Sasraya News Sunday’s Literature Special | 9th November 2025, Sunday | Edition 86 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ৯ নভেম্বর ২০২৫, রবিবার | সংখ্যা ৮৬

SHARE:

ম্পাদকীয়

হেমন্তের শেষ গাঢ় সোনালি আলো পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যখন শীতের আবহ নামতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে SIR নিয়ে। নানা মহলে নানা জল্পনা, উদ্বেগ, আতঙ্কের আবহ তৈরি করার চেষ্টা সবই রাজনৈতিক স্বার্থ কিংবা জনমানসে বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে এমন কিছু শক্তির দ্বারা। অথচ সত্যিটা একেবারে উল্টো। সরকারের নিয়ম, কেন্দ্র ও রাজ্য দু’পক্ষের প্রশাসনিক কাঠামো, সবকিছুই সাজানো আছে যাতে সাধারণ মানুষের কোনও অসুবিধা না হয়। SIR নিয়ে মানুষের অকারণ ভয় বা আতঙ্ক সৃষ্টি করার কোনও কারণ নেই, বরং এই সময়ে প্রয়োজন সহযোগিতা, মনোবল, এবং দায়বদ্ধতা।

পশ্চিমবঙ্গ বহু কঠিন সময় দেখেছে অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, এমনকী প্রাকৃতিক দুর্যোগও। কিন্তু এই রাজ্যের মানুষ প্রতিবারই প্রমাণ করেছেন তাঁরা আতঙ্কবন্দী হন না; তাঁরা বাঁচেন সহমর্মিতায়, সহাবস্থানে, পারস্পরিক আস্থায়। তাই SIR বা যে কোনও নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনও মানেই নেই। সরকারের নির্দেশিকা স্পষ্ট এর ফলে কাউকে দেশ ছাড়তে হবে না, কারও নাগরিকত্বের অধিকার নষ্ট হবে না, কোনও পরিবার হঠাৎ করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে না। এতসব তথ্য জানা থাকলে, আসলে আতঙ্কের জায়গা কোথায়?

জাতীয় নির্বাচন কমিশন স্বাস্থ্যসাথী কার্ডকে SIR নথি হিসাবে খারিজ করেছে। বাংলায় আধার ও আরও ১১টি নথি বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক।
-প্রতীকী চিত্র

এই মুহূর্তে সবচেয়ে দরকার বাস্তব তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া, গুজব বা রাজনৈতিক ‘স্পিন’ থেকে দূরে থাকা। যেহেতু সামনে নির্বাচন, রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই নানা ইস্যুকে ঘিরে উত্তাপ বাড়তে পারে। কিন্তু মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টাই যদি ভোটের কৌশল হয়, তবে সেই কৌশল জনগণের কাছে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ভোটাররা এখন অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা বোঝেন তাঁদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, পরিচয় এগুলো কোনও রাজনৈতিক প্রচারের খেলনা নয়। তাই SIR নিয়ে অযথা ভয় ছড়ানো, মানুষকে ভীত করতে চাওয়া বা বিভাজনের রাজনীতি এসব কার্যত ব্যর্থ হওয়ারই কথা।

ভোট কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয় এই সত্য আজও প্রাসঙ্গিক, বরাবরের মতোই। বাঙালি ভোটার কর্ম দেখে মানুষকে বিচার করেন। একজন মানুষের কাজ, নীতি, সততা, তার প্রশাসনিক দক্ষতা এগুলোই ভোটের সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। দেশ বা রাজ্যের উন্নয়ন, মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-চাকরি এসবই আসল ইস্যু, যেগুলো নিয়ে বিতর্ক করা, আলোচনা করা, রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা অর্থবহ। কিন্তু ভয় দেখিয়ে, মানুষের মনোভাবকে বিভ্রান্ত করে কোনও দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ভালবাসা, আস্থা, মানবিকতা এসবই শেষ পর্যন্ত জয় আনে।
শীতের সকালের রোদ যেমন ধীরে ধীরে কুয়াশা সরিয়ে দেয়, তেমনই সত্য ধীরে ধীরে ভয়কে সরিয়ে দেয়। মানুষের সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যৌথ অংশগ্রহণ এগুলোই পরিস্থিতিকে সহজ করে তোলে। SIR কোনও অগ্নিপরীক্ষা নয়; এটা একটা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা দিয়ে তথ্য সুসংগঠিত থাকবে, নথিপত্রের স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। আর স্বচ্ছতা মানেই নিরাপত্তা। যেহেতু দেশের এবং রাজ্যের সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে কোনও নাগরিকের অধিকার এতে ক্ষুণ্ণ হবে না, তাই ভয় পাওয়ার কোনও যুক্তিই থাকে না। সঠিক নথি পত্র সময়ের মধ্যে না দেখাতে পারলে ভোট দিতে পাবেন না এর চেয়ে বেশি কিছুই নয়। পরবর্তীতে নথি পত্র দেখিয়ে নিজেদের ভোটার বা আঁধার কার্ড বানিয়ে ফেলতে পারবেন।

এই সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিজে ভয় না পাওয়া, এবং সমাজে ভয় না ছড়ানো। কারণ গুজব ভয় তৈরি করে, আর ভয় সমাজকে দুর্বল করে তোলে। অন্যদিকে সহযোগিতা ও ভালবাসা সমাজকে শক্তিশালী করে। শীতের এই শান্ত, নিরিবিলি আবহে আমাদের দায়িত্ব হল শান্ত থাকা, সচেতন থাকা, পরস্পরকে সাহায্য করা। কোনও রাজনৈতিক উস্কানি বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রচার আমাদের চিন্তাভাবনাকে যেন না দখল করে নেয়। রাজনীতি থাকবে, বিতর্ক থাকবে, মতবিরোধ থাকবে এই তো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় মাথায় রাখা উচিত- বেকার যুবক-যুবতীর স্বপ্নের বাস্তবতায় সহায়ক হয়েছে, ক্ষমতার জন্য সমাজকে কে পঙ্গু করতে চাইছে, কে কাজ করেছে, কে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, কে উন্নয়নের রাস্তা খুলেছে, আমাদের রাজ্য বা দেশ এগিয়েছে না পিছিয়ে গেছে, কে বিভাজনের আগুন জ্বালাতে চেয়েছে, এই সব নজর করে ভোট প্রদান করা উচিৎ। এতেই দেশ ও রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অগ্রগতি ঘটবে।

পশ্চিমবঙ্গ সবসময়ই ভালবাসার রাজ্য। এখানকার মানুষ জানেন মানুষ মানুষকে গ্রহণ করলেই সমাজ এগোয়। ভয় নয়, আস্থা এটাই ভবিষ্যতের ভিত্তি। আর সেই আস্থার মাঝেই আছে প্রকৃত গণতন্ত্রের শক্তি। তাই এই শীতের শুরুতে, যখন রাজনৈতিক উত্তাপ ধীরে ধীরে চড়ছে, তখন মনে রাখুন ভালবাসা দ্বারাই জয় আসে। বিভাজন নয়, ঐক্যই শেষ পর্যন্ত রাজ্যের ও দেশের মঙ্গল বয়ে আনে।🍁

 

 

 

🍁মহামিলনেরথা

 

গুরুর আদেশ

সন ১৯৭৬। গঙ্গাসাগরে (শ্রাবণ মাস) ঠাকুরের চাতুর্মাস্য চলছে। ঠাকুর একদিন সকালবেলায় আমাকে বললেন, “এটা কোথায় বল্ তো?” আমি বললাম, “বাবা গঙ্গাসাগর।” ঠাকুর বললেন, “ভারতবর্ষের মহাতীর্থ স্থান। এত বৎসর পর আগামীকাল একটা দিন আসছে। এই যোগে মহাতীর্থ স্থানে তোকে দীক্ষা দেব।”

তার আগে বাবার সাথে সারা ভারতবর্ষে নামপ্রচার করেছি। একদিন বাবাকে প্রণাম করে বললাম, “বাবা আমাকে দীক্ষা দিন।” ঠাকুরটি বললেন,”তোর এখন সময় হয়নি।” বেশ কিছুদিন পর আবার বললাম, “বাবা, আমার থেকে কত ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে দীক্ষা দিচ্ছেন অথচ আমায় দিচ্ছেন না।” ঠাকুরটি বললেন, “যে কোন একটি তীর্থস্থানে দীক্ষা দেব।” ভারতবর্ষের প্রায় সব ধর্মস্থান গেছি আর বলেছি, “বাবা,এটা তো তীর্থস্থান।” বাবা কিন্তু এড়িয়ে গেছেন। বিরক্ত হয়ে বাবাকে বলা ছেড়ে দিলাম ।

‘৭৬ সালে চাতুর্মাস্য চলাকালীন যখন বাবা ডেকে বললেন তোকে দীক্ষা দেব তখন মন আমার আনন্দে ভরে গেল— আমার বহুদিনের একান্ত মনের ইচ্ছা পূর্ণ হতে চলেছে। এদিকে সকাল হতে কাকদ্বীপের পারাপার বন্ধ। কারণ প্রচণ্ড বেগে বাতাস ও বৃষ্টি হচ্ছে। সাইক্লোন। সরকার নির্দেশ দিয়েছে— ২৪ ঘণ্টার জন্য যান চলাচল বন্ধ থাকবে। আশ্রমের মধ্যে ৩/৪ শো লোকের সমাগম। যত বেলা বাড়ছে সমুদ্র উত্তাল, ঝড়ের দাপট বাড়ছে। সাগরের রূপ ভয়ঙ্কর থেকে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

ঠাকুর সন্ধ্যা ছয়টার সময় নাট মন্দিরে পাঠ প্রার্থনা অন্যদিনের মত করাচ্ছিলেন। হঠাৎ হাতের কাছে শম্ভু নামক যুবককে ঠাকুর বললেন, “এর মামাতো বোন চুঁচুড়ায় থাকে। বয়স হয়েছে, তাকে আনতে এখনই রওয়ানা দে।” শম্ভু বললো— “বাবা, পারাপার বন্ধ, তাছাড়া এই প্রচণ্ড ঝড় জলে কি করে যাবো? ঠাকুর বললেন, “ঠিক আছে।” আবার একটি যুবককে বাবা বললেন, “তুই যাবি?” সেও একই কথা বলল। এইরূপে দুই-তিনজনকে বলাতে কেউ রাজি হল না। এই সময় ঠাকুরের সামনে আমি পড়তেই আমার হাত ধরে বললেন— “এর মামাতো বোন চুঁচুড়ায় থাকে, কাল তার দীক্ষা হবে। নিয়ে আসতে পারবি?” বললাম, “হ্যাঁ,বাবা। আদেশ করুন।” ঠাকুরটি মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “রওনা দে।”

আমি যখন রওনা হব বলে প্রস্তুত হচ্ছি তখন বেশ কয়েকজন গুরুভাই-বোন, বিশেষতঃ কর্ণেল পুরকায়স্থদা আমাকে বললেন, “খেপেছ? এই আবহাওয়ায় যাবে কি করে? একটাই বাস ৬টার সময় চলে গেছে। কি করে যাবে? তাছাড়া কচুবেড়িয়া কাকদ্বীপ পারাপার বন্ধ। তুমি কি পাগল হয়েছো? ঠাকুর বলনেন আর তুমিও চললে?” আমি ওদের কথায় কান না দিয়ে রওনা দিলাম। প্রচণ্ড বৃষ্টি ও তার মধ্যে প্রবল ঝড় বয়ে চলেছে। বাসস্ট্যাণ্ডে এসে দেখি সন্ধ্যা ৬-২০ মিঃ হয়েছে। সবে বাসটি ছেড়ে যেতে শুরু করেছে। আমি প্রাণপণে চীৎকার করছি— “ও দাদা দাঁড়ান— আমি যাব।” বাস থামলো, আমি বাসে উঠে বসলাম। জিজ্ঞাসা করলাম— আচ্ছা বাসটি তো ছটার সময় ছেড়ে যাবার কথা। একজন বললেন— “এই ঝড় জলের মধ্যে অন্য কোন বাস নেইতো তাই একটু অপেক্ষা করছিলাম।” এরপর ৭-৩০ মিঃ নাগাদ কচুবেড়িয়া পৌঁছালাম। ঘাটে গিয়ে দেখি বিশাল বিশাল ঢেউ পাড়ে আছড়ে পড়ছে। তার সঙ্গে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। সমস্ত দোকান বন্ধ। নৌকাগুলি সব নোঙ্গর করা রয়েছে। দেখলাম একটি দোকান একটু খোলা আছে, ভিতরে গিয়ে দেখি— মাঝি মাল্লারা তাস খেলছে। ভিতরে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে, এদের মধ্যে একজনকে বললাম আপনি সুবলদা না? তিনি বললেন, তুমি কে? আমি বললাম, ঠাকুরের সারথি নিমাই। বলল, ভিতরে ঢুকে পড়। আমি বললাম, সুবলদা ওপারে নিয়ে যেতে হবে। বলল, মাথা খারাপ হয়েছে তোমার? সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি ও ঝড় বাতাস চলছে। সমস্ত যান চলাচল সকাল ৬টা পর্য্যন্ত বন্ধ। গঙ্গার এই জল দেখে আমাদের বুক কাঁপছে। ভয়ঙ্কর অবস্থা। আর এখন তুমি বলছো ওপারে যাবে। খিচুড়ি খেয়ে শুয়ে পড়। কাল যদি আকাশ ভাল থাকে তাহলে দেখা যাবে। আমি কিন্তু নাছোড়বান্দা। বারবার বিরক্ত করতে লাগলাম । ওদের মধ্যে ৪ জন বলে উঠলো— চল তো বেটাকে নৌকায় তুলে দেখি বুকের পাটা কত?

শুধুমাত্র ভয়ঙ্কর রূপ দেখানোর জন্য ওরা আমাকে নৌকায় তুলল। নৌকা প্রায় ১০ ফিট লাফাচ্ছে, কী ভীষণ রূপে। গঙ্গার জল উথাল পাতাল হচ্ছে। এই অবস্থায় আমি লাফ মেরে উঠলাম। ওরা আমাকে বাঁচানোর জন্য লাফ মেরে নৌকায় উঠে পড়ল। এমত অবস্থায় কি যে হল, কিছু বোঝার আগেই নৌকা যে নোঙর করা ছিল সেটা আলগা হতে আরম্ভ করল। ওদের কিছু বোঝার আগেই পালটা অনেকটা উঠে গেল, নৌকা তীরবেগে ছুটতে আরম্ভ করল। কি যে হল ওরা টের পেল না। শুধু দেখলাম ভয়ঙ্কর ঢেউ-এর মধ্যে নৌকা তীর বেগে এগিয়ে চলেছে। আমি পালের লাঠি ধরে বসে পড়েছি। অসম্ভব বিদ্যুতের ঝলক। ১০ থেকে ১২ ফিট ঢেউয়ে নৌকা যায় যায় অবস্থা। আতঙ্কে প্রচণ্ড ভীত হয়ে পড়েছি। শুধু গুরু গুরু জপ করছি। এর মধ্যে হঠাৎ পালের দড়ি ছিঁড়ে গেল। মাঝিরা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। চোখ চলে গেল পালের দিকে— এক ঝলকের মধ্যে দেখতে পেলাম আমার ভগবানকে, হাসি মুখে হাত তুলে আমায় অভয় দিচ্ছেন। এর পরের ঘটনা আরো অভাবনীয়। ৩/৪ পাক খেয়ে নৌকাটি তীরবেগে সোজা পাড়ের দিকে, নির্দ্দিষ্ট ঘাট থেকে দেড়/দু কিলোমিটার দূরে জল থেকে পাড়ে জয়গুরু বলে লাফিয়ে পড়লাম। ওরাও পাড়ে লাফিয়ে উঠল। সুবলদা ও সাথিরা বলল—‘ঠাকুরের কৃপায় নবজন্ম হল।’ শুধুমাত্র তোমাকে ভয় দেখাবার জন্য নৌকায় তুলেছিলাম। কিন্তু জানিনা কি যে ঘটে গেল। আমাদের দীর্ঘ মাঝির জীবনে এই প্রথম।

সুবলদাকে বিদায় দিয়ে, নদীর বাঁধ ধরে এগিয়ে চললাম কাকদ্বীপের মোড়ে। তখন রাত ১১ টা। সামনে চলছে টানা বাতাস ও বৃষ্টি। আশেপাশের কোন লোকজন দেখলাম না। একটা চায়ের দোকান দেখলাম একটু খোলা। জিজ্ঞাসা করলাম ভাই একটু দরজাটা খুলুন না। আমার কাদামাখা অবস্থা দেখে দোকানদার বললেন আগে যাও আগে যাও। বললাম দেখুন আমি কলকাতায় যাব। একা এসেছি। দোকানদারটা বলল রাত ৮ টায় লাস্ট বাস চলে গেছে। তুমি একটা কাজ কর, চা পাউরুটি খেয়ে শুয়ে পড়। চা খাবার প্রস্তুতি করছি, হঠাৎ ঘরে একটা লাইট আসছে। দোকানদারটি বলল— ‘লরী টরী হবে।’ আমি দোকান থেকে একটু খানি এগিয়ে দেখলাম নামখানা-ধর্মতলার একটি সরকারি বাস। কনডাক্টর বাসটি দাঁড় করাল। উঠে পড়লাম। উঠে পড়ে অবাক হয়ে দেখি বাস কন্ডাক্টর, ড্রাইভার এবং জনা চার যাত্রী, সবাই কাদামাখা। জিজ্ঞাসা করলাম— এটা কি ধর্মতলায় যাবার লাস্ট বাস যেটা রাত ৮ টায় ছেড়ে আসার কথা? ওরা উত্তরে বলল হ্যাঁ, এটা লাস্ট বাস। জানতে চাইলাম এত রাত হওয়ার কারণ কি? তখন বাস ড্রাইভার বলল— আমরা সময়মত আসছিলাম কিন্তু নামখানা থেকে কিছুটা দূরে আসার পর একটা লরীকে সাইড দিতে গিয়ে আমাদের গাড়ীর চাকাটি মাটিতে বসে যায়। আমরা সকলে মিলে তুলে এই আসছি।🍁 (লেখাটি অংশ বিশেষ নেওয়া হল। লেখকের বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।) >সীতারাম লীলা মাধুরী | সারথি নিমাই

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস

 

কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় এর ধারাবাহিক উপন্যাস
বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

 

৬.

ছবিদের গানবাজনা 

রাতের অন্ধকার ভেদ করে ভোর নামল। শীতের কুয়াশা গায়ে মাখা শহরটা তখনো আধো ঘুমে ডুবে। হিরণ্য জানলার পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল। ঘুম তার চোখে তেমন আসেনি। সারারাত ধরে মনের ভেতরে কোনো এক অদ্ভুত সঙ্গীত বাজছিল। মনে হচ্ছিল, শব্দগুলো তার ভেতরে চাপা থেকে আবার বাইরে বেরোতে চাইছে। আলমারির পুরনো ড্রয়ার খুলতেই দেখা গেল, কাগজের স্তূপ। হলুদ হয়ে যাওয়া খাতা, যার পাতায় মলিন কালি দিয়ে লেখা কবিতার লাইনগুলো এখনো জেগে আছে। দীর্ঘদিন ধরে সে এগুলোকে ছুঁয়েও দেখেনি। এখন অবাধ্য পা যেন তাকে বাধ্য করল ড্রয়ার খুলতে।

শব্দগুলো হিরণ্যর কানে বাজতে থাকল। সে জানত, এই মেয়ে তার জীবনে কিছু একটা নতুন দিক এনে দিচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে বুকের গভীরে অরুণিমার মুখও ভেসে উঠছিল। দুই নারীর মুখ যেন একে অপরের উপর ছাপ ফেলছিল। একজন অতীত, অন্যজন বর্তমান।

একেকটা পাতার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এগুলো যেন তার নিজের নয়, অন্য কারো লেখা। হয়তো এক ভিন্ন হিরণ্য, যে আজ আর নেই।
কাগজের পাতায় লেখা:
“তুমি নেই, অথচ তোমার ছায়া হাঁটে
আমার অবাধ্য পায়ের ভেতর দিয়ে।” লাইনটা পড়ে তার বুক কেঁপে উঠল। এ কবিতা লিখেছিল সেই সময়ে, যখন অরুণিমার খবর এল তার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। সেই দিনের যন্ত্রণায় লেখা। শব্দগুলো এখনও তাজা।চায়ের ধোঁয়া চোখের সামনে ভেসে উঠতেই মনে হল অরুণিমা যেন দাঁড়িয়ে আছে। চোখে সেই মৃদু হাসি, ঠোঁটের কোণে মায়া। কানে বাজল সেই কণ্ঠ, “আমাদের ছবিগুলো মুছে দিও, মেসেজগুলোও। পারলে আমাকে ব্লক করে দিও।”
হিরণ্যর বুকটা টনটন করে উঠল। সত্যিই কি সবকিছু মুছে ফেলা যায়? অবাধ্য পা কি কখনো মুছে ফেলতে পারে কোনো পথের স্মৃতি? সেদিন সন্ধ্যেয় সৌম্য ফোন করল। কেমন আছিস রে? কালকে তোকে দেখে মনে হচ্ছিল অন্যরকম। হিরণ্য হেসে বলল, হ্যাঁ, অনেকদিন পর এমন পরিবেশে গিয়ে ভালো লাগছিল।সৌম্য চুপ করে থেকে আবার বলল, মীরা তোকে নিয়ে কথা বলছিল। বলছিল, তুই যেন আবার লিখিস। তোর কবিতা শুনে ও খুব আলোড়িত হয়েছে। মীরা! নামটা শুনেই বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল। অরুণিমার ছায়ার ভেতর থেকে মীরার মুখ যেন ভেসে উঠল। চোখে সেই জিজ্ঞাসা, “তুমি কি লিখতে পারবে আবার?”
পরদিন টিউশনের ফাঁকে হিরণ্য নিজেকে সামলাতে পারল না। খাতার কোণে লিখে ফেলল কয়েকটি লাইন। ছাত্ররা মন দিয়ে সমীকরণ কষছিল, আর সে অন্য সমীকরণে মগ্ন হয়ে লিখল,
“যে গান একদিন থেমেছিল
আজ আবার বাতাসে বাজে।
অপরিচিতা এক মুখে লেগে থাকে
পুরনো দিনের অমোঘ ছায়া।”
লিখে ফেলার পর বুকটা হালকা লাগল। মনে হল, অবাধ্য পা আবার তাকে সেই পথে ঠেলে দিচ্ছে, যে পথ থেকে সে বহু বছর আগে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
সন্ধ্যেবেলা কবিতা কর্নারে গিয়ে দেখা হলো মীরার সঙ্গে। সৌম্য ইচ্ছে করেই তাদের পরিচয় করিয়ে দিল। মীরা খুব সহজভাবে হাত বাড়িয়ে বলল,
আমি আপনার লেখা কবিতা গেয়েছি, জানেন? অনেকেই আমাকে বলেছে, ওই কবিতাটা নাকি একসময় আপনারই লেখা।
হিরণ্য অবাক হয়ে তাকাল।
—তুমি কোথায় পেলে সেটা?
মীরা মৃদু হেসে বলল,
—সৌম্যদা দিয়েছে। বলেছে, কবিতার সঙ্গে গান মিশিয়ে দেখো। আমি তাই করেছি।
শব্দ শুনে হিরণ্যর বুকের ভেতর হাহাকার ভেসে উঠল। যে শব্দ সে নিজেই ভুলতে চেয়েছিল, সেই শব্দ অন্য কারও কণ্ঠে ফিরে এলো। আর তাতেই যেন তার আত্মা জেগে উঠল।
তাদের কথোপকথন ধীরে ধীরে গাঢ় হল। মীরা বলল,
—আপনি কেন আর লেখেন না? আপনার মধ্যে তো এখনো আগুন আছে। আমি গেয়েই বুঝেছি, আপনার শব্দ নিছক শব্দ নয়, ওরা গান হয়ে যায়।
হিরণ্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কিছু আগুন একসময় ছাই হয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম আর কিছু নেই।
মীরা মাথা নাড়ল,
—না, আগুন মরে না। ওটা কেবল ছাইয়ের নিচে লুকিয়ে থাকে। কেউ না কেউ এসে আবার ফুঁ দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।
শব্দগুলো হিরণ্যর কানে বাজতে থাকল। সে জানত, এই মেয়ে তার জীবনে কিছু একটা নতুন দিক এনে দিচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে বুকের গভীরে অরুণিমার মুখও ভেসে উঠছিল। দুই নারীর মুখ যেন একে অপরের উপর ছাপ ফেলছিল। একজন অতীত, অন্যজন বর্তমান।
সেদিন বাড়ি ফিরে হিরণ্য প্রথমবার কবিতা লিখতে বসল। দীর্ঘ বিরতির পর কলম যেন কাঁপছিল তার হাতে। কিন্তু অবাধ্য পা আবার তাকে টেনে আনল। সে লিখল,
“আমি জানি না, তুমি কে-
অতীত না বর্তমান,
ভুল না সত্যি,
কিন্তু আমার পা তোমার দিকেই হাঁটে।”
লিখতে লিখতে তার চোখ ভিজে উঠল। মনে হল, এ কবিতা কেবল মীরার জন্য নয়, অরুণিমার জন্যও, আর নিজের জন্যও।
রাত গভীর হল। জানলার বাইরে কুয়াশা জমল। হিরণ্য চেয়ারে বসে রইল, হাতের নিচে খোলা খাতা। মনে হল, পায়ের অবাধ্যতা আসলে কোনো শাস্তি নয়, এ এক আশীর্বাদ। কারণ এ অবাধ্যতাই তাকে আবার ফিরিয়ে আনছে জীবনের দিকে, কবিতার দিকে, ভালবাসার দিকে। 🍁(চলবে)

 

 

🍂কবিতা 

 

 

অমিতাভ মুখোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

Illustration হে নীরব তোমাকেই ভাবি, প্রকাশ্যে 

রাতগুলো এখন আর ঘুম ডেকে আনে না
শুধু জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ভাবি
তুমি থাকলে কেমন হতো এই নীরবতা!
হয়ত হালকা বিনুনির ভেতর তোমার মুখটা জ্বলজ্বল করত
হয়ত তুমি চুপ করে আমার পাশে বসে থাকতে।

ভালবাসা এখন আমার কাছে
একটা অপেক্ষা
যার শেষ নেই, শুরুও নেই।
তুমি যেন ফুটন্ত জ্যোৎস্না
ছোঁয়া যায় না, অথচ রশ্মি দাও আমার বুকের ভিতর।

আমি লিখি না এখন,
কিন্তু তোমার কথা এলেই কাগজে ভেসে ওঠে কিছু শব্দগুঞ্জন
তোমার হাসি, তোমার চোখ,
আর কিছু অসমাপ্ত লাইন…
ওই সেখানে প্রতিটি শব্দে আমি
আর প্রতিটা বিরতিতে তুমি-

তুমি জানো,
মানুষ আসলে একবার অথবা নিদেনপক্ষে দু’বার সত্যি ভালবাসে–
বাকি সবই অভ্যাস, ভুলে থাকার চেষ্টা।
আমি সেইখানেই আটকে আছি,
তোমার নামের মতোই, ঘ্রাণের পাশে, নিঃশব্দে।

 

 

সোমনাথ আচার্য -এর তিনটি কবিতা

অপ্রকাশ্য ও নিকটে

প্রতিদিন ভেতরে নামে অচেনা স্থিরতা
যার উৎস খুঁজে পাই না, তবু সে থাকে নিরবধি
চোখের গভীরে জমে থাকা নিঃশব্দ প্রতীক্ষা
কখনও কখনও রূপ নেয় দীর্ঘ স্বপ্নে।

স্পর্শহীন সান্নিধ্যে শব্দ থেমে যায়
সময়ের মানে হারায় নিজের সংজ্ঞা
কোনও গোপন সত্তা ছুঁয়ে যায় ভেতরকে
যেন শ্বাসের ভেতর অন্য এক জীবন জেগে থাকে।

প্রেম এই নিঃশব্দ স্বীকৃতি
নাম নেই, প্রতিশ্রুতিও নয়, শুধু টান-

একবার জেগে উঠলে আর নিভে না কখনও।

সেই টানের ভেতরেই অস্তিত্ব ও রহস্য
যেখানে আমি ও বিশ্ব একই সুরে মিশে যাই
অদৃশ্য, অথচ সম্পূর্ণ, অপ্রকাশ্য শূন্যে

 

অস্তিত্ব ও অন্তরাবর্তী

সব প্রশ্ন একসময় থেমে যায়
শুধু দৃষ্টি থাকে, গভীরে লুকিয়ে থাকে পথ, অন্তরের সূচনার রুটম্যাপ

যা মেলে না, অঙ্কের মতন
তাতেই দাঁড়াই স্থির, যা হারায়
তা-ই থেকে যায় সবচেয়ে গভীরে কোথাও
এটা বুঝতে হবে

স্পর্শের বাইরে থেকেও সত্তা ছুঁয়ে থাকে নীরব
বাতাসে, জলে, দাবীহীন উপস্থিতি নিঃশব্দে।

ভালবাসা, উচ্চারণ না প্রতিশ্রুতিও না
শুধু অদৃশ্য টান, একবারই জেগে ওঠে
তারপর আর কখনও ঘুমোয় না

বোঝো। বোঝা দরকার, বোঝা যায়ও
হারানোও প্রাপ্তি, নিঃশব্দই ভাষা,
অপ্রকাশ্যই সবচেয়ে সত্য স্তম্ভ

জানতে হবে সেটা

 

শান্ত, শূন্য, স্থিরতা 

নিঃশেষে থেমে যায় ধ্বনি।
আছে নিঃশ্বাসের আভাস
অচেনা সীমারেখা ছুঁয়ে।

সময়ের পরিধি হারাল কী দিশা!
অস্তিত্ব গলে যায় অনন্তে।
সব রূপ মুছে গিয়ে জন্ম
এই নিরাকার স্পন্দন।

মনে স্বচ্ছতা, আছি, অথচ নেই।
এই তো স্পর্শহীন অনুভব
ভাসে অদৃশ্যের প্রান্তে…
কিছু নক্ষত্র ঝরে যায় নির্বিকার।

টিকে থাকে, শুধু টিকে থাকে
নির্দিষ্ট স্থিরতা : নিঃশব্দ, অবিচল, পরিপূর্ণ।

আমাকে গিলে খাবে? খাও।

 

 

রেহানা বীথি -এর একটি কবিতা

সান্নিধ্য 

মাঝে মাঝে যাঁরা চাঁদের শহরে সান্ধ্যভ্রমণে যান
তাঁদের কাছে গল্প শোনার ইচ্ছে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকি
এতটাই চুপচাপ, যেন আমার নিঃশ্বাসের শব্দ
তাঁদের ভ্রমণতরঙ্গে কোনও আঘাত না করে
এতটাই বিস্ময়াভিভূত, যেন আমি নিতান্তই এক শিশু

অথচ আমি
সেই এক লালমাটির পথে
উড়িয়ে এসেছি শৈশব কৈশোর
এবং এখনও, উড়িয়ে দিচ্ছি তুমুল যৌবন…

তবু যাঁরা চাঁদের শহরে সান্ধ্যভ্রমণে যান
নিঃশব্দে বসে থাকি তাঁদের সামনে…

 

 

মৃণালকান্তি দাশ -এর একটি কবিতা

নিঃশর্ত 

আমার সত্যিকার অর্থে কোনও প্রেম ছিল না।
ছিল কিছু ছায়া, কিছু মুহূর্তের স্পর্শ
ছিল ভিড়ের মধ্যে হাসির অভিনয়,
কিন্তু ভালবাসা- না, ছিল না কখনও

ভালবাসা মানে তো নিঃশর্তে পাশে থাকা
ওখানে স্বপ্নও নিশ্চুপ থাকে
যেখানে কারও চোখে লুকিয়ে থাকে আশ্রয়
না বলেও বোঝা যায়, কিছু নিঃশব্দ উচ্চারণ

আমি খুঁজেছি বহু মুখে
দেখেছি- অনেকেই আসে ক্ষণিক ঝড়ের মতো
কেউ ভালবাসে সুবিধার জন্য
কেউ ভালবাসার অভিনয় করে প্রয়োজনের মতো।

আমার ভিতর একটা আশা বেঁচে আছে-
একদিন হয়ত তোমায় পাব ঠিক
যার সামনে মুখোশ খুলে নির্ভয়ে বলব
এই আমিটাকেই ভালবাসো, বুকে গুঁজে নাও।

 

 

প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

সন্ধ্যা

কোমল স্পর্ধায় নুয়ে আসে সন্ধ্যা।
এক এক করে জ্বলে ওঠে মায়া-আলো।
প্রতি ঘরে স্তব জমে ওঠে, তবু মন্ত্রভ্রম হয়।

দাম্পত্য এক রহস্য উপাখ্যান।
বাণ ভাসিয়ে খরা আসে।
নদীর কোলে পুজো নামে,ভাসে বেহুলার ভেলা।

নবজন্মের লোকগাঁথায় বিশ্বাস ক’রে ইচ্ছে হয় সমর্পণের জ্যোৎস্না মাখতে।

সকল উপাচার নিয়ে ক্ষতচাঁদ
জলে ভেসে থাকে,
অথচ যেদিন গেছে হৃদয়ের সন্ধ্যায়, সে আর ফেরে না।

 

 

সোমপ্রভা বন্দোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

লবণ

যে মেঘ কথা দিয়েছিল বৃষ্টি ডাকার তার ভেঙে গেছে ঘর, মাটির দাওয়া গলিয়ে ফুঁসে উঠেছে স্রোত, লাঙ্গল চষতে কারা যেন এফোঁড় ওফোঁড় করেছে বুক, সেখানেই লাল রঙা নদী জেগে তোড়জোড় করছে শান্তির পতাকা ওড়াতে।

এসব আবোলতাবোল শেষে বাদল হয়েছিল ঢের
যেন এক দৈত্য কালো মেঘের ছলে গিলে খাবে অভিশপ্ত সভ্যতার শেষ মাসটুকু, এক বুক ফাটা কান্না ভরিয়ে তুলেছিল গলুই, তারপর সেসব ছেঁচতে ছেঁচতে বেঁকে গেছে কোমর, এখন ওই ভাতাটুকু সম্বল করে খিদে থালায় জেগে থাকে চাঁদ, সেখানেই একসাথে লবণ ভাত খেতে বসে জাতধর্ম।

 

 

রোকসানা রহমান -এর একটি কবিতা

আমি গর্বিত নারী 

‎আমি সেই নারী, পৃথিবীর সুরভিত হাওয়া
‎ভোরের স্বচ্ছতার কোমল রূপের কল্পনার
‎উন্মোচনকারীনি।
‎ঈশ্বর পাঠিয়েছেন মানুষ করে, তাই সঁপে দিয়েছি তোমার হৃদয়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছুরিত আলোয় আমার আত্মা।
‎ঈশ্বর নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন আমার স্নায়ুকে, গেঁথেছেন অনন্যরূপে।
‎আমি তোমারই স্বপ্ন, এঁকেছিলাম ফসলের মাঠ, বহন করেছি আমার চেনা শরীরের ভিতর আস্তে-আস্তে বেড়ে উঠেছে আশ্চর্য একটি চারা
‎গাছ, বিস্তৃত করে চলছে তার শাখা-প্রশাখা
‎আমার অহংকার নারী হয়ে জন্ম নেবার অপূর্ব অনুভূতির।
‎এই যে আমি নারী বলেই তোমাদের আকাশে উড়তে শিখেছি কল্পনার ডানা মেলে ঈগলের মতন।
‎ঈশ্বর আমাকে শিখিয়েছেন ভালোবাসতে,
‎গর্বিত করেছেন, আনন্দময়ী করে তুলেছেন আমার নারী সত্তাকে…!

‎আমি সেই নারী পাহাড়ের নীচে বয়ে যাওয়া উচ্ছ্বল নদী, কখনো দমকা বাতাসে চন্দন সৌরভের তীব্র অগ্নি, তোমার রাতকে উষ্ণ করি, কোমল স্পর্শময়ী হাতে, আগ্নেয় আলোকে উজ্জ্বল করি তোমার অন্ধকার। সেই আলো তোমার দেহের প্রলম্বিত আবেগের ভিতর ছুঁয়েছো স্পর্শময় শরীর , ভালোবাসার মধুর আলিঙ্গনে।
‎অথচ তোমরা পরিবর্তন করে ফেলো প্রকৃতির
‎রূপের ভিতর ঈর্ষার ঝড়।
‎আমি গ্রহণ করি কল্পনার রঙে আঁকা অনুভূতির
‎স্পন্দনে শ্বাস নেয় আমাকে আঁকড়ে ধরে।
‎আমি হাঁটি বিস্তির্ণ কর্দমাক্ত পথে পৃথিবীর ত্রাসের ভিতর দুঃখ-কষ্ট কে অতিক্রম করে
‎বসত করি স্মৃতিবৃক্ষে,
‎আমি যে নারী এবং ঈশ্বরের অপার সৃষ্টি
‎তোমার অন্ধকার, স্বপ্নের তৃষ্ণাকাতরতার আলোকপাত্রের পূর্ণতার এক সেরা নারী–
‎সুশোভিত করি তোমার ক্লান্ত রাতকে, তুমি পাঠ করো প্রেমময় মগ্ন পাতার গ্রন্থ।
‎আমি গর্বিত এক নারী, আমাকে সৃষ্টি করেছেন আলোকময় পৃথিবীতে স্বর্গীয় অনুভূতি ও ভালোবাসার ঐশ্বর্যময়ী রূপে।
‎আমি ঈশ্বরের সৃষ্টির গর্বিত সৃষ্টি বলেই
‎প্রখর রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকি মাথা উঁচু করে।

শুভমিতা -এর একটি কবিতা

ভালোবাসাবাসি খেলা

আমার তোমার ছোট্ট ফুলের ঘর
পান্তা নুনে ঝগড়া চুলোচুলি
আমার তোমার রান্নাবাটি খেলা
সোনার খাঁচায় ছোট্ট বুলবুলি

আমার তোমার এক কাপ চায়ে ভোর
তোমার যেনো সবেতেই বাড়াবাড়ি
একটা গামছা টানাটানি হয় রোজ
দিনের মধ্যে একশোবার আড়ি

আমার পছন্দ মাংস আর ভাত
তোমার আবার মাছের ঝোল চাই
যুদ্ধ চলে প্রতিদিন খেতে বসে
তবুও তোমায় ছাড়া জীবন নাই

ঝগড়া শেষে হাওড়া ব্রিজে পাশাপাশি
হাতভর্তি সূর্যমুখীফুল
আমরা দুজন ভালবাসাবাসি

তোমার বুকে উড়ে যায় খোলাচুল

 

 

বিশ্বজিৎ মণ্ডল -এর একটি কবিতা

সেনোরিটা, ভালবাসার এক উপত্যকা

১.
কলেজ চত্বরের প্রবল প্রণয়ের দুপুরে তোমাকে খুঁজেছি সেনোরিটা
ক্যাম্পাস ভেঙে হৈহৈ ছুটে গেছে, তোমাকে আঁকা সংলাপ
বাঙালিয়ানার মোক্ষম হার্টথ্রব তুমি
সবাই ছুঁতে চায়, তোমার সুগন্ধি রুমালের স্পর্শ

অথচ ক্যাম্পাসে আমি একা দাঁড়িয়ে ভিজে গেছি, মানসিক আতঙ্কে সম্পৃক্ত হয়ে
লাইব্রেরী রুমের শান্ত টেবিলে সাজিয়ে রেখেছিলাম
তোমাকে লেখা, আমার থার্ড ইয়ারের প্রথম দুর্বলতা

২.
আজ আমি কলেজ লাইব্রেরীর টেবিল মোছার পিওন…

সেই জ্বলন্ত দুপুর নেই, নেই ক্যাম্পাসের কোন উত্তাপ,
নেই অলিন্দে হাঁটা তোমার সহচরীর দল

সেনোরিটা এখন, ভালবাসার প্রাক্তন এক উপত্যকার নাম
যা লেখা আছে, ডাইরির গোপন পৃষ্ঠায়

 

 

মিতা নূর -এর একটি কবিতা

সব চিহ্ন মুছে ভুলে যাই

দুপুর তপ্ত রোদের ভিড়ে,
তোর ঠোঁটের ছোঁয়া খুঁজি
খুঁজি বুকের তৃষ্ণার ঘোরে।

কেন এই রুক্ষতার শহরে তবুও,
আজ তুমি দূর, আমি একা’
এতো করে চেয়েও!

ইচ্ছে করে, সব চিহ্ন মুছে ভুলে যাই
আমাদের প্রেম হয়ে ছিল, অবশেষে,
মনের চৌকাঠ ডিঙিয়ে
অভিমান, অপেক্ষা বেরিয়ে আসে।

ধীরে ধীরে থেমে যাই
বদলে যাই,  ঘৃণার রঙে যাই মিশে’
সব চিহ্ন মুছে ভুলে যাই’
কে কাকে’ বেশি ভালবাসে।

 

 

নিলয় রফিক -এর একটি কবিতা


জলের বোতাম

শিমুলতলায় রোদের ঝিলমিল মৈনাক পাড়ায়
প্রকৃতির শব্দসেতুর শিমুলের ডানায় নিলয়
গুপ্তস্মৃতি প্রানখুলে চোখের নজরে ছবি আঁকে
চোখাচোখি তৃপ্তিঢেউ আড়ালে সৌরভ পথে ডাকে

চেঁচামেচি চারপাশে কানকথা পাখির মহলে
লজ্জায় কপালে চোখ অসময়ে বর্ষার মৌসুম
দাবিপূরণের লিপি জলের বোতাম শব্দ-চাবি
পাশকাটিয়ে নিজেকে আত্মমগ্ন ভোরের কুসুম

হুংকারেই মুখরিত আকাশের তারায় প্রচ্ছদ
আকুতি মিনতি নত, সরে ফেলো দেবীর স্বরূপ
শোনেনি মনের কথা ফৌজদারি দাখিলে সমন
ঘুরেফিরে চোরাপথে লাঠিচার্জ শান্তির আলাপ।

 

 

কর্ণালী সরকার -এর একটি কবিতা 

বিশ্বাস

একটা বিশ্বাস জন্মনিয়েছিল।
সেদিন,
তোমাকে আমি পরিষ্কার করেছি!

তোমার এক ডায়ালেই
আমি আমার সাধ্য মত উজাড় করেছি।

সময়ের দিন গোনা শুরু
তারপর আর খোঁজ নেই

অপেক্ষায় আছি,
কবে সেই কথা রাখবে বন্ধু—

 

 

দীপ্তি চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

ঐকতান

এবার বৃষ্টিতে ধুয়ে যাবে বিষাদ পাহাড়
একটি একটি করে কেটে যাবে
সকল বিপদ
সমক্ষে থেকে যারা আনন্দ রস
আস্বাদন করছিল
তাদের জন্য বয়ে আসবে আরও
অপেক্ষাবার্তা
এসব একটির পর একটি জানলা
পেরিয়ে দ্রাঘিমা রেখার জীবনের গল্প নয়
ভাঙাচোরা বুক থেকে উঠে আসা
কিছু আরোগ্য সংকলন
যেখানে পাখি ডাকা ভোর আর নীরব নদীর স্রোতের টানে
স্মৃতিরা প্রাণ খুলে খুঁজে পায়
জীবনের ঐকতান

 

 

শারাবান তহুরা -এর একটি কবিতা

সুর্যোদয় তুমি

বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা শব্দের বুনন হয়ে ঝরে
বরফের মতো জমাট হিম হয়ে থাকা মনটা
নির্জনে কাঁদে নিঃশব্দে সন্ধ্যা তারার মতো
তুমুল বাতাসে উড়ে যায় পাখির পালক
তোমার নাক ছোঁয়া তিলটা কবিতা হয় ক্ষণিকেই
মনের গভীরে সুর তোলে তোমার কণ্ঠের গান
নজরকাড়া অপরূপ রূপ জ্বলে ওঠে
সম্পর্কের বাঁধনে
চিরস্নিগ্ধ সুন্দরের প্রতীক স্মার্ট সুর্যোদয় তুমি।

 

 

প্রিয়াঙ্কা নিয়োগী -এর একটি কবিতা

তুমি কি জানো 

তুমি কি জানো!
তোমার মুখে সেই উদ্দীপ্ততা আছে
যা প্রকাশ পেলে
সবার মুখ উদ্দীপ্ত হবে।

তুমি কি জানো!
তোমার কন্ঠস্বরে
মানুষের শান্তি ও মিষ্টতা
প্রফুল্ল হওয়ার মশলা আছে।

তুমি কি জানো!
তোমার চলা ফেরাতে
সুগন্ধি ছড়ায় চারিদিকে।

তুমি কি জানো!
তোমার কাজে আছে
উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে
ঘুম ভাঙানো নিশি যাপনের উৎসর্গে।

তুমি কি জানো!
তোমার হাসিতে আছে
মন্ত্র জগৎ হাসানোতে
হাসির রাজ্য দাও ছড়িয়ে।

তুমি কি জানো!
জাদু তোমার বাক্যে
মানুষের কষ্ট দুঃখ মোছে।

তুমি কি জানো!
নিজেকে রাখো যেভাবে
তোমাকে দেখলে
প্রকৃতির দোলা হৃদয়ে
মানুষের আনন্দ লাগে।

 

 

গীতা চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

সফেন ঢেউ

গোধূলির অস্তরাগের স্তিমিত আলোয়
তটের কিনারার পদচিহ্নগুলোকে
মুছে দিয়ে যায় সফেন ঢেউ।
মুছে দিয়ে যাবে
আজীবন এমনি করেই
মুছে দিয়ে যায় সব স্মৃতি
নিরবিচ্ছিন্ন খেলায়।

 

 

ছবি ধর -এর একটি কবিতা

মরুতীর্থ, জীবন 

মন খোঁজে মনের মানুষ
আজন্ম খুঁজে না পাওয়ার যন্ত্রণা চেপে
অবজ্ঞায় হাসতে শেখে, ঢোক গিলে ফেলে অকথ্য-
মিছে আশায় বুক বেঁধে অভিনয় করে
নিজে ঠকে জিতিয়ে দেয় তরুণকে
স্বপ্নের কণ্ঠ রোধ করে হর হামেশাই
দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে আপন করে পরকে
বাহুল্য হীন নম্রতায় নিজেকে নিঃস্ব করে
প্রিয় মানুষের মনযোগ চেয়ে
আকন্ঠ পান করে মরুজীবন
বাঁচার লড়াইয়ে হার জিতের পালা শেষে
মুক্তির স্বাদ এনে দেয় মরণ!

 

 

গোলাম কবির -এর একটি কবিতা 

এখন কষ্টের আরেক নাম নীল অপরাজিতা 

তোমার অবহেলা, অবজ্ঞা ও উপেক্ষায়
এক সমুদ্দুর কষ্ট পাবার
জ্বলজ্বলে স্মৃতিচিহৃ ঠোঁটের নিচে
কালো তিলের মতো সেঁটে আছে
আমার বুকের মধ্যিখানে,
যা এখন ছড়িয়ে গেছে
নীল অপরাজিতার ঝাড়ের মতো
সমস্ত হৃদয় জুড়ে!
তাই এখন কষ্টের আরেক নাম
নীল অপরাজিতা!

 

 

 

🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

 

কিশাণঞ্জের ফেলুদা

Kishanganjer feluda
তাপস রায়

২২.

‘গুরু, মানে টানে কিছু নেই, যে জন্য তোমার কাছে এসেছিলাম, মানে সেই মালবাবুর কুকুরকে উদ্ধার করা, তা আমি করে ফেলেছি।’
‘আরে কী বলছ ভাই বোঁদে! হুইস্কি কোথায় পেলে? একটু বেশি হয়ে গেছে নাকি? আমিও খানিকটা মেরে দিয়েছি জানো। আমার রুমের বেয়ারা জোগাড় করে দিয়েছে।
“না না। এক ফোঁটাও খাইনি। তবে গঙ্গারামকে আমি তুলে নিয়েছি। কাল সকালে এখান থেকে বেরিয়ে কিশানগঞ্জে ফিরে ফেলুদার হাতে গঙ্গারামকে তুলে দিতে পারলে আমার শান্তি।’
পঙ্কজ থাপা তেমন করে বুঝে উঠতে পারে না। তার হঠাৎ মনে হয় বোঁদে বিপদে পড়তে পারে। সে জিজ্ঞাসা করে, ‘আচ্ছা, তোমার রুমে কোনো বিড়াল-টিড়াল ঘুমিয়ে নেই তো?’
‘না বিড়াল নেই, তবে কুকুর আছে। গভীর ঘুমে। ডিনারের পর গঙ্গারামকে ম্যাডাম কর্মার ঘরের বারান্দা থেকে তুলে নিয়ে এসেছি। কেউ টের পায়নি। গঙ্গারামের নাক-মুখে ক্লোরোফর্ম স্প্রে করেছি। এখন সে আমার বড় ট্রলি ব্যাগের ভেতর। ব্যাগের চেন অল্প একটু খুলে রেখেছি। কাল সকালে ট্রলি টেনে সিকিউরিটির নাকের উপর দিয়ে বেরিয়ে যাব।’

 

বোঁদের মনে হল, এই শীতের রাতে কী করে ওরা খালি গায়ে আছে!পঙ্কজ দেখে বুঝতে পারল, ঘরে আলো জ্বলার কারণ ক্যামেরা কাজ করছে। একটি মেয়ে আচ্ছন্ন ছেলেটাকে নিয়ে শারীরিক খেলা করার সময় তার হাত টেনে নিজের খোলা বুকের উপর ধরতেই বোঁদের চোখে পড়ে গেল একটা চেনা চেনা কিছু যেন ছেলেটার সাদা চামড়ার উপর লেখা রয়েছে।

পঙ্কজ থাপা দেখল এখন কুকুরটা ফেরৎ দিতে গেলেও বিপদ। কিন্তু সকাল বেলায় যতক্ষণ না পুলিশ ফোর্স সহ উপস্থিত না হয় ততক্ষণ বোঁদেকে লুকিয়ে রাখতে হবে। আর সে জন্য পঙ্কজ নিজে একটা গার্ড বাহিনী বানিয়ে নেবে ভাবল। সে তার গ্যারেজের সিকিউরিটি অফিসার মোহিত লামাকে ফোন করে বলল, সকাল ছটার মধ্যে দশজন গার্ড চাই সিভিল ড্রেসে, ‘হেভেন হোকাস-পোকাস-এ। সঙ্গে আর্মস যেন থাকে।
রাতের ঘুম চটকে গেছে পঙ্কজের। তার রক্তে এখন উত্তেজনা ছুটোছুটি করছে। কুকুর উদ্ধার হয়ে গেছে। কিন্তু স্কুলের ওই ছেলেটাকে তো বাঁচাতে হবে এই গ্যাঙের হাত থেকে। পঙ্কজ ভাল করে বুঝে গেছে এই ডাক্তারকে পাকড়াও করতে পারলে অনেকটা কাজ হয়ে যাবে। পুলিশ সে কাজটা করে দেবে। তার মনে হচ্ছে ম্যাডাম কর্মার সঙ্গে ডাক্তারের সম্পর্ক আছে। না হলে তার কুকুর বেড়ালগুলো কেন এক চোখো! আর কী করে এক চোখো! কেনো কুকুর বেড়ালগুলোকে কানা করে রাখা হয়েছে! অনেকগুলো প্রশ্ন জেগেছে। কাল সকালে এই হেভেনে একটা নাড়াচাড়া পড়বে। ভালমন্দ কী হবে জানে না পঙ্কজ। তবে মাঝ পথে পালিয়ে আসার মানে হয় না। কুকুর উদ্ধার করতে এসে মনে হচ্ছে, আরো অনেক সমস্যা জড়িয়ে আছে এখানে। সমাধান পেলেও পেতে পারে। কিন্তু বিপদও তো আছে। সকালবেলায় কুকুর না পেয়ে ম্যাডাম কর্মা ক্ষেপে গিয়ে নানা কান্ড বাঁধিয়ে দিতে পারেন। এত বড় রিসর্ট চালান, পোশা গুন্ডা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিছু একটা করতে হবে। রাতে ঘুমোলে চলবে না। সকালের জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকাটা ঠিক হবে না।
জ্যোৎস্নায় স্নান করে সাদা মেঘগুলো নেমে এসেছে ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’- এর উপরে। একেবারে অপার্থিব সৌন্দর্য। বোঁদের কুকুর উদ্ধারের উত্তেজনা ওই স্বর্গীয় আবহে থিতিয়ে এসেছে। তার মনে হচ্ছে এ জীবন ধন্য হল। পঙ্কজ থাপার ফোন পেয়ে রুমের বাইরে না বেরোলে তো এই স্বর্গ উপভোগ করা যেত না। ওরা দু’জন অর্কিডের বাগানে কাঠের বেঞ্চে বসেছে। প্রকৃতির এই আশর্য লীলার ভেতর গোটা তল্লাট ঘুমিয়ে আছে কেন!জেগে থাকলে কী এমন অসুবিধে হত একদিন! ঘুমিয়ে থেকে এই অসাধারণ মুগ্ধতা তারা আর কীভাবে পাবে! বোঁদের ভাবনা ভেঙে এবার একটি সিগারেট সহ হাত সামনে এল। পঙ্কজ এর হাত। সত্যি এই ঠান্ডার ভেতর এই সিগারেটের উষ্ণতা জরুরি ছিল। দু’জনে কেউ কথা বলে প্রকৃতিকে বিরক্ত করতে চাইছে না। তবে সিগেরেট ধরিয়ে ওরা দু’জন অনেক্ষন বসে থাকল বাগানে।
গীর্জার ঘড়িতে ঢং ঢং ঘন্টা বাজার শব্দ এই নিস্তব্ধতার ভেতর বেশ জোড়ালো আর তন্ময়তা ভাঙাতে যথেষ্ট। পঙ্কজ ফিসফিস করে বলল, ‘রাত দুটো বাজে। কেউই জেগে নেই। চলো, সবচে উঁচু ধাপে উঠে আমরা নিচের দিকটা দেখব। মানে ম্যাডাম কর্মার বাড়ির নিচে জঙ্গলের ভেতর পাহাড়ের ওই ঢালের ঘর বাড়িগুলি যদি দেখা যায়। চলো দেখি। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে , বলব জ্যোৎস্নায় পাহাড়ের রূপ দেখতে বেরিয়েছি।’
সবচে উঁচু ধাপে ডাইনিং হল ‘অর্কিড’ এর সামনে যেখানে ‘ বন ফায়ার’ হয় প্রতি রাতে, সেখানে তখনও ছাইয়ের ভেতর অল্প আগুনের লাল। এখানেই ঘন্টা তিনেক আগে গোল হয়ে বসে এই রিসর্টের সব অতিথিরা ডিনার করেছে। বোঁদে উত্তেজিত হয়ে পঙ্কজের হাত ধরে ‘অর্কিডের’ পেছনে হালকা সবুজ রঙের টিনের ছাউনি দেয়া কটেজের সামনে এল। এখানেই দরজার সামনে শুয়ে ছিল গঙ্গারাম। এখান থেকেই বোঁদে তুলেছে কুকুরটাকে। পঙ্কজ থাপা ওই সবুজ রঙের চালার পেছনে আরো অনেকগুলো কটেজ দেখতে পেল। তার একটা কটেজের কাচের জানালা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। জ্যোৎস্নায় অর্কিড বনের ভেতর পায়ে হাঁটা পাহাড়ের প্রতিটি ধাপই পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। সব রাস্তাই ছোটো ছোটো আর টুকরো পাথরে বাঁধানো। তিন চারটে ধাপ নামতে হল। সামনের হাঁসেদের খোঁয়ার, কোথাও মুরগির খোঁয়ার। আর যে রুমে আলো জ্বলছিল তার কোণের দিকে দেখা যাচ্ছে সাদ রঙের চার-পাঁচটা শুয়োর শুয়ে আছে। জ্যোৎস্না একেবারে দিনের বেলার মতো করে রেখেছে রাতকে। পঙ্কজের মনে হল, এগুলো সব সার্ভেন্ট কোয়াটার। মানে রিসর্টে যারা কাজ করে, তারা থাকে এখানে। বনের পথে নামতে নামতে চোখ সরায়নি ওই আলো জ্বলা ঘরটি থেকে। সামনের দিক দিয়ে না গিয়ে পঙ্কজ ঘরের পেছন দিকে রাবার গাছ, পাইন গাছ আর ফার্ণের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঘরের জানালায় চোখ রাখল। পঙ্কজ তার অভিজ্ঞতায় জানে কাচের জানালায় সাদা ফুলকারি নক্সার পর্দা থাকলেও তা কোনের দিকে তেমন টানা থাকে না। কোণের দিক দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখা যেতে পারে। সেখানে চোখ ফেলে সে চমকে উঠল। বোঁদেকে ডাকল হাতের ইশারায়। বোঁদের চক্ষু চরকগাছ। দু’জন মেয়ে আর একটা প্রায় বাচ্চা, সবে গোঁফের রেখা উঠেছে, ছেলে পুরোপুরি নগ্ন। নানা ভাবে অঙ্গ-ভঙ্গি করছে মেয়ে দু’টি। নাচ করছে নাকি। তবে কি লুকনো ক্যামেরা চালু আছে! ভিডিও তৈরি হচ্ছে! ছেলেটা কিন্তু ঢুলছে। চোখ খোলা রাখতে পারছে না। তবে হাসছে। বোঁদের মনে হল, এই শীতের রাতে কী করে ওরা খালি গায়ে আছে!পঙ্কজ দেখে বুঝতে পারল, ঘরে আলো জ্বলার কারণ ক্যামেরা কাজ করছে। একটি মেয়ে আচ্ছন্ন ছেলেটাকে নিয়ে শারীরিক খেলা করার সময় তার হাত টেনে নিজের খোলা বুকের উপর ধরতেই বোঁদের চোখে পড়ে গেল একটা চেনা চেনা কিছু যেন ছেলেটার সাদা চামড়ার উপর লেখা রয়েছে। হ্যাঁ মনে পড়ে গিয়েছে। দিলীপ এর সঙ্গে রাতের বেলায় যখন মোবাইল ট্যাপ করে ভিডিও কল রেকর্ড করছিল তখন দেখেছে এই লেখা।
বোঁদে ভাবল, এইটা কি সেই ছেলেটা হবে! তা সে এখানে কী করবে! সে তো গ্রাহামস-এর রেসিডেন্সে থাকবে! বোঁদে পঙ্কজকে দেখাল। পঙ্কজ বুঝে ফেলেছে। ছেলেটাকে হেরোইন দিয়ে এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। আর ছবি তুলছে পর্ণ সাইটের জন্য। মেয়েগুলো নিশ্চই দেহজীবী। কিন্তু ওই বাচ্চা ছেলেটাকে ওরা ব্যবহার করছে কেন! এখানে আর থাকা ঠিক হবে না। তবে এই ঘরটাকে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। দিনের বেলায় যাতে চিনতে পারে। পঙ্কজ দেখল ঘরের এক পাশে সাদা শুয়োরের খোঁয়াড়। অন্যগুলিতে ছিল, হাঁস বা ছাগলের খোঁয়াড়। তাও বাড়ির সামনের দিকে এসে মোবাইলে একটা ছবি তুলল।🍁 (চলবে)

 

 

 

🍂ল্প 
দেব বুঝতে পারে, ঘরটা এখন তার নয়, তাদেরও নয়। এটা সেই শিল্পীর, যিনি প্রতিবার প্রেম জন্মালে, কোনও না কোনও দম্পতির নিঃশ্বাসে নতুন ছবি আঁকে। সে ধীরে দরজা খোলে। বাতাস ঢুকে পড়ে ঘরে, ছবির দিকে, জেমির মুখে। বাতাসের সঙ্গে এক অদৃশ্য হাসি ভেসে ওঠে।

 

ঙের ঘ


সানি সরকার

যোধপুর পার্কের সেই গলিটা একেবারে যেন সময়ের বাইরে। রাস্তার পাশে পাতা ঝরে আছে, গাছের শিকড় উঠে এসেছে ফাটল ধরা ইটের ওপর। বিকেলের সূর্য সেখানে ঢোকে, কিন্তু আলো পৌঁছায় না পুরোপুরি।
যেন সময়ের মাঝখানে আটকে আছে সেই জায়গাটা। সেই গলির শেষেই দাঁড়িয়ে এক পুরনো তিনতলা বাড়ি। দ্বিতীয় তলার জানালা বন্ধ। বারান্দায় শুকনো ধুলোর আস্তরণ। রেলিংয়ে শেওলা। দরজার ওপরে এক নামফলক, লেখা, … B. Basu । অর্ধেক অক্ষর মুছে গিয়েছে। তিনি কে ছিলেন?
শোনা যায়, এক শিল্পী! হয়ত চিত্রকর, হয়ত ভাস্কর।
আর অনেক বছর ধরে এই ফ্ল্যাট বন্ধ। সেই বন্ধ দরজা একদিন খুলে গেল। চাবিটা ঘুরিয়ে খুলছিল দেব।
তার পাশে দাঁড়িয়ে জেমি। কালো কুর্তি, চোখে নরম কৌতূহল। দরজা খুলতেই ঘরের ভেতর থেকে এক পুরনো বাতাস বেরিয়ে এল। ধুলো, তেলরঙ, অব্যক্ত গন্ধ মিশে এক অঅন্যরকম অনুভূতি তৈরি করল, যেন ঘরটা নিঃশ্বাস ফেলল বহুদিন পর।

রাত। জেমি ঘুমতে পারছে না। দেবের নিঃশ্বাস ধীরে উঠছে-নামছে। জানালার বাইরে শহর ঘুমচ্ছে। দেওয়ালের ছবিগুলোর ওপর দিয়ে এক ফিকে নীল আলো বয়ে যাচ্ছে, কোথা থেকে আসছে বোঝা যায় না। জেমির মনে হল, ছবিগুলো নড়ছে। একটি ছবিতে একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে পিঠ ফিরিয়ে, নগ্ন, কাঁধে আলো। আলোটা নড়ল। যেন কেউ আলত করে শ্বাস ফেলল ছবির মধ্যে। এগিয়ে গিয়ে ছবিটা ছুঁল।

জেমি ধীরে ভিতরে পা রাখল। চোখে বিস্ময়, যেন কোনও গোপন মিউজিয়ামের দরজা খুলে গিয়েছে।
দেব বলল,
—এতদিন কেউ ছিল না এখানে।
জেমি নিচু গলায় বলল,
—তবু মনে হচ্ছে কেউ এখনও আছে। তাই না?
দেওয়ালে রঙের দাগ, শুকনো প্যালেট, মেঝেতে পড়া পুরনো ক্যানভাস।
এক কোণে অসমাপ্ত মূর্তি, প্লাস্টার শুকিয়ে শক্ত হয়েছে।
একটা ছবি ঝুলছে। এক নারীর মুখ, চোখ নেই, শুধু ঠোঁটের ছায়া। দেব টেবিলের ওপর একটা কাচের বোতল তুলে নিল। বোতলের ভিতরে শুকিয়ে যাওয়া তেলরঙ জমে আছে। গাঢ় নীল স্তর।
সে বলল,
—দেখ, সময়ও এখানে শুকিয়ে গিয়েছে।
জেমি হাঁটছে ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে। তার পদচারণে ধুলোগুলো জেগে উঠছে।মনে হচ্ছে সে কোনও শব্দ না করেই কোনও এক সুর তৈরি হচ্ছে। ওর চোখ থামল এক মূর্তির সামনে।
নারীমূর্তি। আধখানা মুখ।
দেখলে মনে হয়, চোখ বন্ধ, কিন্তু ঠিকমতো দেখলে বোঝা যায়, চোখের কোণে আলো আটকে আছে।
এমন আলো, যা কেবল জীবন্ত চোখেই জমে থাকে।
জেমি বলল,
—এটা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
দেব মৃদু হেসে বলল,
—শিল্প সবসময় জীবনের প্রতিস্থাপন।

এই ফ্ল্যাটটি নিয়েছে ভাড়ায়। হায়দরাবাদের চাকরি ছেড়ে, নিজেদের এক নতুন শুরু স্টার্টআপ ArtNest চালু করবে। একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে স্বাধীন শিল্পীরা তাদের কাজ বিক্রি করতে পারবে, কোনও কর্পোরেট ফিল্টার ছাড়াই।

দেবের মনে হয়, প্রযুক্তি ও শিল্পের এই যুগলবন্দী এক বিপ্লব। জেমির মনে হয়, নতুন শিল্পচেতনা। কিন্তু নতুন শুরুটা হঠাৎ এই ঘরে এনে ফেলার মধ্যে যেন এক অজানা টান ছিল।
জেমি প্রথম দিনই বলেছিল,
—এ ঘরে কেউ বাস করত, এখন আমরা হয়ত কেবল অতিথি।
দেব বলেছিল,
—অতিথিও তো অনেক সময় ঘরের আত্মা খুঁজে পায়।

প্রথম ক’য়েকদিন ওঁরা ফ্ল্যাটটির চতুর্দিক শুধু পরিষ্কার করল। জানালা খুলে দিল, পর্দা বদলাল, বাতাস ঢুকল ভেতরে। ঘরটা ধীরে ধীরে নিজের রঙ ফিরিয়ে আনল।জেমি একদিন বারান্দায় বসে আঁচল পেতে বসে চা খাচ্ছিল। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, গাছের পাতায় আলো পড়ছে সোনালি। দেব বলল,
—এই ঘরে আলোটা অন্যরকম।
জেমি বলল,
—তুই সবকিছুতেই ব্যাখ্যা খুঁজিস।
দেব হেসে বলল,
—এই ঘরের আলোয় মানুষ বদলে যায়। দেখিস, তুই-আমি দু’জনেই বদলে যাব।
জেমি হাসল, কিন্তু হাসির ভেতরে যেন একটা ছায়া। ঘুরছে।

রাত। জেমি ঘুমতে পারছে না। দেবের নিঃশ্বাস ধীরে উঠছে-নামছে। জানালার বাইরে শহর ঘুমচ্ছে। দেওয়ালের ছবিগুলোর ওপর দিয়ে এক ফিকে নীল আলো বয়ে যাচ্ছে, কোথা থেকে আসছে বোঝা যায় না। জেমির মনে হল, ছবিগুলো নড়ছে। একটি ছবিতে একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে পিঠ ফিরিয়ে, নগ্ন, কাঁধে আলো। আলোটা নড়ল। যেন কেউ আলত করে শ্বাস ফেলল ছবির মধ্যে। এগিয়ে গিয়ে ছবিটা ছুঁল।
রঙ শুকনো, কিন্তু স্পর্শে যেন উষ্ণতা। ঠিক তখন দেব ঘুম ভেঙে বলল,
—তুইও দেখছিস?
জেমি তাকাল, চোখে প্রশ্ন!
দেবের মুখে বিস্ময়, ভয়, আকর্ষণ, তিনটিই।
—এই আলোটা আগেও ছিল?
—না জানি না… হয়ত আমরা কল্পনা করছি।
—না, ঘরটাই আমাদের দেখছে…

পরদিন দেব ল্যাপটপে কাজ করছিল। জেমি বসেছিল জানালার পাশে। ওরা কথা বলছে না, তবু দু’জনের মধ্যেই এক অদৃশ্য স্রোত বয়ে যাচ্ছে। জেমিই বলল,
—তুই জানিস, এই ঘরে শব্দ নেই, কিন্তু প্রতিধ্বনি আছে।
দেব বলল,
—কোন শব্দের?
—স্পর্শের।
দেব হাসল, তুই যেন কবিতা লিখছিস। জেমি বলল, শিল্প ছাড়া আমরা বাঁচব কীভাবে বল!
সেই রাতে তারা একে অপরকে ছুঁল। একদম নিঃশব্দে। ঘরটা অন্ধকার, কিন্তু জানালা দিয়ে নীলচে আলো ঢুকছে। তাদের শরীরে সেই আলো লেগে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে তারা রঙে পরিণত হচ্ছে। দেবের হাত জেমির গলায়, আঙুলে রঙের দাগ।
জেমির চুলে আলো, ঠোঁটে নিঃশ্বাসের আর্দ্রতা।
কোনও শব্দ নেই, শুধু হালকা শ্বাসের ওঠানামা, আর বাইরে দূরের কুকুরের ডাক।
তারা যেন কোনও ছবি হয়ে যাচ্ছে, দু’জন মানুষ, একে অপরের মধ্যে মিশে যাওয়া আলো-ছায়া। ওদের শরীর তখন রঙ, রেখা, গন্ধ, আর সময়।
জেমি বলল,
—এই ঘর আমাদের তৈরি করছে, দেব।
দেব বলল,
—হয়ত, কিংবা আমরা কেবল মাধ্যম।
তাদের ঠোঁট মিলল পরস্পরের সঙ্গে। দেওয়ালের রঙও যেন কেঁপে উঠল।
ভোরে, জানালার পাশে একটি ক্যানভাস পড়ে আছে।
জেমি সেখানে কিছু এঁকেছে, কিন্তু সে নিজেও জানে না কবে। ছবিটা একজন নারীর, চোখ নেই, কিন্তু যেন তাকিয়ে আছে। চুলে আলো, ঠোঁটে ছায়া। দেব জিজ্ঞেস করল,
—তুই এটা আঁকলি কখন?
—মনে নেই। হাতগুলো নিজেরাই নড়ছিল।
—তুই তো আঁকিস না।
—এই ঘরে কেউ আছে, দেব। হয়ত ওর হাত আমার হাতের মধ্যে।
দেব কিছু বলল না। শুধু ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।তার মনে হল, ছবিটার নারীমুখটা নড়ে উঠল সামান্য। আলোর রেখা বদলে গেল।

দিন ক্রমশঃ চলে যায়। ঘরের রঙ বদলায়। জেমির মুখে ধীরে ধীরে আসে নরম আলোর ছাপ। দেব কখনও কখনও রাতে দেখে, জেমি জানালার পাশে বসে থাকে, তাকিয়ে থাকে দেওয়ালের দিকে। ও-একদিন জিজ্ঞেস করল,
—কি দেখিস ওভাবে?
জেমি বলল,
—যে শিল্পী এখানে ছিলেন, ওঁ-এখনও আঁকছেন। হয়ত আমাদেরই।
দেব বলল,
—তুই জানিস না, এমন ভাবলে বাস্তবও হারিয়ে যায়।
জেমি হেসে বলল,
—বাস্তবটাই তো সবচেয়ে ভঙ্গুর শিল্প রে।

সেদিন দুপুরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। দেব বেরিয়েছে, জেমি একা ঘরে। রঙের টিউব খুলে টেবিলে রেখেছে, আর্ট পেপারটা উড়ছে। তখনই দরজার কাছে কেউ নিঃশব্দে যেন পেরিয়ে গেল। ছায়াটা পড়ল পেপারের ওপর। জেমি তাকাল, কেউ নেই। কিন্তু মেঝেতে পায়ের দাগ, রঙে ভেজা…। ওর বুকের ভিতর কেঁপে উঠল।
হঠাৎ বাইরে বজ্রপাত, জানালা খুলে গেল। বাতাসে রঙ উড়ল : নীল, লাল, সাদা…
আর সেই বাতাসের ভেতর, খুব আস্তে, কেউ যেন ফিসফিস করে বলল,
শিল্পী নেই, কিন্তু শিল্প থেকে যায়।
জেমি জানালার দিকে তাকাল, মুখে আলো পড়ছে।
তার চোখে ভেসে উঠছে একটি চেনা মুখ। না দেবের, না নিজের, না সেই অজানা শিল্পীর? যিনি এই ঘরটিকে আজও জীবিত রেখেছেন রঙে, গন্ধে, নিঃশ্বাসে।
আমরা কার ছবিতে আছি, দেব? কথাটা নরমভাবে ভেসে আসে ঘরের অন্ধকারের মধ্যে। জেমির গলা যেন কোথাও আলো আর ছায়ার মাঝখানে স্থির হয়ে আছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু বৃষ্টির শব্দও এই ঘরের ভেতর ঢুকতে ভয় পাচ্ছে, এতটাই ঘন এই নিস্তব্ধতা। দেব জানে না, সে জেগে আছে নাকি ঘুমের ভেতর, কোনও অন্য বাস্তবতায় ঢুকে পড়েছে! জানালার ধারে যে ছায়াটা প্রতিদিন পড়ে, এখন তা অন্যরকম। যেন কোনও মুখ, যার রেখা অস্পষ্ট, কিন্তু উপস্থিতি প্রবল। ঘরটা এখনও পুরনো রঙে মোড়া, অথচ কিছু যেন বদলে গিয়েছে। একটা অদৃশ্য হাত যেন রাতের মধ্যে নতুন আলো এঁকে দিয়েছে। দেওয়ালে এমন আলো, যা কোনও প্রদীপ বা চাঁদ থেকে আসে না। দেব ধীরে ঘুরে তাকায়। জেমি মেঝেতে বসে আছে, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পুরনো তুলি, শুকনো রঙের বোতল, আর কয়েকটা ক্যানভাসের ফ্রেম। সে এক ফ্রেমের ওপর আঙুল চালাচ্ছে, যেখানে কিছুই আঁকা নেই, কেবল ধুলোর স্তর, আর তার ওপর আঙুলের দাগ।

দেখ, জেমি বলে, আমি আজ ওর মতো করে দেখতে চাই।
দেব চুপচাপ বসে থাকে। ওঁ- অর্থাৎ সেই অজানা শিল্পী, যিনি এখানে ছিলেন, এখন নেই, তবু প্রতিটি নিঃশ্বাসে জেগে আছে।
জেমির চোখে তখন এমন এক স্থিরতা, যা কেবল শিল্পীর চোখে দেখা যায়, সৃষ্টি আর বিনাশের মাঝখানে স্থির থাকা একটি মুহূর্ত। সে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে, যদি আমরা আসলে কোনও ছবির চরিত্র হই? যদি আমাদের প্রতিটি শ্বাস ক্যানভাসে রেখে যাওয়া রঙের মতো হয়?
দেব উত্তর দেয় না।
কেবল হাত বাড়িয়ে দেয়, দু’জনের মাঝের অন্ধকারে হাতটা যেন বাতাসে এক রেখা টেনে দেয়। সেই রেখা থেকেই ঝাঁক ঝাঁক আলো জন্মাতে থাকে।
রঙের গন্ধ ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে দু’জনের দেহ নয়, ছায়া মিশে যেতে থাকে আলোর মধ্যে, রঙের মধ্যে। দেব অনুভব করে, জেমির কণ্ঠ এখন তার ভিতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেমন বাতাসে গাছের ডালগুলি দোলে! অনেকটা তেমন…!
–এই ঘরটা আমাদের শেখাচ্ছে কেমন করে অনুভব করতে হয়, জেমি বলে।
হয়ত ঠিক তখনই, বাইরে বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে একটি অদৃশ্য তুলির টান মিশে যায়।
দেওয়ালে যেন নতুন একটি আকার ফুটে ওঠে। দু’টি মুখ, যাদের চোখ নেই, কিন্তু তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে।
দেব হঠাৎ বলে ওঠে, তুই শুনতে পাচ্ছিস?
–কী?
–যেন কেউ এঁকে চলেছে আমাদের।
জেমি হাসে। কিন্তু সেই হাসিটা মিশে যায় বাতাসে।
তার কাঁধের ওপর আলোর দাগ, যেন কারও আঙুলের ছোঁয়া।
সে চোখ বন্ধ করে, এবং সেই মুহূর্তে দেব বুঝতে পারে, ঘরটা শুধু ঘর নয়, এটা একটি চলমান ক্যানভাস।
তাদের চারপাশে সবকিছু খুব স্নিগ্ধ ও নরমভাবে গলে যাচ্ছে, টেবিল, মূর্তি, জানালা, রঙের বোতল, এমনকী সময়ও। সবকিছু এক অদৃশ্য স্রোতে মিশে যাচ্ছে, রঙের, স্পর্শের, নীরবতার।
দেব জানে না কতক্ষণ কেটে যায়। একসময় দেখে, জেমিকে একদম অচেনা দেখাচ্ছে। তার মুখে এমন প্রবল শান্তি, যা কেবল সৃষ্টির পর থাকে।
–আমরা এখন কোথায়? দেব জিজ্ঞেস করে।
–অন্তরালের সেই ঘরে, জেমি উত্তর দেয়।
–ওই শিল্পীর ঘর?
–না… আমাদের খুব ভেতরের ঘর।
তারপর আবার নীরবতা।
কোনও শব্দ নেই, কেবল একটা শ্বাসের সুর বাজছে, দূর থেকে, খুব পুরনো, খুব চেনা। হঠাৎই দেওয়ালের রঙ চমকে ওঠে। সেই ক্যানভাসে, যা এতদিন ফাঁকা ছিল, এখন ঝলসে ওঠে এক ঝাপসা প্রতিচ্ছবি।
দেব এগিয়ে যায়, দেখে, দু’টি অবয়ব পাশাপাশি, একে অপরের দিকে হেলে আছে।
কিন্তু তাদের মুখ স্পষ্ট নয়, কেবল আলো আর ছায়ার রেখায় গড়া।
জেমি ধীরে বলে, দেখছিস? ওঁ-আমাদের এঁকেছে।
দেবের শরীরের ভেতর দিয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে যায়।
–ওঁ?
–যে নেই, তবুও আছে। হয়ত আমরা ওর শেষ কাজ।
আলোটা ক্রমে ম্লান হয়ে আসে। তাদের শরীরের চারপাশে কেমন একটি পর্দা, যেন সময় নিজেই ঝরে পড়ছে। দেব অনুভব করে, তার হাত এখন রঙে ভিজে গিয়েছে।
সে তাকিয়ে দেখে, না, রঙ নয়, এ তো জেমির চুলের গন্ধ, ত্বকের আলো, আর সেই নিঃশব্দ উষ্ণতা, যা কোনও ভাষায় বলা যায় না।

ঘরের ভেতর হালকা বাতাস ওঠে। ক্যানভাসগুলো একে অপরের সঙ্গে দুলে ওঠে, শব্দ হয়, কাগজের, নিঃশ্বাসের, জীবনের। দেব চোখ বন্ধ করে। সে বুঝতে পারে, এই মিলন কোনও শরীরের নয়। এটা দু’টি রঙের মিশে যাওয়ার মতো, যেখানে আলাদা করে বোঝা যায় না কোনটা নীল, কোনটা ধূসর, কোনটা কমলা…
বাইরের দুনিয়া থেমে গিয়েছে। কেবল ঘরের ভেতর আলো আর ছায়া একে অপরকে ছুঁয়ে আছে! যেমন শিল্পী আর তার ক্যানভাস, প্রেমিক আর তার প্রেমের প্রতিচ্ছবি। অচেনা শিল্পী হয়ত আবার ফিরে এসেছেন,
অথবা হয়ত সে কখনওই যাননি। রাতের শেষে, যখন জানালা দিয়ে প্রথম আলো ঢোকে, দেওয়ালে নতুন রঙের দাগ দেখা যায়। একটা অদ্ভুত, উষ্ণ, অস্পষ্ট রেখা, যা স্পর্শের মতো, নিঃশ্বাসের মতো। জেমি তখন ঘুমিয়ে আছে। দেব নিঃশব্দে উঠে জানালার কাছে যায়। বাইরে হাওয়ায় ভেসে আসে কিছু পাখির ডাক। সে ঘুরে তাকায় দেওয়ালের দিকে।

সেই ছবিটা এখন সম্পূর্ণ। দু’জন মানুষ পাশাপাশি, মুখ নেই, চোখ নেই, তবু এক অদ্ভুত আলোয় জেগে আছে।
নিচে ছোট হরফে লেখা। কেউ একসময় হয়ত লিখেছিলেন, ‘অন্তরাল।’ দেব বুঝতে পারে, ঘরটা এখন তার নয়, তাদেরও নয়। এটা সেই শিল্পীর, যিনি প্রতিবার প্রেম জন্মালে, কোনও না কোনও দম্পতির নিঃশ্বাসে নতুন ছবি আঁকে। সে ধীরে দরজা খোলে। বাতাস ঢুকে পড়ে ঘরে, ছবির দিকে, জেমির মুখে। বাতাসের সঙ্গে এক অদৃশ্য হাসি ভেসে ওঠে।
যেন কেউ দূর থেকে বলছেন, ছবি শেষ হয় না, শুধু রঙ বদলায়।🍁

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News