Poet Paran Majhi | কবি পরাণ মাঝি -এর কবিতাগুচ্ছ

SHARE:

জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। এক শ্বাপদ সঙ্কুল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে জীবনে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হতো হত-দরিদ্র ছোট্ট পরাণ মাঝি। বাগদার মিন ধরতে ধরতে ধরতে নদীপ্রেমে আত্মহারা; নদী তাই শৈশব থেকেই টানে। লঞ্চে রাধুনির কাজ করতে করতে কলেজে পা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষক কবি শঙ্খ ঘোষের কাছে কবিতা লেখার হাতে খড়ি। কবির প্রথম কাব্য গ্রন্থ, ‘সাঁকো’, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, ‘মন্দ বাসিনি তোকে’, ও তৃতীয় কাব্য গ্রন্থ, ‘সাদা আঁধারের কালো আলো’। এ ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নানা পত্রপত্রিকায় কবির লেখা প্রকাশিত। কবি পরাণ মাঝি ‘সাঁকো আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্রিকা’-র প্রতিষ্ঠাতা। সাশ্রয় নিউজ-এর আজকের পাতায় পাঠকদের জন্য কবির একগুচ্ছ কবিতা।

 

 

পরাণ মাঝি-এর কবিতাগুচ্ছ

হেলালপুরে 

যুবতি শব্দমালা আলগা হয়ে শুয়ে আছে বিনম্র শালায়
মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে চলে এসেছি ঘামাতুর নদী পেরিয়ে তার শ্রেয়সী তলায়

বিচ্ছেদের মত কিছু রাত স্বচ্ছ প্রেমে মিশে গেছে মোহনার কাছে এসে

“হেলাল” পুরে খুঁজে বেড়াচ্ছি একা থাকার সামান্য একটা দোচালা মাটির ঘর

ঝুলছে আগামী এবং মঞ্চ জুড়ে নির্জন বন-তল
ভেতরে ভেতরে চাপকে যিনি আমাকে সোজা করেছেন তাঁর নাম ‘হাফিজ হেলাল’—

 

লক্ষ নেত্রকোণা 

এবং
ব্যক্তিগত শব্দের চাকচিক্য ছেড়ে বেহালা জুড়ে ‘হেলাল’ পাতার স্বরগম
সকাল ছাড়িয়ে সন্ধ্যের আঁচল ভাসা নরম নদীর কলতানে নীরবে নৌকা চলে

হালে হাতের চুম্বন; পালে ‘হেলাল’ হাওয়া
জলতলে হিমেল চিত্রকল্প
নৌকার ছইয়ের ভেতর অনামিকা কুসুম গৃহস্থালি মন

শব্দ গেঁথে গেঁথে দ্রোহের গান মাঝির মুখে
লক্ষ্য — নেত্রকোণার যে জলে আগুন জ্বলে

 

সে নামে মাথা নোয়াই 

মনের প্রত্নে একলা ডাহুক; ছমছমে দিনমান
শব্দের গুগলি আর গেঁড়ি সাথে বকুলের ফল
ঘুম জড়ানো চোখ; গহন মাদল বাজে
শিশিরে ভেজা গাছের শরীর

যোগ বিয়োগের বাউল তলায় এসে দেখি
নিথর হয়ে ঘুমিয়ে আছে কবরে; প্রিয় কবি “হেলাল”
তার পাশে টেনে হিঁচড়ে নিজেকে বসাই
শরীর থেকে ছিঁড়ে ফেলা মুণ্ডু আর মন আবার জোড়া লাগাই

বাকল খুলে অভয় অরণ্যের দিকে যেতে যেতে
সে নামে মাথা নোয়াই…

 

জোছনপুরে 

নিজের ভেতরপুরে রাখা জোনাকির আলো; মেঘলপুরে টুপটাপ হাতছানি
শব্দের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ‘হেলাল’ তারা দেখি
কত দূরে তার কবিতা সুরের বাড়ি

ক্ষত শুকাবো বলে চলেছি প্রতিপদের জোছনপুরে
পুরনো পল্টন ছেড়ে জাহাজ ভিড়বে শিশির সুন্দরে
ডালিম আর কামরাঙা বন পেরিয়ে অসীম আনন্দের আকন্দ ফুলের বন্দরে

আমার প্রিয় কবিদের পাশে লেখা থাকে যাঁদের নাম
তার মাঝে জ্বল জ্বল করে “হাফিজ হেলাল”!

 

না, না ডেকো না তাঁরে 

হঠাৎ
ঝরে গেল ফুল; সাদা তার রঙ; অলুক সকাল
মোহন শব্দাঙ্গে এখন সুবাস সপ্তম সুরে
দূর সীমানায় দাঁড়িয়ে দেখি; ফুলস্টপ খবরে স্থির চোখ দু’টি আছে বুঁজে

স্মৃতির জল গড়িয়ে পড়ে শিশিরের গায়
কষ্টের হুক খুলে খুলে যায়
মিল ও অমিলের ভাবনায় ভেসে যায় কত গান
চির-ঘুমে ঘুমিয়ে আছেন “হেলাল ”

না, না
তারে এখন কেউ ডেকো না বলে এ পরাণ

বিছিয়ে দাও– কাফনের সাদায়— পরম আদরে থাকুন কবি মন
চিরকাল শুনুন তিনি একলা চলার সুর ও ক্ষণ

জ্বলুক মনের মোম চিরটাকাল সামান্য শব্দের এ বুকে

না, না
ডেকো না কেউ কবিরে ; কবি ঘুমান অনন্ত সুখে…

 

তবু ছেড়ে গেলে

রোল কল করতে করতে বেজে ওঠে গোপন ভাষ
হঠাৎ ঝরে গেছে আমার প্রেমের গোলাপ

চাইনি এসব অন্তর বিচ্ছেদ
তবু ছেড়ে গেলে সুজনেষু খাতা ও কলম

আজ ভূবন কাঁদে; শব্দের গরিমায় সব পংক্তির কান্না আমায় ছুঁয়ে যায়

চাইনি, চাইনি এমন সন্তাপ
মানকচু পাতার ওপর দোলে কচি লাউ ফল
তার কাছে গিয়ে দেখে আসি তার বেহিসেবি দোল

স্মরণ চিহ্নে ‘হেলাল’ চরণ; মন আজ উঁচাটন

 

পবিত্র প্রস্থান

আলো কম; মৃত গাঙচিল,— ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’
শব্দের দেশ; ফুলের পাহাড়– আর সাগরের ঢেউ
নাম ভূমিকায় হৃদয়ের ঋণ
ইচ্ছে ছিল— একটি পতাকা পেলে পৃথক পাহাড়ে থাকবেন কিছু দিন

রয়ে গেল মনে কেবল— অমিমাংসিত সন্ধি
এবং ঘোর রাজনীতি

ব্রক্ষ্মপুত্রের মেয়ে কী আর কাঁদবে— তুমি তুমি করে…
তোমার জন্য তাঁর পরম দান— পবিত্র এ প্রস্থান!

 

 

অপেক্ষার ঘাম মুছে মুছে 

কাঁটা তার পেরিয়ে কতবার বসেছি তোমার ঋ.দ. এ-র মাঠে
দেখেছি— একদিকে জ্বলছে আগুন; অন্য দিকে জুঁই পাহাড়

অপেক্ষার ঘাম মুছে মুছে
কীভাবে হয়েছিলে শান্ত শীতল অথচ ভীষণ উচ্ছ্বল
কীভাবে বিছিয়ে ছিলে প্রেম পংক্তির শরীরে
কীভাবে তিল তিল করে পুড়ে পুড়ে নিজেকে গড়ে তুলে ছিলে
শব্দের সাগরে ভাসিয়ে ছিলে ঋ.দ.য় তরী বক ফুলের ছায়ায়

উল্টো পথ; অসম বিপদ তবু ছিলে ধীর স্থির
রক্তের ভেতর কত তুমি পুষেছিলে কবি; শোকগান
আলোকিত মরমি বিতান

 

চলেছিল কলম তার অতুল বৈভবে 

একেক দিন ঘুম ছুটে যায়; ফেরে না সহজে
জোনাকি পোকা এসে ঢেকে দেয় শরীর
আঁধার তবু আঁধারে জেগে থাকে ঋ.দ.য়…

চাঁদের গলনের মতো গলে সব গবেষণা
বিচ্ছেদ বেদনার রুমালে তবু মন ঢেকে ‘হেলাল’ হাসি ফুটিয়ে ছিল মুখের আয়নায়

বাঁকেনি নিরিখ
চলেছিল কলম তার অতুল বৈভবে

তাঁর সেই শূন্য নদী-তীরে এখন নৌকা ভাসে হাওয়ায়

 

সাদা সাদা মেঘ ফুল

দ্যাখে না কেউ; কেউ কী দ্যাখে অন্তর আগলে
মিঠে কথার জৌলুস বেজে ওঠে নিরবধি

আড়াল করা আঁধার
একা কাঁদে শোকগান

ছলনার ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রেমল বুকে
‘হেলাল’ শব্দ রেখায় লুকায় দ্বৈরথ

সুবর্ণ সে মহিয়ান; মনোনদে দ্রোহের পংক্তি নাচে

আমি তাঁর চরণে রাখি সাদা সাদা মেঘ ফুল

 

হেলাল হাওয়ায় 

নদী নাকি ঢেকে রাখে ঋ.দ.য় পুর
সময় নাচে; জল বাজে; মেঘ ভাসায় বুকের আয়নায়

বারবার
শতবার
অসীম সংখ্যায় তারাদের প্রেম আগুন স্রোতের চুম্বনে জ্বলে

নির্জন ঠোঁটের ডগায় শব্দ ফোটে
মাঝি জানে; জলেরাও জানে ছেঁড়া ছেঁড়া জালে মাছেদের বীরত্ব

তবু নৌকা চলে “হেলাল” হাওয়ার পালে
সুদূরের পানামা ছোঁবে বলে

 

বাঁশের খুঁটি ছিল লোহার থেকেও শক্ত 

হঠাৎ এসে একটা যুবতি পাখি বাসা বেঁধেছিল সুচন্দন ঘরে
ছিলও বেশ কিছু দিন; চলছিলও বেশ
তারপর অভাবের ঝড়ে উড়ে গেল বৈভব বাগানে

কোলে রাখা মাথা
চোখে রাখা চোখ
ঠোঁটের কাছে ঠোঁট দীর্ঘশ্বাসের সুজনেষু মন থেকে বানের জলের মতো ভেসে গেল প্রেম

বাঁশের খুঁটি ছিল লোহার থেকেও শক্ত
নড়েনি এক তিল
শুধু কেঁপে ছিল ফুলেল শব্দের পাহাড়
প্রিয়জন ছেড়ে গেলে একাই নিভিয়ে ছিল সে আগুন পংক্তির জলে

কবি তো সেই মানুষ; ব্যথা সহে, বিরহ বুকে জড়িয়ে আঁধারে আলো জ্বালে—

তুমিও কবির প্রিয়তমা; বুঝেছো কী সে মরম কোনো কালে?

চান ঘরে নিভেছে বাতি 

পাতা ঝরার দিনে; নক্ষত্র পতনে ন্যায় নিশ্চিত চলে গেলে
সাদা রঙ রইলো ছড়িয়ে
সমাধির পাশে পাখিটি হয়ে যদি পারতাম যেতে
এই দিনগত শোকানল ছুঁয়ে

বিজয় দেখেছো তুমি; পরাজয়ও বুঝেছিলে ঘুমের আগে

এখন সে কামরাঙা বনে হাজার মাছরাঙা পাখি
জানি না তুমি দেখেছো নাকি
ধিকিধিকি তবু জ্বলছে জোনাকি

করুণা করে নিয়ে যাও তারে –আমরা শব্দে গাঁথি মালা, পরাবো তোমার কবরে

চান ঘরে নিভেছে বাতি
পাঁকে ডুবছি যারা পদে পদে
হাত ধরে হেঁচকা টানে কে বাঁচাবে এ বিপদে
তারা হয়ে জ্বালো আলো
সন্তর্পণে পার করো— ভুলিয়ে দাও বিভেদ বেড়াজাল

 

সুবর্ণতলে 

জ্বলো তুমি; জ্বালাও আকাশ লণ্ঠন
শব্দের সীমার ভেতর অসীম সে আলো

চুপি চুপি ছুঁতে গিয়েছি; মন ডুবেছে সে সাগরের জলে
বিস্ময় অতলে মুখোশ খুলে যেই ঢুকেছি সুবর্ণতলে

ডেকেছো ‘হেলাল’ তুমি শিশুতোষ মনে
সীমানার ওপারে তুমি ফুটিয়েছো পংক্তির ফুল
দূর থেকে মনে মনে ছুঁয়েছি তার পাপড়ি প্রেম

এখন—
বেঁধেছো যে ঘর; ঠিকানা দাও তার; খোলো দ্বার
অদৃশ্য সংসারে আমি যে অতিথি তোমার

 

 

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার,  কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকারঅঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক 

 

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন