Rajgad Travelog in Bengali with full travel details | রাজগড়ে একদিন: সাহ্যাদ্রি পাহাড়ে হারানো রাজ্যের খোঁজ

SHARE:

মধুজা সান্যাল : যখন প্রথম শুনেছিলাম মহারাষ্ট্রের (Maharashtra) রাজগড় (Rajgad) দুর্গের কথা, তখন জানতাম না যে এ একদিনের ট্রেক নয়, একটি নিঃশব্দ সংলাপ প্রকৃতি, ইতিহাস আর নিজের সঙ্গে। পুণে (Pune) শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের এই পাহাড়ি দুর্গে পৌঁছানোর রাস্তা যেন সময়ের মধ্য দিয়ে হাঁটার মতো। ট্রেক শুরুর আগেই চোখে পড়ে পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট গ্রাম। মানুষগুলো সহজ, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি, হয়ত এই পাহাড় তাদের আস্থারও প্রতীক।

নিচে নামতে নামতে পথ আরও পিচ্ছিল হচ্ছিল। পা ফসকে গেলে একপাশে খাঁদ। তবু পাহাড়ের এই রুক্ষতা ভয় না দিয়ে সাহস জাগায়। গ্রামের বাচ্চারা পাহাড়ি পথ বেয়ে স্কুলে যায় প্রতিদিন। ওদের মুখে হাসি। গাইড বলছিলেন, ‘আমরা পাহাড়ের সন্তান। এ আমাদের পথ।’ ওদের কথায় সহজ অথচ দৃঢ় বিশ্বাস।

সকালবেলায় গুনজাবানি (Gunjavane) গ্রামের রাস্তা ধরে যখন হাঁটতে শুরু করলাম, চারপাশে ভিজে মাটি আর কুয়াশার ঘ্রাণ যেন মনকে সঙ্গীতময় করে তুলছিল। পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা পাথুরে পথ। কখনও পিচ্ছিল মাটি, কখনও খাড়া পাথর। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, কত শত বছর আগে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ (Chhatrapati Shivaji Maharaj) এই পথেই হয়ত হেঁটেছেন! হয়ত তাঁর সেনাবাহিনী চলেছে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে!

দূর থেকে দেখা যায় দুর্গের প্রাচীর। সেই প্রাচীর যেন পাহাড়ের গায়ে মুকুট। কাছে আসতেই টের পেলাম, রাজগড় কেবল দুর্গ নয়, পুরো একটি পাহাড়কে আঁকড়ে থাকা প্রাচীন রাজত্ব। এ যেন ঘুমন্ত অজগর, যার শরীর জুড়ে ইতিহাসের খোঁজ। গেটওয়ে দিয়ে প্রবেশের পরেই চোখে পড়ল পাথরের সিঁড়ি। প্রতিটি পাথরেই সময়ের ক্ষয়, সবুজ শ্যাওলা আর নীরবতার সাক্ষর। ওপরের দিকে উঠতেই হাওয়ার বেগ বাড়ছিল। রাজগড়ের সর্বোচ্চ অংশ ‘বালকিলা’ (Balekilla)। এখান থেকে নিচের কোঙ্কন (Konkan) সমতলভূমি দেখা যায়। মনে হয়, আকাশ হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। মেঘগুলো যেন কাছে এসে মুখে ঠেকছে। একদিক দিয়ে সূর্য উঠছে, অন্যদিকে মেঘের ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে সবকিছু। এমনই দ্বন্দ্ব এই দুর্গেরও, কঠোর আর কোমল, রুক্ষ আর শান্ত।

রাজগড়ের ভেতর অনেক অংশ আছে। পদ্মাবতী মচি (Padmavati Machi), সঞ্জীবনী মচি (Sanjivani Machi), সুজাই মচি (Suvela Machi) প্রত্যেকের ভিন্ন সৌন্দর্য। পদ্মাবতী মচিতে বসে এক কাপ চা খেতে খেতে যখন সামনের দৃশ্যপট দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল এই প্রকৃতি আর ইতিহাসের মেলবন্ধন জীবনের সমস্ত ব্যস্ততাকে মুছে দিতে পারে। পাহাড়ি গাইড বলছিলেন, ‘এখনও বহু মানুষ জানেন না রাজগড়ের প্রকৃত মাহাত্ম্য। শুধু শিবাজি মহারাজের রাজধানী নয়, এ দুর্গ তাঁর রাজনৈতিক কৌশলেরও নিদর্শন।’ দুর্গের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রাচীন জলের ট্যাঙ্ক, পাথরের ঘর, গোপন দরজা। ইতিহাসের ছাত্ররা বলবে, রাজগড়ে (Rajgad Fort) একসময় চলত যুদ্ধের পরিকল্পনা, গুপ্ত বার্তা পৌঁছানোর রাস্তা ছিল নির্দিষ্ট। দুর্গের খাদের ধার ঘেঁষে তৈরি পথগুলি এখন পিচ্ছিল আর শ্যাওলায় ঢাকা। তবু মনে হয়, পা ফেললেই শুনতে পাব কোনও সেনাপতির হাঁটার শব্দ! ট্রেকের শেষপ্রান্তে যখন বালকিলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, মনে হচ্ছিল এ এক জয়। কিন্তু আসলে এ জয় পাহাড়ের নয়, নিজেরই। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন শান্ত। চারদিকের বাতাসে ভিজে থাকা সবুজ গন্ধ, মাটির কোমলতা আর অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। একসময় চোখ বন্ধ করে শুধু বাতাসের তান শুনছিলাম। মনে হল, দূরে কোথাও যুদ্ধের দামামা বাজছে আর অনতি দূরত্বেই যেন কারও কণ্ঠে শিবাজির (Shivaji) নাম ধ্বনিত হচ্ছে।

নিচে নামতে নামতে পথ আরও পিচ্ছিল হচ্ছিল। পা ফসকে গেলে একপাশে খাঁদ। তবু পাহাড়ের এই রুক্ষতা ভয় না দিয়ে সাহস জাগায়। গ্রামের বাচ্চারা পাহাড়ি পথ বেয়ে স্কুলে যায় প্রতিদিন। ওদের মুখে হাসি। গাইড বলছিলেন, ‘আমরা পাহাড়ের সন্তান। এ আমাদের পথ।’ ওদের কথায় সহজ অথচ দৃঢ় বিশ্বাস।

সন্ধ্যার দিকে যখন গুনজাবানি (Gunjavane Village) ফিরে এলাম, তখন আকাশে শেষ রোদের ঝলকানি। ফিরে বুঝতে পারলাম, খিদে জানান দিচ্ছে পেট। গরম ভাত, ডাল, ভাজা মাছ আর লেবুর আচার দিয়ে খাবার খেলাম গ্রামের এক ছোট্ট হোমস্টেতে। সেই খাবারের স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। হয়ত প্রকৃতির কাছাকাছি এলে খিদেও প্রকৃতির মতোই খাঁটি হয়ে ওঠে।রাজগড় দুর্গ থেকে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, কিছু রয়ে গেল সেখানে। হয়ত এক টুকরো নিঃশব্দতা, হয়ত এক বিন্দু সাহস। বুঝলাম, পাহাড়ে যাওয়া মানে কেবল ছবি তোলা নয়, কেবল চেক ইন করা নয়, নিজের সঙ্গেই নিজে পাহাড়ে ওঠা, নিজেকে নতুনভাবে দেখা।

রাজগড়ে যেতে হলে পুণে থেকে বাস বা গাড়িতে গুনজাবানি গ্রাম পর্যন্ত যেতে হবে। সেখান থেকে শুরু হবে ট্রেক। বর্ষায় যেতে চাইলে খেয়াল রাখতে হবে পিচ্ছিল পথ। শরতের দিনে পরিষ্কার আকাশে দূরের পাহাড় দেখতে অসাধারণ লাগে। গাইড নেওয়া ভাল, কারণ দুর্গের ভেতর রাস্তা বিভ্রান্তিকর। টেন্টে রাত কাটানোরও ব্যবস্থা আছে কিছু অংশে, কিন্তু অনুমতি নিতে হবে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে।রাজগড় থেকে ফিরেও মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের মাথায় যেন একটি অদৃশ্য মুকুট রেখে এলাম। মুকুট! সেখানে গড়ে ওঠে ইতিহাস, প্রকৃতি আর মানুষের ভালবাসায়!

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Leh – Ladakh | লেহ, লাদাখ : প্রকৃতির সঙ্গে ভ্রমণ

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন