🍂মহামিলনের কথা
শিষ্য৷ দেব! আমায় তুলসীদেবীর মাহাত্ম্য বলুন ৷
গুরু৷ যাঁহাকে দর্শন করিলে সমস্ত পাপ নষ্ট হয়, স্পর্শ করিলে শরীর পবিত্র হয়, অভিনন্দন করিলে রোগ দূর হয়, জলসেক করিলে যমভয় থাকে না, রোপণ করিলে ভগবান কৃষ্ণের মিলন বিধান করেন, কৃষ্ণচরণে অর্পণ করিলে বিমুক্ত দান করেন, সেই তুলসীকে প্রণাম করি!
শ্রবণা নক্ষত্রযুক্ত দ্বাদশী তিথিতে শালগ্রাম-শিলা পূজায় যে ফল হয়, গঙ্গাসাগর সঙ্গমস্থলে স্নান করিলে যে ফল প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহা তুলসী পূজার দ্বারা লাভ করা যায়। আমলকী ফলের দ্বারা হরিপূজায় ও জয়ন্তী-যোগে জন্মাষ্টমীতে উপবাস করিলে যে ফল মানব লাভ করে,তুলসী পূজার দ্বারা সেই ফল হয়। প্রয়াগে স্নান করিলে যে ফল হয়, কাশীধামে প্রাণবিয়োগ হইলে দেবগণ যে ফলবিধান করিয়াছেন,সেই ফল কেবল তুলসীর পূজায় হয়৷
যাঁহার আলয়ে তুলসী পূজিতা হইয়া অবস্থান করেন তাঁহার সমস্ত মঙ্গল প্রত্যহ সর্ব্বদা বর্দ্ধিত হয় ৷
হে ভাবিনি! সহস্রতীর্থ ও পুণ্য পর্ব্বত সকল পরিত্যাগ করত কলিযুগে,তুলসী কাননে নিত্য অবস্থান করি৷
নর্ম্মদা দর্শন, গঙ্গাস্নান আর তুলসীদল স্পর্শন কলিযুগে এই তিনটিই সমান পূণ্যপ্রদ বলিয়া কথিত হয়৷
হরিতকী যেমন রোগসকল দূর করে সেইরূপ দারিদ্র্য, দুঃখ, রোগ, শোক এবং বহু প্রকার পাপও তুলসীক্ষেত্র হরণ করিয়া থাকে।
হে দেবি! শুক্লপক্ষে, তৃতীয়া তিথিতে, যে সময় শ্রবণা নক্ষত্রের যোগ হয় সেই কালে তুলসী অধিক পুণ্যদায়িনী হন।🍁 [সম্পাদকীয় নোট: এই লেখার বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে ]
>শ্রীশ্রীতুলসীমহিমামৃত | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
🍂ফিচার
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে নারী সংখ্যা : জনসংখ্যার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন

সংবেদন শীল
বিশ্বের বহু দেশে এখন নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। লিঙ্গসমতার প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও, গত ক’য়েক দশকে জনসংখ্যা-সংক্রান্ত আরেকটি শান্ত পরিবর্তন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যে পরিবর্তনে নানা দেশের জনসংখ্যার ভারসাম্য ক্রমশ নারীমুখী হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক দপ্তর (UN DESA – United Nations Department of Economic and Social Affairs) ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) -এর ২০২৪ সালের ডেমোগ্রাফিক রিপোর্ট বলছে, পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়ার কিছু অঞ্চল, এমনকি আফ্রিকার দক্ষিণাংশের কয়েকটি দেশে আজ নারীর সংখ্যা পুরুষকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জন্মহার ও মৃত্যুহার যতই সমানতালে এগোচ্ছে, ততই জনসংখ্যা বিশ্লেষকরা দেখছেন, এখনই অন্তত ৩০টিরও বেশি দেশে নারী-সংখ্যা স্থায়ীভাবে পুরুষের তুলনায় বেশি। এই প্রবণতার পেছনে কাজ করছে নারীদের বেশি দিন বাঁচা, পুরুষদের শ্রম-অভিবাসন, এবং জনসংখ্যার বার্ধক্যজনিত বাস্তবতা। একজন জনসংখ্যাবিদ মন্তব্য করেছেন, “নারী-সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি হঠাৎ উঠে আসেনি। গত তিন দশকে রোগপ্রবণতা, জীবনযাপন, কর্মসংস্থান, এবং অভিবাসনের ধারা বদলে যাওয়ায় এই পরিবর্তন হয়েছে।”
বিশ্বে নারী-পুরুষের সর্বাধিক ফারাক দেখা যাচ্ছে পূর্ব ইউরোপে। লাটভিয়া (Latvia), লিথুয়ানিয়া (Lithuania) এবং ইউক্রেন (Ukraine) এই তিন দেশেই প্রতি ১০০ পুরুষে ১১৬ থেকে ১১৮ জন নারী রয়েছেন। মৃত্যুহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের আয়ুষ্কাল এখানে নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের তাগিদে তরুণ পুরুষদের বড় অংশ বিদেশে অভিবাসন করেন। তার ফলে নিজ দেশে থেকে যান নারীরাই, বিশেষত বয়স্ক শ্রেণিতে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ঐতিহাসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তিনটি মিলে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে রাশিয়া (Russia) ও বেলারুশ (Belarus) -এ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ দেশগুলোতে তরুণ পুরুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, আর নারীরা তুলনায় দীর্ঘজীবী হন। পশ্চিম ইউরোপেও নারী-সংখ্যা এগিয়ে পর্তুগাল (Portugal), ফ্রান্স (France) এবং জার্মানিতে (Germany) নারী-প্রধান জনসংখ্যার কারণ মূলত বেশি আয়ুষ্কাল; নারীরা সাধারণত পুরুষের তুলনায় ৪ থেকে ৬ বছর বেশি বাঁচেন।
এশিয়ায় অভিবাসন বদলে দিচ্ছে নারী-পুরুষের অনুপাত
এশিয়ার দু’টি অঞ্চলে নারী-সংখ্যা পুরুষের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে নেপাল (Nepal) ও হংকং (Hong Kong)।নেপালে পুরুষদের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া বা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কর্মসংস্থানে যান। এতে দেশের জনসংখ্যার স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে নারীর হার বাড়ছে। নেপালের এক গবেষক বলেন, “পুরুষেরা যখন বছরে ৮-১০ মাস দেশছাড়া থাকে, তখন ঘরোয়া অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো চালায় নারীরাই।” অন্যদিকে হংকংয়ে নারীর আয়ুষ্কাল বিশ্বের অন্যতম সেরা। সেখানে জীবনযাত্রার মান, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও কম মৃত্যু-ঝুঁকি এই তিন কারণে নারী-সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। পুরুষদের তুলনায় এখানে নারীর মৃত্যুহার কম হওয়ায় লিঙ্গ অনুপাত বছর বছর বদলে যাচ্ছে।
আফ্রিকার দক্ষিণাংশেও নারী-প্রধান জনসংখ্যা : লেসোথো (Lesotho) ও নামিবিয়া (Namibia) এই দুই দেশেই পুরুষেরা প্রচুরসংখ্যায় দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) খনি, শিল্প বা নির্মাণক্ষেত্রে কাজ করতে যান। এই দীর্ঘমেয়াদের শ্রম-অভিবাসনের ফলে দেশের স্থায়ী জনসংখ্যা গঠনে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা সমাজবিজ্ঞানীরা ‘‘অর্থনৈতিক অভিবাসনজনিত জনসংখ্যার ফাঁক’’ বলে ব্যাখ্যা করছেন। আবার, দক্ষিণ আমেরিকায় বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে নারীর হার দেখলে দেখা যায়, আর্জেন্টিনা (Argentina) ও উরুগুয়ে (Uruguay) দুই দেশেই জনসংখ্যার বার্ধক্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীরা বৃদ্ধ বয়সে বেশি বাঁচায় এই দেশগুলোর ৬০ বছরের বেশি বয়সি শ্রেণিতে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বড় ব্যবধানে বেশি।
বিশ্বের সামগ্রিক গড় ও ভবিষ্যৎ চিত্র
বিশ্বে সামগ্রিকভাবে এখনও পুরুষ সামান্য এগিয়ে-প্রতি ১০০ নারীতে ১০১ পুরুষ। তবে বয়স বাড়লেই ছবিটা বদলে যায়। ষাটোর্ধ্ব বয়সে নারী-সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, আর ৭৫ বছর পেরোলেই নারীর সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি চলে আসে। এক বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, “নারীরা দীর্ঘায়ু হওয়ায় জনসংখ্যার আকৃতি বদলাচ্ছে। আগামী ২০ বছরে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হবে।” জনসংখ্যা বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই পরিবর্তনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, কর্মসংস্থান, পরিবার কাঠামো সবই এই প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে বাধ্য। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের আয়ুষ্কাল বেশি হওয়ার পেছনে কারণ হল, তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন, কম দুর্ঘটনা, কম সহিংসতা-সংক্রান্ত মৃত্যু, এবং উন্নত স্বাস্থ্যসচেতনতা। অন্যদিকে পুরুষরা কর্মক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকি তুলে নেন, এবং বাড়তি স্ট্রেস তাঁদের দ্রুত অসুস্থ করে তোলে। অভিবাসন গবেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ দশকে শ্রম-অভিবাসন আরও বাড়বে, বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। পুরুষেরা কাজের সন্ধানে বিদেশে গেলে নিজ দেশের স্থায়ী জনসংখ্যায় নারীর ভাগ স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে থাকবে।
সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, “নারীরা কেবল সামাজিক ব্যবস্থায় নয়, জনসংখ্যার কাঠামোতেও এখন অনেক দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।” এই পরিবর্তন শুধুমাত্র সংখ্যাই নয়- এটি অর্থনীতি, পরিবার, এবং পূর্ণ সমাজব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তুলছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, আগামী বছরগুলোয় নারী-সংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা আরও প্রকট হবে। ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশই নারী-প্রধান জনসংখ্যার তালিকায় আরও স্থায়ীভাবে যুক্ত হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পরিবর্তনের ঢেউ একবার শুরু হলে তা আর থামে না, এখন বিশ্ব জনসংখ্যার পরিবর্তনের দিগন্তেও তেমনই এক নতুন অধ্যায় লেখা শুরু হয়েছে। নারী-সংখ্যা বৃদ্ধির এই বাস্তবতা বুঝিয়ে দিচ্ছে বয়স, অভিবাসন ও আয়ুষ্কালের পরিবর্তন মিলেই এক ভবিষ্যত তৈরি করছে, যার শিরায় লিখিত হচ্ছে নতুন জনসংখ্যাকাঠামো।🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
কবিতা কর্ণার
কবিতা কর্নারের মাঠটা ছোট হলেও মনে হয় অনেক বড়, যেন শব্দ ও স্মৃতির একান্ত জঙ্গল। ঢুকতেই হিরণ্যর নাকে পড়ে চায়ের একটা কাঁচা, মিষ্টি গন্ধ; কাগজে মুদ্রিত পোস্টারের পাশে কনসার্ভেটিভ এক অলসতা ভেসে আছে। দেওয়ালে লেগে থাকা পুরনো পোস্টারগুলোতে নামগুলো অচেনা, চোখ লেগে থাকা কয়েকটি ছবি। পুরনো দাগে কালো হয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে একটা সময়ের আবহ রচনা করে। কর্নারের ভিতরটা তেমন বড় নয়; সামান্য মঞ্চ, তিনটা সারি চেয়ারের সারি, একটা ছোট্ট ক্যাফে-কাউন্টার, এবং এক কোণে পুরনো বইয়ের স্টল। সকালবেলার রোদ এখানে টেনে আনে একধরনের শান্তি; বিকেলের আলোটা হয়ে ওঠে একটু কাঁচা, যেন কথাগুলোই আলোকে হালকা করে ফেলে।
হিরণ্যর ভেতর একটা কাঁটা নড়ে উঠল, মীরা? নামটা অচেনা, তবু ওর চেহারা, মিষ্টি হাসি সবই যেন অরুণিমার ছায়া। সৌম্য বলল, “ওই চোখে কি দেখছিস, ভেবেছিস ও-অরুণিমা?” হিরণ্য কণ্ঠে অচেনা এক আক্ষেপ, “না, না, ওর মতো নয়, শুধু…” তিনি থেমে গেলেন। কথা শেষ হল না। কারণ পুরো দুপুরটা ছিল একটা ঝোলানো আবেশ।
হিরণ্য ঢুকতেই চোখ রাখল, চারপাশে কতই না বদলে গেছে অনেক কিছু। একসময়ের পরিচিত মুখগুলো নিয়ত হারিয়ে গিয়েছে; কেউ হয়ত শহর বদলে দিয়েছে, কেউ দেশে থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু শব্দের সেই শক্তি যেন অটুট। কবিতার শব্দ, গান, আড্ডা সবকিছু এখনও ওই কৌতুকময় কণ্ঠে জাগে। সৌম্যকে একপ্রকার সারাবেলা খুঁজে পাওয়া যায়। তার অদম্য হাসি, বারবার নতুন কবিতা শুনিয়ে দেওয়ার লালসা। সে চলে আসে, হয়ত প্রতিবারের মতই মঞ্চে দাঁড়িয়ে না হয়ে থাকবে; কিন্তু তার কথাগুলো একরকম ধারালো, ক্লান্তিহীন। হিরণ্য এগোল মঞ্চের পাশ ঘেঁষে খালি ক’টি চেয়ারে। বুকের ভেতরকে একেকটু করে নামিয়ে নিয়ে সিটে বসে পড়ল, চোখ বন্ধ করে নিল। ইচ্ছে মতো কথা চলে এলেই, আকাশটা খুলে যাবে। পাশে বসে থাকা কেউ হঠাৎ নাম ধরে বলল, “হিরণ্য?” হঠাৎ কণ্ঠ শুনে সে চমকে উঠল। সৌম্যই ছিল, তার মতোই পুরনো নিপুণতা, চেহারায় বদল নেই, কেবল বয়সটা একটু বাড়তি রেখেছে চওড়া গালের কোণে সূক্ষ্ম ফিওরলাইনসের ছাপ। সৌম্যের চোখে ছিল সেই পুরনো উচ্ছ্বাস, আর মুখে একই টিপিক্যালি অপ্রত্যাশিত হাসি।
“তুই আসলি,” সৌম্য বলল হঠাৎ, “বহুদিন হয়ে গেল। তোর ছাপা কবিতাগুলো তো এখনও অনেকেই খুঁজে।… কিন্তু তুই তো বললেই না, কাইতে গিয়ে ফাটল পড়েছে?” তার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকভাবে একটা খোঁজখবর, আর একরকম রসিক-উপদেশ। হিরণ্য হাত হেলল অস্বস্তিভরে।
“আমি—” তিনি শুরু করলেন, কিন্তু শেষ শব্দটা বেরল না। কেমন যেন লজ্জা, কেমন যেন নিজের অপ্রতুলতা। বহু বছর ধরে নামানো এক পাটা কাগজকে নতুন করে ছুঁয়ে ফেলছে নিজেরই আঙ্গুল।
সৌম্য হেসে দিলেন, “আজকে আমাদের প্রধান অতিথি আছেন, ওজনদার। আর কারা-পরে পড়ব দেখবি। তোর গানের জায়গাটা তো এক ছিল, তুই কি ভাবছিস পড়বি?”
হিরণ্যর মনে এক আকস্মিক ইচ্ছা জেগে উঠল- না, পড়া সম্ভব হবে কি? সে শেষবারের মত কবিতা লেখা কখন জানা নেই; তবে বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কয়েকটি লাইন তখনই চিৎকার করে উঠল যেন, বলতে দে। অবাধ্য পা তাকে মঞ্চের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল; কিন্তু ভেতর একটা অদ্ভুত ঘাবড়াহট। সে নিজের কণ্ঠের গলায় ভরসা করে না; অনেক বছর ধরে কণ্ঠটা যে শীতল হয়ে গিয়েছে। শব্দগুলো এখন কীভাবে ঘর ছেড়ে বেরবে?
মঞ্চে আলোর বদলে, প্রথমে একটা গান শুরু হল, কেউ পুরনো সুর গাইল, চোখ বন্ধ করে। গলাটা ভেসে এলো, সুরটা হিরণ্যর কানে অচেনা হলেও ভিতরে লাগল এক অতীন্দ্রিয় স্পর্শ। গান শেষে মঞ্চে সেই মেয়েটি উঠল, তা যেন সেই সানগ্লাসটা পরে ছিল পুরো অনুষ্ঠানটাই। হিরণ্য একনজর তাকাল, মেয়েটির চেহারা, সাজ, চলা, সবকিছু তবু অদ্ভুত পরিচিত লাগছে। সানগ্লাস খুলে মুখটা দেখলে মনে হবে, কোনটা অরুণিমার মতো। কিন্তু দেখা গেল না পুরোপুরি মিল; বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট, বদলে যাওয়া বয়েস, সেই একই তিল, যা হিরণ্যর মনে পরিচয়ে অদ্ভুত হটকা দিয়ে দেয়।
প্রতিটি ধাপে হিরণ্যর হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল। কেন জানে না, সে কেবল অনুভব করছিল শব্দ আর দৃশ্যের মাঝেই যেন অদ্ভুত এক ঝকঝকে তৎপরতা জাগছে। সে সেই মেয়েটিকে লক্ষ্য করে, উদ্দেশ্যহীনভাবে, চোখে চোখ রেখে। মেয়েটির গলার স্বরে ছিল শান্তি, আর চোখে ছিল বোঝার একটা চাহনি, অচেনা হলেও মনে লাগছিল যেন কোনো না কোনো কোণে তার মনের কথা পড়ছে।
সৌম্য মঞ্চে এক ছন্দে কথা বললেন, “আজকের অনুষ্ঠানটা আমরা ছোটখাটো করে করছি। কিন্তু প্রয়োজনের চাইতে বেশি শ্রদ্ধা থাকুক শব্দের প্রতি “we will listen more than we speak.” তিনি চেয়েছেন শব্দগুলোর মূল্য বোঝাতে, শব্দ আর মানুষের সম্পর্কের এক অচেনা বন্ধন। এরপর একে একে কয়েকজন কবি উঠল, গল্প হল পুরাতন স্মৃতির, কেউ কাঁদল, কেউ হাসল, এগুলোর মাঝে হিরণ্য একটা ফাঁক খুঁজে নিচ্ছিল নিজের জন্য।
ফাঁকা যতই খুঁজে নিচ্ছিল, ভীড় ততই বেশি মনে হচ্ছিল। দেখতে দেখতে অনুষ্ঠান অগ্রসর হলো, এবং হঠাৎই মঞ্চে বল হল, “আজ আমাদের অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ, নতুন কণ্ঠ, যিনি এখনই গান গেয়েছেন, ওই লেডি!” হিরণ্যর চোখ আবার সেই মেয়েটিকে খুঁজে পেল। মেয়েটির কণ্ঠ থেকে একটি পুরনো কবিতার লাইন, যা একসময় হিরণ্য নিজেও লিখে ছিল, বয়ে গেল। র ওয়েসটা যেন সম্মিলিত করে দিল সবকিছু সুর, শব্দ, স্মৃতি- চিৎকার করে বলছিল সেই নাম-
অরুণিমা? না, নামটা ভিন্ন ছিল। কিন্তু রেশটা একই।
হিরণ্যর ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা জাগল। সে সেই শব্দগুলো শুনে হঠাৎ স্মৃতির গভীরে সাঁতার কাটতে লাগল,
কখনও সেই গানের পঙক্তি কীভাবে নিজের ক্লাসরুমে ছড়িয়ে গিয়েছিল, কীভাবে অরুণিমার হাসত, কোন রাতগুলো একে একে ওদের আলাপের সাক্ষী ছিল- সবই এখন চোখের সামনে লাইভ হয়ে উঠল। মনে হল, প্রতিটি ছন্দ এক একটা দরজা খুলে দিচ্ছে।
সংঘাতের মধ্যে এক ক্ষণ হিরণ্য মনে করলেন, এখানে থাকা মানে কি নিজেকে ধ্বংস করা? সে যাকে চায়নি, যে তাকে ভুলে যেতে বলেছিল, ওই অরুণিমা নিজেই কি আজও এখানে? নাকি সেটি কেবল স্মৃতির ছায়া? জটলা টেনে গেল মনের ভেতর, একসঙ্গে দুঃখ, লজ্জা, আকাঙ্ক্ষা। কাশ্মীরের শ্যাওলা হরিণের মতো রকমের কিছুকিছু- চোখে দেখা ফেলেও সে বুঝতে পারছে না কোনটা বাস্তব।
আহা! এই বিভ্রমটাই গল্পের মাংস; কারণ জীবনেই তো অহেতুক বিভ্রমের ছাপ। কবিতা কর্নারের আলো অদ্ভুতভাবে কনকনে, শব্দগুলো যেন নিজেই গিঁট বাঁধছে। হিরণ্য ক্রমান্বয়ে নিজের কাছেই প্রশ্ন করছিল, কী চাইছি, আছ কি কিছুর প্রত্যাশা? আর কোন ভাগ হতে চায় না, সে নিজের আছে কি আশু?
অবশেষে, সৌম্যের অনুরোধে, হিরণ্য মঞ্চের দিকে উঠে এলেন। তার হাত একটু কাঁপছিল; কিন্তু মুখে একটা অচেনা স্থিরতা ছিল। অপ্রশিক্ষিত কণ্ঠ নিয়ে সে বলল, “আমি! বেশ কিছু দিন পর এখানে এসেছি…” শব্দগুলো আস্তে আস্তে পাশে ছড়িয়ে গেল। হিরণ্য প্রথমেই একটা পুরনো কবিতার পংক্তি বলল; লাইনগুলো অনুভব করাল তার পুরনো কণ্ঠকে, যা বহুদিনের নীরবতার পরে এখন তুলে আনতে চায়, “আবার সেই রাত, যখন চাঁদ ছিল ভাঙা…” সে বলে গেল, লাইনগুলো সাবাইকে শুনে নিল, কেউ না বুঝলেও সে বুঝে নিল সবটা নিজেরই।
পড়ার পর ক্ল্যাপ এল, অল্পস্থিরতা এল, এবং হিরণ্য ফিরে আসলেন সিটে। মনে এল, শব্দগুলোকে মুক্ত করে দিলেই অচেনা ভার কমে যায়। কিন্তু সেই মুহূর্তেই হিরণ্যর দৃষ্টি ফের গেল মঞ্চের পাশে থাকা মেয়েটির দিকে, ও আবারও মুচকি করে হাসছে। সেই হাসিটায় লুকিয়ে ছিল কিছুর সম্মতি, আর কিছুর অনুযোগ, যেন বলছে, “তুমি বললে ঠিকই বলেছ।”
অনুষ্ঠানের পর ক্যাফের কফির টেবিলে সৌম্য লোকাল একজনকে নিয়ে আসল, সে পরিচিত এক তরুণ পাণ্ডিত্যের কণ্ঠধারী। তাঁর সঙ্গে হিরণ্য গল্প করল বই, পুরনো ইভেন্ট আর কীভাবে সময় বদলে দিয়েছে সবকিছু, এমনই কিছু। কথাগুলো চলতে চলতে হঠাৎ সৌম্য ইঙ্গিত করল, “ওই- ওই মেয়েটার সঙ্গে একটু কথা বলিস, ও মিউজিক শিখে আছে, ওর নাম মীরা।” মুখে হাসি রেখে সে বলল, “মীরা- তুই আরেকবার বাজা… সেই পুরনো টানে।”
হিরণ্যর ভেতর একটা কাঁটা নড়ে উঠল, মীরা? নামটা অচেনা, তবু ওর চেহারা, মিষ্টি হাসি সবই যেন অরুণিমার ছায়া। সৌম্য বলল, “ওই চোখে কি দেখছিস, ভেবেছিস ও-অরুণিমা?” হিরণ্য কণ্ঠে অচেনা এক আক্ষেপ, “না, না, ওর মতো নয়, শুধু…” তিনি থেমে গেলেন। কথা শেষ হল না। কারণ পুরো দুপুরটা ছিল একটা ঝোলানো আবেশ।
মীরার সঙ্গে হিরণ্য অল্প কথাবার্তা করল; মীরা বলে, “আমি ওই কবিতাটা আজ গেয়েছি আপনাদের জন্য। শুনেছি, আপনি আগে থেকে এখানে অনেক গান লিখেছেন, কিছু শুনব?” মীরার চোখে কোনও কৌতূহল, কোনও বিশুদ্ধ আগ্রহাভাস ছিল। হিরণ্যে অচেনা এক ক্ষুধা জেগে উঠল, এবারও কি ফিরে আসবে কবিতা? কিন্তু একই সাথে মনে হচ্ছিল, এ সবই যেন অচেনা পথ। সে অস্বস্তিতে বলতে পারল না।
সন্ধ্যার আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় হতে লাগল; কর্নারের আলো বাইরে বাড়ির ধ্বনিতে মিশতে লাগল। হিরণ্য যখন বলল, “তোমার কণ্ঠটা ভাল।” মীরার চোখে অদ্ভুত একটি কিছু ছিল, “তুমি কিছু দেখেছ না, তুমি কিছু শুনেছ না, কিন্তু তবু মনে হয়েছে” মীরার সেই খোলামেলা চোখে ছিল একটা সহানুভূতি, যা হিরণ্যর ভেতর দাগ কাটল।
এই মধ্যাহ্ন থেকে সন্ধ্যা, সমস্ত মুহূর্তে হিরণ্যর ভেতরের ভাঙা গ্লাসগুলো ক্রমান্বয়ে জোড়া লাগতে লাগল। মনে হচ্ছিল, কিছু না কিছু ভাঙছে আর গড়ে উঠছে, তার মধ্যে একটা সান্ত্বনা ছিল। কিন্তু সাথেই থাকে কষ্ট। যে কষ্ট, পুরনো ভালবাসার রেশ এখনও মেজাজে ঝুলে আছে।
ঘন কুয়াশা নামতে নামতেই হিরণ্য ফিরে এল বাসস্ট্যান্ডের দিকে। অবাধ্য পা তাকে ভেতর থেকে বারবার টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, কোন জায়গায় যেন সে হারিয়ে যেতে চায়, আবার ফিরে আসতে চায়। বাসে ওঠা-নামার জটিলতায় সে অজান্তেই বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল, মনের মধ্যে এক অনিশ্চয়তা, যে অচেনা হলেও অদ্ভুত আরাম দেয়।
বাসে ফিরে রাস্তাপথে বসে, হিরণ্য জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। রাস্তায় বাতাসে লুকনো শব্দগুলো, গানের সুরের পঙক্তি, মীরার কোমল-সুরে গাওয়া লাইন, সৌম্যের কথাবার্তাসব, সব মিলিয়ে একটা দীর্ঘ সেতু বানিয়ে দিল। তার মধ্যে থেকে এক লাইন বারবার ভেসে উঠল, “তুমি যে পা রেখেছ, ওগুলোই তোমার নয়; পা রেখেছে অন্য কোনও দিশায়।” হিরণ্য হাসল নিজেই, কেমন যেন অদ্ভুত পাগলামি।
ঘরে ফিরে এসে যখন আলোর নিচে বসে টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলো খুলে দেখল, তখন দাগে-ঝড়ের মতো কিছু পুরনো লেখা লাইন খুঁজে পেল। এগুলো আমি কি লিখেছি? মনে হল, না, এগুলো আগের ছোট ছোট চিহ্ন, যেগুলো সে ফেলে এসেছিল, শুধু নিজেরই নয়, কোনও এক সময়ের চাঁদঝলক। হিরণ্য একটা লাইন পড়ল, “আমার অবাধ্য পা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে; সে জানে না ফিরলে কার এখানে কেউ থাকবে।” চোখে পানি এসে গেল।
পাকঘরের কাচের পাশে তাসের ছায়া কেটে গিয়েছে; সে চা বানাল, ভাবল, আজকের রাতটা অন্যরকম হবে। সে ভাবছিল, হয়ত এখনই অরুণিমার কাছে গিয়ে সব পরিষ্কার করে বলব, তোমাকে ভুল বোঝা হয়েছিল, আমি ভুল করিনি। কিন্তু ঠিক ভাবতেই মনে হল, অরুণিমা তো এখন তার জীবন থেকে বহু দূরে; সে কোনও বিবর্ণ স্মৃতি, একটা অল্পদূরে থাকা দরজা। মীরা আসলে আরও কিছু। সে কি অনুচিত হবে যদি হঠাৎ সেই বাঁশি-স্বরকে অরুণিমার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলি? হিরণ্য নিজেই অবাক হচ্ছিল এটা ভাবতে দেখে।
রাত্রি গভীর হচ্ছিল। হিরণ্য জানলার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে রইল। শহরে বাঁশি-বাজার আওয়াজ কানে লাগছিল মৃদু; আর ভেতরে কিছুর ছায়া নড়ছিল। অবাধ্য পা একবার ধড়ফড় করে উঠল। যেন বলতে চায়, এখনই যেও না, ঠিক আজ নয়। কিন্তু সে জানত, এই পা তাকে বারবার টানবে; এমনকী সে নিজেই হয়ত চায়, কাজেই পথ পা ছাড়া চলা নয়।
এভাবে কর্নারের সন্ধ্যা তার মধ্যে একটা নতুন তেজী ঘোড়ার মতো কিছু ঢুকিয়ে দিল। নতুন কিছু, পুরনো কিছু, স্মৃতি ও সম্ভাবনার এক অদ্ভুত মিশেল। হিরণ্য বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবল, আগামীকাল আবার টিউশন, ক্লাসের পড়ার যে দায়িত্ব; তবু মনে হল, কবিতার পাখা আজ একটু পাখা মেলে। অবাধ্য পা হয়ত আজ রাতে আর নীরবে থাকবে না। সে হয়ত আবার উঠে পড়বে, কোনএক অচেনা পথে পা বাড়াবে। এই অংশের শেষে হিরণ্যর জীবনে কেবল একটি ঘটনা ঘটেনি। কবিতা শুধু ফিরে আসে নি; অরুণিমার স্মৃতি আর মীরার উপস্থিতি মিলে হিরণ্যর হৃদয়ে এক নতুন গোপন দরজা খুলে দিয়েছে। এই দরজাটা খুলে কি সে প্রবেশ করবে, না জানা নেই। তবে একটি সংবেদনশীলতা গড়ে উঠেছে। নিজেকে প্রশ্ন করার, পুরনো ভুলগুলোকে আবার দেখতে, ও নতুন সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে চলার। অবাধ্য পা ঠিক বোঝে কিনা, তা বলা কঠিন; তবে হিরণ্য ঠিক জানে এক বাস-টিকিটের মতো জীবনের ছোট্ট সিদ্ধান্ত কখনও কখনও সম্পূর্ণ অজান্তে ঘর-বাড়ি বদলে দেয়।🍁 (চলবে)
🍂কবিতা
তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

জানালা
জানালা খুলেছ কেন? কেন খুলেছ জানালা?
জানালার পাশে আমার মৃতবিকেল পড়ে আছে
এখন আর মাছ ধরতে বেরোই না ওই পথে
এখন অনেক রাত্রি নেমে এসেছে
হাসিখুশিরা কেউ বেঁচে নেই
শুধু স্মৃতিরা জোনাক হয়ে ওড়ে
এই বর্ষা আর নূপুর পরে না
কলসি কাঁখে জল তোলে না
পুকুর ঘাটে হারিয়ে যাওয়া সাবান খোঁজে না
নিঃশব্দ সন্ধ্যেবেলায় ওড়ে না দিনান্তের বক
সাইকেলে বাজে না পুরনো বেল
বুকের ওড়না ওড়ে না ফাগুনে বাতাস দিলে
আমি রোজ এখানে ঘুমিয়ে যাই
আমার স্বপ্ন ক্লান্ত ধূসর
চোখ তুলে আর তাকাতে পারে না
খোলা জানালায় কে আজ বিদ্রূপ করে যায়!
বৃন্দাবন দাস -এর তিনটি কবিতা
সমীকরণ
উদাসীন সমর্থন ক্রমাগত শূন্য করে নিচ্ছে
নির্জন অহংকার
অভিমন্যু-রণক্ষেত্র অমাবস্যা জানে
জানে ছেঁড়া বাসস্থান আর ভুল দরজা
সীমানা পেরিয়ে মেঘেরা যতদূর যায়
হস্তরেখা তার পিছু পিছু
বাধ্যমেয়ে রঙ মাখে, ঋতু খেলা শেখে
সঙ্গে সুফলা টইটুম্বর জরায়ু
সমীকরণে নির্ঘুম জলসিড়ি ধানসিঁড়ি
সামনে পারম্পর্যহীন থৈ থৈ পান্ডুলিপি
অংক মেলে না—
জরুরি পাঠ
ঠিক কতটা শিক্ষিত হলে
মিথ্যেটা গুছিয়ে বলা যাবে
ঠিক কতখানি গুণী হলে
মিথ্যেকে সুন্দরের বেদীতে বসানো যাবে
ঠিক কোন বিদ্যালয়ের শিক্ষা নেয়া জরুরি
ঠিক কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি একান্ত প্রয়োজন
খোঁজ পাইনি
নিতান্ত দুর্ভাগা মেনেই বেঁচেবর্তে আছি
আমি যে সত্য মিথ্যে আরেকটু শিখে নেব
আমার সেই মাস্টারমশাইরা আর নেই
মাটির পৃথিবীতে
খুব খোঁড়াখুঁড়ি করে কচিত্ দু- এক জন মেলে
দেখি, তাঁরা এখন বধিরতার পাঠ নিচ্ছেন—
ব্রজপুর
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে
হ্যাঁ, চিরকালই লাগে
কাশীপুরে লাগে
পোড়ামাতলায় লাগে
বিবেকানন্দ শীলায় লাগে
শুন্যরা অনর্গল মৃত্যু-উপযোগী
‘অনঘ’ শব্দের মাঝে কাঁচা পাকা কিছুই থাকেনা
গলা তুলে কেউ কেউ পদাবলী গায়
কেউবা প্রণয়ের দংশনে মৃত্তিকা ময়
এখন তো সাইবার স্পেস থেকে
রাত জাগা আহ্লাদ
নিপুন আত্মহত্যা শিখে নেয়
জ্যোত্স্নার স্বরলিপি না জানলেও
ব্রজপুর
চাঁদ আর চাঁদের সাগর—
আমিনা তাবাসসুম -এর একটি কবিতা
দিনচিত্র
ক্লান্ত অবগাহন-
যা সমস্ত স্মৃতির থেকে
আদৌ ভেঙে পড়া নয়
এক একটি সূর্যমুখী
হলুদ গন্ধের ভেতর
অথবা
গোলাপী কোমলতা ঘিরে
প্রতিদিন আলো নিয়ে আসে
যে আলো মেঘ-মেদুর স্নাত নয়
ভোরের উজ্জ্বলতা, সুকুমার্য
সবুজাভ প্রেমে ভরে ওঠে
আসলেই
বুকপকেটে কোনও অসুখী লক্ষণ
রাখিনি
যা অনুরাগে বৈচিত্ত্যে
সকাল-সন্ধ্যে ভরপুর
মোহনীয় পদ্ম।
দিলীপ প্রামাণিক -এর একটি কবিতা

নায়ক নায়িকারা উস্কে দেয় মন
তোমাদের চিত্রায়নে আমার আবছা সন্ধিক্ষণ বয়স
কথা বলে,আবেগে স্মৃতিরা ভেসে ওঠে
টিউসনে নরম আড় চোখে কথা হতো
পেনসিল দেওয়া নেওয়ার স্পর্শের অনুভুতি
আজ ও রাত জাগা কথা বলে
নির্জন রাস্তা পুকুর পাড়ে দেখা হতো
চুলের গন্ধে ধুকপুকানি মনটা
দ্রুত নিঃশ্বাসে শুকিয়ে আসত গলা
সেকি ভোলা যায়,আলিঙ্গনের দৃশ্য
গানের কলিতে অসংখ্য ছবির কোলাজ
মনে করিয়ে দেয় সন্ধিক্ষণ বয়স
প্রেমের কবিতায় স্মৃতিরা আজ ও কথা বলে একান্তে
বিড় বিড় হেটে যায় উস্কে দেওয়া স্মৃতির ছায়ারা
মমতা রায় চৌধুরী -এর একটি কবিতা

ভেবেছিলাম বেড়াতে যাব
কথা হয়েছিল বেড়াতে যাব
তর্ক হয়েছিল। আমি বলেছিলাম পাহাড়
তুমি বলেছিলে সমুদ্র। কেন
পাহাড় নয় কেন?
তুমি বলেছিলে সমুদ্র নয় কেন?
পাহাড়ের নীরব নির্জনতা আমার ভীষণ ভয় লাগে
যদি সেই নির্জনতায় কোন সাড়া না জাগে
আর সাগর যেখানে বসে দেখব ফেনিল সমুদ্রের গর্জন। জোয়ার চোখে মুখে জল দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নীলাচলে। সমুদ্রের গভীরতার মত দু’জনের ভালবাসার স্রোত বইবে
একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে
গোপনে বুনবো নকশি কাঁথা যেখানে থাকবে
তোমার আমার অমলিন অমর গাঁথা।
ঠিক আছে। ধর পাহাড়ের নির্জনতার মধ্যেই যদি জাগে সাড়া ।তোমার আমার বরফ ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে। আরো বেশি কাছে পেতে ইচ্ছে করবে
কেমন লাগবে বলো যখন উল্কা স্রোত বইয়ে দেবে
দুজনার প্রেমকথা যদি লেখা থাকে পাহাড়ের বুকে
ক্ষতি কি?
তবে তাই হোক
মানে?
মানে তোমারটাও থাকুক আমারটাও থাকুক
পাহাড় সমুদ্র দুজনেই আপন করে নিই।
মন উদ্যান মরুভূমি তবুও মরু ঝড়
আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যাক ,যাক
পাহাড় থেকে সমুদ্রে সমুদ্র থেকে পাহাড়
এভাবেই হয়ে যাই দু’জনে একাকার।
আশিস সরকার -এর একটি কবিতা

মা
কি এক অভিমান হয়েছিল সেদিন
আমি বেশ কদিন পর বাইরে থেকে–
বাড়ি ফিরে দেখি মা বাড়িতে নেই।
চিৎকার করে ডেকেছি মা কোথায় তুমি
মা আমি এসেছি– তুমি কোথায়?
মা আমার খিদে পেয়েছে– তাড়াতাড়ি এসো।
ক্লান্ত আমি বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি মা আমায় বাতাস করছে
পাশে ভাত গেলাশে জল আসন পাতা…!
শুভমিতা -এর একটি কবিতা

আত্মা
হাজারবার চেষ্টা করেছি-
নিজের আত্মা থেকে-
তোমাকে মুছে দিতে,
কিন্ত পারিনি!
যতবার চেষ্টা করেছি,
ততোবারই তুমি,
নিরীহ লতাপাতার মতো,
জড়িয়ে ধরেছো,
আগুন চোখে জল ঝরানোর-
ক্ষমতা তোমার অসীম।
ভীতু ঠোঁটে অভিযোগ না ক্রোধ না
বারবার নিস্তব্ধ এক উচ্চারণ।
এরপর আমার আত্মা থেকে-
তোমাকে মুছে ফেলার শক্তি
আমি হারিয়ে ফেলেছি।
🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।
কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়
২৩.
ফেলুদা সমুন্দর সিং আর তার খাদানের কর্মচারী চারজনকে নিয়ে ‘তিন তিনে চাপা চু’র পথে অনেকখানি উপরে উঠে এসেছে। ঐ পথেই পায়ে পায়ে একটা পাহাড়ি সোঁতা নামছে। নিচ থেকে তো বোঝা যায়নি ঝর্ণাটা
***
আছে! হয়ত ঝর্ণাটা নদীতে নেমেছে অন্য কোনও বাঁক থেকে। ফার্ণ গাছগুলো ঝর্ণার পাশে বেশ বড় সড় আর ঝাকড়া। হলুদ, সবুজ কোথাও ইট রঙের। ওরা একটু উপরে উঠতেই ফেলুদার চোখে পড়ে একজন বয়স্ক মত লম্বা লোক, পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে ঝুঁকে হাঁটছে, একজন স্কুল ড্রেস পরা ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটছে।
ফেলুদা বলল, “সমুন্দর, ওদের ফলো করো।”
সমুন্দর সঙ্গে আসা খাদানের চারটি নেপালিকে এগিয়ে দেয়। সমুন্দর তার পেছনে। ফেলুদা তারও পেছনে। বনের ভেতর একটা কটেজের সামনে এসে ভেতরে ঢোকার আগে একবার পেছনে ফিরতেই নেপালি বৃদ্ধটি দেখল, দু’টো ছেলে পেছন পেছন আসছে। সে কোমরে কুকরিতে হাত দিল। তারপর নেপালিতে কী যেন বলল। এদিক থেকে ওরাও কিছু বলতে বলতে বৃদ্ধ নেপালিটির কাছে পৌঁছে গেছে। আর পেছন থেকে, মানে বাড়িটার অন্য দিক থেকে ফেলুদার অন্য দুজন নেপালি কর্মচারী গিয়ে বৃদ্ধ লোকটিকে জড়িয়ে ধরে কোমর থেকে কুকরিটি নিয়ে ওই কটেজের ভেতর ঢুকে গেল। ফেলুদা দেখল, বেশ স্মুথ হল সব।। গন্ডগোল এড়ানো গেছে। তবে ফেলুদার ভাবনার সাথে তাল মিলিয়ে যেন ঘটনাগুলো ঘটছে। সে দূর থেকেই চিনতে পেরেছে, স্কুলের ড্রেসের ছেলেটি মালবাবুর ছেলে ঋতব্রত। কিন্তু এখনই সামনে যাওয়া উচিত হবে না। ঋতব্রত ভাবছে হয়ত তাকে হেভেনে নিয়ে আসা হয়েছে। ফেলুদাকে দেখলে তার মনে হতে পারে অন্য কিছু। গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে। সমুন্দরকে ফেলুদা জানাল, “সমুন্দর তোমরা কাল সকাল পর্যন্ত সামলে নিতে পারবে তো? আমি তোমার দলের এই স্মার্ট ছেলেটাকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। আর ভটভটির মাঝিকে বলে দাও, আমাদের ওখান থেকেই নিয়ে যেতে। তুমি শুধু দেখবে ওই লোকটি মোবাইলে যেন কোনও কথা বলতে না পারে। আর বলো ও যেন যা যা কাজ করার কথা তা করে। না হলে জেলে পচে মরতে হবে।
“না না, মালবাবু জানতে পারবে না। সে কিশানগঞ্জে ফিরতে ফিরতে দিন চারেক লাগাবে। আমি আপনাকে আজই দেখা করিয়ে দেব আপনার বাবার সাথে। একান্ত নাহলে কাল সকালে।”
বনবিহারী গাড়ি চালাতে চালাতে নিজের বাঁ পাশে বসিয়ে আনা চানুমতিকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। এরকম সুন্দরী পাশে বসলে গাড়ি চালানোর আনন্দও বেড়ে যায়। বনবিহারীর গল্প থামে না। বেলা তিনটের সময় রওনা দিয়েছে কিশানগঞ্জ থেকে। মালবাবুর শিলিগুড়ি পৌঁছে যাওয়া নিশ্চিত হয়েই যাত্রা করেছে। বেশি রেক্লেস ড্রাইভ করে না বনবিহারী। তার পূর্বপুরুষ কালিম্পং-এ প্রথম মোটোরগাড়ি চড়েছে। কিন্তু কখনও উচ্ছৃঙ্খলতা প্রশ্রয় দেয়নি। পাহাড়ি পথ হেড লাইট জ্বেলে ধীরে এগোচ্ছেন।
গনেশ ছেত্রীর আরও দু-একরের একটা জমি আছে একটু দূরে এই বড় রাস্তার পাশে। ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’ এর সাফল্যে উৎসাহিত ম্যাডাম কর্মার ইচ্ছে সেখানে আর একটি রিসর্ট বানানো। তার দু’ই ছেলে দু’জনের জন্য দু’টি রিসর্ট করে যেতে পারলে ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মারামারি হবে না। গনেশ ছেত্রী কিছুতেই চাইছে না ওই শেষ সম্বল টুকু হাতছাড়া করতে। তার মনের ইচ্ছে, যদি মেয়ে কোনওদিন ফিরে আসে, তাকে তো কিছু দিতে হবে।
বনবিহারী চানুমতীর মন পাবার চেষ্টা করছেন। এরকম একজন সুন্দরী তার জীবন সঙ্গিনী হলে যেন মানাত। বৌ কর্মাও সুন্দরী। কিন্তু কেমন গোল গোল। এই তীক্ষ্ণ নাশা, টানা চোখ অল্প কপাল, সরু ঠোঁটের দীর্ঘাঙ্গীর কাছে সে যেন কিছুই নয়, এখন মনে হচ্ছে। তাছাড়া কর্মার অন্য পুরুষে আসক্তি আছে। বিশেষ করে হাঁটুর বয়সী ওই পারিবারিক ডক্তারের সঙ্গে যে মাখমাখো সম্পর্ক তা টের পায় বনবিহারী। কিন্তু কিছু বলতে পারেন না। তার স্ত্রী’র সঙ্গে এত উঁচু তলার লোকের দহরম মহরম, যে সম্মুখ সমরে পেরে উঠবেন না। তো এই রিসর্টটা পুরোটাই স্ত্রী নিজের নামে করে নিয়েছে। বনবিহারী নিজের একটা ধান্দা করতে তাই তো কিশানগঞ্জে পাড়ি দিয়েছিলেন।। আজ অনেকটা সেখানে দাঁড়াতে পেরেছেন। বনবিহারী আজ সরাসরি চানুমতিকে গনেশ ছেত্রীর হাতে তুলে দিতে চান না। একরাত, নিজের শ্যালেট-এ রেখে একটু চোখের সামনে সুন্দরীর ঘোরাফেরা উপভোগ করবেন। পাহাড়ে থাকলেও বনবিহারীর কর্মার সঙ্গে একই ঘরে রাত কাটানোর হুকুম নেই। স্ত্রী কর্মা তার পোশা কুকুর-বেড়াল নিয়েই ঘুমোয়। পাশে নিচের ধাপে বনবিহারীর শ্যালেত বা কুটীর। সেখানে অন্য কুটিরগুলোর মতো দুটো ঘর আছে। মানে এই হোকাস-পোকাস-এর পাঁচ একর জোড়া জঙ্গল ঘর গুলির সব কটিই একই ডিজাইনের। শুধু নাম আলাদা। উপরে উঠে তারা অর্কিড, ম্যাগনেলিয়া, স্প্রিং সাইড এরকম নাম পায়। নীচে পেছনের ধাপে্ ফ্যামিলি হাউস আর চাকর-বাকরদের কোয়ার্টার।
***
বনবিহারী গাড়ি চালাতে চালাতে, চানুমতীর রূপ মাধুর্য উপভোগ করতে করতে ভেবে রেখেছেন। যদি চানুমতীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাহাড়ে বাবার কাছে রেখে দেওয়া যায় তো এক ঢিলে দু-পাখি মারা হবে। কর্মার মুখের উপর একটা বিফিটিং জবাব দেওয়া যাবে। মানে যখন তখন কর্মা বনবিহারীর পৌরুষ তুলে আঘাত করে। মানে বনবিহারীর নাকি কোনও যোগ্যতাই নেই। কোনও সুন্দরী মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী করা নাকি তার কম্ম নয়। বনবিহারী জঙ্গলের পথে সার্চ লাইট ফেলে যেতে যেতে নিজের মনের অন্ধকারেও আলো ফেলেন। যদি চানুমতি রাজী হয়, তবে তার গর্ভে বনবিহারী সন্তান উৎপাদন করে দেখিয়ে দেবে। ডাক্তারের কাছে যায়নি, তবুও বনবিহারীর বিশ্বাস তিনি নিজে ঠিকঠাক, কর্মাই বনবিহারীর সন্তান ধারনে সক্ষম নয়।
আরও একটি গোপন উদ্দেশ্য আছে বনবিহারীর। ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’ এর এর জন্য তো দু’একর জমি জলের দরে ছেড়ে দিয়েছে গনেশ ছেত্রী। বদলে এখানে একটি ভাল শ্যালেট পেয়েছে সে। খাওয়া-দাওয়াও ফ্রি। কিন্তু গনেশ ছেত্রী এমনি এমনি খায় না। এখানকার সব কর্মচারীর মতো কাজও করে। স্বেচ্ছায় শুয়োর প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়েছে। তার শ্যালেটের কাছে অনেকটা ফাঁকা জায়গা জুড়ে সাদা শুয়োরের চাষ হয়।
গনেশ ছেত্রীর আরও দু-একরের একটা জমি আছে একটু দূরে এই বড় রাস্তার পাশে। ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’ এর সাফল্যে উৎসাহিত ম্যাডাম কর্মার ইচ্ছে সেখানে আর একটি রিসর্ট বানানো। তার দু’ই ছেলে দু’জনের জন্য দু’টি রিসর্ট করে যেতে পারলে ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মারামারি হবে না। গনেশ ছেত্রী কিছুতেই চাইছে না ওই শেষ সম্বল টুকু হাতছাড়া করতে। তার মনের ইচ্ছে, যদি মেয়ে কোনওদিন ফিরে আসে, তাকে তো কিছু দিতে হবে। বনবিহারী একেবারে আশা ছেড়ে দেননি। গনেশজীকে বুঝিয়ে যদি ওই জমিটা পাওয়া যায়। তাইতো গনেশজীকে খুশি করতে চানুমতিকে কিশানগঞ্জ থেকে তুলে আনার ঝুঁকি নিয়েছেন।
বনবিহারী ঝিঁ ঝিঁ ডাকা সন্ধের ভেতর করোনেশন ব্রীজের উপরে গাড়ি তুলে দেখলেন নিচে তিস্তার জলে জ্যোৎস্না লাফাচ্ছে। ভারি ভাল লাগছে তার। মন ভাল করা কথা বলতে ইচ্ছে করছে এখন। বললেন, “ভাবিজী আপনার বাবা গনেশ ছেত্রী খুব ভাল মানুষ। আমাদের রিসর্টেই তো থাকেন। যা কিছু রোজগার করেন সব আপনাকে পাঠিয়ে দেন। নিজের জন্য কিছুই রাখেন না। যেসব জমি জিরেত আছে, তার খেতি করেন লোক দিয়ে। কিন্তু সব ফসল আমাদের রিসর্টে কম দামে সাপ্লাই করেন। বলেন, কে খাবে। বলেন, আমার তো কেউ নেই। বউ তো সেই কবে মারা গিয়েছে। মেয়েটাও কাছে নেই। কত যুগ হয়ে গেল তাকে দেখি না। মরার আগে যদি একবার দেখতে পেতাম!”
বাবার কথা ওঠায় চানুমতির ঝেঁপে কান্না এল। বাবাকে ঠকিয়ে সে তো সেই কোনকালে কিশানগঞ্জে সটকে পড়েছিল ভিন জাতের ছেলে শিবপ্রসাদ চক্রবর্তীর সঙ্গে। তার হদিশ না পাওয়ায় যে মা মারা গেছে তা ভাল করে জানে চানুমতি। তার বুক ফেটে কান্না আসতে লাগল। এজন্যই তো চানুমতি নিজেকে নিপীড়িত হতে দেয় মালবাবুর কাছে। নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে শরীরে নির্যাতন নিয়ে। চানুমতি চোখে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কান্না ঠেকায়। তার বুক ধড়ফর করছে। বাবাকে কেমন দেখবে। বাবা তাকে কেমন করে নেবে। সে কি নিজে কান্না সামলাতে পারবে! 🍁(চলবে)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।







