Sasraya News Sunday’s Literature Special | Edition 96| 18th January 2026, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | সংখ্যা ৯৬ | ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ | রবিবার

SHARE:

সম্পাকীয়

এই সময় এমন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ, যেখানে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছে মানুষ। চারপাশে যে শব্দ, যে কলরব, যে অবিশ্বাসের কুয়াশা সেগুলো শুধু সমাজের নয়, আমাদের মনের মধ্যেও জমছে প্রতিদিন। অথচ ইতিহাস বলে, মানুষের আত্মার যাত্রা কখনো থেমে থাকেনি; অন্ধকারের গভীরতম রাতেও আলো নিজের পথ খুঁজে নিয়েছে। তাই এই সময়কে বোঝার সবচেয়ে বড় উপায় নিজেকে বোঝা।

বাইরের পৃথিবী আজ খুব দ্রুত বদলাচ্ছে; কিন্তু মানুষের ভিতরে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়, সেগুলো হাজার বছরেও বদলায় না। নিরাপত্তা, সম্মান, শান্তি, ভালোবাসা, সত্য এসবই চাইছে মানুষ। কিন্তু পাওয়ার তাগিদে সে কখনো কখনো ভুলে যাচ্ছে নিজেকেই। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন আমরা প্রত্যক্ষ করছি তর্কের জলোচ্ছ্বাস, ক্ষোভের আগুন, আর অদৃশ্য যুদ্ধের শব্দ। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছি, এত চেঁচামেচির ভিতরে আমরা কি সত্যিই আর শুনতে পাচ্ছি মানুষের আসল কণ্ঠস্বর? এই সময় শুধু রাজনীতির ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সময়। সত্যকে দেখার চোখ আজ দারুণভাবে বিভক্ত। কেউ বিশ্বাস করতে শিখছে যা সে শুনতে চায়; কেউ আবার হিসেব করছে কীভাবে সত্যকে নিজের সুবিধামতো সাজানো যায়। ফলে মানুষ আজ দুই ভাগে নয়, বহু ভাগে বিভক্ত। ভাষা, ধর্ম, মত, চিন্তা সবই যেন ভিন্ন মেরুর দিকে ছুটছে। কিন্তু আমরা বুঝতে ভুলে যাচ্ছি, ভাঙন যত বাড়ে, হৃদয়ের ভিতর তত বেশি দহন জ্বলে। এই সময় মানে অস্থিরতা, কিন্তু একইসঙ্গে সম্ভাবনা। অস্থিরতার ভিতরেও একটা নতুন পৃথিবীর জন্ম হয়। আমরা যদি একটু থামতে পারি, নিজের ভেতরে তাকাতে পারি, তবে বুঝব মানুষের ভেতরের সত্তা এখনও নির্মল। আমরা এখনও ভালোবাসতে জানি, এখনও কাঁদতে পারি, এখনও মমতার ভাষা বুঝি। এই সময় যতই কঠোর হোক, মানুষের কোমলতা শেষ হয়ে যায়নি। এই সময় আমাদের শেখাচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রযুক্তি নয়, তথ্য নয়, ক্ষমতাও নয়; বরং সহমর্মিতা। যে সমাজ অন্যের দুঃখ বোঝে, সে সমাজ কখনো হারায় না। অথচ আমরা কখনো কখনো ভুলে যাই, একটি ছোটো হাত ধরা, একটি ছোটো কথায় সান্ত্বনা দেওয়া এসবই সবচেয়ে বড় মানবিকতা। মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভেতরের আলো দেখতে শেখা, আজকের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা। এই সময় আমাদের সামনে দ্বিধাময় পথ খুলে রেখেছে। একদিকে বিভাজন, তিক্ততা ও অবিশ্বাসের অন্ধকার; অন্যদিকে সংহতি, সাহস ও নতুন চিন্তার আলো। আমরা কোন পথে হাঁটব? তা ঠিক করবে আমাদের মন, আমাদের বিবেক, আমাদের মানবিকতা। কারণ সময় কখনো একা পরিবর্তন আনে না পরিবর্তন আনে মানুষ। তাই এই সময়কে ভয় নয়, কৌতূহল ও দৃষ্টির স্বচ্ছতায় দেখা উচিত। আমরা যদি সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে পারি; যদি ভিন্ন মতকে সম্মান দিতে শিখি; যদি মানুষের চোখে মানুষের মুখ দেখতে পারি তবে এই সময়ই হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। শেষ পর্যন্ত সময় সবসময়ই নদীর মতো। আমাদের ভুল, আমাদের সঠিক, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের সাফল্য সবকিছু তার স্রোতে বয়ে যায়। কিন্তু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে মানুষই ঠিক করে সে কোন দিকে যাবে। আজকের এই সময়ও একদিন ইতিহাস হবে। প্রশ্ন শুধু একটাই আমরা কি সেই ইতিহাসকে আলোর দিকে বাঁকাতে পারব?

এই সময় সত্যের পরীক্ষার সময়।
এই সময় মানুষ হয়ে ওঠার সময়।

 

 

🍂মহামিলনের কথা

 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
‘শিব’ এই উত্তমের উত্তম বিমল নাম যিনি নিত্য স্মরণ করেন, আমি তাঁর দাস হব। শ্রীশঙ্কর বলেছেন— শ্রীভগবানের নারায়ণাদি বহু নাম কীর্ত্তিত হয়েছে তন্মধ্যে রামনাম সকলের প্রকাশক, শ্রীনারায়ণাদি নাম সাকার ঐশ্বর্য্যযুক্ত আর নিত্য নিরাকার নির্গুণ ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন এবং শ্রীদাশরথি রামের যে নাম তা সগুণ-নির্গুণ দুইটি ঐশ্বর্য্যবিশিষ্ট এবং সগুণ নির্গুণ ঐশ্বর্য্য প্রদানকারী শ্রীরামচন্দ্র নিত্য সাকেতপুরে মাধুর্য্যস্বরূপ হয়ে বিরাজ করেন,যে যে স্থানে যাদের উদ্ধারের কথা শুনা যায় কিম্বা দেখা যায়, সে সব রামনামের প্রভাবেই হয়েছে— আমার একথা সত্য, অতি সত্য।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

রামনামের মহিমা বলতে যেন ঠাকুর নৃত্য করে উঠেন।
রামনামই যে ভগবান শঙ্করের সব। বাৎস্যায়ন সংহিতায় বলেছেন— তুলাপুরুষ দান করলে যে ফল লাভ হয় রামনামকীর্ত্তনের দ্বারা তদপেক্ষা অসংখ্য গুণ ফল লাভ করে।
তুলাপুরুষ কি?
তুলাদণ্ডে একদিকে কর্ত্তা উপবেশন করেন, অন্যদিকে স্বর্ণ-রৌপ্যাদি স্থাপন করা হয়, তাঁর সমপরিমাণ সেই দ্রব্যসকল ব্রাহ্মণগণকে দান করাকে তুলাপুরুষ দান বলে। সভ্যতার মহাবাত্যায় সেসব পুণ্যকর্ম্ম ভারত হতে চলে গেছে, কিছুদিন পরে তার নামও থাকবে কিনা সন্দেহ!
পতঞ্জলি সংহীতায় দেখা যায়— কলিযুগে সদা রামনামের দ্বারা বিনা প্রযত্নে লোকসকল পরমপদে গমন করে। নিখিল কল্যাণনিলয়শ্রেষ্ঠ সকল যুগপূজিত উন্নত এই যুগ। এই যুগের মত আর যুগ নাই। তবে নামমহিমা যা শুনবে তাহা শাস্ত্রের কথা,শাস্ত্রসম্মত এইটি মনে করো। শোনো, অত্রি স্মৃতিতে রাম নাম করতে করতে ভোজনের কথা আছে। গ্রাসে গ্রাসে রাম নাম কীর্ত্তন করতে করতে ভোজন করলে অন্নদোষে লিপ্ত হইতে হয় না।

বৃথা তব কতদিন গিয়াছে চলিয়া।
যেতে হবে কোনদিন ভাবনি ভুলিয়া।
বিলম্ব করো না আর জপ সদা নাম।
হাসিতে হাসিতে যাবে দাস সীতারাম।

বল— শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম।

🍁শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

🍂গল্প 

 

খুবই উৎসাহিত গলা এবার শশধর কর্মকারের। দুই আঙুলে সে কি একটা তুড়ি দিল! নাহলে তারকনাথ বাবু অমন করে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন কেন!
সমস্যা থাকলে তার সমাধানও আছে। অফিসে কয়েকদিন ধরে নানা সমস্যায় ফেঁসে যাচ্ছিল শশধর কর্মকার। যা করতে চাইছে, তাতেই কোনও না কোনও ভুল থেকে যাচ্ছে। নতুন বড়বাবু জয়েন করার পর থেকেই এই কাণ্ডটি। আগে ঝপঝপ করে ফাইল বানিয়ে দিলেই তা চারখানা টেবিল ঘুরে দিব্য ফিরে আসত এক বেলার মধ্যে। এখন দু-তিন দিন লেগে যাচ্ছে। বড়বাবু নিজের টেবিলে সব ডাঁই করে রেখে দিচ্ছেন।

 

