Sasraya News Sunday’s Literature Spacial | Issue 72, 6th July 2025, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ৬ জুলাই ২০২৫, সংখ্যা ৭২। রবিবার

SHARE:

সম্পাদকীয় 

মৃত্যু হচ্ছে মায়া! একথা আমরা সকলেই জানি। আরও জানি যে জন্ম নিলে মৃত্যু হবে। জেনেও আমাদের মধ্যে “কিন্তু” থেকে যায়! ভোগ বিলাসিতা হিংসা তছরূপ রাহাজানি ছিনতাই সবরকম সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে। অর্থ আমাদের সমাজকে একে অপরের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমি একজন মানুষ হয়ে উঠবার স্বপ্ন দেখলেও তার মর্যদা নেই কারণ একটাই একটাই অর্থ। ১০০ কোটিতে যদি একজন উদাহরণ হয়ে ওঠে তাহলে সাড়ে সাতশো কোটিতে ৭ জন উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা হাস্যকর বিষয়। কারণ অকারণ না ভেবেই ও পাড়লো তুই কেন পারবি না; সে পারলো তুই কেন পারবি না! এই বিষয় টিও না বিবেচনা করেই বলে থাকি আমরা। আসলেই ভুল। এই ভুল স্বীকার করবার ক্ষমতা আমাদের নেই। আর থাকবেই বা কি ভাবে। আমিও তো ঐ ভাবেই ছোট থেকে কুড়িয়ে এসেছি সমস্ত শব্দ। তাহলে আমাদের প্রথাগত ভাবেই দুর্বল হয়ে থাকি। এই বিষয় থেকে বেরিয়ে এসে। প্রকৃত প্রতিভার বিকাশ ঘটান প্রয়োজন। না হলেই ধর্ম নিয়ে যা চলছে তা লজ্জার বিষয়। যদি ঈশ্বর সামনে থাকতেন তাহলে অবশ্যই তিনি এই সমাজ থেকে দূরত্ব তৈরী করে চলে যেতেন। তিনি তো কাউকেই ধর্ম বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জন করতে সৃষ্টি করেননি। তিনিও একটি সুন্দর সৃষ্টির আনন্দ নিতে চেয়েছেন। অথচ কাল জয়ের রহস্যের পার্থক্য তৈরী করছেন মানুষ। 🍁

 

🍂মহামিলনের কথা
 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
যে আমাকে সহস্রনামের দ্বারা স্তব করতে ইচ্ছা করে—যদি সব পাঠে সমর্থ না হয়,মাত্র একটি শ্লোক উচ্চারণ করলেও আমি স্তুত হয়ে থাকি। স্তবকারীকে আমি বড় ভালবাসি।
স্তবকারীকে তুমি ভালোবাস কেন?
দেখরে জীব আমার অংশ। আমাকে ভুলে দেহাত্মবোধে উন্মাদ হয়ে কত দুঃখ ভোগ করে। জন্ম-জন্মান্তর ধরে বহু বহু আকাঙ্খা করে কত কষ্ট পায়। সে যা চায় আমি তাই হয়ে তাকে আত্মদান করি।
তুমিই সব হও?
হাঁ,যখন জীব স্ত্রী চায়, আমি স্ত্রী হই ; যখন সে পুত্র, মিত্র, আত্মীয়-স্বজন মান সম্ভ্রম বিদ্যা তপস্যা চায়,আমি তাই হয়ে তার সেবা করি,কিন্তু তাতে অশান্তি ভিন্ন শান্তি পায় না। যতক্ষণ বহুদর্শন থাকে,ততক্ষণ শান্তির আশা করা উন্মাদ কল্পনা। সহস্র সহস্র জন্ম যাতনা পেয়ে যখন সে প্রকৃত আমাকে চায়,তখন আমি তাকে ধরা দিই। প্রকৃতরূপে চাইবার সহজ সরল পথ হল আমার নাম করা, স্তব করা।

বল, তোমার মুখে তোমার স্তব শুনতে বড় ভাল লাগে।
আমার মুখ ভিন্ন আর মুখ কি আছে? জগতে যত মাথা আছে,যত হাত পা জ্ঞান কর্ম্মাদি ইন্দ্রিয় আছে,সব আমার। আমি সব হয়ে সব ব্যাপ্ত করে অবস্থান করি। অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ডে অনন্ত অনন্ত কোটি স্থাবর জঙ্গম হয়েও আমি ফুরিয়ে যাই না। পূর্ণ আমি অনন্ত সেজেও স্বরূপে সেই পূর্ণই থাকি। তোর কি আমার এই রূপ দেখতে ইচ্ছা করে না?
আমি তোমার। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা তুমি সব নাও। তোমার যা ইচ্ছা তাই কর। আমি আর তোমায় কিছু বলবো না। আমি তোমার শরণাগত।
হাঁ,এ কথাটি স্মরণ রাখতে চেষ্টা কর,আমি তোর যোগক্ষেম বহন করবো,অনন্য ভক্তের যোগক্ষেম আমিই করে থাকি।
তোমার ‘তবাস্মি’ এ মন্ত্রটি আমাকে চিরদিনের জন্য দাও। আমি যেন একপল মাত্র ‘তবাস্মি’ এই মহামন্ত্রটি না ভুলে যাই।
বল্,কেবল বল্—
কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ! কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ!
আবার বল্—
জয় ব্রজনাথ জয় জয় ব্রজনাথ।
জয় ব্রজনাথ জয় জয় ব্রজনাথ॥
🍂ঋণ : শ্রীশ্রীনামামৃত লহরীশ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

🍂প্রচ্ছদ গদ্য

 

উল্টো রথ

রীতা বিশ্বাস পান্ডে
ছবি : সংগৃহীত

 

আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হয় এক মহাযাত্রা। পুরুষোত্তম শ্রীক্ষেত্র পুরী যেন এক জীবন্ত লীলাক্ষেত্র, যেখানে ভক্তির রঙে রাঙা হয় প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি মানুষ। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে ভেসে আসে জয়ধ্বনি, “জয় জগন্নাথ!” তিনটি বিশাল রথ, তাদের চূড়ায় পতপত করে ওড়ে বিচিত্র সব পতাকা নন্দীঘোষ, তালধ্বজ আর দর্পদলন। রথের চূড়ায় বসে থাকা কাঠের মূর্তিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে ভক্তদের ভালোবাসায়। এই দিন জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রা তাঁদের মূল মন্দির ছেড়ে মাসির বাড়ি, অর্থাৎ গুণ্ডিচা মন্দিরের দিকে যাত্রা করেন। এ যেন এক রাজকীয় শোভাযাত্রা, যেখানে রাজা নিজে বেরিয়ে আসেন প্রজাদের মাঝে।

উল্টো রথের দার্শনিক তাৎপর্য সম্পর্কে জানা যায়,
উল্টো রথ নিছকই একটি উৎসব নয়, এর একটি গভীর দার্শনিক দিক আছে। রথযাত্রা যেন জীবাত্মার পরমাত্মার দিকে যাত্রা। সংসার নামক কর্মক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যেমন ঈশ্বরের দিকে ধাবিত হয়, ঠিক তেমনই জগন্নাথদেব তাঁর মন্দির ছেড়ে গুণ্ডিচায় যান। আর এই আট দিনের বিশ্রাম যেন জীবনযুদ্ধের মাঝে একটু বিরতি, আত্মানুসন্ধানের সময়।

গুণ্ডিচা মন্দিরে বলরাম, সুভদ্রা আর জগন্নাথ আট দিন ধরে অবস্থান করেন। এই আটটা দিন যেন ভক্তদের জন্য এক অন্যরকম উৎসবের আবহ। মন্দির প্রাঙ্গণে নিত্য পূজা, ভজন-কীর্তন আর আরতি চলে। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়টুকুতে জগন্নাথদেব যেন আরও বেশি করে তাঁর ভক্তদের কাছাকাছি থাকেন, তাঁদের প্রার্থনা শোনেন। পুরীর আকাশ-বাতাস এই ক’দিন যেন এক অলৌকিক আনন্দের সাগরে ডুবে থাকে। এইসময় মেয়েরা আলপনা আঁকে তাদের দুয়ারে,আর পুরুষেরা মেতে ওঠে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে। এই আট দিন যেন একটি বিরতি।মূল মন্দিরের নিয়মের বাইরে এক উন্মুক্ত পরিবেশে দেবতারা যেন একটু বিশ্রাম নেন, ভক্তদের সঙ্গে একাত্ম হন।এরপর আসে নবম দিন, আষাঢ় শুক্লপক্ষের দশমী তিথি। এই দিনটিই উল্টো রথ বা বহুড়া যাত্রা নামে পরিচিত। আট দিন মাসির বাড়িতে কাটিয়ে জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রা ফিরে আসেন তাঁদের নিজালয়ে, শ্রীমন্দিরে। এই প্রত্যাবর্তন যাত্রা সাধারণ কোনো ফিরে আসা নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ তাৎপর্য। গুণ্ডিচা মন্দির থেকে রথগুলো যখন আবার মূল মন্দিরের দিকে চলতে শুরু করে, তখন ভক্তদের উন্মাদনা যেন আগের থেকেও বেশি হয়। রথের দড়ি টানার জন্য এক অন্যরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সবার একটাই লক্ষ্য, একবার যদি রথের দড়ি ছুঁয়ে দেওয়া যায়, যদি টানার সুযোগ মেলে, তাহলে জীবন ধন্য। এই দড়ি টানা শুধু শারীরিক শক্তি নয়, এ যেন ভক্তি আর বিশ্বাসের এক সম্মিলিত প্রকাশ। রথের চাকার ঘর্ষণে তৈরি হয় এক অদ্ভুত সুর, যা ভক্তদের হৃদয়ে গভীর শান্তি নিয়ে আসে।

উল্টো রথের দার্শনিক তাৎপর্য সম্পর্কে জানা যায়,
উল্টো রথ নিছকই একটি উৎসব নয়, এর একটি গভীর দার্শনিক দিক আছে। রথযাত্রা যেন জীবাত্মার পরমাত্মার দিকে যাত্রা। সংসার নামক কর্মক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যেমন ঈশ্বরের দিকে ধাবিত হয়, ঠিক তেমনই জগন্নাথদেব তাঁর মন্দির ছেড়ে গুণ্ডিচায় যান। আর এই আট দিনের বিশ্রাম যেন জীবনযুদ্ধের মাঝে একটু বিরতি, আত্মানুসন্ধানের সময়। উল্টো রথের ফিরে আসা হল জীবাত্মার আবার সংসারের পথে ফিরে আসা, কিন্তু এবার এক ভিন্ন রূপে। এই ফেরা যেন এক নতুন চেতনা নিয়ে ফেরা। ঈশ্বরের সান্নিধ্যে থেকে জীব যেমন নতুন শক্তি, নতুন উপলব্ধি লাভ করে, তেমনি উল্টো রথের মাধ্যমে দেবতারা যেন তাঁদের ভক্তদের জন্য সেই দিব্য শক্তি বয়ে নিয়ে আসেন। এটি আসলে এক চক্রপূরণ, এক জীবনের পূর্ণতা। ঈশ্বর আমাদের মাঝে আসেন, আমাদের দুঃখ-কষ্টের ভাগীদার হন, তারপর আবার আমাদের মাঝে থেকেই স্বস্থানে ফিরে যান, কিন্তু তাঁর আশীর্বাদ রেখে যান।

যখন রথগুলো ধীরে ধীরে শ্রীমন্দিরের সিংহদ্বারে এসে পৌঁছায়, তখন চারিদিকে এক মিশ্র অনুভূতি ছেয়ে যায়। একদিকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে উৎসব শেষের বিষণ্ণতা। দেবতারা মন্দিরে প্রবেশ করেন, আর ভক্তদের হৃদয়ে রেখে যান এক গভীর শান্তি আর আগামীর রথের জন্য এক মিষ্টি অপেক্ষা। উল্টো রথ শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়, এটি ভক্তি, বিশ্বাস, আর ঐক্যের এক অনবদ্য গাথা, যা প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয়।🍁

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
শুরু হচ্ছে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কবি তৈমুর খানের জীবন। বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কীভাবে বয়ে গেয়েছিল উপলব্ধির স্রোত। কেমন করে প্রকৃতি ও জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। কেমন করে জীবনে এলো ব্যর্থতা। সেসব নিয়েই নানা পর্ব

 

একটি বিষণ্ণরাতের তারা

তৈমুর খান

চৌত্রিশ.

পনেরো দিনের মধ্যেই খামড়া ভাবকি হাইস্কুলে জয়েন করতে হবে 

সবচেয়ে বড় কষ্টের হল বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও বিয়ে করতে না পারা। সমাজের মূর্খ রিক্সাওয়ালা, রাজমিস্ত্রি, শ্রমিক, চাষি এদের ক্ষেত্রে বিয়ের কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু শিক্ষিত বেকার সে যত উচ্চ শিক্ষিতই হোক যদি তার চাকরি না থাকে তবে তার কানাকড়িও মূল্য নেই। কেউ তাকে জামাইও করতে চায় না। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যাটিই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, চাকরি না পাওয়া লোকেদের সমাজে অযোগ্য, অলস, মস্তিষ্কহীন, বলদ অথবা শয়তান বলে মনে করে। আমি যতবারই মেয়ের বাপের বাড়ি গেছি বিয়ে করার উদ্দেশ্যে, তারা কেউই আমাকে জামাই হিসেবে গ্রহণ করতে চায়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলেছে, “ওরকম উচ্চশিক্ষিত আজকাল রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেয়ের চারহাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দেওয়া অনেক ভালো, তবুও ওরকম লোকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।” শিক্ষার ডিগ্রি নিয়ে কি তারা ধুয়ে জল খাবে? সত্যিই তাই হয়েছে। মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এসেছি এক রকম কাঁদতে কাঁদতেই। বিয়ের স্বপ্ন তাই অনেক আগেই মুছে গেছে। তবু কী জানি, মাঝে মাঝে হৃদয়খানা উদাস হয়ে ওঠে। এক অলৌকিক জগতে কল্পনায় ভর করে চলে যাই। সেখানে অনেক ফুলের বাগানে ঘুরতে থাকি। সুন্দর সুন্দর পরিরা ডানা খুলে রেখে আমার সঙ্গ দেয়। মনে মনে তাদের সরু মজা ধরে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে থাকি। কখনো কখনো তাদের লম্বা চুল দুই হাতে সরিয়ে গোলাপি ঠোঁট আর শ্বেতকরবীর ফুলের মতো কপালে চুমু খাই। স্বপ্নেও তারা কখনো কখনো ঘোরাফেরা করে। সেইসব স্বপ্নে অনেক দূর তাদের পেছন-পেছন চলে যাই। তারপর দেখি কোথাও এক অচেনা শহরের এক কোণে একটি ঘরে দুজনে বসে আছি। ওকে বলতে থাকি, মুখ ফিরিয়ে আছো কেন? সত্যি সত্যি সত্যি তিন সত্যি, আমি তোমাকে ভালোবাসি! বিশ্বাস করো না? তাহলে আমার হৃদয়খানা দ্যাখো, বলেই বুকখানা ফেড়ে দেখাতে চাই। অমনি সে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসতে থাকে। আমার ভ্রম দূর হয়, এ তো আমারই প্রিয় ছাত্রীটি মণিমালা! হ্যাঁ, মণিমালা। একটুও ভুল বলছি না। কপালের চুলগুলো মুখটাকে ঘিরে রেখেছে। চোখ দুটো দারুণ দীপ্ত।উর্বশীকে কখনো দেখিনি, কিন্তু আমার কাছে এ তো উর্বশী থেকেও অনেক গুণ বেশি সুন্দরী। তার শরীর যেন ঊর্বর ভূমি। পরিপূর্ণ শস্য-শ্যামলিমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এক অনাস্বাদিত শিহরন আর ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। আমি কিছুতেই ছুঁতে পারছি না থাকে। আমার হাত কেঁপে যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে থাকলাম তার কথা। ভীষণ তৃষ্ণাও পেল আমাকে। কিন্তু উঠে গিয়ে বোতল থেকে জল গড়িয়ে খাব সেরকমও সামর্থ্য হলো না। কাত মেরে পড়ে থাকলাম। শরীর ঘর্মাক্ত হয়ে উঠলো।

বৌদির কথার উত্তরে আমি হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলতে পারিনি। অনুমান যে সত্যিই তা বলাই বাহুল্য। বৌদি তখন বলেছিলেন, ওর প্রেমে পড়াই স্বাভাবিক। একশো মেয়ের মধ্যেও ওকে আলাদা করে চেনা যায়।
পুরুষ হৃদয়টি বারবার জোড়া দিতে চেয়েছি কিন্তু তা আর জোড়া লাগেনি। কলেজ জীবন থেকে শুরু করে ঘুরতে ঘুরতে এই বেকার জীবনেও সেই ভাঙা হৃদয়েরই একটানা বিরহের সুর আমাকেই শুনতে হয়েছে।

মণিমালা শহরের মেয়ে। বাংলা কবিতার উচ্চারণ তার মুখে আমাকে মুগ্ধ করে। নজরুলগীতিও এমন গাইতে পারে যে সুরের ঝরনা বয়ে যায়। মাত্র দু-বছরই তাকে পড়িয়েছি। বাংলা সাহিত্যে সে আমার এক নামকরা ছাত্রীও বটে। মনের অগোচরে কখন সে আমার হৃদয়ে প্রবেশ করেছে বুঝতেও পারিনি। সমাজে এত ঘাত-প্রতিঘাত, অভাব অভিযোগ যন্ত্রণার মধ্যে পথ চলেছি যে, হৃদয়ের মধ্যে তার প্রবেশ অনুভব করতেও পারিনি। তাই অবচেতনের আশ্রয়ে তার এত স্নিগ্ধতা স্বপ্নের মধ্যে জেগে উঠেছে। বুঝতে পারছি, সব সময় জীবনকে আমরা তথা চেতনাকে ইচ্ছে করে ও বেঁধে রাখতে পারি না, বা জোর করে পরিচালিত করতে পারি না। অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজস্ব নিয়মে চলতে চায়। অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন হয়ে ভাবতে চায় নিজেদের কথা। ছত্রিশ বছর বয়সেও পদার্পণ করে নিজের সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়ার কথা বলে বেড়ালেও আমার চেতনাপ্রবাহ ভিন্ন পথে প্রবাহিত হতে চেয়েছে। তাই সে চেয়েছে নারী সান্নিধ্য, চেয়েছে ভালোবাসা, হৃদয়ের একান্ত উষ্ণতা। তাই স্বপ্ন তার কখনো বিচ্ছেদ ঘটায়নি। হৃদয় তার নিজস্ব পথই অন্বেষণ করেছে। কিন্তু চেতন মন অবচেতনের এই প্রতিক্রিয়াকে কখনো প্রকাশ করতে চায়নি। একপ্রকার জোর করেই তাকে শাসন করেছে। ব্যঙ্গ করে বলেছে, যার চাকরি করার মুরোদ হয়নি, যার সামাজিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি, সে কেমন করে একটা শহুরে অভিজাত ঘরের মেয়েকে পাওয়ার স্বপ্ন দ্যাখে? যার চালচুলো নেই সেও রাজকুমারের দাবি করে? তারপর হাহাহা করে হেসেছে। নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়েছি । নিজেকে নিজেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছি। তাই ওপথে আর পা বাড়াতে চাইনি। মাথা নিচু করে টিউশান করিয়েছ। মাথা উঁচু করে ডানহাতে চায়ের কাপ তুলে নিয়েছে। তারপর ভালো মানুষের মতো সাইকেলের বেল বাজাতে বাজাতে ফিরে গেছে নিজের ঘরে।

তবে সবার চোখ এড়ালেও একদিন অসীমদার বউ দীপা বৌদির চোখ এড়ায়নি। আমার উদাসীনতাকে তথা অন্যমনস্কতাকে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে উপলব্ধি করেছে।
—এরকম চুপচাপ দেখছি ক’য়েকদিন থেকেই, কী হয়েছে বলেন তো?
—কিছুই হয়নি এই টিউশান পড়ালাম তাই একটু আপনার কাছে বিশ্রাম নিচ্ছি।
—না, ঠিক বলছেন না, অন্য দিনের মতো হলে তো আপনি নতুন কবিতা শুনিয়ে দিতেন। নতুন কিছু লেখারও খবর দিতেন। বলুন না, কী হয়েছে আমাকে চুপিচুপি!
— সেসব লজ্জার কথা আর বলে কী করবো?
—আমাকে নিজের লোক ভাবুন, তারপর না হয় বলুন, আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।
— একটা মেয়েকে স্বপ্নে দেখেছি, বারবার দেখি?
— কে মেয়েটি আপনি চেনেন না?
— আমি চিনি, আমারই ছাত্রী!
— এই এখন পড়ালেন এদের মধ্যেই তো?
—হ্যাঁ, এদের মধ্যেই।
—তাহলে আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি যার কথা বলছেন সে মণিমালা।

বৌদির কথার উত্তরে আমি হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলতে পারিনি। অনুমান যে সত্যিই তা বলাই বাহুল্য। বৌদি তখন বলেছিলেন, ওর প্রেমে পড়াই স্বাভাবিক। একশো মেয়ের মধ্যেও ওকে আলাদা করে চেনা যায়।
পুরুষ হৃদয়টি বারবার জোড়া দিতে চেয়েছি কিন্তু তা আর জোড়া লাগেনি। কলেজ জীবন থেকে শুরু করে ঘুরতে ঘুরতে এই বেকার জীবনেও সেই ভাঙা হৃদয়েরই একটানা বিরহের সুর আমাকেই শুনতে হয়েছে। নজরুল জীবনীতে পড়েছিলাম :
“আজো শুনি আগমনী গাহিছে সানাই,
ও যেন কাঁদিছে শুধু—নাই কিছু নাই!”

২০০৩ সালের শেষ পর্বে এসে উপস্থিত হয়েছি। একদিকে টিউশান, অপরদিকে কলেজে পার্টটাইম শিক্ষক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছি। টানাপোড়েনের সংসার। আমার পরের দুটো ভাই মাঠে-ঘাটে কাজ করে ঘাস কেটে জীবিকার রসদ সংগ্রহ করছে। দু’টি বোনও শাক-পাত তুলে এনে সংসারে যোগান দিচ্ছে। এক আধ-বেলা খেয়ে না-খেয়েই চলে যাচ্ছে আমাদের দিন। এমনই এক বিষাদ করুণ ভাদ্র-বিকেলে ডাক পিয়ন এসে দরজায় উপস্থিত হলেন: “সুখবর! তৈমুর, সুখবর! চাকরির চিঠি!”
পিয়নের কথা শুনে বিস্মিত হলাম। সত্যিই তিনি একটি কাগজে সই করিয়ে নিয়ে আমাকে দিলেন সেই চিঠি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার উল্লিখিত ছাপানো অক্ষরে লেখা আমার নাম। হাতে চিঠি নিয়েই মুখটি রাঙা হয়ে গেল। উত্তরাঞ্চল জোন থেকে এসেছে এসএসসি অফিসের চিঠি। পনেরো দিনের মধ্যেই খামড়া ভাবকি হাইস্কুলে জয়েন করতে হবে।
কোথায় গো খামড়া ভাবকি হাই স্কুল?
না কেউই বলতে পারলেন না। জঙ্গিপুর ব্লক টু। জেলা মুর্শিদাবাদ। পরে অবশ্য খোঁজ পেয়েছিলাম আমার এক কাকার কাছ থেকেই। কাকা বলতে আমার বাবার মেজো কাকার ছেলে আবুল খায়ের। চাকরি নিয়ে দীর্ঘদিন বহরমপুরে রয়েছেন। মুর্শিদাবাদের প্রায় সমস্ত এলাকাই তাঁর পরিচিত। তিনিই বললেন, খামড়া ভাবকি বলে গ্রাম দু’টি বর্তমানে পদ্মা গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই প্লট দু’টিও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। শুধুমাত্র স্কুলটি ওই নামেই থেকে গেছে বাংলার মাটিতে। রঘুনাথগঞ্জ থেকে গঙ্গা পেরিয়ে সাইদাপুর পেরিয়ে তেঘড়ি গ্রামে এই বিদ্যালয়টি অবস্থিত। খুবই বড় ইস্কুল। অনেক ছাত্র-ছাত্রী। যত তাড়াতাড়ি পারি আমাকে গিয়ে জয়েন করতে হবে। প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। 🍁(চলবে)

 

ল্প🍂

 

ছায়ারাও থামে

মৌলী তরফদার

নীরব দুপুর। পাহাড়ের গায়ে আঁচড় কাটতে কাটতে কুঁচকে যাওয়া সবুজ, মাঝে রঙিন লণ্ঠনের মতো ফুটে থাকা বনফুল। দূরে ছোট্ট নদী, নাম তার মৃণালিনী। নামের মতোই কোমল, ধীরে বয়ে চলে।
মৃণাল নদীর তীরে বসে আছে জীতু। বয়স ত্রিশের ঘরে। শহরের নীল আলোয় অভ্যস্ত চোখে আজকের এই ছায়ামাখা দুপুর কেমন অচেনা ঠেকে। কলকাতার থকথকে ধোঁয়া, আর্থিক লক্ষ্য, কর্পোরেট প্রেজেন্টেশন, ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এসবের বাইরে যে এমন এক জগৎ আছে, তা যেন তার জানা ছিল না। আজ এই নির্জন জায়গায় বসে ও-হাঁফাচ্ছে। ক্লান্তি শরীরে নয়, মনেই। চিরকালীন চেনা পরিবেশ, শহুরে সম্পর্ক, মেকি হাসি থেকে ছুটে এসেছে এখানে। কিন্তু কেন এসেছে, এই প্রশ্নের উত্তর এখনও সে খুঁজে পায়নি।

কনক চলে গিয়েছে অন্য শহরে। ওর নতুন জীবন। জীতু জানে, এ বিচ্ছেদ অনিবার্য ছিল। কিন্তু আজ পাহাড়ের কোলে বসে, নদীর শব্দ শুনতে শুনতে, সে বুঝতে পারছে, ও কনককে হারায়নি। হারিয়েছে নিজেকেই। ভাবছিল জীতু। হঠাৎ পিছন থেকে আওয়াজ এল।
–একা বসে আছো কেন?

 

ক’দিন আগেই কনক বলেছিল,
–তুমি কি জানো জীতু, কেন আমরা একসঙ্গে থেকেও আলাদা হয়ে যাচ্ছি?
জীতু কোনও উত্তর দিতে পারেনি। কনকের কণ্ঠে ছিল না কোনও অভিযোগ। ছিল অদ্ভুত এক শীতলতা। যা কারও রাগ নয়, অভিমান নয়, শুধু নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।

ছ’মাস আগে, জীতু আর কনক এসেছিল এই পাহাড়ি গ্রামেই। ছুটি কাটাতে। তখনও সম্পর্কের ভিত নড়ে ওঠেনি। রাতভর তারা দেখেছিল আকাশে, ভোরের কুয়াশায় চা খেতে খেতে কথা বলেছিল জীবন নিয়ে। কনকের চোখে তখনও ছিল ভীষণ আগ্রহ, প্রশ্ন, আর তীব্র অধিকার। কিন্তু ধীরে ধীরে জীতুর ভেতর থেকে সব ফুরিয়ে যেতে লাগল। ও-কথা কমিয়ে দিল, ছোঁয়া কমিয়ে দিল, একসঙ্গে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা বন্ধ করল।
একদিন রাতে কনক বলল,
–তুমি কি অন্য কাউকে ভালবাস?
–না কনক। জীতু ধীরে বলেছিল।
– তাহলে কেন এই শূন্যতা? আমি তোমার চোখে কিছু দেখি না। তুমি কোথায় চলে গিয়েছ?
জীতু চুপ করে ছিল। কারণ সত্যিই ও-জানত না কোথায় গিয়েছে। শুধু মনে হত, সবকিছু থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কলকাতার কাচের বিল্ডিং, প্রফেশনাল সেমিনার, টিম মিটিং, টাকার হিসাব সব একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছে। এমনকী কনকের মুখও। ও নিঃশেষ হতে থাকল, কিন্তু বেরবার রাস্তা পেল না।

সেই সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছে। কনক চলে গিয়েছে অন্য শহরে। ওর নতুন জীবন। জীতু জানে, এ বিচ্ছেদ অনিবার্য ছিল। কিন্তু আজ পাহাড়ের কোলে বসে, নদীর শব্দ শুনতে শুনতে, সে বুঝতে পারছে, ও কনককে হারায়নি। হারিয়েছে নিজেকেই। ভাবছিল জীতু। হঠাৎ পিছন থেকে আওয়াজ এল।
–একা বসে আছো কেন?
মেয়েটির নাম মায়া। এই গ্রামেরই মেয়ে। বয়স জীতুর চেয়ে কিছু কম। সারাদিন কাজের ফাঁকে যখনই জীতুকে দেখেছে, নিজে থেকে এসেছে কথা বলতে। আজও এসেছে। সাদা-কালো ছাপা কুর্তি, মাথার খোঁপায় লাল জবা। মুখে স্নিগ্ধ হাসি।
–শুধু বসে ছিলাম, জীতু জবাব দিল।
–তুমি কি কিছু খাবে? দুপুরের খাওয়া হয়েছে?
– না, খিদে নেই।
মায়া ওর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল,
–তুমি খুব দুঃখী মানুষ। জানো? জীতু ম্লান হাসল। বলল,
–দুঃখ… আমি জানি না মায়া, ঠিক দুঃখ কিনা। কোথাও গিয়ে যেন কিছু নেই। কিচ্ছু নেই। শূন্য।
মায়া বসল ওর পাশে। মৃদু বাতাসে লাল জবা নড়ছে। নদীর ওপারে ধানক্ষেতে কাক ডাকছে।
–সব ফুরিয়ে গেলে তো মানুষ মরে যায়, বলল মায়া।
–হয়ত আমি মরে গিয়েছি। শুধু টেরটি পাইনি।
মায়া কিছু বলল না। ওর শান্ত চোখে নদীর মত জল জ্বলজ্বল করছিল। এই মেয়েটি, যার জীবন প্রতিদিন ধানকাটা, নদীতে মাছ ধরা, রাতে লণ্ঠনের আলোয় গল্প সেই মেয়েটির চোখে এমন এক শান্তি আছে যা জীতুর মেট্রো লাইফে কখনও ছিল না।

রাতে, মাটির ঘরটির তক্তপোশে শুয়ে শুয়ে আবার কনককে ভাবল জীতু। ওর শেষ কথাগুলো মনে পড়ল।
–তুমি জানো জীতু, সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে শুধু প্রেম থাকলেই হয় না। দায়বদ্ধতা লাগে, যত্ন লাগে। তুমি সেগুলো দিতে পারো না। আমি আর পারছি না।
জীতুর মনে হয়, সত্যিই কনক সঠিক বলেছিল। ওর মধ্যে ‘দায়’ নেওয়ার মানসিক শক্তি নেই। ও চেয়েছিল নিস্তব্ধতা। যা এই পাহাড়, এই নদী দিয়েছে।
পরের দিন সকালে মায়া ওকে নিয়ে গেল বনের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি জলপ্রপাতে। হাঁটতে হাঁটতে মায়া বলল,
– তুমি ফিরবে না কলকাতায়?
–ফিরতে হবে। অফিস আছে। বাড়ির লোন আছে। আরও কিছু দায়বদ্ধতা…
–তুমি কী চাও?
প্রথমবার ঋভু থমকাল। সত্যিই তো, ও কী চায়? কনককে? নাকি এই নির্জনতা? নাকি নতুন কোনও ভালবাসা?
ওর গলা ভিজে এল। বলল,
–আমি শান্তি চাই মায়া। শুধু শান্তি।
মায়া তাকাল না। মৃদু হেসে বলল,
–শান্তি চাও? তবে সব ছেড়ে এখানে থেকে যাও। দেখবে কত শান্তি। কিন্তু মানুষ পারবে না। মানুষকে ফিরতেই হয়, না হলে মন খালি হয়ে যায়।

সন্ধ্যার অন্ধকার নামল। জীতু চলে যাবে কাল। মায়া জানে ওর আর কোনওদিন ফেরা হবে না। জীতুরও তাই মনে হয়।
বিদায়ের আগে মায়া বলল,
–তোমাকে দেখে মনে হয় তুমি সারাজীবন কাঁদবে। কিন্তু বাইরে নয়, ভেতরে।
–হয়ত তাই। কিন্তু এই কান্নাই আমার শান্তি মায়া।
বাসে ফিরছে জীতু। জানলার বাইরে পাহাড়ের রেখা মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। ওর মনে হচ্ছে, কনককে ও-ভালবাসত, তবু যত্ন দিতে পারেনি। মায়াকে সে ভালবাসে না, তথাপি ওর কাছ থেকে যত্ন পেয়েছে। এই জগৎ বড্ড অদ্ভুত। হয়ত মানুষ প্রকৃতিকে ভালবাসে, মানুষকে নয়। অথবা মানুষ মানুষকে ভালবাসে, প্রকৃতিকে নয়। কিন্তু যেদিন দু’টোই হারায়, সেদিন তার ভেতরেই কেবল মৃত্যু বাঁচে।
জীতু জানে, আজ থেকে সে কনককে ফোন করবে না। ওকে নতুন জীবনে শান্তি খুঁজতে হবে। হয়ত জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ও সেই শান্তি পাবে না। কিন্তু এই পাহাড়ি নদীর মতনই, সে বয়ে যাবে… কোথাও না থেমে, কোথাও না পৌঁছে। আসলে জীতু জানে, কিছু সম্পর্ক বাঁচে না। কিছু বিচ্ছেদই মানুষের মুক্তি। কিন্তু মুক্তি মানেই শান্তি নয়। সুখও নয়। কিন্তু কী? অন্যজীবনের টান? কখনও কখনও মুক্তি মানে, নতুন শিকল?

এখন, এই বিকেলের শেষ আলোয়, জীতু জানে, তার জীবন আগুনের মতন শান্ত। এবং সে কথা জানার মতো কেউ একজন নেই। থাকবে না। এই নীরবতাই তার ভবিতব্য। বাতাস সব লিখে নিচ্ছে। বাতাসে সব জমা থাকে তাই না? 🍁

🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

 

কিশানগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়

খানিকটা অপরাধীর মতো মুখ করে চায়ের গ্লাসে নজর চালিয়ে চুমুক দিতে দিতে বোঁদে ভাবল, ঠিক কথা। এরা খুব যে একটা ভেবে টেবে হিংসা করে তা না। মনে পড়ল, টিভিতে দেখেছিল, দার্জিলিং-এ ম্যাল-এর মতো জনবহুল জায়গায় মদন তামাং বলে এক নেতা পড়ে আছে। তার গলা থেকে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। পরে জেনেছিল, তার পরিচিত লোকেরাই কুঁকরি ঝেড়েছে। কাগজে বের হল কীসব মুক্তি মোর্চার নেতা গুরুঙ্গের নাম।
বোঁদে অনেকটা গভীর হয়েছে। পঙ্কজ থাপা বলেছে,” বেশি জানাজানি কোরো না বন্ধু। এদের হাত তো অনেক লম্বা, আমারও বিপদ হতে পারে। তবে তুমি জেনে রাখো কুকুর আমি তার মালিকের কাছে ফেরাবই। কুকুরের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না।”
বোঁদের সহ্য হচ্ছিল না যে। গুরুর কষ্ট সত্যি প্রাণে ধাক্কা দিয়েছে। ফেলুদার সাথে অনেকদিন থেকে আছে। সে যেটুকু যা দাঁড়িয়েছে তা ফেলুদার জন্য। ফেলুদা সেদিন আক্ষেপ করছিল, “হেরে গেলামরে। পঞ্চায়েতের টিকিটটা মনে হয় দেবে না। ওই চাঁদ মিঞাকেই টিকিট দেবে ভেবেছিলাম, পঞ্চায়েতের কাজ করার যদি সুযোগ পাই আমার সামর্থ আর ভালবাসা দিয়ে গরিব মানুষদের জন্য কিছু একটা করব। কিন্তু দু’দুটো গায়েব। আর তার কিছুই হদিশ হচ্ছে না। আমার গায়ে ফেলের দুর্নাম সেঁটে দেবার জন্য তো ওঁত পেতে বসে আছে ওরা। এতদিন পাইনি, আর পাব না। মনে হয় কুকুরটাকে মেরে ফেলেছে এতদিনে। ওই ধর্মনগরের মিশ্রাজীর গোষ্ঠী। ওরা চায় চাঁদ মিঞা যেন টিকিট পায়। তাহলে কিশানগঞ্জের পঞ্চায়েতের ট্রান্সপোর্টের কন্ট্রাক্ট সব হাতাতে পারবে। মনে হয় ওরাই কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়েছে। মরে না গেলে এতোদিনে ঠিক হদিশ করে ফেলতাম রে!”
সে যে একটা আশার আলো দেখেছে, তা বলতেও পারছে না গুরুকে। পঙ্কজ থাপার নির্দেশ। পঙ্কজের নির্দেশ মতো বোঁদে বনবিহারী লোকটা আসলে কে তা জানতে চায়। মানে সে কালিম্পং-এর ম্যাডাম কর্মার বর না অন্য কেউ তা স্পষ্ট হতে চায়। এখানে গুরুকে দরকার। সে ফেলুদাকে অল্প অল্প করে শুধু সন্দেহের কথা বলেছে। পঙ্কজ থাপার কোনও গল্প বলেনি। তবে এটা কায়দা করে বলেছে যে বনবিহারী পান্ডের কাছেই কুকুরের হদিস আছে। তাকে একটু নজরে রাখলে বেরিয়ে পড়বে সব।

মালবাবুর গলায় হতাশা। খুব আন্তরিক গলায় বনবিহারী বলেন, “আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, সেসব পেয়ে যাবে। এখনও তো ফাইনাল বিল পাইনি। পি ডব্লিউ ডি আগে কমপ্লিশন রিপোর্ট দিক, তবে তো ওরা ছাড়বে! আমিও ঘরে লাভ তুলিনি এখনও। সবার কাছ থেকে নেয়া মূল টাকা শোধ করছি। শেষ টাকাটা এলে সবার লাভ আমি দিয়ে দেব। তুমি তো জানো আমি কারও টাকা মারি না।”

**

ফেলুদা তেমন আশ্বস্ত না হলেও বোঁদের কথা কোনওকালেই ফেলেন না। বনবিহারী গান্ধীচকে থাকেন। নানা রকমের কারবার তাঁর। কখনও রেডিমেড গার্মেন্টস-এর সাপ্লাই করেন। কখনও রোড সারান। তার মাল্টিপার্পাস কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন। হেড অফিস গান্ধীচক, কিশানগঞ্জ। কিশানগঞ্জের টেলিফোনের টিডিএম সাহেবকে বনবিহারীর ল্যান্ডলাইন নাম্বার ০৬৪৫৬-২২৩১২০ আর মোবাইল নাম্বার ৯৭৭৫৯৫৫৪৮৩ দিয়ে গত তিন মাসের কল লিস্টটা যদি পাওয়া যায়, বলে রিকোয়েস্ট করলেন ফেলুদা। টিডিএম অখিলেশ সাহেব ফেলুদাকে খুব পছন্দ করেন। তিনি বলেছেন, “দো-দিন রুক জাইয়ে, মিল যায়েগা। প্রিয়রঞ্জন ছুট্টিমে হ্যায়। উনকো আনে দিজিয়ে।”
বোঁদে সকাল সকাল বাড়ির ছাদে বড় এক মাগ লাল চা, আতশ কাচ আর কল লিস্ট নিয়ে বসেছে। ফেলুদা কললিস্ট বাছাই করার কাজ দিয়েছেন। বোঁদে সঙ্গে নিয়েছে স্বপনকুমারের একটা বই, একটা ডায়েরি আর কলম। ওর যা যা খটকা মনে হচ্ছে, ডেট অনুযায়ী সাজিয়ে রাখছে।
দীপক চ্যাটার্জীর অ্যাসিস্টান্ট রতনলাল তো এরকমই করত! কোথায় কী নতুন দেখা-দেখি হচ্ছে লিখে রাখছে বোঁদে। কালিম্পং-এর ঘটনা তো বলতে পারেনি ফেলুদাকে। যদি বোঁদে ধরতে না পারে কালপ্রিট, এই ডায়েরি তুলে দেবে ফেলুদাকে। সে নিশ্চই পারবে।
ছাদ থেকে দেখা যায় নতুন ফ্লাইওভারটা প্রায় হয়ে এসেছে। বোঁদে জানে মুখ্যমন্ত্রী এসে উদবোধন করবেন। পঞ্চায়েতের ভোটের আগেই শেষ করা গিয়েছে, তিনি ব্যাপারটায় বেজায় খুশি। শুধু এ অঞ্চলে নয়, অন্যান্য জায়গাতেও এই ফ্লাইওভারের কাজ দেখিয়ে উন্নয়নের কথা বলে ভোট নেওয়া সহজ হবে। পঞ্চায়েত ভোট আসতে আর মাসখানেক দেরী।
উদ্‌বোধনের জন্য ফ্লাইওভার সাজানোর তোড়জোর চলছে। ডেকরেশনের কাজ বোঁদের। লোকাল সাইট থেকে ভাঙাচোরা আর আর মালপত্র সরানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। জায়গাটা সাফ-সুতরো হয়ে গেলে গোটা ফ্লাইওভারে রঙের কাজ শেষ করবে বনবিহারী পাণ্ডের দল। এই ফ্লাইওভারের সাব কন্টাক্ট বনবিহারীর। ক’দিন আগে বোঁদে শুনেছে এই কাজে প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা ইনভেস্ট করেছে মালবাবু। কিন্তু মালবাবু এত টাকা পান কোথা থেকে!
বনবিহারীর ল্যান্ডলাইনের কললিস্ট ঘেঁটে তেমন কিছু পাওয়া গেল না। ফোন কল খুবই কম। কিন্তু তিন চারটে নাম্বারেই মাঝে মাঝে কথা হয়েছে। বোঁদে ডায়েরিতে লিখে রাখল কোন কোন ডেটে বেশিক্ষণ কথা হয়েছে, আর তার নম্বর। পুরো লিস্ট চেক করে দেখল দুপুরের দিকেই কথা হয়। আর তা ০৩৫৫২-২৫৪৪৩৫, কালিম্পং-এর নাম্বারে। একটা দু’টো কল, বোঁদে তেমন মাথা ঘামাল না।
ল্যান্ড লাইন শেষ করে মোবাইল ফোনের কললিস্ট ঘাঁটতে গিয়ে দেখল সেখানেও খুবই কম কল হয়েছে গত এক মাসে। একটা কল হয় দুপুর সাড়ে বারোটায়। ফোন যায় কালিম্পং-এর ০৩৫৫২-২৫৪৪৩৫ নম্বরে। আর দু’দিন ভোরের দিকে কিশানগঞ্জেরই কোনও সিম-এ।
বোঁদে হঠাৎ যেন দুঁদে গোয়েন্দা হয়ে গিয়েছে। সে দেখল ল্যান্ড লাইন আর মোবাইল থেকে বনবিহারীর কলগুলির ভেতর এই দু’টি নম্বর কমন। বোঁদে কি মনে করে নিজের ট্যাগ কাজে লাগাতে চাইল। দিলীপ সিংকে ফোন করল। দিলীপ কিশানগঞ্জ টেলিফোন অফিস-এ ফ্রাণচাইজির লোক। দিনের বেলায় অফিসের ফাইফরমাস খাটে। রাতে এক্সচেঞ্জে থাকে। এখনই বনবিহারীর ফোন করার সময়। কাকে ফোন করছে, সে কোথায় আছে তা মোবাইল টাওয়ার দিয়ে আইডেন্টিফাই করা যায়।
দিলীপ জানাল মোবাইলে যার সঙ্গে কথা বলছেন বনবিহারী বাবু তার সিম কিশাণগঞ্জের হলেও কথা হচ্ছে কালিম্পং-এ। মানে বিহারের সিম বাংলায় ব্যবহার হচ্ছে। আশ্চর্য!
“দিলীপ তালে তুই দেখ কালিম্পং-এ যে নাম্বার ব্যাবহার হচ্ছে তার কল লিস্ট।”
দিলীপ এক ঘন্টার ভেতর জানিয়ে দিল ঐ নম্বার থেকে সব থেকে বেশি নেট চলেছে সপ্তাহে একটি বিশেষ দিনে শেষ রাতে। সেটাও হয় অন্য একটি কিশানগঞ্জ মানে বিহারের নাম্বারে। কালিম্পং-এ বসে কেন তবে বিহারের সিম! সেই কলটা হচ্ছে কালিম্পংয়েই। বোঁদে এই কলটার সময় আর তারিখ ডায়েরীতে নোট করল। সে উত্তেজিত। এক্ষুনি কি বন্ধু পঙ্কজকে ফোন করে জানিয়ে দেবে নম্বরটি! না আলোচনা করবে ফেলুদার সাথে! তালে কি পঙ্কজ থাপার কথাই সত্যি! রহস্য কি লুকিয়ে আছে কালিম্পংয়ের রিসর্টে!

**

থার্ড রানিং বিলের টাকাটা এসে গেছে পাটনা থেকে। মালবাবুকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দিয়ে বনবিহারী বলল, “শুনেছ, মুখ্যমন্ত্রী না কি খুব খুশি হয়েছেন, সময়ের আগেই কাজ শেষ হওয়ায়। তিনি কিশানগঞ্জের সবাইকে ধন্যবাদ দিয়েছেন।” সবজির ব্যাগে ভর্তি করে সব দু’হাজার টাকার নোট ঘরের ভেতর নামিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে বনবিহারী। টাকা নেবার সময়-ই বলা ছিল ক্যাশে ফেরত দিতে হবে।
“সে তো বুঝলুম বনবিহারী, পালংশাকের আঁটির নিচে পঞ্চাশ লাখই এনেছ। কিন্তু পঞ্চাশ নামিয়ে যদি পঁচাত্তর ঘরে না আসে তবে নামানোই বা কেন!” মালবাবুর গলায় হতাশা। খুব আন্তরিক গলায় বনবিহারী বলেন, “আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, সেসব পেয়ে যাবে। এখনও তো ফাইনাল বিল পাইনি। পি ডব্লিউ ডি আগে কমপ্লিশন রিপোর্ট দিক, তবে তো ওরা ছাড়বে! আমিও ঘরে লাভ তুলিনি এখনও। সবার কাছ থেকে নেয়া মূল টাকা শোধ করছি। শেষ টাকাটা এলে সবার লাভ আমি দিয়ে দেব। তুমি তো জানো আমি কারও টাকা মারি না।”
তা ঠিক। মালবাবু জানেন, অনেক বছর হয়ে গেল, বনবিহারীর সঙ্গে গোপন কারবার করছেন সরকারী চাকরি বাঁচিয়ে। বনবিহারী ঠিক সময় মত সুদে মূলে টাকা ফেরৎ দিয়েছে। মালবাবু কথা ঘোরাতে চাইলেন। এই যে লাভের অংশ চেয়ে বসে তিনি খানিকটা অপ্রতিভ হয়েছেন। সেখান থেকে ফিরতে বললেন, “এই যে টাকা ফিরে এল, কিন্তু আমার গঙ্গারাম কতদিন হয়ে গেল এখনও ঘরে ফিরল না।”
গঙ্গারামের কথা ওঠায় বনবিহারীর মুখে একটা আফশোসের ধ্বনি উঠল বটে, তবে মুখে একটা কালো মেঘের ছায়া পড়ল। তো তো করতে করতে বললেন, “এতদিন গঙ্গারাম ফেরেনি যখন, তার আশা ছেড়ে দাও। আমি না হয় তোমার জন্য ভাল জাতের একটা কুকুর কিনে এনে দি।”
“কী বলছ বনবিহারী! গঙ্গারাম কি কুকুর মাত্র, সে আমার পরিবারের একজন। ওকে ছেড়ে থাকাটাই তো কষ্টের।” 🍁(চলবে)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার,  কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকারঅঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক 

 

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন