তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, বিশাখাপত্তনম : বিশাখাপত্তনমের মাঠে এক অভাবনীয় নাটক। বাংলার মেয়ে রিচা ঘোষ (Richa Ghosh) ব্যাট হাতে একাই লড়লেন, কিন্তু জঘন্য বোলিংয়ে ভরাডুবি হল ভারতের। দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) কাছে ৩ উইকেটে হারল হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)-এর দল। অথচ একসময় মনে হচ্ছিল, ম্যাচটা হাতের মুঠোয়।
২৫২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৮১ রানে ৫ উইকেট পড়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। সেখান থেকেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন অধিনায়ক লরা উলভার্ট (Laura Wolvaardt), ক্লোয়ি ট্রিয়ন (Chloe Tryon) ও নাদিন ডি’ক্লার্ক (Nadine de Klerk)। একের পর এক ব্যর্থতার মাঝে ভারতীয় বোলিংকে ছেলেখেলা মত নিলেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত ৫৪ বলে ৮৮ রানের ইনিংস খেলে নাদিন ডি’ক্লার্ক দলকে জেতান। আটটি চার ও পাঁচটি ছক্কায় ভরপুর সেই ইনিংস ভারতের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিল। ম্যাচ জিতলেন সাত বল বাকি থাকতে। ভারতীয় দলে তখন কেবল হতাশার ছায়া।

অন্যদিকে, রিচা ঘোষের ইনিংস ছিল ভারতীয় ইনিংসের একমাত্র ঔজ্বল্য। ৭৭ বলে ৯৪ রানের ইনিংসটি যেন একা হাতে দলকে ভরসা দিল। ১১টি চার ও ৪টি ছক্কার সেই ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে এক সময় ২৫০ পার করে ভারত। কিন্তু সেই রান রক্ষা করতে পারল না বোলাররা। রিচা নামেন আট নম্বরে, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভারত যখন ৬ উইকেটে ১০২ রানে ধুঁকছে, তখনই ক্রিজে আসেন তিনি। শুরুতে সাবধানে খেললেও ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে ফেরেন। অর্ধশতরান করেন ৫৩ বলে, তারপর মাত্র ২৪ বলে আরও ৪৪ রান যোগ করেন। শেষ ওভারে শতরানের সুযোগ ছিল, কিন্তু কোমর-উচ্চতার ফুলটসে ছক্কা মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। তিনি আউট হন ৯৪ রানে। নো-বল হওয়ার দাবি তুললেও রিপ্লেতে দেখা যায় মাত্র ৪ সেন্টিমিটার ফারাকেই বেঁচে গেলেন বোলার। কিন্তু, রিচার এই ইনিংস হয়তো হার ঢাকতে পারেনি, কিন্তু ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারের দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। হরমনপ্রীত (Harmanpreet Kaur) মাত্র ৯ রান, স্মৃতি মন্ধানা (Smriti Mandhana) ২৩ এবং জেমাইমা রদ্রিগেজ (Jemimah Rodrigues) শূন্য, এই তিন তারকার ব্যর্থতাই ভারতের ইনিংসকে ভাঙা মেরুদণ্ডে পরিণত করে।

ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, হরমনপ্রীতের বোলিং পরিবর্তনেও ভুল ছিল। শুরুতে ক্রান্তি গৌড় (Kranti Gaur) ও রেণুকা সিংহ ঠাকুর (Renuka Singh Thakur) নতুন বলে ভাল স্পেল করলেও পরে তাঁদের ব্যবহার করা হয়নি সঠিক সময়ে। পাকিস্তানের বিপক্ষে যেমন তাঁরা টানা ১৫ ওভার বল করেছিলেন, সেই আগ্রাসন দেখা গেল না। ফলে ম্যাচের মাঝপথে ছন্দ হারায় ভারতীয় বোলিং। দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে একমাত্র উলভার্টই (Laura Wolvaardt) কিছুটা লড়াই করেন শুরুতে। ৭০ রানে তিনি আউট হলেও দলের ভিত গড়ে দেন। তাঁর পর ক্লোয়ি ট্রিয়ন (Chloe Tryon) ৪৯ রানে ফিরে গেলেও সেই সময় পর্যন্ত ভারতের ম্যাচ হাতে ছিল। কিন্তু ডি’ক্লার্কের ঝোড়ো ইনিংসই সব হিসেব উলটে দেয়। তিনি শেষ ওভারের আগেই ক্রান্তি গৌড়কে নিশানা করে টানা দু’টি ছক্কা মারেন। ভারতীয় ফিল্ডাররা তখন যেন হতভম্ব। দর্শকদের চোখের সামনেই ভারতের জয় ফসকে যেতে থাকে।

ম্যাচের পর অধিনায়ক হরমনপ্রীত বলেন, “আমরা শুরুটা ভাল করেছিলাম। কিন্তু শেষ দিকে বোলিংয়ে ছন্দ হারিয়েছি। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমরা চাপ সামলাতে পারিনি।” অন্যদিকে, রিচা ঘোষ বলেন, “আমি চেষ্টা করেছিলাম দলকে বড় রান দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হারের কষ্টটা থেকেই গেল।”
ভারতের সামনে এখন রবিবার আরও বড় চ্যালেঞ্জ, অস্ট্রেলিয়া (Australia)। যদি এই ম্যাচে হরমনপ্রীতের দল নিজেদের ভুল শুধরে না নেয়, তবে বিশ্বকাপে পথ আরও কঠিন হবে। দলের ব্যাটিং অর্ডার ও বোলিং পরিকল্পনা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যত দিন না স্মৃতি মন্ধানা ও হরমনপ্রীত নিজের দায়িত্ব নিয়ে রান করছেন, তত দিন ভারতের এই সমস্যা থেকেই যাবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বাংলার রিচা ঘোষই আজ ভারতের একমাত্র আশার জাগালেন। তাঁর ব্যাটে সাহস, আগ্রাসন ও এক ভরসার বার্তা পেল দল। কিন্তু ক্রিকেটে একার লড়াইয়ে জয় আসে না। ভারতকে এখন দল হিসেবে লড়তে শিখতে হবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India vs Pakistan Women’s World Cup 2025: হরমনপ্রীতদের দাপুটে জয়, পাকিস্তানকে হারাল ৮৮ রানে