বাঘশলা

তাপস রায়

“আগের সপ্তায় মাংসের দোকানে লম্বা লাইন ছিল। ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে পেছনের পায়ের কাঠি সহ আধা-কিলোটাক জুটেছিল। কাল কিন্তু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে বাজার চলে যাব। বুঝলে!”
“হ্যাঁ, যেও। কে তোমাকে মাথার দিব্যি দেয় দেরি করে ঘুম থেকে উঠতে, অ্যাঁ!”
“আরে না। কে আর দেবে। কিন্তু গোটা সপ্তা ওই ভোর ভোর উঠে আটটা দশের বনগাঁ লোকাল ধরার যে তোড়জোর, তা তো থাকে না। তাই একটুখানিক বেশি গড়াতে ইচ্ছে করে। ফাঁকা বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে নিজেকে রাজা-বাদশার মতো লাগে!”
“তোমার যা ইচ্ছে তাই কোরো, আমি ঘুমোলাম। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি, আর পারা যায় না। এই তো রাত দশটায় একটু নিস্তার নিই। তারপর তো আবার কাক না ডাকতেই উঠে পড়ে হেঁসেল ঠেলার আয়োজন করতে হবে।”
খানিক বাদে গিন্নির নাকের বাদ্যি শুরু হল। শশধর বালিশের ভেতর দু’কান গুঁজে দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে বাঁচাতে ঘুমের ভেতর গড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে।
বাজারে গিয়ে শশধর অবাক। লোকজন ঘুমোয় না নাকি! এই ভোরেও এত লাইন! প্রায় এগারোজনের পেছনে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের ভেতর টের পেল শশধর তার পেছনে আরো পনের-ষোল জন দাঁড়িয়ে পড়েছে। অবাক হয়ে সামনে দাঁড়ান হাফ প্যান্টের প্রৌঢ় লোকটিকে খুব নরম গলায় জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা শুনছেন, আজ এত লম্বা লাইন পড়ল কেন মাংসের দোকানে?”
ভদ্রলোক খুব সজ্জন। অনেকেই ফালতু কথার উত্তর দেয় না। কিন্তু তিনি এড়িয়ে গেলেন না। বললেন, “দোকানির রেটবোর্ড ফলো করুন। বুঝতে পারবেন।”
অনেক খোঁজ করেও বিশেষ কিছু খুঁজে না পেয়ে শশধর আবার বলল, “ওই তো ছ’শ ষাট টাকা কেজি। তা তো সব দিনই লেখা থাকে। কই দাম তো কম নয়, তাহলে এত ভিড়!” শেষের কথাগুলো খানিকটা নিজেকে শুনিয়ে।
“দেখতে পাচ্ছেন না, দেখতে পাচ্ছেন না! মশাই আজ বাঘের মাংস বিক্রি হচ্ছে। তা বড় বড় করে উপরে লেখা আছে।”
“হ্যাঁ, সত্যি তো!” এবার চোখে পড়েছে শশধরের। হলদে বোর্ডের উপরে সাদা চকে লেখা। তেমন উজ্জ্বল নয়। কিন্তু বড় করে লেখা বলে বোঝা যাচ্ছে দূর থেকেও।
“না না, তবে আমি যাই। আমি বাঘের মাংস খাই না।”
লোকটা খপ করে শশধরের হাত ধরে ফেলে। “আরে কোথায় যান মশাই, পেছনে তাকিয়ে দেখেছেন লাইনটা সোজা তেঁতুলিয়া রোডের দিকে চলে যাচ্ছে। মশাই লাইনে এখন কত লোক হবে ভাবুন তো! সবাই কি আহাম্মকি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে! নড়বেন না। একদিন খানই না, পরে দেখবেন আর কোনো মাংস মুখে রুচছে না।”
“আপনি আগে খেয়েছেন?”
“না। খাইনি বলে যে খাব না, তা তো হয় না! আগে বাঙালিরা খইনি খেত না, বিহারীরা খেত। এখন বাসে-ট্রেনে, রাস্তা-ঘাটে, অফিস-কাছারিতে কাদের ঘন ঘন থুক্ করতে দেখেন?”
হ্যাঁ, লোকটার কথায় যুক্তি আছে। নিজের অফিসেই তো দুটো ছোকরা ক্লার্ক টেবিলের নীচের ওয়েস্ট পেপার বক্স টেনে ঘন ঘন খইনি সহ থুতু ফেলে। শশধরের খুব ঘেন্না হয়, রাগ হয়। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। প্রতিবাদ করতে পারে না। প্রতিবাদ তার রক্তে নেই।

কোন ফুসমন্তরে যেন নিজের উপর আস্থা এসে গেছে চিরকালের গোবেচারা শশধরের। কাল সোমবার অফিসে গিয়েই নীলিমেশদার স্মরণ নিতে হবে। নীলিমেশদা গ্রুপ-ডি ইউনিয়নের নেতা। অফিসাররা খুব ভয় করে তাকে। সে অফিসারের ঘরে চার-পাঁচ জন সাগরেদ সহ ঢুকে আগে বাবা-মা তুলে খিস্তি করে। তার মতে সব অফিসারেরাই চোর। তো চোরের আবার জাত কি! শোন শুয়োরের বাচ্চা, বলে সম্বোধন করতেই সব অফিসার কুঁইকুঁই করতে থাকে।

২.

“আচ্ছা, বাঘ মানুষ খায় শুনেছি, কিন্তু মানুষ বাঘ খায় তা তো শুনিনি।” নির্ভেজাল, শান্ত-শিষ্ট শশধর কর্মকারকে দিয়ে কেউ যেন এখন কথার পিঠে কথা বলিয়ে নিচ্ছে। তা না হলে সে তো সাত চড়ে রা কাটার মানুষ নয়। মাংসের দোকানে লাইনে দাঁড়ানো ফর্সা, দীর্ঘ, মাথায় অর্ধ-চন্দ্রাকৃতি টাক আঁকা মানুষটি অনেক আগেই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি জানেন এক একজনকে দিতে অন্তত দশ মিনিট লাগছে। চামড়া ছাড়িয়ে পাঠার মতো করে, বা ভেড়ার মতো করে লোহার আংটায় ঝোলানো আছে। কিন্তু বেশ বড় আকৃতির। আর তা পুরনো ধারালো অস্ত্র শস্ত্রে কেটে আনতে বেশ বেগ দিচ্ছে। বাঘের মাংস বলে কথা, হবে না!
তো সেই ভদ্রলোক বললেন, “আপনি চা খান? মানে চা পান করেন?”
“কোন বাঙালি চা খায় না! ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই চা দিয়ে শুরু হয় আর সেই ঘুমনো তক তো চায়ের হাঁড়ি জ্বলতে থাকে।”
ওই ভদ্রলোক একগাল হেসে বললেন, “তবে! বৃটিশরা এদেশে আসার আগে এখানকার মানুষ চা খেয়েছে কেউ কোনোদিন? খাবে কি চিনত না মশাই। অনেকদিন পর্যন্ত চা বানাতেও জানত না। দেখাদেখি করতে গিয়ে প্রথমে তো চায়ের জল ফেলে দিয়ে সিদ্ধ করা চায়ের পাতা খেয়েছে বাংলার মানুষ। ভাবুন! আর আপনি ছাগল, পাঁঠা, গরু্ মোষ, শুকর, কুকুর— সব চারপেয়ে খেয়ে অভ্যস্থ, এখন আর একটা চারপেয়ের মাংসে সন্দেহ প্রকাশ করছেন! এজন্য বাঙালির কিস্যু হল না। নতুনকে একসেপ্ট করার মতো সাহসই নেই গড় বাঙালির!”
শশধর কর্মকারের সত্যি সত্যি মনে হলো, না এই ভদ্রলোক যেমন হাফ প্যান্ট টি সার্ট ওয়াকিং শু পরে দেখতে স্মার্ট, তেমনি ভাবনাতেও বেশ এগিয়ে থাকা মানুষ। তার বেশ একটা ভক্তি লাগতে লাগল। এই ভদ্রলোক যখন খেয়ে হজম করে ফেলতে পারবেন বাঘ, সেও পারবে। বনগাঁ লোকালে দু-বেলা যাতায়াত করলে শরীরে যে কশ হয়, তা আর কোথায় তেমন করে সম্ভব! ট্রেনে লাফিয়ে ওঠার সময় যেমন শেয়ালদায় পেছন থেকে লোকজন টেনে ধরে, তেমনি মসলন্দপুরে নামার সময়েও গায়ের সব তাগদ লাগিয়ে নামতে হয়। সঙ্গে থাকে পকেট বা ব্যাগ যাতে না কাটে তার সতর্কতা। পারবে সে পারবে। শুধু মনের ভেতর যা একটু ধুকুপুকু। তা সেটা কাটিয়ে ওঠা যাবে।
“আচ্ছা, অনেক সময় ধরে আমরা কথা বলছি, কিন্তু পরিচয় হল না!”
শশধর কর্মকারকে যেন আজ কোনো জি্নে পেয়েছে। এই কথা অন্য সময় বলতে গেলে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে দিন কাবার করে দিত। মানে উল্টো দিকের মানুষটা কিছু ভাববে না তো! মানে গায়ে-পরা লোক ভাববে না তো! আরো সাত-পাঁচ। যেমন এখন তো কে কেমন লোক বিশ্বাস করা যায় না। সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হবে হয়তো। মানে লোকটা নিশ্চয়ই দুষ্ট লোক, নাহলে নাম-ধাম জিজ্ঞাসা করছে কেন! এই সব ভাবনায় ঢুকে গিয়ে তার কোনো কথা বলাই হত না।
“আমি তারকনাথ মুখোপাধ্যায়, কাছেই থাকি। আপনি?”
“আমাকে বলছেন! আমি শশধর কর্মকার, এখান থেকে অনেকটা দূরে বাড়ি। নকপুল। সাইকেলে আসি বাজার করতে রোববার করে। রেলবাজারে একটু সস্তা হয়। রোজই তো সকালে সাইকেল দাবড়ে অফিসে আসার সময় দেখি বাজারে কি ভিড় কি ভিড়! তখন তো তাকানোর সময় হয় না। কোন রকমে সাইকেলটা গ্যারেজে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্লাটফর্মে উঠে দেখি ট্রেন ঢুকছে। বলব কি তারকনাথ দাদা, ট্রেন যদি দশ মিনিট দেরিতেও আসে, আমি দেখেছি, ঠিক সেই দৌড়ে বুকের খাঁচায় হাপর চালাতে চালাতে ট্রেনে উঠছি। এমনই আমার কপাল।”
শশধর নিজে সত্যি অবাক হয়ে যায়। এতখানি কথা ঘরে বঊ-এর সঙ্গেও কোনোদিন বলেনি। আজ তার হোলো কি! এই সময় তার ভাবনা হোলো, তবে কি বাঘের মাংসের ঝোঁকে পরিস্থিতি নিজে নিজেই তাকে তৈরি করে নিচ্ছে! মানে ভেতরে বেশ বাঘ বাঘ ব্যাপার জন্মাচ্ছে! মানে কেমন একটু বেপরোয়া টাচ এসেছে যেন জিভে!

৩.

“এই বাজারে সব কিছু পাওয়া যায়। এদিকে তেঁতুলিয়া বর্ডার, ওদিকে পেট্রাপোল বর্ডার। দিনের বেলায় মাছ-মাংস-সবজি হই হই করে কেনা বেচা চলে। সন্ধ্যা নামতেই খদ্দের আর বিক্রেতা পালটে যায়। ওয়ান শর্টার থেকে চায়না আর জার্মান মেড রিভলবার, বাংলা মালের পাউচ থেকে রুশ ভদকা— অনায়াসে মেলে। শুকনো নেশার বস্তু গুটখা, গাঁজা, চরশ, আফিং তো দিনের বেলাতেই পানের দোকানে মিলে যাবে। তবে হ্যাঁ, আপনাকে একটু ফিসফিস করে বলতে হবে, দাদা শুকনো আছে? পান সাজতে সাজতে সে একটা পুরিয়া ঠিক আপনার দিকে বাড়িয়ে দেবে। ”
শশধর কর্মকার জানে এই রেলবাজারে অনেক কিছু পাওয়া যায়। তারকনাথ বাবুর এই কথাগুলোও আবছা আবছা শুনেছে আগে। শুয়োর, ভেড়ার মাংসের সাথে কচ্ছপ, কখনও কখনও হরিণের মাংসও পাওয়া যায় মসলন্দপুর স্টেশন বাজারে, তা সে জানে। তবে সে হরিণের মাংস কখনও খায়নি। শুনেছে, হরিণের মাংস একটু মাটির নীচে রেখে খেলে নাকি ভালো। মানে বডি থেকে রস ঝরিয়ে। তাতে মাংস নরম হয়। কিন্তু বাঘের কথা কখনও শোনেনি। শশধর তকিয়ে দেখল লাইন অনেক লম্বা হয়েছে। পাশের জ্যোতি সিনেমা হলে তার কিশোর বয়সে একবার শোলে পড়েছিল। তখন দেখেছিল এরকম লাইন। এখন তো সে হল ভূতের বাড়ি। বুকের ভেতরে কী যেন একটা অজানা ব্যথা চিন চিন করে ওঠে। তার কলেজের দিন মনে পড়ে।
শশধর দেখল এখনও সামনের ভদ্রলোক, মানে তারকনাথ বাবুকে ধরে ছয় জনের পেছনে সে। আরও কিছু সময় তো কথা বলা যায়। তা হোক না সে আগডুম-বাগডুম কথা! সময়টা তো কাটে! রোদ চড়ছে। সেটাও একটা বিরক্তির ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে। তবে গল্প-সল্প করলে ভুলে থাকা যায়। কত যুগ পরে যেন তার বুকের পর থেকে পাথরটা সরে গেছে। সে যেন বেশ হালকা। একটু কি উড়ছে। চোখে না পড়ে তেমন করে টুকুস করে একটু লাফাল শশধর কর্মকার। দেখে নিতে চাইল উড়ছে কিনা! ছোটোবেলায় ফাঁকা মাঠে যখন দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে দৌড়ে বেড়াত, তার কেবলি মনে হত সে উড়ে যাচ্ছে। কি যে আরাম বুকের ভেতর!
শশধর কর্মকার মনে করল এই সিনেমা হলের কথাটা পাড়বে নাকি!অমন রমরম করে চলত হল। যেকোন ছবি এলেই ব্ল্যাক হত। ‘দু’কা চার, দু’কা চার’ বলে ফিসফিস করে ঠিক হাতের ম্যাটিনি শো’র এক গোছা টিকিট সে বেচে দিত। উদয় আর সে গোবরডাঙ্গা কলেজের পাস কোর্সের দুই বন্ধু। কত কত যে ক্লাস কেটে এসব করেছে! এই সিনেমা হল তাকে প্রথম উপার্জন শিখিয়েছে। আর সেটার এখন এই হাল!
তা সিনেমা হলের কথা ভদ্রলোক তেমন পাত্তা দিলেন না। তিনি বললেন, “এই যে মশাই, বাঘের মাংস নিয়ে বাড়ি যাবেন, আপনার গিন্নি এই মাংস রেঁধে দেবেন তো?”
শশধর কর্মকার ভাবল, হ্যাঁ ঠিক কথা। হুজুগে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে সে। কিন্তু এই দিকটা তো ভেবে দেখা হয়নি ! প্রতি রোববার বুক ফুলিয়ে রান্নাঘরে মাংসের ব্যাগ রেখে গিন্নিকে হাঁক দেয়া অভ্যাস। গিন্নি সিরিয়াল দেখতে দেখতে এসে ব্যাজার মুখে থলি খালি করে মাছ, মাংস ধুয়ে তোলে। কিন্তু বাঘের মাংস শুনে যদি বেঁকে বসে! যদি বাঘের মতো চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে! যদি বলে এ আমি রান্না করতে পারব না, তবে! সত্যি তো নতুন জিনিস। রন্ধন প্রণালী নাই বা জানতে পারে! বাড়িতে হলদে হয়ে যাওয়া কাগজে রান্নার একখানা বই অবশ্য আছে। বেলা দে-র লেখা। বিয়ের সময় নেমন্তন্ন খেতে এসে কেউ হয়ত দিয়ে গেছিল। কিন্তু তাতে কি বাঘের মাংসের রন্ধনপ্রণালী থাকবে!
“কি হল, অমন চুপ্ করে গেলেন কেন! খুব ভাবনায় পড়েছেন মনে হয়!”
শশধর কর্মকার নিজের স্বভাব মতো চুপসে যাচ্ছিল। এমনিতে তো তারা সহজিয়া বৈষ্ণব। যে পাত্রে ঢালবে সেই পাত্রের মতই হয়ে ওঠে। অফিসে, বাসে, ট্রেনে, এমন কি বাড়িতেও শশধর কর্মকারের গলা কেউ কখনও টের পায় না। এখন তারকনাথ বাবুর কথায় বউ-এর কোমরে আঁচল প্যাঁচানো চেহারাটা সামনে চলে আসতেই তার সকাল থেকে বুক ফোলান ইমেজ শ্রিংক করতে লেগেছিল। কিন্তু কী যেন কী করে আবার সে ঠেলে উঠতে চেষ্টা করছে। ডুবে যেতে থাকা মানুষ যেমন কোন একটা সাপোর্ট পেয়ে জলের উপরে মাথা তুলে হাঁসফাস করে,ঠিক তেমন না হলেও বোঝা যাচ্ছিল শশধর কর্মকার লোকটা এতক্ষণের স্বাভাবিকতা হারিয়ে আবার তা ফিরে পাবার মরিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে।

৪.

“আরে না না, অত ভাববেন না। মেয়েরা স্বভাব রন্ধনবিদ হয়। ও ঠিক ম্যানেজ করে নেবে! এই দেখেন না, মাস খানেক আগে রুলিং পার্টির ডাকে বন্ধের দিন। সব কিছু বন্ধ। বাড়িতে বাজার নেই। তো আমার গিন্নি মোটেও
ঘাবড়ালেন না। উঠোনে সরু সরু কচুর পাতার মতো কী এক গাছ উঠেছিল। বলল, ঘাটকল। তো সে পাতা-লতা দিব্য বেটে, ভেজে ঝাল ঝাল এক অমৃত বানিয়ে ফেলল। বাড়ির শেফালি গাছের পাতা ছিঁড়ে এনে শুক্তো করে দিল। আর বুনো আমড়ার একছড়া লগি দিয়ে টেনে এনে টক। হলো কিনা! বাড়ির মেয়েরা সব অন্নপূর্ণার জাত। কী দিয়ে কী করে দেবে, আপনি টেরটি পাবেন না! ”
“বলছেন, ম্যানেজ হয়ে যাবে!” এতক্ষণে পায়ের নিচে মাটি পেয়েছে শশধর কর্মকার। নতুন স্রোতের অভিঘাতে হু হু করে পায়ের নিচ থেকে বালি সরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু উল্টো দিক থেকে একটা আশ্বাস বাণী আসায়, তীব্র ভেসে যাওয়া থেকে যেন রক্ষা পেয়ে গেল।
“হ্যাঁ। পাঁঠার মাংস, ভেড়ার মাংস রান্না করার সময় যে প্রস্তুতি, এটাও সেরকম। বেশি টেনশন নেবেন না। তবে বাঘ বলে কথা। ওকে একটু বেশি সময় ধরে জপাতে হবে। মানে ম্যারিনেট করতে হবে অনেক সময় ধরে। আজকে টাটকা না খাওয়াই ভাল। পেঁয়াজ, সর্ষে তেল, দই মাখিয়ে আজ ফ্রিজে রেখে দিয়ে কাল বানালে এক্কেবারে শিক কাবাবের মতো ফুরফুরে লাগবে।”
“না না, আপনি যখন বলছেন তখন আজ তো নয়ই কাল অফিস থেকে ফিরে খাব। মানে গিন্নিকে বলব, কাল রাতের খাবারের জন্য ওটা রাঁধতে।” দূর থেকে যেন হেডলাইটের আলো আসছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তায় মোটোরগাড়ির আলো যেমন হয়। চোখ-মুখে একটা চিকচিকে খুশির আভা শশধরের। আর দু’চোখের দেখাও যেন রেল লাইন ধরে দূর দূরান্তের দিকে চলে যাচ্ছে।
তারকনাথ বাবু কথা ফেললেন, “তবে মশলার পরিমানটা একটু বাড়িয়ে নিতে বলবেন বৌদিকে। বাঘ বলে তো কথা। এমনিতে যদি পাঁঠার মাংস রান্নার সময় পনেরটা শুকনো লঙ্কা শিলে বেটে নিতে হত, এ ক্ষেত্রে তা ত্রিশটার নীচে যেন না হয়। বুঝতেই তো পারছেন, বাঘকে জব্দ করতে হলে ওটুকু বাড়তি বোঝা বইতে হবে।”
“ঠিকই বলেছেন, বাড়িতে তাই বলব। আর নিশ্চই কুকারে বাড়তি কয়েকটা সিটি দিয়ে নিতে হবে! তাই না!”
খুবই উৎসাহিত গলা এবার শশধর কর্মকারের। দুই আঙুলে সে কি একটা তুড়ি দিল! নাহলে তারকনাথ বাবু অমন করে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন কেন!
সমস্যা থাকলে তার সমাধানও আছে। অফিসে কয়েকদিন ধরে নানা সমস্যায় ফেঁসে যাচ্ছিল শশধর কর্মকার। যা করতে চাইছে, তাতেই কোনও না কোনও ভুল থেকে যাচ্ছে। নতুন বড়বাবু জয়েন করার পর থেকেই এই কাণ্ডটি। আগে ঝপঝপ করে ফাইল বানিয়ে দিলেই তা চারখানা টেবিল ঘুরে দিব্য ফিরে আসত এক বেলার মধ্যে। এখন দু-তিন দিন লেগে যাচ্ছে। বড়বাবু নিজের টেবিলে সব ডাঁই করে রেখে দিচ্ছেন। তারপর যখন ছাড়ছেন, তা আর উপরের দিকে যাচ্ছে না। নামছে নিচের দিকে । মানে অবজেকশন সহ আবার উৎস স্থলে ফিরে আসছে। কাজ এগোচ্ছে না। শশধর কর্মকার ক’দিন ধরেই ভেবে চলেছে কী হল! এতদিন, মানে এতগুলো বছর ধরে এই লেবার কন্ট্রাক্টরদের বিল বানাতে বানাতে কলমে হাজা হয়ে গেছে। এখন তা বের হতে চাইছে না! কারণ কি!
তারকনাথ বাবুর সাথে কথা বলতে বলতে এই মুহূর্তে একটা সমাধান যেন উঁকি মারছে। অফিসে সকলেই নতুন বড়বাবুকে আড়ালে বাঘবাবু বলে ডাকছে। লোকটা একটা না একটা খুঁত ধরে ফাইল ফেরৎ পাঠাচ্ছে। সহজে তার কাছ থেকে ফাইল বের করা যাচ্ছে না। আবার ফাইল না চললে তার হুঙ্কারও আছে। এখন শশধর ভাবল খাঁটি বাঘের মাংস যদি জব্দ করা যায় মশলার হেরফেরে, সামান্য বাঘমানুষকে কব্জায় আনা যাবে না! যাবে, যাবে।

.

আজ কোন ফুস্মন্তরে যেন নিজের উপর আস্থা এসে গেছে চিরকালের গোবেচারা শশধরের। কাল সোমবার অফিসে গিয়েই নীলিমেশদার স্মরণ নিতে হবে। নীলিমেশদা গ্রুপ-ডি ইউনিয়নের নেতা। অফিসাররা খুব ভয় করে তাকে। সে অফিসারের ঘরে চার-পাঁচ জন সাগরেদ সহ ঢুকে আগে বাবা-মা তুলে খিস্তি করে। তার মতে সব অফিসারেরাই চোর। তো চোরের আবার জাত কি! শোন শুয়োরের বাচ্চা, বলে সম্বোধন করতেই সব অফিসার কুঁইকুঁই করতে থাকে।
শশধর এবার বাঘবাবুকে নরম করার জন্য মোক্ষম মশলাটি মনে মনে ঠিক করে নিল। হ্যাঁ নীলিমেশদা। অফিসের বাঘ জব্দ হবে না মানে! হতেই হবে। নিজের অজান্তেই বাজারের ব্যাগ সহ তার হাত চলে গেল তারকনাথ মুখোপাধ্যায়ের ডান হাতের দিকে। আর সে হাত খুব আবেগ নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে থাকল শশধর। 🍁

 

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস | ১ 
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস,  ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

ব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

১৫.

ভুলে যাওয়া গানের শব্দেরা

বিকেল নেমেছে অলস আলোয়। শহরটা যেন কাচের তৈরি, ভিতর দিয়ে হাঁটলে পায়ের শব্দও প্রতিধ্বনি হয়ে ফেরে। সোমদত্তা আজ আর অফিসে যায়নি। ঘরের মধ্যে হালকা বৃষ্টির গন্ধ ভাসছে, অথচ জানলার বাইরে আকাশ শুকনো, কোনও বৃষ্টি নেই। দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটা মাঝে মাঝে নিজে নিজেই উল্টো ঘুরে যায়, তারপর আবার থেমে যায় একটুখানি নিঃশ্বাসের মতো শব্দ তুলে। সে আজ নিজের ছায়ার সাথে কথা বলতে চায়নি; মনে হচ্ছিল, ছায়াটাও যেন ক্লান্ত। তাই সে বেরিয়ে পড়ল।
রাস্তা পেরিয়ে যখন গলির মুখে এল, হঠাৎ দেখতে পেল, আজ শহরে একটা মেলা বসেছে। কিন্তু এই মেলা অন্যরকম। স্টলগুলোয় কেউ জামা-কাপড় বিক্রি করছে না, কেউ খেলনা বিক্রি করছে না। এখানে বিক্রি হচ্ছে স্মৃতি, স্বপ্ন, আর অনুতাপ। প্রথম স্টলের সাইনবোর্ডে লেখা, ‘ভুলে যাওয়া গানের দোকান।’ ভিতরে গিয়ে দেখা গেল, সারি সারি ছোট কাচের শিশিতে আটকে রাখা আছে মানুষের গলা। কেউ কিনে নিয়ে বলল, ‘এই গলাটা আমার বাবার মতো।’ শিশিটা খুলে দিতেই ভেসে উঠল একসঙ্গে হাসি আর কান্নার শব্দ। সোমদত্তা অবাক হয়ে থেমে গেল।

হঠাৎ শুনল কেউ বলছে, ‘সোমদত্তা!’
সে ফিরে তাকাল। দেখা গেল, জ্যোতিষী দাঁড়িয়ে আছে মেলার শেষ প্রান্তে, হাতে একদণ্ড ধোঁয়ার শলাকা।
‘তুমি ভয়কে বিক্রি করেছ?’ জ্যোতিষীর কণ্ঠে ছিল মায়া, কিন্তু চোখে আতঙ্ক।
‘হ্যাঁ,’ সোমদত্তা বলল, ‘আমি ভয়কে দিয়েছি আমার নীরবতার বিনিময়ে।’

পাশের স্টলে এক বৃদ্ধ বসে আছে, চোখ দুটো পাথরের মতো স্থির। তাঁর দোকানের নাম, ‘চোখে দেখা বাতাস।’ সোমদত্তা জিজ্ঞেস করল, ‘বাতাসও দেখা যায় নাকি?’ বৃদ্ধ হেসে বলল, ‘সবকিছুই দেখা যায়, যদি সময় তোমাকে চেনে।’ কথাটা শুনে সে থেমে যায়। সময় যদি চেনে! নিজের সময়ের কাছে সে কতটাই না অপরিচিত।

হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছল মেলার শেষ প্রান্তে, যেখানে কেউ নেই। কেবল একটা অস্থায়ী স্টল সাদা পর্দায় ঢাকা। তাতে লেখা, ‘নিঃশব্দ প্রজাপতি বিক্রি হয়।’ সে পর্দা সরাতেই দেখা গেল, মৃদু নীল আলোয় ঝলমল করছে ছোট ছোট প্রজাপতি। তাদের ডানায় লেখা কিছু শব্দ, ‘আশা’, ‘ভয়’, ‘অপেক্ষা’, ‘ভালবাসা, ‘অস্তিত্ব’… এক নারী বসে আছেন, মুখে সাদা কাপড়ের মুখোশ, চোখে অদ্ভুত স্থিরতা। তিনি ধীরে বললেন, ‘একটি প্রজাপতি নিতে চাও?’
সোমদত্তা ফিসফিস করে বলল, ‘ওরা জীবিত?’ নারী হাসল, ‘ওরা মৃত হলে এত আলো ছড়াত না।
সে জিজ্ঞাসা করল, ‘এর দাম কী?’ নারী বলল, ‘দাম নয়, বিনিময়। যা হারাতে রাজি, তাই দিতে হবে।’
সোমদত্তা থেমে গেল। তার মনে পড়ল সেই মুখোশের রাত, সেই আয়নার জল, সেই ভাসমান ছায়া। সে বলল, ‘আমি আমার ভয় দিতে পারি।’ নারী মাথা নেড়ে সম্মতি দিল, ‘ভয় দিয়ে দিলে তোমার ভিতরের আলো আরও তীব্র হবে, কিন্তু সাবধান ভয় না থাকলে মানুষ নিজেকে চিনতে পারে না।’ সোমদত্তা তবু রাজি হয়ে গেল। প্রজাপতিরা যেন তার চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল, একটা, দুটো, তিনটে… তারপর একটি এসে বসে পড়ল তার ডান হাতের কবজিতে। সেটির ডানায় লেখা, ‘নিঃশব্দ।’
প্রজাপতিটা বসতেই সে অনুভব করল, তার শরীরের মধ্যে হালকা আলো জ্বলে উঠছে। মাথার ভেতর যেন একটানা মৃদু গুঞ্জন, কিন্তু সেটা শব্দ নয়, বরং অনুভব। তার হাত দিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। তখনই সে দেখতে পেল, শহরের সব মানুষ থেমে গেছে। তারা মাঝপথে দাঁড়িয়ে, কেউ হাঁটছে না, কেউ কথা বলছে না। কেবল তার চারপাশে নৈঃশব্দ্যের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে। সেই নারী বলল, ‘এটা নিঃশব্দ প্রজাপতির আশীর্বাদ। কিন্তু মনে রেখো, এই আলো যতটা তোমার, ততটাই অন্যেরও। তোমার নীরবতা যদি ভেঙে যায়, ওরা ফিরে যাবে।’ সোমদত্তা জিজ্ঞাসা করল, ‘ওরা কারা?’ নারী চোখের ভেতর তাকিয়ে বলল, ‘যারা একসময় তোমার কথা শুনত, এখন তারা প্রজাপতি হয়ে ফিরে এসেছে।’
সোমদত্তা চমকে উঠল। সত্যিই কি ওরা তার অতীত? সেই রিমি, যে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি ঠিক আছ তো?’; সেই মানুষ, যাদের সামনে সে অভিনয় করেছিল, সবাই কি প্রজাপতি হয়ে ফিরে এসেছে? সে নিজের হাতে থাকা প্রজাপতিটা দেখল, ওটা এখন মৃদু স্বরে ফিসফিস করছে। শোনার চেষ্টা করতেই একটা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘আমরা তোমার ভেতরের না-বলা শব্দ।’
চারপাশের আলো ঘনিয়ে আসছে। দোকান, পথ, মানুষ সব মিলেমিশে যাচ্ছে এক নীল কুয়াশায়। সোমদত্তা হাঁটছে, কিন্তু তার পায়ের নিচে এখন আর রাস্তা নেই, জল। সেই জলটাও আলোকিত, নরম সোনালি আভায় ভাসছে। আকাশ থেকে পড়ছে পাপড়ি, যেগুলো আসলে কাগজ, তাতে লেখা অসমাপ্ত বাক্য। সে একটি কাগজ তুলে নিল, তাতে লেখা ছিল, ‘তুমি যা ভাবছ, আমি তা জানি না।’
হঠাৎ শুনল কেউ বলছে, ‘সোমদত্তা!’
সে ফিরে তাকাল। দেখা গেল, জ্যোতিষী দাঁড়িয়ে আছে মেলার শেষ প্রান্তে, হাতে একদণ্ড ধোঁয়ার শলাকা।
‘তুমি ভয়কে বিক্রি করেছ?’ জ্যোতিষীর কণ্ঠে ছিল মায়া, কিন্তু চোখে আতঙ্ক।
‘হ্যাঁ,’ সোমদত্তা বলল, ‘আমি ভয়কে দিয়েছি আমার নীরবতার বিনিময়ে।’
জ্যোতিষী ধীরে মাথা নাড়ল, ‘তাহলে এখন থেকে যা দেখবে, তা সত্য হবে না, কারণ ভয়ই সত্যের মাপ।’
মুহূর্তে চারপাশের সবকিছু কেঁপে উঠল। মেলার আলো নিভে গেল। সোমদত্তা একা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে নিঃশব্দ প্রজাপতি। সেটি ধীরে ধীরে আলো হারাতে লাগল। তারপর উড়ে গেল তার মুখের দিকে, চোখের ওপর বসে পড়ল। এক ঝলক উষ্ণতা, তারপর অন্ধকার।

যখন সে চোখ খুলল, দেখল, সে নিজের ঘরে। জানলার পাশে একটি প্রজাপতি উড়ছে, ডানায় লেখা ‘ভয়।’ সে বুঝল, মায়া কখনও পুরোপুরি যায় না, কেবল রূপ বদলায়। সে মৃদু হাসল, আর ঘড়ির টিকটিক শব্দে আবার নতুন দিনের শুরু হল। (ক্রমশঃ)🍁

 

 

🍂বিতা 

 

বৃন্দাবন দাস -এর দু’টি কবিতা 

আমাদের কারসাজি আমাদের ধর্ম 

অনেকগুলো মিথ্যে জড়ো করে আমরা ধর্ম বানাচ্ছি

আমাদের ধর্মের নাম লোভ লোভ আরো লোভ
যারা যারা খুব কাছের এবং নিভৃতের
তাদের সঙ্গেই বানিয়ে তুলছি ধ্বংসের সংসার
বানিয়ে তুলছি মিথ্যের রাষ্ট্র
বানিয়ে তুলছে চরম হিংসার ইমারত

কেউ আমার সঙ্গে থাক বা না- থাক
আমার তবিলে অর্থের স্রোত জমবে

আমি অন্তত দেখাতে পারবো কে কে আমার
কে কে অন্তরীক্ষ-মুলুকের কাছে যেতে প্রস্তুত
কে কে দাঙ্গার জন্য নিজেকে নিবেদিত করেছে
কে কে অদৃশ্য ফরমান মেনে
হত্যা লীলায় কুণ্ঠিত হবে না

আমি অবিসংবাদি এক দেবতা হয়ে যাব
আমার নামে থান হবে
আমার নামে গান হবে
আমার নামে কেউ কেউ অহংকারী হবে
মাহাত্ম্যে মাহাত্ম্যে ছয়লাফ হবে সংসার

যাদের কেউ নেই তাদের কেউ না থাকাই ভালো

এসব হবে বলেই না আমি ধর্ম পুষছি

 

প্রহ্লাদ 

প্রতিটা দশকে আমরা ভয় লিখছি
প্রতিটা শতকে আমরা ভয় লিখছি
প্রতিটা সহস্রাব্দে আমরা ভয় লিখছি

আমাদের লেখনী থেমে নেই
আমাদের ভয়ও থেমে নেই
আমাদের সকাল থেমে নেই
আমাদের বিকেল থেমে নেই

কোন কোন রাত নরকাসুরের তাণ্ডব
কোন কোন গোধূলি হিরণ্যকশিপূ

প্রহ্লাদ
নৃসিংহমুরারি ঠিক কতদূর—

 

 

রেহানা বীথি -এর একটি কবিতা

আড়ালচারি 

‘তোমার জন্যে টিলার আড়ালে
লুকিয়ে আছে বসন্তকালের অসংখ্য আঙুল’

দৈববাণীর মতো শুনিয়েছিল কথাটুকু
তারপর টিলার এপারে
এলোমেলো আমি গুছিয়ে বসেছিলাম

মাঝে মাঝে এমন করেই গুছিয়ে বসি
বসে বসেই খুঁজতে থাকি-
শূন্য রেখা ধরে পদশব্দের মিহি মায়া
খুঁজতে থাকি, অঙ্গুলি-নির্দেশ…

খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে চোখের পা…
তবু আমি, বসে থাকি দু’চোখের শৈশব মেলে–
আড়াল ভেঙে যদি কখনও বেরোয় বসন্তকালের অসংখ্য আঙুলেরা
আমি তখন কনিষ্ঠটি আঁকড়ে ধরব
তারপর হারিয়ে যাব রঙের অন্ধকারে…

 

 

দীপান্বিতা রায় সরকার -এর দু’টি কবিতা

পুড়ছে মানুষ 

গাছের উপর ধর্ম আছে ঝুলে,
অবয়বে একটি শুধু মানুষ।

ধর্ম যখন সবার চেয়ে বড়
ধর্ম যখন শুধুই সর্বভুক।

মুষলধারার বর্ষা বরণ রাতে
প্রতীক আঁকা শাপিত শহরে।

নগ্ন ঘৃনার বিষাক্ত কারবার
মৃত্যু নিয়ে জলসা করে ফেরে।

সেটাও ধর্ম? বলতে হবে?
রক্ত মাখা কারো হাতের সত্য বিধান!

পন্থা জানি মানবতাই, নজর মিনার।
আমার যেমন কাব্য, পুঁথি গীতবিতান।

 

 

ট্রাপিজমের খেলা 

দ্রুত ফুরায় নটে গাছের মুড়ো,
সুতোর উপর ট্রাপিজমের খেলা।

বিস্ফোরণের শর্তসাপেক্ষেই
সলতে পাকায় তপ্ত বারুদ কণা।

এই স্তিমিত, নীরব মনের ভীতে
আস্ফালনে নিচ্ছে যারা জিতে।

তাদেরও তো আসবে নেভার পালা,
সুতোয় যেমন ট্রাপিজমের খেলা।

 

 

শর্বাণীরঞ্জন কুন্ডু -এর একটি কবিতা

অভাগারা

অসংখ্য সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা ঘটে, কেন ঘটে কেউ জানে না।
প্রতি মুহুর্তের কিছু প্রয়োজন থাকে।
সেই মুহুর্তগুলো যা চায়
আমরা সচেষ্ট হয়ে উঠি তাকে সার্থক করতে।
কখনো হয়, কখনো হয় না।
কখনো তৃপ্ত হই, আনন্দিত হই,
কখনো অসফল হই,
কখনো ব্যথা লাগে, বেদনা হয়,
সময় থেমে যায়,
তারপর স্মৃতি ধুমিল হয়,
আবার কাজে নামতে হয়।

কাজ করে যাওয়া ছাড়া আমাদের কোনো কাজ নেই।
কিন্তু কিছু মানুষ এই যে সমাজকে ও সময়কে ভরাট করার যে প্রয়োজনীয়তা
তাকে নষ্ট করে স্বভাব দোষে।
তারা অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে,
কখনো অহেতুক অন্যের পেছনে লাগে-
তাদের নিজেদের সৃষ্টিশীলতায় খামতি থাকে বলে।
এতেই তাদের আনন্দ।
অমূল্য সময় না বুঝেশুনে এইভাবেই খরচ করে তারা।
কি বলবে এদের অভাগা ছাড়া?

 

 

তাহমিনা শিল্পী -এর তিনটি কবিতা

শিশিরের হাতে সঁপে দিই জটলাটুকু

শিশির পড়লেই আমরা ডুবে যাই শান্ত এক আলোছায়ায়
রাতের বুকে রেখে যাওয়া শীতল স্বচ্ছতার নিকটে।

আমি আর আমির ভেতরের আর-এক আমি
শিশিরের হাতে সঁপে দিই জটলাটুকু
বিরক্তি, অস্থিরতা এবং সকল জটিলতা
শিশির সব ধুয়ে ফেলে তুষার-ঠাণ্ডা নীরবতায়।

গাছেরা তখন বলে ওঠে ভোরের গোপন কথা,
সবুজ পাতায় চিকচিক করে ওঠে চিঠির মতো আলো।

শিশির ঝরলেই আরেকটি আমি এসে দাঁড়ায় সামনে
ক্রমেই খসে পড়তে থাকে আমার যাবতীয় ক্লান্তি
বন্ধুত্বের শর্তে এক ফোঁটা জলে রেখে যায় মুগ্ধতার দাগ।

শিশিরকে কখনও দেখিনি ঝড় হতে
দেখেছি তাকে নরম কণ্ঠে
রাতের দুঃখ মুছে দিতে দিতে
পাতার মাথায় ভোরের কণা সাজাতে।

 

নক্ষত্রের আলোয় সেদ্ধ হচ্ছে রাত

চাঁদের কোমল খোলস ফুঁড়ে
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোর জন্ম হয়
এক এক করে জ্বলে ওঠে নক্ষত্র
নক্ষত্রের আলোয় সেদ্ধ হচ্ছে রাত
এমন রাতে শহরটাকে জীবন্ত মনে হয়
কালো কাচে মোড়া দালানগুলোও যথেষ্ট স্পষ্ট
চাঁদের আলোয় ধুঁয়ে যায় শহর
আকাশ ছুঁয়ে থাকা তারা ঝরে পড়ে জলের ভেতর
সকল মানুষ এক কাতারে দাড়িয়ে চাঁদ দেখে
এমন নক্ষত্রভেজা আলোয়
আমার মরতে ইচ্ছে করে না
আমি মরতে চাই না।

 

ভাঙনের ঢেউ

দুঃখ সংরক্ষিত নয়, থাকে সবারই,
কেউ বুকের ভেতর ঢেকে রাখে নীরবে।
ভাঙনের ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রতিদিন,
কেউ শব্দ তোলে, কেউ হারিয়ে যায় গভীরে।

হাসির আড়ালে জমে ওঠে ফাটল,
চোখের কোণে লুকানো থাকে নোনা জল।
যে ভাঙন লুকাতে পারে দক্ষ হাতে,
সে কারিগর- নিজেকেই গড়ে প্রতিনিয়ত।

তবু প্রতিটি ঢেউ জানে,
সব ভাঙনের শেষে থাকে একরাশ আলো।

 

 

অঞ্জলি দে নন্দী (মম) -এর কবিতাগুচ্ছ

গায় জৌনপুরি রাগ 

বাড়ি তার ছিল হুগলীর আরামবাগ।
এখন তার বাস দিল্লীর শালীমারবাগ।
রোজ ঊষায় সে গায় জৌনপুরি রাগ।
রাতে সে জ্বালিয়ে কাঠ কয়লায় আগ
নিজের হাতে রান্না করে সে মাটির হাঁড়িতে
তারপরে বসে মেঝেতে পাতা গালিচায়
আর অতি ধীরে ধীরে ধীরে সে খায়।
সে একাই থাকে তার বিশাল বাড়ীতে।
অনেক ময়ূর ও ময়ূরী পোষা আছে
তার বিরাট বড় বাগিচায়।
মেঘ ডাকলেই তারা নাচে।
আর তখন সে উচ্চ স্বরে গায়।
চড়ে না সে মোটর সাইকেল অথবা গাড়ীতে,
সব জায়গায়ই যায় সে সাইকেল চালিয়ে।
তার ছিল এক সুন্দরী বৌ;
নাম তার ছিল মৌ।
বরকে ছেড়ে সে গিয়েছে পালিয়ে।
খুব বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ সে আজ।
অতি উত্তম তার কণ্ঠের আওয়াজ।
সবাই বলে তাকে ওস্তাদ।
সঙ্গীতই তার সাধনা ও সাধ।
তবে সে কিন্তু বেশ দুঃখী।
বৌটি যে করল না সংসার তার সাথে।
তাই বিনিদ্রই থাকে সে রাতে।
সঙ্গীত তাকে পারে নি করতে সুখী।
নাম তার শ্রী দেবী প্রসাদ।

 

হস্তী ও হনুমান

শ্বেত-হস্তীর লম্বা শুঁড়ে
লাগায়ে দিলুম হাফ ডজন
কৃষ্ণ বর্ণের গোঁফ।
ওনার তো কয়েক মণ ওজন।
তাই ধীরে ধীরে ধীরে
উনি এনজয় করছেন ঘুরে ঘুরে ঘুরে।
কখনও বা পিঠে বসছে, কাক, বক।
সারমেয়দল ঘেউ ঘেউ ঘেউ করছে
তাঁকে ঘিরে।
পাড়ার নন্দী-বুড়ি
তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে।
এমন সময় হঠাৎ ওনার হল শখ,
গোঁফে মাখবেন চন্দন-সোপ।
মাখলেন উনি যেই
ওমনি শুঁড়ে তাঁর লাগল সুড়সুড়ি।
শুরু হল তাঁর হাঁচি।
হেঁচেই চলেছেন উনি, উনিশ, কুড়ি…
থামার বালাই নেই।
ক্লান্ত হয়ে বললেন উনি,
থামলে হাঁচি, বাঁচি!
একে একে একে
খুলে পড়ল তাঁর সব ক’টি গোঁফ।
থামল তখন তাঁর হাঁচি।
এরপর থেকে
শুঁড়ে চন্দনের তিলক এঁকে
হেলে দুলে ঘোরেন উনি।
একদিন এক ছোট ছেলে
তাঁর লেজে দিল নাড়া।
ওমনি উনি তখন তাঁর কান মেলে
উড়লেন আকাশে, আনন্দে আত্মহারা;
কিছুক্ষণ ওড়ার পরে
কানদুটি হয়ে গেল তাঁর ডানা।
উড়তে নেই কোনোই মানা।
উড়তে উড়তে উড়তে তিনি
গাইছেন গান সুর করে।
“আমি চিনি গো চিনি…”
শুনে তাঁর সেই গান
আকাশে দিল রান
অকারণ এক খামখেয়ালী হনুমান।
সূর্য তখন বলেন হেসে,
ওরে ও-হনুমান!
এবার থামা তোর রান!
হাতীর শুঁড়ে বোস তুই এসে!
তাঁর কথা শুনে তখন হনুমান
বসল হাতীর শুঁড়ে এসে।
হাতীবাবু বললেন তখন তাকে,
বসেছিল বোস, ভাল কথা।
কিন্তু একদম যেন দিস না যেন সুড়সুড়ি
আমার নাকে।
হেসে বলে হনুমান,
ক্যানো আমি দব সুড়সুড়ি অযথা?
দব না; বরং তোমার শুঁড়ে বসে ঘুরি।
হনুমান আর হস্তী
করল খুব মস্তি।
ওদের হল বেশ দস্তি।

 


রাত

রাত নামে ধীরে ধীরে ধীরে
উঁচু উঁচু উঁচু গাছেদের শিরে।
পাখি যত বিশ্রাম করে নীড়ে।
আকাশে চমকায় কত তারা-হীরে।
আঁখি-তারায় যায় তাদের গোণা কি?
দীঘি পাড়ে
ঝোপে-ঝাড়ে
টিমটিমিয়ে জ্বলে জোনাকী।
‘গাঁ তুমি শেখ নিশি-বায়ুর কল্পনার জাল বোনা কি?’
দীঘি জল সুধায় তারে।
গাঁ নীরব হাসি হেসে বলে,
“ও গো দীঘি! ঢেউয়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলে দুলে দুলে
তোমার হৃদয় যে কথা বলে,
যদি আমি না শিখি,
যায় তা শোনা কি?
আমার এ নিবিড় আঁধার মনের মাঝে।
চিররাতই তোমার হৃদ-কথা শুনব বলে
নিত্য নিশীথে আমি শিখি
নিশি-বায়ুর কল্পনার জাল বোনা।
আমার এ শেখা শেষ হয় প্রাতে,
আর শুরু হয় সাঁঝে।
শিখি আর লিখি।
ওই সুদূর দিগন্তের পাড়ে।
যত আমার অনুভবের কথা।
খুব মনের মিল যে আমার ওর সাথে।
আমরা প্রেম বিনিময় করি সারা রাতে।
এভাবেই তো সময় সামনে চলে।
তুমি কি জানো না?
আমার চিররাতের জন্য ও-ই করে
মোরে আনমনা।
আমি রই সৃষ্টিরতা,
শুধু ওরই তরে।
তোমার স্পন্দনও আমাদের মাঝে
তুমিও আন না!
এসো হই সবাই পরিপূর্ণ একসাথে,
আমাদের এই অনন্ত রাতের সীমাহীন ঘরে!
প্রিয় করে নিই গহীন রাতে।”

 


অপলক

বিনিদ্র রাতি।
সাথে নেই সাথী।
আকাশে শশী-বাতি।

খোলা জানলা।
মৃদু হাওয়ায় নড়ছে পাল্লা।
তারই কাছে করেছি শয়ন।
চন্দন পালঙ্ক, তাতে নরম গদি।
অদূরে বইছে কুলুকুলু নদী।
সুদূরে পৌঁছয় দৃষ্টি।
ভাবি- কী অপরূপ সৃষ্টি!
মনোরম তারারা, সুন্দর চাঁদ আর।
কল্পনায় ছুঁই চাঁদের পাহাড়।
তারাদের করি চয়ন।

গাঁথি অলিখ স্বপ্ন-মালা।
পরি নিজ গলে।
জ্যোৎস্না রজত বর্ণে গলে।
পূর্ণ ধরণীর ডালা।
পরিতৃপ্ত আমার যুগল নয়ন।
নিদ্রাহীন রজনী নয় বৃথা।
আমার প্রেমসঙ্গী এ নিশি-পৃথা।

কানন

গহীন কানন।
সতেজ তার হরিত আনন।
আমি বনবাসী।
জঙ্গল ভালবাসি।

বিহঙ্গের গীত মধুর বড়।
মৃগের রূপের মাধুর্য মনোরম।
বৃক্ষ ছায়াতল, মম ঘর ও।

অরণ্যের লাবণ্য যত বলি তত কম।
মৃদু শীতল মলয়
শিহরণ জাগিয়ে বয়।
আমি তৃপ্তির পরশ পাই।

আনমনে বন্য-গভীর প্রেমে পৌঁছে যাই…
বিটপির স্পন্দনই তো প্রাণ ভরে চাই।
এর তো কোনোই বিকল্প নাই।
কানন বিথী আমার কাছের।
হৃদয় আমার বন্য-ছাঁচের।

 

ভারাক্রান্ত

পৃথিবী আজ ভারাক্রান্ত।
প্রেম হয়ে গেছে ভ্ৰান্ত।
আমার ভাব আজ শ্রান্ত।
ধরিত্রী সৃষ্টির আদি থেকে
আমি খুঁজে চলেছি কাকে যেন?
তাকে, যে জীবন আয়ুর সীমা লেখে।
সে অনন্ত করেনি আয়ুকে কেন?
আমি সহ্য করতে পারি না জীবনের থামাকে।

আমি জন্ম পথের পান্থ।
আজ আমি বড় ক্লান্ত!
খুঁজে যে আজও পাই নি তাকে।
কোথায় যে সে থাকে?
কে বলবে আমাকে?
কেউ কি তার খোঁজ-ঠিকানা রাখে?
সেই তো ভাগ্য রেখা আঁকে।
প্রাণকে হারিয়ে দেয় মৃত্যুর বাঁকে।

 


কলঙ্কিত

কলঙ্কিত চাঁদ।
তবুও আলো তার অবাধ।
রূপ দেখে মেটে না সাধ।
জ্যোৎস্না ভাঙে আঁধারের বাঁধ।
আকাশ আমার ছাদ।
সেথায় রয় প্রিয় চাঁদ।
আমি পৌঁছে যাই কল্পনায়।
নিজেকে সাজাই আবেশী আল্পনায়।
চাঁদের গায়ে গা লাগিয়ে
রাখি তাকে নিশি জাগিয়ে।
ওর কলঙ্ক আমার প্রেম ভালবাসা।
আমার বাঁচার আশা।
আমার হৃদ স্পন্দনের ভাষা।
যুগে যুগে তাই তো এই কলঙ্কের কাছে আসা।
এই প্রেম কলঙ্কই মোর অমর বাসা।


ঘৃণ্য

দুনিয়ার হিংসা ঘৃণ্য।
মানসিকতা কত ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন?
অথচ বাঁচার তাগিদে সবাইই অভিন্ন।
নিচতায় সম্পর্ক বন্ধন হয় ছিন্ন।
সম্বন্ধ চায় নিস্তার।
কুবুদ্ধি করে মায়াজাল বিস্তার।
ধ্বংস লীলা চলগামী।
মনুষ্যত্ব অধগামী।
বিবেক দিশাহারা।
মন তো বদ্ধ কারা।
ভালোবাসা নিম্নগামী।
অসহায় অন্তর্যামী।

 

টাকা ও টাক

কয়েক কোটি টাকা।
মাথা তার ফাঁকা।
একটিও নেই কেশ।
টাক চকচক করে।
নাম তার লোকেশ।

হরেক টুপি সাজানো তার ঘরে।
ঘন্টায় ঘন্টায় ঘন্টায়
বদলে বদলে বদলে টুপি পরে।
তবুও খচ খচ খচ করে মনটায়।
দুঃখের ছাপটা তার ওঠে মুখে ফুটে।
কেন যে চুল সব গেল উঠে!
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বদলায় টুপি।
সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা আছে টুপি বহু।
একের পর এক মাথায় পরে
আবার খোলে এক এক এক করে,
দরজা বন্ধ করে,
কুকুটিকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে।
ভয়ে ভয়ে ভয়ে, চুপি চুপি চুপি।
কিছুতেই পছন্দ হয় না আর।
কোনোটাই মানাচ্ছে টাকে তার।
হঠাৎ কাণ্ড দেখে ফেলে
রেগে জ্বলে ওঠে তার বৌ।
বৌয়ের নাম মৌ।
লোকেশ ভয়ে ঢোঁক গেলে।
এরপরে পোষা কুকুরের মত নেয়।
নাম ওর গুপি।
গুপিই একটি টুপি বেছে দেয়।
লোকেশ সেটি টাকে পরে নেয়।
কুকুরটি ডাকে তখন, ভৌ ভৌ ভৌ।
লোকেশ বোঝে ওর ভাষা।
ও বলে, মানিয়েছে খাসা!
বৌয়ের নয় ও পেয়েছে কুকুরের ভালবাসা।
মাঝে মাঝেই তার যমজ দু’ নাতী
ঠাকুরদার টাকে তবলা বাজায়।
তারা তার প্রিয় সাথী।
কখনও বা ওরা রঙে টাক সাজায়।
আঁকি বুঁকি – হিজিবিজি আঁকে,
মসৃন, খোলা, বড় টাকে
দু’জনে বসে দুপাশে,
আর বেদম জোরে হাসে।
লোকেশ তখন খক খক খক কাশে।
পতির রঙিন টাক দেখে
পত্নী-মৌ মুচকি হাসে।
ওর মাথার সব চুল গেছে পেকে।
বৌমা তেড়ে আসে।
যমজ ছেলে দুটোকে নেয় ডেকে।
তোয়ালে ভিজিয়ে জলে,
মৌ মুছে দেয় লোকেশের টাক।
আদরে লোকেশ বলে,
“আই লাভ ইউ মৌচাক!”

 


গীতিকার্নী/১ 

বাংলার নদীর তীরে
জন্মে জন্মে জন্মে আসি
ফিরে ফিরে ফিরে।

বাংলার মাটি
আমি বড় ভালবাসি।
বাংলার বায়ু চির খাঁটি।
এর শুদ্ধ জল
দেয় অনন্ত বল।
আলো এর অশেষ।
এ আমার প্রিয় দেশ।
বাংলায় গান গাই।
অমরত্ব পাই।
কত কত কত
দেশে দেশে দেশে যাই।
এ দেশের মত
এমন দেশটি আর নাই।
সেরা দেশ এ দেশ তাই।
আমি বাংলার প্রাণ।
আমার এ জীবন বাংলারই দান।
বাংলা আমার আত্মসম্মান।
এই বাংলাতে জন্মেছি আমি।
প্রার্থনা করি, হে অন্তর্যামী!
বাংলার বুকে
মরণ হয় যেন সুখে!
আমার বাংলা গান যেন থাকে
সকলের মুখে মুখে মুখে।
মৃত্যুর পরেও যেন
এ বাংলা আমায়
নিজেদের অন্তরে রাখে!
আমার বাংলা গান যেন
কেউ না থামায়!
আমার সৃষ্টি যেন
যুগে যুগে যুগে প্রেমাশ্রু নামায়!

 


গীতিকার্নী/২

সৈকতে যেতে যেতে যেতে
আমরা উঠেছি মেতে
মন চায় আরও কাছে পেতে
জোয়ার ছোঁয়ার খেয়ালী বাসনা
ও আকাশ ক্যানো কাছে আসো না
জোয়ার ছুঁয়ে ক্যানো ভালবাস না
মনের শ্যামল কাননে দেয় উঁকি আলো আঁধারী অনন্ত সুখই
আমরা চির সুখী
সাগরের বুকে পাগলামী
প্রেমী প্রেমী তুমি আমি
এসো কপোলে খাই হামী হামী হামী হামী
এ সৈকত তো বড় আবেগী আবেশী
বেশির চেয়েও আরও অনেক বেশি
উত্তাল কল্লোলে কল্লোলে শুধুই মেশামেশি

 

 

প্রিয়াংকা নিয়োগী সনি -এর একটি কবিতা

বাঘ

বাঘ মামা বড়ো আদরের
দূর থেকে কদরের
প্রিয় সে সকলের
দাপুটে হাবভাবের
রাজত্বের মালিক তার রাজ্যের,
ছিঁড়ে খাবার ডর সকলের
ছিঁড়ে ফেলে লোভ মাংসের।

বাঘ দেখে দূর থেকে
বাঘের দেখাতে ভয় ধরে
এই বুঝি এলো লাফিয়ে
দিলো ঘার মটকে
নাড়িভুঁড়ি বের করে।
তুমিও থাকো বাঘের বেশে
বাঘ তুমি গর্জনে
কামর বিয়াদপিতে
বুঝবে যখন মিল বাঘের সাথে
ভাববে না ঠকাতে।

 

🍁ধারাবাহিক ন্যাস |
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হল সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

হারিয়ে যায়া নারীর ইতিথা


মমতা রায় চৌধুরী

সুনয়না দি

২.

বাপরে কি জ্বালা কি জ্বালা এভাবে কী আর সংসার করা যায়! মাঝে মাঝে মনে হয় যেদিকে দু’চোখ যায়, চলে যাই।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রোজই প্রায় এই ধরনের
কথা শুনতে পায়। তিথি বুবনের দুধ গরম করতে করতে কথাগুলো শুনতে পায়।
বুবনের শরীরটা ভাল নেই। আজ তিথি স্কুলে যেতে পারবে না। পবিত্র বাড়ি থাকলে তাহলেও যেতে পারত কিন্তু কিছু করার নেই। এদিকে সুনয়নাদি কাজে দেরি করে এসেছে।

আমি বুঝেছিলাম যাই হোক সেই মতো রাত বারোটায় বেরিয়ে যায়। রাত বাড়তে থাকলেই তো এই গলিতে সব থেকে বেশি টাকা ওড়ে। মাসি মদ খেয়ে চুর আর দালালদের ফিট করে রাখাতে সুবিধে হয়েছে। সেদিন অন্ধকার রাত পেরিয়ে সুনয়না হাত ধরে একটু আলোর প্রকাশে। সেই দিনই ওরা কালী মায়ের মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে।’

ছাঁকনিতে দুধ ঢালতে ঢালতে কথাগুলো শুনে আজ তিথি বলেই ফেলল ‘কেন দু’চোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যেতে চাইছ। এই পালসিটে কি তোমার ভাল লাগছে না।’
সুনয়নাদি কি একটা খুঁজতে লাগল। না পেয়ে বলল ‘আমার ঝাঁটাটা কোথায় গো?’
‘তুমি নিজে কোথায় রাখো কিছুই মাথায় রাখতে পারো না।‘
‘কি যে বলো না বৌদি, আমার জায়গা তো তোমার সিঁড়ি ঘরের নিচে। ওখানে তোমার ঝাঁটা নেই।’
‘কেউ তো নেয়নি। দেখো ভাল করে ওখানেই আছে।’
‘হ্যাঁ গো, আমি ঠিক করে দেখলাম গো, ঠিক আছে আর একবার যাচ্ছি।’
‘বুবন দুধটুকু খেয়ে নাও ।না ,না নাক শিটকোলে হবে না। খেতেই হবে’।
‘না, আমি খাব না।’
‘এটা কি দুষ্টুমি হচ্ছে বুবন ,ফেলে দিলে দুধটা।’
ঝাঁটা কোথায় পেলে গো?’
সুনয়নাদি কোন সাড়া দিল না।
‘আর একটুখানি আছে খেয়ে নাও বাবা। এইতো আমার সোনা বাবা।’
ঘর মোছার বালতিটা নিয়ে ঘর মুছতে চলে গেল সুনয়না দি।
‘কিগো তোমায় জিজ্ঞেস করছি। কোন রা কাটছ না।’
‘ওখানেই ছিল’।
‘তবে যে বললে নেই।‘
আসলে ও-কাজে আসলে সব সময় ছুটতে থাকে যেন মনে হয় ও-রাজ্যের আরো কাজ কোথাও বাকি রেখে এসেছে।
আর যদি একটু না তাকাও সব কাজ নিমিষেই শেষ করে ফেলে। কাজ তো করে যায়। কিন্তু নোংরাকে নোংরাই রয়ে যায়।
এই হচ্ছে সুনয়নাদি ফর্সা, রোগা ছিপ ছিপে চেহারা চোখগুলো ছোট, চুলগুলো স্টেট আর নাকি সুরে কথা। তবে ওর কথার আওয়াজ খুব আস্তে। খুব আস্তে আস্তে কথা বলে। কাছে না গেলে বোঝাই যাবে না কি বলছে? শুধু সিঁড়ি দিয়ে যখন ওঠে তখনই একটু শোনা যায় ওর কথা। আর রোজই একই কথা কেন যে বলে এটাই বুঝে উঠতে পারে না তিথি।
কাগজি মাসি বলেছিল বৌমা আমি তো সব কাজ করে উঠবো না আর একজনকে কাজে দেব?
তিথি একটু অবাক হয়ে গেছিল’ এইটুকু কাজ আবার দুজন করবে।‘
‘না, না আমি অন্য জায়গায় একটা কাজ ধরেছি।’
‘কী কাজ?’
‘আয়ার কাজ।’
‘মাইনে বেশি নাকি’?
‘না না সেরকম নয় ‘আসলে উপর নিচ করতে হয় তো বুঝতেই পারছ, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।‘
তিথি বুঝতে পারল।
‘এজন্য একে নিয়ে আসলাম।’
আর তুমি গল্প লিখছ যেমন সেরকম গল্প লিখে যাও, এই সুনয়নাকে নিয়েও তুমি গল্প লিখো। এও কি… মুখের কথাটার শেষ না হতেই
‘একই পথের পথিক তবে ওর পথের ঠিকানাটা বদলেছে।’
তিথি একটু অবাক হয়ে যায়।
‘হ্যাঁ গো‘।
‘কেমন কেমন,’ তিথি একটু উৎসাহী হয়ে বলল।
‘ও ওই নর্দমার জীবন থেকে বেরিয়ে এসেছে।‘
‘কি বলছ, মাসি‘।
‘ঠিকই বলছি‘।
‘তবে এতে ওর ঝুঁকিটা অনেক বেশি ছিল। যাই হোক, জীবনেতে ঝুঁকি নিতে হবেই। আর নিয়েছিল বলেই জীবনটা কিছুটা হলেও সুন্দর হয়েছে। নইলে ওর জীবনটাও এরকম অভিশপ্ত হয়ে
যেত। ভগবানের অশেষ কৃপা যে, ও বেরতে পেরেছে।’
সেই কাহিনি তোমাদেরকে বলব।’
চা খেতে খেতে মাসি একটু আনমনা হয়ে গেল হাতের শিরাগুলো জেগে উঠেছে। বিস্কুটটা ভেঙে পড়ে গেল।
মাসি তুলতে যাচ্ছিল। ‘থাক, থাক মাসি, আমি দিচ্ছি বিস্কুট।’
‘ওতে কিছু হবে না। আমাদের জীবনটাই আস্তাকুঁড়ের মত’। একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘সুনয়নাকে ওর মা বিক্রি করে দিয়েছে।‘
‘এখানেও সেই বিক্রি…মাসি।’
‘হ্যাঁ গো এখানেও কিন্তু সেই অভাবটাই কাজ করেছে।’
‘কী রকম?‘
‘জানো তো ও-নেপালি।‘
’কিন্তু কি সুন্দর বাংলা বলে।’
‘হুম এখন শিখেছে।’
পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় সেখানেও তো খাদ্য সঙ্কট আছে। ওরা অনেকগুলো ভাই-বোন। এটা ওর মুখ থেকেই শোনা।’
‘তাই বলে মা বিক্রি করে দেবে!’
‘কি করবে? ওর মা খাদ্যের যোগান দিতে পারছিল না ওর মাকেও টোপ দেয়া হয়েছিল মেয়ে খুব ভালো থাকবে।’
‘সেই।’
জানো তো পাহাড়ি মেয়েরা কত পরিশ্রমী হয়। কপাল দেখো ওকেও এসে উঠতে হলো এই দুর্বার সমিতিতে। পড়লো দালাল আর মাসির খপ্পরে। ওকে দিয়েও শুরু হল সেই একই ব্যবসা। তবে ওর কাস্টমার ওর প্রেমে পড়ে গেল ওর অসহায় চাউনি আর ওর ভালবাসার কাছে।
‘তাহলে এখানে ভালবাসা জিতেছে বলো।’
‘তা বলতে পারো। ‘
ভালবাসার কখনও পরাজয় নেই।এ যে চিরন্তন।’
‘কিন্তু সব ভালবাসা পূজা হয়ে ওঠে না।‘
‘কি রকম।‘
ও-কিন্তু এক সন্তানের মা ও গর্ভধারণ করে ফেলেছিল। কতবার আর অ্যাবরশন করবে বলো! অথচ যে ছেলেটি ওর কাছে প্রায় দিনই আসত, সেই একদিন ওকে বলল আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।’
‘বলো কি!’
‘আমাকে আমাদের মত মেয়েদেরকে কে বিয়ে করবে দু’দিন পর আবার সেই ছুঁড়ে ফেলে দেবে।’
‘না, না এই আমি তোমার গা ছুঁয়ে শপথ করছি’।
মেয়েটার চোখে জল আমাদের মত মেয়েদের কি এই সমাজে স্থান দেবে।
‘এই সমাজের কথা আমি জানি না সু।
তবে আমি তোমাকে আমার হৃদয়ে স্থান দিয়েছি। বলেছিল প্রদীপ।’
ছেলেটির নাম প্রদীপ।
হ্যাঁ গো।
সত্যিই সুনয়নার জীবনে প্রদীপ আলো জ্বেলেছিল।
তারপর।
‘ও বলেছিল ‘কিন্তু আমার তো একটা মেয়ে আছে।
তাহলে ওই মেয়েটি কি ওই ছেলেটির নয়।’
‘না।’
‘very interesting…’
ছেলেটি বলেছিল ‘তাতে কি হয়েছে আমি তো সব জেনেই তোমাকে ভালবেসেছি।‘
তিথি অবাক হয়ে গেল। সত্যি ছেলেটার মনটা অনেক বড়।
কাগুজি মাসি বলল, সুনয়না আমাকে যেভাবে বলেছে কথাগুলো আমি ঠিক সেভাবেই তোমাকে বলছি।’
‘তারপর’
তারপর যা হয় দু’টি হৃদয় এক হয় তখন কোন বাঁধই বাঁধা মানে না।
‘কিন্তু ওখান থেকে পালানো তো সহজ নয়।’
‘তাহলে? ‘
‘অনেক বাধা প্রতিবন্ধকতা।’
মাসি আর দালালেরা ছাড়তে চায়?
ছেলেটিও এর শেষ দেখে ছাড়ে।
দিনের পর দিন ও সুনয়নার সঙ্গে পড়ে থাকে।
তারপর মাসিরা দেখল না এই মেয়েকে দিয়ে আর কোনও কাজ হবে না। কিন্তু ছাড়া তো সহজ নয় একদিন বলল, ‘আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব, তুমি পালাবে আমার সাথে। কিন্তু সেই কাজটি সহজ ছিল না বৌমা। আমি এই কাজে ওকে সহায়তা করেছি আমি জানতাম এই জীবনটা কতটা ভয়ঙ্কর আর যেখানে ও ভালোবাসার মানুষ পেয়েছে সেখানে পড়ে থাকবে কেন। যে ওকে সম্মান জানাতে চায়।’
‘সে তো ঠিকই।’
আমি ছেলেটাকে বললাম, ‘তোমাকে কিছু টাকা খরচ করতে হবে।’
সুনয়না বলল, ‘আমার কাছে টাকা আছে বলো মাসি কিভাবে আমি এখান থেকে বের হতে পারবো।’
আমি ক’য়েকজন দালালের সঙ্গে কথা বললাম ওদেরকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করলাম তারপর সুযোগ বুঝে একদিন ওকে বের করে দেয়া হল।’
‘তুমি তো দারুণ ভূমিকা নিয়েছিলে মাসি।’
‘জানো তো বৌমা সুনয়না দিনের পর দিন কাঁদত কিন্তু ওর ওই কান্না কারোর মন ভিজত না।
আমি বুঝেছিলাম যাই হোক সেই মতো রাত বারোটায় বেরিয়ে যায়। রাত বাড়তে থাকলেই তো এই গলিতে সব থেকে বেশি টাকা ওড়ে। মাসি মদ খেয়ে চুর আর দালালদের ফিট করে রাখাতে সুবিধে হয়েছে। সেদিন অন্ধকার রাত পেরিয়ে সুনয়না হাত ধরে একটু আলোর প্রকাশে।
সেই দিনই ওরা কালী মায়ের মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে।’
‘কিন্তু মাসি ছেলেটির বাড়িতে মেনে নিয়েছে?’
আমাদের নারীদের জীবন তো এরকমই একটা বাঁধা বের হতে না পেরেতেই আর এক বাঁধার সম্মুখীন।
তুমি বলো এই ধরনের মেয়েকে কি কেউ মেনে নিতে চায়, কোন বাবা মা চাইবে অবিবাহি ত ছেলের সঙ্গে এই গলির মেয়ে তার আবার একটি বাচ্চা আছে কোন পরিবার মেনে নেবে বলো?’
‘সেটাই তো’।
মাসি এবার গান ধরে ‘আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে….’
‘ও মাসি তুমি যে গান ধরলে’।
‘সেই জন্যই তো গানটা ধরলাম’।
হঠাৎ করেই দুমদাম বাসন পড়ার আওয়াজ।
কি হল? ছুটে এসে তিথি দেখে তার ছেলে বাসনগুলো ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে কাজের মাসি বাসন মেজে রেখে দিয়েছে আর এই অনাসৃষ্টি কাজগুলো করে যাচ্ছে তার ছেলে।
কি যে মাথাটা গরম হয়ে গেল একটা চড় মারতে যাবে কিন্তু পারল না মনে পড়ে গেল তার ছেলেটি তো অন্য সব বাচ্চার মতো স্বাভাবিক বাচ্চা নয়, সুতরাং মাথা ঠাণ্ডা রেখে ধৈর্য ধরে ওকে বোঝাতে হবে।
‘বাবা… বুবুন সোনা, তোমার কি রাগ হয়েছে?’
ছেলে গুম হয়ে আছে। মাথা নিচু করে আছে।
‘বল, বল, মাম মামকে বল তুমি কি রাগ করেছ?’
‘তোমরা কেউ আমার সাথে কেন খেলছ না ‘
‘কাগজি মাসি তুমি আজকে আমার ছেলের সঙ্গে খেলা করো নি। ওই দেখো কত অভিমান জমা হয়েছে।‘
‘হ্যাঁ তাই তো আজকে তো খেলাই হয়নি, আমি তো গল্প করতে বসে গেছি।
ঠিক আছে বুবুন সোনা, আমি তোমার মাকে কতগুলো কথা বলে নিই তারপর তোমার সাথে খেলবো।’মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কাগজি মাসি কথাগুলো বলল।
ছেলেটা মনে হল একটু শান্ত হল।
তারপর যেই সুনয়নার কথা বলতে যাবে,
তখন তিথি বলল থাক মাসি অন্য দিন বোলো তোমাকেও তো স্নান করতে হবে, বাড়িতে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে হবে, অন্যদিন হবে।’
‘হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। ‘
‘ঠিক আছে আমি আমার কাজটা করে এসে যদি বিকেলে তুমি ফ্রী থাকো তাহলে তোমার সাথে কথা বলব। 🍁(ক্রমশঃ)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন