনাক্তকরণ, বন্ধ্যত্ব চিকিৎসাসহ অসংখ্য ক্ষেত্রে RIA ব্যবহার হচ্ছে। অন্য একটি বিষয়ে রোজালিন বলে গিয়েছেন, বৈষম্যের সমস্যাটা বৈষম্য নিজেই নয়, বৈষম্যের শিকার মানুষগুলো যখন নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করে, তখনই আসল ক্ষতি হয়।’ বাধা ছিল। সামাজিক, পারিপার্শ্বিক আরও অনেক অনেক। কিন্তু রোজালিন ইয়ালো, সমস্ত বাধা অতিক্রম করেছিলেন। শুধু তাই-ই না, বিজ্ঞান ও মানবতার জন্য রেখে গিয়েছেন অসীম অবদান।🍁

 

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস 
শুরু হয়েছে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কবি তৈমুর খানের জীবন। বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কেমন ভাবে কেটেছিল। মননে চেতনায় কিভাবে বয়ে গেছিল উপলব্ধির স্রোত। কেমন করে প্রকৃতি ও জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। কেমন করে জীবনে এলো ব্যর্থতা। সেসব নিয়েই নানা পর্ব।

 

একটি বিষণ্ণরাতের তারা

তৈমুর খান

ছত্রিশ.

প্রেমে পড়লে কি এরকমই হয়?

বিদ্যালয়ের চাকরি প্রথম প্রথম আমার কাছে খুব আনন্দের হলেও দৈনন্দিন কাজকর্মে একটা গতানুগতিকতার পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গেল। প্রতিদিন ঠিক টাইমে বিদ্যালয়ে প্রবেশ কর, আবার ছুটির ঘন্টা পড়লে বেরিয়ে যাও। এভাবেই যাওয়া-আসা চলতে লাগলো। রঘুনাথগঞ্জে দু’টি হোটেলও ছিল উল্লেখযোগ্য। একটির নাম ছিল ‘মিলন’ আরেকটির নাম ছিল ‘সঙ্গম’। সকাল দশটায় মিলনে ভাত খেতাম। সন্ধ্যা ন’টায় সঙ্গমে রুটি খেতাম। জীবন শুধু ‘মিলন’ আর ‘সঙ্গমে’ই বন্দী হয়ে গেল। সন্ধ্যেবেলায় কাজকর্ম বলতে লেখালেখি নিয়ে বসতাম। মাঝে মাঝে আসতো চন্দন পাণ্ডে। মাঝে মাঝে সুভাষ রবিদাস। দু’জনেই ছিল তরুণ কবি। দু’চোখে তাদের অনেক স্বপ্ন। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ থাকতো। চন্দনের কাছে থাকতো নেশার পানীয়। ‘মুক্তবেণী’ নামে একটি পত্রিকাও সে সম্পাদনা করতো। নতুন কিছু লিখলে আমাকে পড়ে শোনাতো। যাদবপুরে ফিজিকস পড়তে গিয়েও সে আর তা সম্পূর্ণ করেনি।

 

রক্তমাংসে গড়া আমারও শরীর সুতরাং মনের মধ্যে তার ছায়া সর্বদা ঘোরাফেরা করতো এ কথা অস্বীকার করতে পারি না। সেদিন বাস থেকে নেমেই কোনো এক জাদুর আকর্ষণে আমার ভাড়া বাড়ির পথ ছেড়ে অনেকটাই তার পেছন পেছন চলে গেছিলাম। তখন শহরের রাস্তায় আলো জ্বলে গেছে। কিন্তু লোকজনের ব্যস্ততা কমেনি। আমি কোনো মগ্নতার আবেশে তার বেণী দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটা আর রহস্যময় বিভঙ্গ শরীরী বাঁকের বন্যা প্লাবিত উচ্ছ্বাসে যেন ভেসে চলেছিলাম। অধরা নারীটির এমন রহস্যময় চলন আমাকে জাদু বাস্তবের মতোই মনে হয়েছিল।

কী এক পাগলামিতে তাকে পেয়ে বসেছিল বলে ছেড়ে চলে এসেছে। কবিতা নিয়ে তার সঙ্গে তুমুল তর্ক শুরু হতো। কবিতা কেমন হওয়া উচিত এই ছিল তার প্রশ্ন। আমি বলেছিলাম, কবিতা তেমনি হবে যা এখনো আমরা পড়িনি। অর্থাৎ একেবারে নতুন। কারো প্রভাব থাকলেও প্রতিভার গুণে সেখানে নিজস্বতাই বড় হয়ে উঠবে।
চন্দন বলেছিল, “সেরকম কবিতা আজ পর্যন্ত আমারও পড়া হয়ে উঠেনি। এরকম মনে হয়নি যে, এ কবিতা আমি কখনও পড়িনি। তাই নতুন কিছু লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।” অবশ্য এই চেষ্টা তার ছিলও। কিন্তু হঠাৎ তার বিয়ে হয়ে গেল বলে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগদান করলো বলে কবিতা চর্চাই আর রইলো না। বরং বেশি করে নেশার পানীয় খেতে লাগলো এবং ধীরে ধীরে বেহুঁশ হতে লাগলো।
সুভাষ রবিদাস খুবই গরিব বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বিয়ে পাস করে রোজভ্যালি কোম্পানির একটা ক্লার্কের চাকরিতে যোগদান করেছিল। তাই ছুটির দিনেই সে ফিরতো আমার কাছে। তার কবিতা লেখার গতি ও কৌতূহল আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষ বলে উচ্চশ্রেণির লোকেরা তাকে তেমন প্রশ্রয় দিত না। তার শিক্ষা, তার রুচি, তার পরিশীলিত মনন থাকা সত্ত্বেও সে সর্বত্রই অবহেলার পাত্র ছিল। তাই আমার কাছেই তার স্নেহের অভাব হতো না। নানা সুখ-দুঃখের গল্পের মধ্য দিয়েই বহু সন্ধ্যা কাটাতাম গঙ্গার তীরে বসে। চা খেতে খেতেই চলে যেত অনেকটা সময়। তাকে নিয়ে ক’য়েকবার গেছিলাম কলকাতার নন্দন চত্বর এবং ‘দৌড়’ পত্রিকার দপ্তরেও। বেশ কিছু কবিতাও প্রকাশিত হয়েছিল। একদিন তাকে দেখলাম প্রায় পাগলপারা হয়ে গেছে। আমার কাছে এসে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো—
—এ জীবন আর রেখে লাভ কী! মনে হচ্ছে নিজেকেই শেষ করে দিই!
—কী কারণে এই সিদ্ধান্ত তোমার? অসুবিধা না থাকলে বলতে পারো।
—আপনার কাছে কোনো কথাই গোপন করি না। আজও করবো না।
—তাহলে বলো শুনি।
—অনেক ছোটবেলা থেকেই আমি একজনকে ভালোবাসতাম। কিন্তু এতদিন হয়ে গেল চাকরি পেলাম না বলে সে এখন অন্যত্র বিয়ে করে নিচ্ছে। আজকেই তার বিয়ে। কী করে ভুলবো তাকে দাদা!
—তুমি ভুলবে কেন? তাকে মনে রাখো। সারাজীবন মনে রাখো। তুমি তাকে যে সুখ দিতে পারবে না তাই সেটাও তোমাকে ভাবতে হবে। যার কাছে সে সুখ পাবে, তার কাছে যাচ্ছে।
আমি একসময় বিশ্বাস করতাম পৃথিবীতে প্রেমই সব। কিন্তু এখন বিশ্বাস করি, প্রেম বলে কিছু নেই। যদি থাকে তা আধ্যাত্মিক। নারীমোহ যৌবনের আকর্ষণ। শারীরিক সুখ অন্বেষণ। মায়াময় মুখ আর কাল্পনিক শরীরী ভাষা তোমাকে টান দেবে। মনে মনে ভাববে তাকে পেলেই আমার যাবতীয় তৃষ্ণা মিটে যাবে। কিন্তু পেলেই দেখবে সেখানেও জ্বলন্ত অঙ্গার আছে। রোমান্টিক উপলব্ধির সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই।
—এরকম আপনি কী করে বুঝলেন দাদা?
—আমার চোখে দেখা, সম্প্রতি এক যুবক একজন যুবতীর জন্য পাগল হয়ে গেছিল। যেমন করে হোক তাকে পেতেই হবে। যুবতীটিকে পাওয়ার জন্য সে সবকিছু ত্যাগ করতেও প্রস্তুত ছিল। ব্যাপারটা যখন এরকমই সবাই জানলো, তখন তার সঙ্গেই তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু কী আর বলবো, তিন মাসও অতিবাহিত হলো না, যুবকটি অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে পালিয়ে গেল তাকে ফেলেই। যুবতীটিও নাকি আরেকটি পুরুষের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল। তাই তার মনেও এসেছিল মুক্তির চিন্তা। উভয়েই বুঝে গেল প্রেমের স্বাদ বড় মধুর নয়। কেবল মরীচিকাময়।
সুভাষ আমার কথাগুলি বুঝলো। সে নিজেকে রক্ষা করলো ঠিকই, কিন্তু বড় অসহায় হয়ে বাঁচতে লাগলো। কিছুদিন পর তার চাকরিটিও চলে গেল। পুরোপুরি সে বেকার। এদিকে বৃদ্ধ পিতা-মাতাও একে একে বিদায় নিলেন। তার আপন বলতে আর কেউ থাকলো না। মাটির একটা ছোট্ট ঘরে প্রায় সারাজীবনই সে একাকী জীবন কাটাতে লাগলো। গরিব বলে তার বিয়ে পর্যন্ত হলো না। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “এখন কি খাবার জোটে তোমার সুভাষ?”
সুভাষ জানালো, “দু’চারটে টিউশান পড়াতাম তাও চলে গেছে। মাঝে মাঝে এক একবেলা খাবার দূরের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকেই পাই। আবার কোনো কোনো দিন পুরোপুরি উপোস।”
সুভাষের কী ভয়ংকর একটা জীবন। যুবক বয়সেও অনাহারে কাটাতে হয় তাকে। মাঝে মাঝে তিক্ত জীবনের কবিতাও বেরিয়ে আসে। চাঁদের জোৎস্নায় যুবক পুরুষ যখন রোমান্টিক স্বপ্ন দেখে, সুভাষ তখন আত্মহত্যার ঘোষণা করে। নিজের এক নিভৃত আধ্যাত্মিক জগতের খোঁজ করে। কবিতা লেখার মতো কাগজ-কলম কেনারও তার সামর্থ্য নেই।
গফুর শেখ বলে একজন এলআইসি কর্মী তাকে সাহায্য করতেন। দিল দরিয়া গফুর শেখ ছিল আমার কাছেও দাদার মতো। হঠাৎ কিছু টাকা দরকার হলে তার কাছেই পেয়ে যেতাম। মোটর বাইকে চাপিয়ে সে নিয়ে যেত বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও। সুভাষকে সে-ই ভরসা দিয়েছিল কিছু একটা করার জন্য। কিন্তু হঠাৎই তার মৃত্যু গভীর শোকে পতিত করে সুভাষকেও। সুতরাং কোন্ ডালে গিয়ে লাগবে সে? জীবনের যেন কানাকড়িও মূল্য নেই তার কাছে। কবিতাগুলিও যেন অলিখিতই থেকে যাচ্ছে।
স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে একদিন বাসের সিটেই আমার পাশেই দেখছি এক সুন্দরী যুবতী বসে আছে। বারবার তার মুখটি দেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু আধখানার বেশি দেখতে পাচ্ছি না। ভীষণ পরিচিত মনে হচ্ছে, কিন্তু কথা বলার মতো সাহসও হচ্ছে না। হঠাৎ বাসের ড্রাইভার জোরে ব্রেক করলে মেয়েটি প্রায় সম্পূর্ণই আমার শরীরে এলিয়ে পড়ে আমাকে স্পর্শ করলো। তারপর মুখোমুখি হতেই জিজ্ঞেস করলো,
—আমাকে চিনতে পারলেন না স্যার? আমি তানিয়া! কবি নজরুল কলেজের ছাত্রী ছিলাম। নলহাটি কলেজে পরীক্ষা দিবার সময় আপনি পরীক্ষা হলে ছিলেন!
—হ্যাঁ মনে পড়েছে! তা এদিকে কোথায় গিয়েছিলে?
—এইতো আমি মনিয়ারা হাই মাদ্রাসায় চাকরিতে জয়েন করেছি! ছ’মাস হয়ে গেল চাকরি করা!
—বাহ খুব ভালো খবর! আমি জানতাম না। খুব তাড়াতাড়ি চাকরি পেয়েছো। আর ভালো জায়গাতেই পোস্টিং হয়েছে।
—হ্যাঁ স্যার এখানেই আমার শ্বশুর বাড়িও।
—এ তো আরো ভালো খবর।
অধিক কথা বলার আমার সামর্থ্য হলো না। তানিয়া সম্পর্কে কিছু বলার আছে। তখন সে বি-এ পরীক্ষার্থী। দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরী। হাতের লেখাও চমৎকার। তাই ঘুরে ঘুরে তার কাছে আসি আর পড়ে দেখি তার উত্তরপত্র। ‘হ্যাঁ, খুব ভালো হচ্ছে। লিখে যাও।’ তারপর চাকরি পাওয়ার পর প্রথমেই মনে পড়ে তার কথা। বিয়ে করার জন্য সেই ছিল প্রথম পছন্দের। মুরারই কবি নজরুল কলেজের অধ্যাপক বন্ধু এ ব্যাপারে আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু সে রাজি হয়নি। তার ‘প্রেমিক আছে’ এ রকমই বার্তা পাঠিয়েছিল। তাই আশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু মনের মধ্যে তার উপস্থিতি টের পেতাম। প্রেম যতই মায়া বা মরীচিকা হোক, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক জীবনেরই লক্ষণ তা আমিও জানতাম। রক্তমাংসে গড়া আমারও শরীর সুতরাং মনের মধ্যে তার ছায়া সর্বদা ঘোরাফেরা করতো এ কথা অস্বীকার করতে পারি না। সেদিন বাস থেকে নেমেই কোনো এক জাদুর আকর্ষণে আমার ভাড়া বাড়ির পথ ছেড়ে অনেকটাই তার পেছন পেছন চলে গেছিলাম। তখন শহরের রাস্তায় আলো জ্বলে গেছে। কিন্তু লোকজনের ব্যস্ততা কমেনি। আমি কোনো মগ্নতার আবেশে তার বেণী দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটা আর রহস্যময় বিভঙ্গ শরীরী বাঁকের বন্যা প্লাবিত উচ্ছ্বাসে যেন ভেসে চলেছিলাম। অধরা নারীটির এমন রহস্যময় চলন আমাকে জাদু বাস্তবের মতোই মনে হয়েছিল। কিছু দূর গিয়ে সম্বিৎ ফেরে পরিচিত এক শিক্ষকের ডাকে।
”মাস্টারমশাই, এদিকে কোথায় চললেন?”
হঠাৎ নিদ্রা ভঙ্গের মতো কেঁপে কেঁপে উঠি। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলি, “তাইতো আমি কোথায় যাচ্ছি নিজেও জানি না!”
তারপর তিনি জোর করে আমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন। একটা দোকানে বসে দু’জনেই চা খেতে খেতে দেখি, চায়ের কাপেও তানিয়ার মুখ ভেসে উঠছে। আকাশের দিকে চেয়ে দেখি, আকাশেও তানিয়া উড়ে বেড়াচ্ছে দু’টি বড় বড় ডানায়। সুভাষেরও কি তাহলে এরকমই হচ্ছে? প্রেমে পড়লে কি এরকমই হয়? বাসায় ফিরে সেদিন আর কিছুই করতে ইচ্ছে হলো না। আলোও জ্বালালাম না। অন্ধকারেই পড়ে থাকলাম কতক্ষণ কে জানে! 🍁(চলবে)

 

🍁কবিতা 

 

অজয় গঙ্গোপাধ্যায়

ফিরে আসার অর্থ

ফিরে আসা মানে কেবল ট্রেন ধরা নয়

ফিরে আসা মানে পুরনো শব্দে নতুন ব্যথা খোঁজা

বাবার কণ্ঠে রাখা অপূর্ণ গল্প
মায়ের চোখে একটা রোদের রেখা

তখন পুরনো পাড়ায় হাঁটলে কেউ আর চিনতে পারে না
কিন্তু রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে
একজন কাগজ বিক্রেতা, যে জানে
তুমি কে ছিলে, কার জন্য ফিরলে…

তোমার স্কুলবেলার জানালা, এখন বন্ধ
কেবল হাওয়া জানে, কতগুলো ভালবাসা
আটকে আছে তার কপাটে।

 

মৃণাল দাশ-এর তিনটি কবিতা

ঝুলে থাকা ওড়না 

তোমার ওড়না এখনো ঝুলে আছে
ধর্মতলার বাতাস ওড়নাটা হেলিয়ে দেয়, কিন্তু ফেলে দেয় না।
যেন কেউ প্রতীক্ষায় রেখেছে
ভুলে যাওয়া কথা, অপূর্ণ ছোঁয়া!
তুমি ফিরে আসো, আবার হারিয়ে যাও, কোথায় যাও!
কিন্তু ওই রঙিন কাপড়খানা
আজও শহরের হাওয়ায় কিছু বলে,
সবকিছু ফুরিয়ে যায় না, কিছু কিছু
ঝুলে থাকে ঠিক যেখানে ফেলে গেছ।

 

 


ধর্মতলার মোড়ে একলা

ধর্মতলার মোড়ে এখনএ ভিড় হয়,
কিন্তু কেউ আমার নাম জানে না।
আমি দেখি, ট্রামের তারে আটকে থাকা বিকেল ও আলো
কেউ ছিঁড়ে দেয় না।

এই শহরে কেউ প্রেমিক নয়, কেউ প্রিয় নয়।
সবাই সময়ের পায়ে হাঁটে।
আর আমি দেখি,
একটা মেয়ের কাঁচা হাসি
ভিড়ের ফাঁকে পড়ে আছে মাটিতে।
আমি কুড়িয়ে নিই না, ভেবেই নিই,
তুমি রেখে গিয়েছিলে, একদিন ফিরবে বলে।

 

 


ভোর নামে 

ছাদের কার্নিশে,
এখনও হাঁটে ময়দান ছুঁয়ে ক্লান্ত পাখিরা।
কিন্তু যাদের ডাকে ফিরতে চেয়েছিলাম,
তারা কেউ নেই, কেউ আর ফেরে না।

একেকটা দিন শুধু পুরনো নামে ডাক দেয়,
আমি চুপচাপ শুনি,
তুমি তো কথা দিলে ফিরবে!
কিন্তু আমি জানি, ফেরা মানে সব ফিরে পাওয়া নয়,
কিছু কিছু ফিরে এলে আরও শূন্য লাগে।

 

লহমা চক্রবর্তী 

স্মৃতির হাওয়ার ঝলকানি

স্মৃতি কী তবে বাতাসে ফেলে আসা রোদ?
যেভাবে ছুঁয়ে ছিলে, গায়ে লেগে আছে।
একটা দুপুরে, স্কুলের দেয়ালে
যেভাবে তোমার ছায়া পড়েছিল
তেমন আর ছায়া হাঁটে না আমার সঙ্গে।

চেনা পাড়ায় অচেনা কোলাহলে
তোমার নাম উচ্চারণ হয় না,
অজান্তে কারো ঠোঁটে
ভেসে আসে প্রাচীন সুর,
যে সুরে ছিলাম আমি, ছিলে তুমি,
আর ছিল না-বলা সেই গল্প
যা শেষ হল না কখনওই।

 

 

স্বপন দত্ত

অ্যালকেমিস্ট পাঁকে সোনা খোঁজে

আরে কিছুতেই আর বাইরে যেতে পারছি না। এ কি অবস্থা হল, কে ঘিরে ধরল আমাকে? ধাক্কা দিয়ে সরাতে পারি না। নাড়াতে পারি না। ক্রমেই যেন সেঁটে যাচ্ছে। কিসে? সেঁটে যদি যায়— নাহ! এভাবে হবে না। তাহলে একটা অস্তর চাই। অস্তর? অস্তর এখানে কোথায়? আর দেখতেই বা পাবে কী করে? অস্তরেরও তো তোমাকে দেখা দরকার, তবেই তো তুমি তাকে দেখতে পাবে। ওরে স্বপন, মগজটাও গেছে। তোমার মগজের গজটুকু গিয়ে। ম ম করছে। পাঁক। যদিও পাঁকও সারে লাগে। আহা! কী দারুণ। বজরাই ধান হয়। সেই ধান থেকে চাল, কি গন্ধ ছাড়ে! সঙ্গে একটু সর্ষের তেল, নুন লঙ্কা আর কী চাই? গন্ধেই মাত!মাত! এই অবস্থায়! এই গন্ধ! এই খাওয়া! এই দাওয়া! দাওয়াত— কে দেবে। কিছুতেই কিছু হয় না। স্বপন, স্বপ্নেও দেখা দে, এখানে জমে না। এই ক্যুয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম স্পেশ, এ কিছুতেই ছাড়ে না! সব কিছু ভ্যাকুয়াম, তা-ও বোঝার নিরিখ নেই। শুধু হিড়িক। শুধু পিরিক। ওই দ্যাখো, কি সুন্দর পিরিক… পিরিক… পিক…পিক…! হ্যাঁ, আর কিছু নয় পাঁক!

 

 

গোলাম কবির

আমার না হয় পুড়ুক হৃদয় একটুখানি

হররোজ কত কথা জমে থাকে
তোমাকে বলব বলে কিন্তু
সেসব কেন যে আর হয় না বলা!

এমনি করে আমার না বলা কথাগুলো
জমতে থাকে বুকেরই একদম গভীরে
শান্তস্থির কোনও গভীর দীঘির জলের মতো!

এখন সেখানে একঝাঁক রাজহংস
আর রঙিন মাছেরা খেলা করে,
সারাদিন ঘুরে ঘুরে আসে মাছরাঙা পাখিরা।

এখন সেখানে নিত্য নতুন
পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে
এবং সগৌরবে ফোটে লাল শাপলা!

তাই তো ইচ্ছে করেই আর তোমাকে বলি না
আমার সেসব না বলা কথাগুলো!

মনেহয়, এই তো বেশ ভালোই আছি,
আমার নাহয় পুড়ুক হৃদয় একটুখানি!

ওরা তো তবুও ভাল থাকুক,
বেঁচে থাকুক নিত্য নতুন
আনন্দের ভেলায় চড়ে!

 

 

পরাণ মাঝি 

তবু প্রেম থাক নির্জনে

অনেক প্রেমের ইতি হয়; কারণও থাকে অজানা

সে প্রেম থাক নির্জনে; লতাপাতার বন্ধনে

থাক না ভালো কিছু অ-সুখ এ জীবনে

 

 

 

🍁ছোটগল্প | এক 
রবি সম্মতি জানিয়ে বলল, ‘নিশ্চয়ই! হাঁটতে হাঁটতে অল্পস্বল্প গল্পও হতে পারে। আপনি চাইলে রোজই এমন হতে পারে না।’
রবি কথায় হেসে উঠল, বিনোদিনী। বলল, ‘ধীরে চলুন মশাই! পা পিছলে পড়বেন তো!’

 

ঘুর্ণির ভেতরে অবয়ব 

তাহমিনা শিল্পী 

(বাইশে শ্রাবণ উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিবেদিত)

বি ভীষণভাবে ভাগ্যে বিশ্বাস করে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজে রাশিচক্র দেখে। অফিসে যাবার সময় গলির মোড়ে যে লোকটি টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্য গণনা করে, তার কাছেও যায়। পাঁচ টাকা দিয়ে ভাগ্য জেনে নেয়। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কিন্তু আজ এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। টিয়াপাখি কিছুতেই খাম তুলছে না। সাজানো খামগুলোর সামনে কেবল এপাশ-ওপাশ হেঁটে চলেছে, যেন সে কোনও মাধ্যমিক স্কুলের কড়া হেডমাস্টার! ঠিক তখনই একজন সুদর্শনা মেয়ে এসে দাঁড়ালো দোকানের সামনে। অমনি টিয়াপাখিটি চনমনে হয়ে উঠল। মেয়েটিকে দেখে কিচকিচ করে ডাকতে লাগল,
‘বিনু, বিনু, বিনু…’

রবি গোলাপটা কাদম্বরীর দিকে এগিয়ে দেয়।
‘ধুর ওসব ছাড়ো তো বৌঠান। আমি তোমায় ভুলিনি। বাইশে শ্রাবণ এলেই তুমি আসো। তাই তোমার অপেক্ষায় বসে থাকি আমি।’
কাদম্বরী গোলাপটা হাতে নেয়, আলত করে গন্ধ শুঁকে বলে, ‘জানো তো রবি, জীবনটা শুধু রাশিচক্রের খাম নয়। কিন্তু সময়ের গহীনে জমে থাকা বিনে সুতোর টান। তোমার বিনু অতীত, তোমার ক্যামেলিয়া সম্ভবনা। আর আমি? আমি তোমার হৃদয়ের সেই টান। যার সঙ্গে তোমার সবকিছুর শুরু।’

পাখিওয়ালা বলল, ‘আগে রবীবাবুর খামটা তুলে দে, তারপর তোর বিনুর সঙ্গে রঙ্গ করিস।’
টিয়াপাখি তখন একটি খাম তুলে দিল রবির হাতে।
খাম খুলে রবি পড়তে লাগল, ‘আজ বাইশে শ্রাবণ। তোমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন। আজ তোমার নায়িকাদের সঙ্গে রোমাঞ্চ শুভ।’
রবি অবাক হল! নায়িকাদের সঙ্গে রোমাঞ্চ? তার তো একজনও নেই! এখানে আবার নায়িকাদের আসছে কোত্থেকে? কী জানি আজ কী অপেক্ষা করছে তার জন্য!
সে পাখিওয়ালার দিকে পাঁচ টাকা এগিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ঠিক তখনই চোখাচোখি হল সেই মেয়েটির সঙ্গে, যে টিয়া পাখির ভাষায়, বিনু।
মেয়েটি মুচকি হেসে বলল, কেমন আছেন রবিবাবু? আমি আপনাকে প্রায়ই দেখি। আমিও ভাগ্যে বিশ্বাস করি, আপনার মত। রোজ এখানে আসি ভাগ্য জানতে। আচ্ছা, আপনার কি সব মিলে যায়?
রবি একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, বেশিরভাগই মিলে যায়। আমি রবীচন্দ্র মল্লিক। আপনি?’
‘বিনোদিনী সরকার। ডাকনাম বিনু। একটু দাঁড়ান, আজ কী আছে আমার ভাগ্যে দেখে যান।’ বিনু বলল।
বিনোদিনী বসে পড়ে। টিয়াপাখি এবার অঙ্কের মাস্টারের মতো ভাব করে একখানা খাম তুলে দিল তার হাতে।
বিনোদিনী সেটি খুলে পড়ল।
‘আজ তোমার বৃহস্পতি তুঙ্গে। তাই আজ কোনও হিসেব করো না। রোমাঞ্চে ভরপুর দিন কাটবে।’
‘বাহ্! আজ তো দেখি আমাদের দু’জনেরই একইরকম রাশিফল! বলল রবি।’
‘তা কোন দিকে যাচ্ছেন রবিবাবু?’ বিনু মুচকি হেসে বলল।
রবি বলল, ‘ট্রামস্টপ পর্যন্ত। তারপর গড়িয়াহাট, অফিস।’
আমার গন্তব্য ঠিক উল্টো দিকে, দমদম। তবে ট্রামস্টপ পর্যন্ত একসঙ্গে যাওয়া যাক?’ বিনু জানতে চাইল।
রবি সম্মতি জানিয়ে বলল, ‘নিশ্চয়ই! হাঁটতে হাঁটতে অল্পস্বল্প গল্পও হতে পারে। আপনি চাইলে রোজই এমন হতে পারে না।’
রবি কথায় হেসে উঠল, বিনোদিনী। বলল, ‘ধীরে চলুন মশাই! পা পিছলে পড়বেন তো!’
পাশাপাশি তারা হেঁটে চলল।
পেছন থেকে টিয়াপাখি ডাকতে লাগল,
‘বিনু-রবী, বিনু-রবি’…
ট্রামস্টপে পৌঁছে প্রথমে এল বিনোদিনীর ট্রাম। চলে যেতে যেতে জানালার ফাঁক দিয়ে হাত নেড়ে বলল, কাল দেখা হচ্ছে, রবি বাবু!
রবী মনোযোগ তার দিকে দিয়ে তাকিয়ে ছিল। এমন সময় তার ট্রামও এসে গেল। দৌঁড়ে উঠে শেষদিকে একখানা ফাঁকা সিটে বসে পড়ল।
পরের স্টপেজ থেকে একটি মেয়ে উঠল।
‘একটু জানালার ধারে বসতে দেবেন প্লিজ? হাওয়া না পেলে আমার ভীষণ দমবন্ধ লাগে। তাই বিরক্ত করছি। কিছু মনে করবেন না দয়া করে।’
রবি সরে গেল। মেয়েটি বসে একটি বই খুলে পড়তে লাগল।
মেয়েটির চুল উড়ছে জানালার হাওয়ায়, মাঝে মাঝে রবির গালে এসে লাগছে।
ডালিম রঙের শাড়ি, কানে গোঁজা রক্তজবা, মিষ্টি সুগন্ধীতে ঘোর লাগার মতো অনুভূতি।
রবী সাহস করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বই পড়ছেন?’
মেয়েটি বই বাড়িয়ে দেখাল। ‘চোখের বালি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’
‘এই পথেই রোজ যাওয়া হয়? বোধহয় আপনাকে যেন আগেও দেখেছি।’ রবি জানতে চাইল।
মেয়েটি চুপ।
রবি আবার জিজ্ঞেস করল, কি নাম আপনার?
মেয়েটি তখনও চুপ।
পরের স্টপে মেয়েটি নেমে যাচ্ছিল। একটু দাঁড়িয়ে, মেয়েটি এবার হেসে তাকাল। বলল, ‘আমি ক্যামেলিয়া মিত্র। একদিন রেলগাড়ির কামরায় আমাদের দেখা হয়েছিল। থাকি এই তো, কিনু গোয়ালার গলিতে। এই পথে রোজ না এলেও, মাঝে মাঝে যাতায়াত করি বৈকি। আবার যদি আমাদের দেখা হয়, বাকিটা বলব, রবিবাবু!’
রবি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির চলে যাওয়া পথের দিকে। ভাবল, আজ আর অফিসে যাবে না। বরং ময়দানে গিয়ে হাওয়া খাওয়া যাক। পরের স্টপে নেমে পড়ল। হেঁটে চলে গেল সোজা ময়দানে। কিছু্ক্ষণ একাই হাঁটাহাঁটি করল। একটা গোলাপ কিনল ছোট্ট একজন ফুল বিক্রেতার কাছ থেকে। তারপর এক আমগাছের ছায়ায় বসে পড়ল। তারপর আম গাছের ছায়ায় বসে চোখ বুঁজে সারাদিনের সমস্ত কিছু ভাবতে লাগল, রাশিচক্র, বিনু, ক্যামেলিয়া টিয়া পাখি আর বাইশে শ্রাবণ…

হাওয়া বইছে, গাছের পাতায় ছায়ার খেলা। কখন যে ঘুমে ঢলে পড়েছে রবি, বুঝতে পারেনি।
হঠাৎ এক মিষ্টি কণ্ঠের আহ্বান, ‘রবি, এই রবি…’
চোখ মেলে দেখে, তার সামনে দাঁড়িয়ে এক অপরূপা শ্যামবর্ণা নারী। রোদ পড়েছে তার কপালের লাল টিপে, ঠোঁটে রহস্যের ছায়া।
রবি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। খুব চেনা, অথচ অচেনা লাগছে। স্বপ্নের মতো, আবার বাস্তবও মনে হচ্ছে।
‘কি গো, আমায় চিনতে পারছ না? আমি কাদম্বরী। তোমার নতুন বৌঠান।’ কাদম্বরী হেসে বলল।
‘বৌঠান! আমায় ছেড়ে কোথায় চলে গিয়েছিলে? তোমায় ছেড়ে থাকতে আমার কত কষ্ট হচ্ছে তুমি জানো?’
কাদম্বরী হাসে। ঠিক আগের মতো, এই হাসি তাকে পুড়িয়ে দিয়ে যায়, অথচ প্রশ্রয়ে রাখে।
কাদম্বরী হেঁয়ালি করে বলে, ‘হুম, জানি বলেই তো এলাম। কিন্তু এসে তো দেখছি তুমি ব্যস্ত অন্যদের নিয়ে।’
রবি গোলাপটা কাদম্বরীর দিকে এগিয়ে দেয়।
‘ধুর ওসব ছাড়ো তো বৌঠান। আমি তোমায় ভুলিনি। বাইশে শ্রাবণ এলেই তুমি আসো। তাই তোমার অপেক্ষায় বসে থাকি আমি।’
কাদম্বরী গোলাপটা হাতে নেয়, আলত করে গন্ধ শুঁকে বলে, ‘জানো তো রবি, জীবনটা শুধু রাশিচক্রের খাম নয়। কিন্তু সময়ের গহীনে জমে থাকা বিনে সুতোর টান। তোমার বিনু অতীত, তোমার ক্যামেলিয়া সম্ভবনা। আর আমি? আমি তোমার হৃদয়ের সেই টান। যার সঙ্গে তোমার সবকিছুর শুরু।’
বাতাসে বাজতে থাকে এক অলক্ষ্য গান, ‘সে যে কোন কালে হারায়েছে, আজও মোরে ভোলেনি…’
রবি চুপ করে থাকে। যেন কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
কাদম্বরীর অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় ছায়ার ভেতর।
শুধু তার শেষ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘আগামী বাইশে শ্রাবণেও আমি আসব রবি। যদি তুমি আমায় মনে রাখো।’ 🍁

 

 

🍂লিমেরিক
 

রণজিৎ সরকার

লিমেরিকীয় লিমকা

১.
ভাজছ লুচি হচ্ছে কেন শব্দ দমাদ্দম
ভাঙছে মাথায় কাঁঠাল কেউ হরদম
ময়ান দিয়ে চটকে মাথা
ফটাফট চালাও হাতা
দিল্লি থেকে বর্মা ঘুরে গানের সুরে নেই তো কোন সম

২.
শূলপানি ত্রিনয়নে বলল হেঁকে, চড়াও এদের শূলে
যত দোষ নন্দ ঘোষই এ সবের মূলে
এদের যন্তরমন্তরে ঢোকা
নাকে লঙ্কাপোড়া শোঁকা
মগজধোলাই করার আগে কষে দে কান মুলে

৩.
ঢং দেখিইয়ে ঘড়িটা যখন বাজালো রাত নটা
টং করে উড়ে এসে পড়ল টাকা কটা
উলুউলু হুলুহুলু
চুলবুলু বুলচুলু
চুলকোই কোথা জায়গা নেই পশ্চাতে আমার জটা

 

 

🍁ছোটগল্প | দু 

 

শুক্লা জানে, মাঝে মাঝেই আজকাল অভিক ওকে অফিসের নাম করে তবে স্ত্রী তো বুঝতে পারে এসব কিন্তু ওর দুর্বলতা সেজন্য অনেক সময় ও ক্ষমা করে দেয়।
‘যাও বাড়িতে গিয়ে মাকে সামলাও গিয়ে’ -বলেই ফোনটা কেটে দেয়।

 

কী যে মনে হয়

মমতা রায় চৌধুরী

শুক্লা ক্লাস নিতে নিতে হঠাৎ করে নজর পড়ল। ক্লাসের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে আছে বিদ্যুৎ চলে গেল। বোর্ডওয়ার্ক করাতে করাতে মেয়েরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।
‘এ বাবা’… বদওয়ারকে এতটাই নিমগ্ন ছিল হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়াতে তার ধ্যান ভাঙল।
‘কি হল রে’।
‘ম্যাম কিভাবে মেঘ করেছে দেখুন।’ বলতে বলতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি যেন আজকে সমস্ত কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।এমন মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে মেয়েরা কেউ কেউ জানলার কাছে গিয়ে দুহাত পেতে জলের স্পর্শ পেতে আপন আনন্দে মেতে উঠল। কি জানি একটা ছেলে মানুষ মনের ভেতরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ও মেয়েদের সঙ্গে হাত বাড়িয়ে জলের স্পর্শ নেব। উফ কি অপূর্ব! মেয়েবেলায় এইভাবে বৃষ্টি পড়লে বেরিয়ে পড়ত আর কাদা জল মেখে ভুত হতো। আর মায়ের বকুনির হাত থেকে বাঁচতে পুকুরের জলে গিয়ে বৃষ্টির জল গায়ে যেমন মাথা তেমনি পুকুরের জলে গিয়ে সাঁতার কাটত। আর পাশে ছিল ফেলি পিসির বাড়ি। ফেলি পিসি চেরা বাঁশের গলায় চেঁচাতে শুরু করত ‘এই হাড়-হাভাতে মেয়ে মানুষগুলো ভয় ডর বলে কিছু নেই পুকুর ঝাপাতে এসেছে আরে যদি বাজ পড়ে তখন কি করবি? এই মেয়ে মদ্দানিগুলো হাড় জ্বালানি হয়েছে।’

‘আমি তো ভাবলাম আজকে রোদ উঠেছে জামাকাপড়গুলো কেচে মিলিয়ে দিয়ে যায় হাফ ছুটি আছে এসে তুলব। এই জন্য আমি কাচা কুচি করেছি। আমার মাথাতেই আসেনি যে বৃষ্টি হতে পারে। আর তাছাড়া আজকে ওয়েদারটা বৃষ্টি হবার মতো ছিল না।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ সব তো তোমাকে বলে কয়ে আসবে ‘
শুক্লার কথা বাড়াল না উনার সঙ্গে কথা বাড়ানো মানেই অপ্রাসঙ্গিক কথা বেরিয়ে যাবে আর সারাদিনই মেজাজটাই বিগড়ে যাবে।

আমরা সবাই মিলে হো হো করে হেসে উঠতাম আরও বেশি রেগে যেত তারপর একসময় গিয়ে বাড়ির লোকজনকে খবর দিত। ফেলি পিসি কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গিয়েই খবর দিত আমাদের নিরাপত্তার জন্য। তারপর মা যখন লাঠি হাতে আসতেন দুই চার ঘা তখন বাড়িতে যেতাম। কি আনন্দ ছিল সেই দিনগুলো।
মেয়েরাও কেমন আনন্দের সঙ্গে দিদিমনির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কিন্তু শুক্লার হঠাৎ মনে পড়ে গেল বাড়ির ছাদে প্রায় এক ছাদ জামাকাপড় মিলিয়ে এসেছে। আসলে আজ শনিবার কাল রবিবার এক জায়গায় বেরনোর আছে। এইজন্য রবিবারের জামা কাপড়গুলো অগ্রীম কেচে নিয়েছে। শাশুড়ি মা বলেছিল কি দরকার একসঙ্গে এত কাচা। জামাকাপড় তোলার লোক কোথায় যদি বৃষ্টি হয়, শ্বাশুড়ির কথাকে তোয়াক্কা করেনি। কারণ রঞ্জনা বেশ কদিন ধরে কাজে আসছিল না, অনেক জমে গেছে। রবিবার দিন শুক্লা নিজে থাকবে না তখন কি হবে আজকে বরং হাফ ছুটি বাড়ি গিয়েও জামা কাপড় তুলতে পারবে। স্কুল থেকে বাড়ির দূরত্ব তো বেশি নয়। এই আশাতেই কাপড় কেচেছিল কিন্তু শুক্লার জীবনটাই যেন কখনও মেঘ কখনো বৃষ্টি কখনও অন্ধকার। রোদ ঝলমল দিন যেন সে দেখতেই পায় না। এবার মাথায় তো বাজ পড়ল। কি হবে বৃষ্টিতে ভিজে গেল। ক্লাসে ছিল। পাশের বাড়ির অন্তরাকে বলার সময় পায়নি। অনেক সময় অন্তরা ফ্রী থাকে। অন্তরা গৃহবধূ খুব শান্ত স্বভাবের একটি মেয়ে ওর শ্বাশুড়ি মা খুব ভাল। অন্তরা সব জানে শুক্লার দুঃখ-কষ্টগুলো কেমন দলা পাকিয়ে থাকে। স্কুলে কাউকে বলতে পারে না। একবার যাতে বন্ধু ভেবেছিল দিদি বলে এত আপন করে নিয়েছিল। সেই তাকে যেভাবে নাকানি-চোবানি খাইয়েছে তারপর থেকে শুক্লা স্কুলে রিজার্ভ থাকে কখনও কথা শেয়ার করে না জীবনে যত দুঃখ কষ্টই থাকুক হাসি মুখে সবকিছু ভুলে থাকে কিন্তু আজ কি হবে? শ্বাশুড়ি মা কি রণচণ্ডী রূপ ধারণ করে বসে থাকবে কে জানে?
ভাবতে ভাবতে গা টা যেন শিউরে উঠল। আর মেয়েদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারল না। এর মধ্যে ঘন্টাও পড়ে গেল। একজন ছাত্রী বলল ‘আপনাকে ছাতা করে দিয়ে আসব।’
তারমধ্যে তনুশ্রী এসে হঠাৎ করে ধপ করে প্রণাম করল। পায়ে নরম হাতে স্পর্শে গা শিউরে উঠল সঙ্গে সঙ্গে শুক্লা তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিল ‘হঠাৎ প্রণাম করলি কেন?’
ও এমনিতেই খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে চুপ করে আছে।
আবার বলল’ চুপ করে আছিস কেন বল?’
তখন অন্য মেয়েরা ওকে বলল ‘বোধ হয় আজকে জন্মদিন।’
‘ও আজকে তোমার জন্মদিন। আমাদের ছোট্ট সোনার জন্মদিন। তো সবাই একে উইশ করেছ তো?
আমি তোমাকে অনেক অনেক আশীর্বাদ করি। তোমার জন্মদিন এভাবেই হাজার বছর ধরে ফিরে ফিরে আসো তুমি, খুব খুব ভাল থেক আর সারাটা জীবন তুমি আনন্দ কাটাও, তোমার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।’
শুক্লা ভাবল ওকে একটা গিফট দেবার দরকার ছিল আজকে কি করে দেবে। পরের সপ্তাহে ওকে একটা ক্যাডবেরি সেলিব্রেশন দেবে।’
এত কিছু ভাবনার মধ্যেও মন থেকে সেই কাঁটা কিছুতেই যাচ্ছে না। ভয়েতে ফোনও করতে পারছে না অন্তরাকে। বেচারাকে কি বলবে এমনিতেই ও অনেক সাহায্য করে। শেষে ভাবল যা হবে হবে।
ক্লাস থেকে বেরিয়ে ছাতা মাথায় করে আসতে গিয়েও ভিজে গেল। কোনওদিন সালোয়ার পরে আসে। আজকে আবার অরেঞ্জ কালারের একটা তাঁতের শাড়ি পড়ে এসেছে আসলে শাড়ি অনেক জমে গিয়েছে। তাই ভাবছিল, যে আজকে একটা শাড়ি পড়ে গেলে কেমন হয়! ও বাবা একদিন পড়তে না পড়তেই এই শাড়ি আবার মার পালিশে দিতে হবে এমন ভেজা ভিজেছে। রূপসাকে বলল, ঠিক আছে এবার তুমি ক্লাসে যাও তারপর নিজের রুমে ঢুকে শাড়ি থেকে জলগুলো নিঙড়ে ফেলল। হঠাৎ করে ফোন বেজে ওঠে তখনই বুকটা কেমন ভরাশ করে ওঠে বোধহয় বাড়ি থেকে ফোন। এমনিতেই শুক্লারকে একটা মানসিক কষ্টের মধ্যে থাকতে হয় এ বাড়িতে এখনও একটা নাতি বা নাতনির মুখ দেখাতে পারেনি। এ যেন ওর জীবনের একটা অভিশাপ কি করবে ভেবেই পায় না। অথচ ওর মনের ভেতরেও তো তোলপাড় করে হৃদয় একটা ছোট্ট শিশুর মা ডাক শোনার। তারপর ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে হ্যালো… বলতেই ভেসে উঠল ভিকের ফোন, ‘কিগো তুমি আজকে এক ছাদ জামাকাপড় মিলিয়ে গেছ। ওদিকে সব জামাকাপড় ভিজে গেছে। আমি কি একটু অফিসে এসেও শান্তিতে কাজ করতে পারব না।
আজকে আবার তোমার কিসের অফিস তুমি তো আমাকে বলনি!’
‘হ্যাঁ আমার একটু কাজ ছিল তোমাকে বলা হয়নি।’

শুক্লা জানে, মাঝে মাঝেই আজকাল অভিক ওকে অফিসের নাম করে তবে স্ত্রী তো বুঝতে পারে এসব কিন্তু ওর দুর্বলতা সেজন্য অনেক সময় ও ক্ষমা করে দেয়।
‘যাও বাড়িতে গিয়ে মাকে সামলাও গিয়ে’ -বলেই ফোনটা কেটে দেয়।
শুক্লা মনে মনে ভাবে কেমন ছেলেকে বিয়ে করেছ ওর জীবনটা সত্যিই ক্রমশ যেন দুর্বিসহ হয়ে উঠছে কিন্তু সব সময় শ্রীকৃষ্ণের বাণীটা মনে পড়ে ধৈর্য ধরো সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্যিই কি সব ঠিক হয়ে যাবে আর ভাবতে পারে না। আবার মনে মনে ভাবে অভিকের মনটাও কি আর ওর প্রতি কখনও প্রসন্ন হবে না শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দেবার ক্ষমতা নেই বলে।’
ইতিমধ্যে দেড়টায় ঘন্টা পরে আজকে শনিবার আজকেও শুক্লার মিড ডে মিলের ডিউটি আছে। কাজেই সঙ্গে সঙ্গে ও বাড়ি যেতে পারবে না ও মিড ডে মিলে রুমের দিকে ছুটতে থাকে। তখনও হালকা বৃষ্টি পড়ছে ‘ও বাবা মিড ডে মিলের রুমে যাবার পথেই দেখছে নর্দমার জল আর বৃষ্টির জল একাকার হয়ে এক হাঁটু জল এবার ও শাড়ি পড়ে এসেছে তাই ওর ডিঙ্গতে চাইছে না ওখান থেকে দাঁড়িয়েই মনিটরিং করছে মেয়েদেরকে মিড ডে মিল খাবার জন্য একটু জোরে হাত দিয়ে চৈতিকে ডাকলো চৈতি মিড মিলের খাতাটা নিয়ে এসো, ‘মেয়েদেরকে আমি পাশ করে দিচ্ছি ওদেরকে খাবারগুলো দিয়ে দাও আমি আর আজকে ওদিকে যাব না। আমি এমনিতেই ভিজে গিয়েছি, ‘শাড়ি তুলে যাওয়াটা অসম্ভব ব্যাপার।’
‘হ্যাঁ দিদি, আমরাও আজকে খুব কষ্ট করে রান্না করেছি মিড ডে মিলের চাল থেকে জল পড়ছে।’ সে কি তোমরা বলনি এর আগে যারা কমিটি আছে তাদেরকে জানাও।’
‘হ্যাঁ বড়দিকে বলেছি। বড়দি বললেন, আমি মিটিংয়ে আছি এখন এইসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। শুধু শুক্লা মনে মনে ভাবল উনার ভাববার সময় নেই। অথচ মিড ডে মিল থেকে কত প্রফিট হবে সেটা ভাবনার সময় আছে কিন্তু সেটা মিড ডে মিলের কর্মীদের সামনে ও-প্রকাশ করল না নিজের মনের ভেতরেই রেখে দিল। কি দরকার কার মনে কি আছে? যা হচ্ছে হোক ও একা তো আর সবকিছু ঠিক করতে পারবেনা সিস্টেমকে এমনিতেই অনেক কিছু বলতে গিয়ে নেক নজরে পড়েছে। ঘরে বাইরে সব জায়গায় এত দ্বন্দ্ব এত রাজনীতি সত্যি আর নিতে পারছে না।
এবার শুক্লা আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো হঠাৎ করে দেখল একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন তুমি ছাতা আনোনি?’
‘না ম্যাম।’
‘ঠিক আছে তুমি আমার সঙ্গে গেট অব্দি যেতে পারো’
‘তারপরে তারপর আমি টোটো ধরে নেব ম্যাম’
‘ঠিক আছে তাহলে এসো।’
‘মেয়েটিকে ছাতা মাথায় নিয়ে ওকে টোটো ধরিয়ে দিল। তারপর বাড়িতে আসলো বাড়িতে আসতে না আসতেই এমন চিৎকার শুরু করল শাশুড়ি মা যেন পুরো মহাভারতটাই অশুদ্ধ করে দিয়েছে।
সবেমাত্র জুতোটা জুতোর সেলফে রাখছে শাশুড়ি মা প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন। যখনই ঢুকবে খপ করে ধরবেন, ‘কিগো বৌমা! তোমাকে তখনই আমি পই পই করে বললাম যে, আজকে এত কাচার দরকার ছিল না ।তুমি আচ্ছা ধরিবাজ মেয়েছেলেরে বাবা। তোমাকে তো বলে বলে পারা যায় না। গুরুজনদের কোনও কথাই তুমি শুনতে চাও না। এখন এতগুলো জামা কাপড় কোথায় মেলাবে? আমার শাড়িগুলো পর্যন্ত ভিজে গেছে।’
শুক্লা ভেবে পায় না সবারই তো জামা কাপড় ভিজে গিয়েছে উনার শাড়ি ভিজে গেছে এতে এতবার করে বলার কি আছে।
‘আমি কি করতাম বলুন তো?’ কালকে আমি থাকব, না তাহলে এতগুলো জামা কাপড় কালকে কি অবস্থা হবে?
‘আমি তো ভাবলাম আজকে রোদ উঠেছে জামাকাপড়গুলো কেচে মিলিয়ে দিয়ে যায় হাফ ছুটি আছে এসে তুলব। এই জন্য আমি কাচা কুচি করেছি। আমার মাথাতেই আসেনি যে বৃষ্টি হতে পারে। আর তাছাড়া আজকে ওয়েদারটা বৃষ্টি হবার মতো ছিল না।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ সব তো তোমাকে বলে কয়ে আসবে ‘
শুক্লার কথা বাড়াল না উনার সঙ্গে কথা বাড়ানো মানেই অপ্রাসঙ্গিক কথা বেরিয়ে যাবে আর সারাদিনই মেজাজটাই বিগড়ে যাবে। তার থেকে যা বলছে বলুক গিয়ে ওনার মনে প্রাণে। যা হয় উনি বলতে থাকুন এমনিতেই তো সবসময় বলতে থাকেন বলুন।
‘কারুর মনে কিছু হলে সেই মনের দরজা বন্ধ করার তো ক্ষমতা শুকলার নেই। এই ভেবেই সে ছাদে গেল ছাদের থেকে সব জামাকাপড় নামিয়ে আবার হালকা করে জলে ধুয়ে ওয়াশিং মেশিনে নিংড়ে দিয়ে সব জামাকাপড় মিলিয়ে দিল।
তখনো দেখছে শ্বাশুড়ির গজগজানের থামেনি। কাকে ফোন করে সমস্ত রিপোর্টটা দিয়ে দিলেন অর্থাৎ কোনও নিউজ চ্যানেলে যেন প্রতিবেদন পাঠাচ্ছে।🍁

 

 

🍂ভ্র

 

মেঘ, পাহাড় ও সাসপেনশন ব্রীজ  মেঘালয়ের অদ্ভুত সৌন্দর্য

সঞ্জয় সান্যাল

মেঘালয়ের দিকে রওনা দেওয়ার দিন সকাল থেকেই আকাশে শুধু মেঘের খেলা। গৌহাটি থেকে শিলংগামী শেয়ার ট্যাক্সিতে উঠেই প্রথমেই চোখে পড়ল রাস্তার দুই পাশে ঘন বন। উঁচু-নিচু পাহাড়ের গায়ে সবুজের এমন বিস্তৃত আচ্ছাদন হয়ত ভারতের আর কোথাও দেখা যায় না। প্রথমবারের জন্য মেঘালয় যাচ্ছি, শুনেছিলাম এটি ‘মেঘের বাড়ি’ বা ‘Abode of Clouds’, কিন্তু পথেই বুঝতে পারলাম, এই নামের গভীরতা কতটা। একটানা দেড় ঘণ্টা পর, উমিয়াম লেকের ধারে গাড়ি থামল। সকালে রোদ ঝলমলে থাকলেও এখানে আকাশ একেবারে ধূসর। মৃদু বৃষ্টি পড়ছে। লেকের জলরঙ সেই ধূসরের সঙ্গে মিলে গিয়ে এক অপার্থিব ছবি তৈরি করছে।লেকের ধারে দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই জায়গা যেন কোনও ল্যান্ডস্কেপ পেন্টিং। দূরের পাহাড়ে মেঘের গাঢ় ছায়া, সামনের জলে বৃষ্টির কোঁচকানো রেখা, আর পাশের দোকানে ধোঁয়া ওঠা চা। লেকের ধারে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফের গাড়িতে উঠলাম। শহরে ঢোকার মুখেই রাস্তার দু’পাশে পাইন গাছের সারি, তাদের পাতা থেকে অজস্র ছোট ছোট বৃষ্টি বিন্দু মাটিতে পড়ছে। ড্রাইভার জানাল, শিলংয়ের মূল শহর পেরিয়ে আরও ভিতরে যেতে হবে। আমাদের গন্তব্যে, সাসপেনশন ব্রীজের দিকে। ব্রীজটির কথা আগে শুনিনি। কিন্তু মনে মনে ভেবেছিলাম, মেঘালয়ে যেখানে এমন ‘living root bridges’ আছে, সেখানে মানুষের তৈরি সাসপেনশন ব্রীজ দেখাও তাই নিশ্চয়ই অনন্য অভিজ্ঞতা হবে। হলও তা-ই। আসছি সেই প্রসঙ্গে।

গাড়ি ছাড়িয়ে গেল শিলং শহরের বাইরে। বাজার, ক্যাফে, ছোট্ট স্কুল, রঙিন ছাতায় ঢাকা রিকশা শহরজীবন একপাশে রেখে আমরা ঢুকে পড়লাম পাহাড়ি রাস্তার শান্ত, সবুজ জগতে। রাস্তা সরু হতে হতে একসময় আরও বেঁকে গেল। দূরে তখনও বৃষ্টির রেখা দেখা যাচ্ছে। চারদিকের ঘন বন, আমার অচেনা ফুলের গাছ, ঝোপঝাড়, ছোট ছোট পাথুরে ঝর্ণা সব মিলিয়ে রাস্তার দৃশ্য সিনেমাটিক লাগছিল। একজন স্থানীয় মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই ব্রীজটা দেখতে কেমন? তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘আপনি নিজেই দেখে নিন, ছবি বলে বোঝানো যাবে না।’
প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে আমাদের গাড়ি থামল। বৃষ্টির জন্য চারপাশ প্যাচপেচে। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই পাথরের সিঁড়ি। পাহাড়ি পথ। যতই নামছিলাম, পাখির ডাক স্পষ্ট হচ্ছিল। মাথার ওপর থেকে মেঘের দল বয়ে চলেছে। চারপাশের গাছের পাতা দিয়ে বৃষ্টির পড়ার শব্দে একধরনের একঘেয়েমি থাকলেও, তাতেও যেন শান্তিরধ্বনি ছিল। হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে ব্রীজটি চোখে পড়ল।

সাসপেনশন ব্রীজ। ছবি : সংগৃহীত

সাসপেনশন ব্রীজটি দুই পাহাড়ের মাঝখানে বাঁধা। নিচে একটি ক্ষীণ জলধারা। উপরের দিক থেকে দেখলে মনে হবে, সিলভার রঙের সরু ফিতের মতন ঝুলে আছে। ব্রীজের দিকে যেতে যেতে মাটি ভিজে থাকায় পা পিছলাচ্ছিল। কিন্তু কাছে পৌঁছে যখন দাঁড়ালাম, মনে হচ্ছিল, আমি কোনও ছবির ভেতর ঢুকে পড়েছি। ব্রীজের একপাশে ঘন জঙ্গল। অন্যপাশে উঁচু পাহাড়ের ঢাল। ব্রীজের মাঝখান থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় ঝর্ণা সদৃশ্য ক্ষুদ্র নদী। উপরের দিকে তাকালে শুধু মেঘ আর মেঘ। সেই মেঘ পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে, আবার উঠেও যাচ্ছে। যেন কোনও স্বপ্নরাজ্য। ব্রীজে পা রাখতেই হালকা দুলুনি অনুভূত হল। প্রথমে কিছুটা ভয় করছিল। ব্রীজটি লোহার তার দিয়ে শক্তভাবে বাঁধা, তবু মানুষের ভারে সামান্য দুলছে। সেই দুলুনির সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভিতরটাও কেঁপে উঠছিল। একবার ভাবলাম, এত কষ্ট করে আসা, যদি পার ব্রীজটা না পার হতে পারি! কিন্তু একটু সাহস নিয়ে ক’য়েক কদম এগোলাম। ঠিক তখনই মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো পড়ল ব্রীজের মাঝখানে। চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেই আলোয় ব্রীজের লোহার রেলিং, ভেজা কাঠের তক্তা, এমনকী আমার জুতোতেও হীরের মতন ঝিলিক।

পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। মেঘের দল পাহাড়ের মাথায় লেগে আছে। কোনও পাহাড় একদম খালি, ঘাস ছাড়া কিছু নেই। কোনও পাহাড় আবার পাইন আর বাঁশে ঢাকা। রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে গরু চরে বেড়াচ্ছে। কোথাও ছোট্ট মন্দির, কোথাও মেঘের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া গ্রামের ঘর। পথে ফিরতে ফিরতে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে বসেছিলাম।

ব্রীজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। বাতাস এখানে অন্যরকম। ঢেউ খেলানো। কখনও গরম, কখনও হিমেল। পাখিরা ওপরে উড়ে যাচ্ছে। নিচের নদীর শব্দ শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। দূরের পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমছে। সেই মেঘ থেকে মাঝে মাঝে ফোটাফোটা বৃষ্টি পড়ছে ব্রীজের ওপর। আমি দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে আমার শরীরও এই মেঘ, পাহাড়, জঙ্গল আর নদীর অংশ। এখানে কোনও শহরের শব্দ নেই। কোলাহল নেই। শুধু পাখির ডাক, বৃষ্টির শব্দ, আর বাতাসের দোলদুলানি। এই ব্রীজটি যেন দুই জগতের সংযোগকারী, একপাশে বাস্তব, অন্যপাশে এক অলীক সবকিছু।

এখানে পর্যাটকদের সমাগমও বেশ। ওদের আনন্দের চিৎকার বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল। কিছু স্থানীয় যুবক ব্রীজটির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। একজন বলল, এখানে প্রতিদিন আসি। মনে শান্তি লাগে। কথাটি শুনে মনে হল, আমাদের শহরজীবনের তাড়াহুড়ো, অফিসের কাজ, কোলাহল, স্ট্যাটাস, সব কিছুর চেয়ে এই শান্তির প্রয়োজনই সবচেয়ে বেশি।

ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিন্তু ফিরতে তো হবেই! ফিরতি পথে, আবার সেই পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম। এবার কিন্তু ক্লান্তি লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। ব্রীজের দুলুনির সেই অনুভূতি, নদীর শব্দ, মেঘের ঠাণ্ডান্ডা এসব যেন শরীরে মিশে গিয়েছে। উপরে উঠে গাড়িতে বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, পাহাড়ের গা বেয়ে মেঘ নেমে আসছে। পথের ধারে কিছু বাচ্চা স্কুলে যাচ্ছে, তাদের হাতে রঙিন ছাতা। দোকানের বাইরে কিছু বৃদ্ধা বসে আছে, গায়ে মোটা কম্বল। এক কোণায় কাঠের উনুন থেকে ধোঁয়া উঠছে।

গাড়ি এগিয়েছে শিলং শহরের দিকে। রাস্তার বাঁক পেরতেই আবার উমিয়াম লেক। এবার ঝলমলে রোদ পড়েছে জলে। সেই সকালে দেখা ধূসর লেক আর এই উজ্জ্বল লেক দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রাতদিনের। গাড়ি থামানো হল না। জানলার কাচ দিয়ে তাকিয়ে রইলাম। লেকের ওপর দিয়ে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, এই লেক, এই ব্রীজ, এই পাহাড় সবই একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে, যা মানুষের ভাষায় বলা যায় না। এরপর গাড়ি চলতে লাগল গৌহাটির দিকে। পথের ধারে ছোট ছোট ফলের দোকান, আনারস, কমলা, লিচু সাজানো। পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। মেঘের দল পাহাড়ের মাথায় লেগে আছে। কোনও পাহাড় একদম খালি, ঘাস ছাড়া কিছু নেই। কোনও পাহাড় আবার পাইন আর বাঁশে ঢাকা। রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে গরু চরে বেড়াচ্ছে। কোথাও ছোট্ট মন্দির, কোথাও মেঘের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া গ্রামের ঘর। পথে ফিরতে ফিরতে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে বসেছিলাম। মনে হচ্ছিল, জীবনের অনেক জটিলতা এই পাহাড়, মেঘ, নদী আর সাসপেনশন ব্রীজের কাছে অর্থহীন। এখানে এসে মানুষ নতুন করে বোঝে, প্রকৃতিই চরম সত্য। শহরজীবনে ফিরলেও এই অনুভূতি ভুলব না কখনও। মেঘালয়ের এই সাসপেনশন ব্রীজ শুধু একটি ব্রীজ নয়, এটি আমার কাছে জীবনের এক নতুন সংজ্ঞা। শান্তি, স্থিরতা আর নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা, মানুষের হাতের তৈরি হয়েও প্রকৃতিরই অংশ হয়ে যাওয়া! এই ব্রীজ তাই শুধু পাহাড় নয়, দুই জগতকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে।🍁

 

এই সংখ্যায় সাহিত্যিক তাপস রায়-এর ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস অনিবার্য কারণে প্রকাশিত হল না। আগামী সংখ্যা থেকে যথারীতি প্রকাশিত হবে। 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার,  কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকারঅঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক 

 

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন